ফারাক্কা লংমার্চ কি বাংলাদেশের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘ক্লাইমেট জাস্টিস’, ‘এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস’ বা ‘ওয়াটার পলিটিক্স’ শব্দগুলো ইদানীং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব আলোচিত শব্দ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রায় পাঁচ দশক আগেই এই ‘পরিবেশ রাজনীতি’ নিয়ে আন্দোলন করেছে।

ভাবছেন, কীভাবে? ১৯৭৬ সাল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র পাঁচ বছর পেরিয়েছে। ভারত সরকার ঘোষণা দিল, তারা বাংলাদেশের সীমান্তের প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের মালদা-মুর্শিদাবাদের মনহরপুরে গঙ্গা মোহনায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করবে।

বলাই বাহুল্য, এতে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও জীবন-জীবিকা পড়বে চরম হুমকির মুখে। তাই মাওলানা ভাসানী এই বাঁধের প্রতিবাদে ডাক দিলেন ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের। দিনটি ছিল ১৬ মে, ১৯৭৬।

তারপর পেরিয়ে গেছে পঞ্চাশ বছর। কিন্তু ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ আজও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নদীকে কেন্দ্র করে এত বড় গণসমাবেশ আর হয়নি বললেই চলে।

ভাষা আন্দোলন ছিল ভাষার অধিকারের জন্য, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল রাজনৈতিