বিশেষজ্ঞ অভিমত
মেহেদী আহমেদ আনসারী

গত ২৪ জুন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প। ৭ থেকে ৮ মাত্রার এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির খবর জানিয়েছে দেশটির সরকার। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ হাজার ৭৪০ জন। ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে থাকা বহু মানুষের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। সরকারি হিসাব মতেই অন্তত ৮৫৬টি ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
ভেনেজুয়েলার এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের মনে একটি প্রশ্ন ও আতঙ্ক উঁকি দেয়—ঠিক একই মাত্রার (৭-৮) একটি ভূমিকম্প যদি রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কী হবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা তুরস্কেও ভয়াবহ ভূমিকম্প দেখেছি। সেখানে ৭.৫ ও ৭.৬ মাত্রার ব্যাক-টু-ব্যাক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। তবে তুরস্কের ওই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ইস্তাম্বুল বা আঙ্কারার মতো প্রধান শহরগুলো থেকে বেশ দূরে ছিল। প্রধান শহরগুলোতে ভূমিকম্প সহনীয় ভবনের সংখ্যা বেশি থাকায় এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকায় শহরগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, তুরস্কের ইস্তাম্বুল এবং বাংলাদেশের ঢাকার মধ্যে একটি বড় ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—জনঘনত্ব। তুরস্ক বা ভেনেজুয়েলার শহরগুলোর তুলনায় ঢাকার জনঘনত্ব অন্তত ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।
তুরস্কের আঙ্কারায় সাধারণত ৪০ বছর পরপর বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড থাকলেও ভেনেজুয়েলায় এবারের ভূমিকম্পটি ঘটেছে ১২৫ বছর পর। ভেনেজুয়েলা একসময় তেলসমৃদ্ধ ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হলেও সম্প্রতি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ নাজুক। বিভিন্ন তথ্য ও লেখাপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলার এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে বড় কারণ ছিল নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কংক্রিট ও রডের চরম নিম্নমান।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই জায়গাটিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার এক ভয়াবহ মিল রয়েছে। আমাদের দেশে গড়ে ওঠা হাজার হাজার ভবনে যে কংক্রিট বা রড ব্যবহার করা হচ্ছে, তার গুণগত মান কতটা সঠিক, তা যাচাই করার যেন কেউ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল বা ইলেকট্রনিক সিস্টেমে কেবল একটি সিল মেরেই তাদের দায় সারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই ভবনের নকশা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কি না, রড-সিমেন্টের অনুপাত ঠিক আছে কি না—এসব ফিল্ড লেভেলে চেক করার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাজউকের নেই। তাদের সীমিত সংখ্যক পরিদর্শক দিয়ে এই বিশাল শহরের লাখ লাখ ভবন তদারকি করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।
পুরো বিশ্ব এখন 'থার্ড পার্টি' বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের (কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স) কাজ করে। কিন্তু আমাদের এখানে নতুন নির্মাণাধীন ভবনগুলো দেখভালের কোনো লোক নেই, আর আগে থেকে নির্মিত পুরোনো ভবনগুলোর কাঠামোগত ঘাটতি তো আরও মারাত্মক পর্যায়ে।
ভেনেজুয়েলার ১২৫ বছরের বিরতির পর আসা এই ভূমিকম্পে সাড়ে তিন হাজার মৃত্যুর কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা দশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে খোদ ভেনেজুয়েলাই আশঙ্কা করছে। তুরস্কে মৃত্যু হয়েছিল ৫০ হাজারের বেশি। ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবিগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা ১০টি ভবনের মধ্যে হয়তো ২টি ধসে গেছে, বাকি ৮টি দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর কংক্রিট কোয়ালিটি হয়তো ভালো ছিল। এই একই দৃশ্য তুরস্কেও দেখা গেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকায় এমন মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষতির মাত্রা কেমন হবে? বর্তমানে ঢাকা শহরে চার তলার ওপরের ভবনের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। আর এক-দোতলা ও ছাপড়া ঘর মিলিয়ে মোট ভবনের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১০ তলার ওপরের বহুতল ভবন আছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার। সাধারণত ১০ তলার ওপরের ভবনগুলোতে বিনিয়োগ বেশি থাকে বলে বড় কোম্পানিগুলো ভালো প্রকৌশলী দিয়ে এর গুণগত মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মূল বিপদের জায়গাটি হলো ৪ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবনগুলো। এগুলোর নির্মাণেই সবচেয়ে বেশি গাফিলতি ও অনিয়ম হয়েছে।
২০০৯ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর এক গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছিল যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। আমি নিজে ওই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন ঢাকায় মোট ভবন ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার। ১৭ বছর পর ২০২৬ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই ভবনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ হয়েছে। জাইকার সাম্প্রতিক হিসাবগুলোও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় বর্তমানে এই ধসে পড়া ভবনের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার হতে পারে। অর্থাৎ, বহুতল ভবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভবনই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের নিজস্ব ক্যালকুলেশন অনুযায়ী, এই মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ঢাকায় অন্তত ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এই শহরে উদ্ধারকাজ চালানো বা লজিস্টিক সাপোর্ট পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এই আসন্ন মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে আমাদের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে নতুন ভবনগুলোর জন্য বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং নির্মাণকাজে 'থার্ড পার্টি' এনগেজ করে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যমান ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা যাচাইয়ের কাজ আজই শুরু করা প্রয়োজন।
অনেকেই ভাবতে পারেন, এই বিপুল সংখ্যক ভবন যাচাই করার অর্থায়ন কে করবে? আমাদের সরকারগুলোর একটি প্রবণতা হলো, তারা উদ্ধারকাজের যন্ত্রপাতি কেনার মতো বড় বাজেটের প্রজেক্ট নিতে বেশি আগ্রহী হয়, কারণ সেখানে অনেকের বৈষয়িক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ভবন চেকিংয়ের জন্য সরকারের এক টাকাও খরচ করার প্রয়োজন নেই। সরকার কেবল রাজউক বা সিডিএ-এর মাধ্যমে একটি নির্দেশনা জারি করবে যে, নাগরিকদের নিজস্ব খরচে সরকার-নির্ধারিত উপযুক্ত থার্ড পার্টি কোম্পানির মাধ্যমে নিজ নিজ ভবনের ফিটনেস যাচাই করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। একটি ১০ ফ্ল্যাটের ভবনে এই চেকিং করতে হয়তো ফ্ল্যাটপ্রতি ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হবে, যা মালিকদের নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থেই দেওয়া উচিত।
সরকারের আরেকটি বড় অস্ত্র হতে পারে 'অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' (বসবাসের ছাড়পত্র)। ঢাকায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ ভবনের এই সার্টিফিকেট আছে! অর্থাৎ প্রায় কারোরই সঠিক ডকুমেন্টেশন নেই। থার্ড পার্টি চেকিং বাধ্যতামূলক করা হলে সবার ডকুমেন্টেশন তৈরি হবে। রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে এভাবেই আমূল পরিবর্তন এসেছে। সরকার প্রয়োজনে ভবন মজবুত করার (রেট্রোফিটিং) জন্য ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।
তবে এই কাজগুলো করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। আমাদের দেশে হয়তো হাজার খানেক এমন প্রকৌশলী আছেন, যা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। তাই নতুন গ্রাজুয়েটদের ৩ থেকে ৬ মাসের শর্ট কোর্স এবং প্র্যাকটিসিং ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। এছাড়া, নেপাল বা ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ অর্থ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা করে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সর্বোপরি, এই সংকট মোকাবিলায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা 'পলিটিক্যাল উইল'। পশ্চিমা বিশ্ব বা প্রতিবেশী ভারতেও এমন কারিগরি বিষয়গুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসেই সমাধান করে। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা যদি এখনই এই উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তবে আমরা হয়তো বাঁচতে পারার শেষ সুযোগটিও হারাব। কারণ ভূমিকম্প নিজে মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধসে পড়ার কারণে। তাই সময় থাকতে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

গত ২৪ জুন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প। ৭ থেকে ৮ মাত্রার এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির খবর জানিয়েছে দেশটির সরকার। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ হাজার ৭৪০ জন। ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে থাকা বহু মানুষের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। সরকারি হিসাব মতেই অন্তত ৮৫৬টি ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
ভেনেজুয়েলার এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের মনে একটি প্রশ্ন ও আতঙ্ক উঁকি দেয়—ঠিক একই মাত্রার (৭-৮) একটি ভূমিকম্প যদি রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কী হবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা তুরস্কেও ভয়াবহ ভূমিকম্প দেখেছি। সেখানে ৭.৫ ও ৭.৬ মাত্রার ব্যাক-টু-ব্যাক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। তবে তুরস্কের ওই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ইস্তাম্বুল বা আঙ্কারার মতো প্রধান শহরগুলো থেকে বেশ দূরে ছিল। প্রধান শহরগুলোতে ভূমিকম্প সহনীয় ভবনের সংখ্যা বেশি থাকায় এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকায় শহরগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, তুরস্কের ইস্তাম্বুল এবং বাংলাদেশের ঢাকার মধ্যে একটি বড় ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—জনঘনত্ব। তুরস্ক বা ভেনেজুয়েলার শহরগুলোর তুলনায় ঢাকার জনঘনত্ব অন্তত ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।
তুরস্কের আঙ্কারায় সাধারণত ৪০ বছর পরপর বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড থাকলেও ভেনেজুয়েলায় এবারের ভূমিকম্পটি ঘটেছে ১২৫ বছর পর। ভেনেজুয়েলা একসময় তেলসমৃদ্ধ ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হলেও সম্প্রতি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ নাজুক। বিভিন্ন তথ্য ও লেখাপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলার এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে বড় কারণ ছিল নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কংক্রিট ও রডের চরম নিম্নমান।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই জায়গাটিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার এক ভয়াবহ মিল রয়েছে। আমাদের দেশে গড়ে ওঠা হাজার হাজার ভবনে যে কংক্রিট বা রড ব্যবহার করা হচ্ছে, তার গুণগত মান কতটা সঠিক, তা যাচাই করার যেন কেউ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল বা ইলেকট্রনিক সিস্টেমে কেবল একটি সিল মেরেই তাদের দায় সারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই ভবনের নকশা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কি না, রড-সিমেন্টের অনুপাত ঠিক আছে কি না—এসব ফিল্ড লেভেলে চেক করার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাজউকের নেই। তাদের সীমিত সংখ্যক পরিদর্শক দিয়ে এই বিশাল শহরের লাখ লাখ ভবন তদারকি করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।
পুরো বিশ্ব এখন 'থার্ড পার্টি' বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের (কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স) কাজ করে। কিন্তু আমাদের এখানে নতুন নির্মাণাধীন ভবনগুলো দেখভালের কোনো লোক নেই, আর আগে থেকে নির্মিত পুরোনো ভবনগুলোর কাঠামোগত ঘাটতি তো আরও মারাত্মক পর্যায়ে।
ভেনেজুয়েলার ১২৫ বছরের বিরতির পর আসা এই ভূমিকম্পে সাড়ে তিন হাজার মৃত্যুর কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা দশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে খোদ ভেনেজুয়েলাই আশঙ্কা করছে। তুরস্কে মৃত্যু হয়েছিল ৫০ হাজারের বেশি। ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবিগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা ১০টি ভবনের মধ্যে হয়তো ২টি ধসে গেছে, বাকি ৮টি দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর কংক্রিট কোয়ালিটি হয়তো ভালো ছিল। এই একই দৃশ্য তুরস্কেও দেখা গেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকায় এমন মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষতির মাত্রা কেমন হবে? বর্তমানে ঢাকা শহরে চার তলার ওপরের ভবনের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। আর এক-দোতলা ও ছাপড়া ঘর মিলিয়ে মোট ভবনের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১০ তলার ওপরের বহুতল ভবন আছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার। সাধারণত ১০ তলার ওপরের ভবনগুলোতে বিনিয়োগ বেশি থাকে বলে বড় কোম্পানিগুলো ভালো প্রকৌশলী দিয়ে এর গুণগত মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মূল বিপদের জায়গাটি হলো ৪ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবনগুলো। এগুলোর নির্মাণেই সবচেয়ে বেশি গাফিলতি ও অনিয়ম হয়েছে।
২০০৯ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর এক গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছিল যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। আমি নিজে ওই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন ঢাকায় মোট ভবন ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার। ১৭ বছর পর ২০২৬ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই ভবনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ হয়েছে। জাইকার সাম্প্রতিক হিসাবগুলোও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় বর্তমানে এই ধসে পড়া ভবনের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার হতে পারে। অর্থাৎ, বহুতল ভবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভবনই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের নিজস্ব ক্যালকুলেশন অনুযায়ী, এই মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ঢাকায় অন্তত ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এই শহরে উদ্ধারকাজ চালানো বা লজিস্টিক সাপোর্ট পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এই আসন্ন মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে আমাদের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে নতুন ভবনগুলোর জন্য বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং নির্মাণকাজে 'থার্ড পার্টি' এনগেজ করে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যমান ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা যাচাইয়ের কাজ আজই শুরু করা প্রয়োজন।
অনেকেই ভাবতে পারেন, এই বিপুল সংখ্যক ভবন যাচাই করার অর্থায়ন কে করবে? আমাদের সরকারগুলোর একটি প্রবণতা হলো, তারা উদ্ধারকাজের যন্ত্রপাতি কেনার মতো বড় বাজেটের প্রজেক্ট নিতে বেশি আগ্রহী হয়, কারণ সেখানে অনেকের বৈষয়িক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ভবন চেকিংয়ের জন্য সরকারের এক টাকাও খরচ করার প্রয়োজন নেই। সরকার কেবল রাজউক বা সিডিএ-এর মাধ্যমে একটি নির্দেশনা জারি করবে যে, নাগরিকদের নিজস্ব খরচে সরকার-নির্ধারিত উপযুক্ত থার্ড পার্টি কোম্পানির মাধ্যমে নিজ নিজ ভবনের ফিটনেস যাচাই করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। একটি ১০ ফ্ল্যাটের ভবনে এই চেকিং করতে হয়তো ফ্ল্যাটপ্রতি ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হবে, যা মালিকদের নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থেই দেওয়া উচিত।
সরকারের আরেকটি বড় অস্ত্র হতে পারে 'অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' (বসবাসের ছাড়পত্র)। ঢাকায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ ভবনের এই সার্টিফিকেট আছে! অর্থাৎ প্রায় কারোরই সঠিক ডকুমেন্টেশন নেই। থার্ড পার্টি চেকিং বাধ্যতামূলক করা হলে সবার ডকুমেন্টেশন তৈরি হবে। রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে এভাবেই আমূল পরিবর্তন এসেছে। সরকার প্রয়োজনে ভবন মজবুত করার (রেট্রোফিটিং) জন্য ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।
তবে এই কাজগুলো করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। আমাদের দেশে হয়তো হাজার খানেক এমন প্রকৌশলী আছেন, যা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। তাই নতুন গ্রাজুয়েটদের ৩ থেকে ৬ মাসের শর্ট কোর্স এবং প্র্যাকটিসিং ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। এছাড়া, নেপাল বা ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ অর্থ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা করে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সর্বোপরি, এই সংকট মোকাবিলায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা 'পলিটিক্যাল উইল'। পশ্চিমা বিশ্ব বা প্রতিবেশী ভারতেও এমন কারিগরি বিষয়গুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসেই সমাধান করে। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা যদি এখনই এই উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তবে আমরা হয়তো বাঁচতে পারার শেষ সুযোগটিও হারাব। কারণ ভূমিকম্প নিজে মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধসে পড়ার কারণে। তাই সময় থাকতে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
.png)

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন শিক্ষিক, কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণি
৪ ঘণ্টা আগে
ভারতীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে আদালতের নির্দেশের দোহাই দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে দিল্লি পুলিশ ভেবেছিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি হয়ত থেমে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, উল্টো এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে গেল।
১৭ ঘণ্টা আগে
অতি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার অভাবকে ইঙ্গিত করে শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া “ফার্মের মুরগী” সংক্রান্ত রূপক এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ও দুঃখ প্রকাশ রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক বিতর্কের অবতারণা করেছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
পর্দা নামল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ষোলোটি শহরে এক মাস ধরে চলা এই মহাযজ্ঞ এখন স্মৃতি। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও ছিল এই আনন্দের অংশীদার।
১৮ ঘণ্টা আগে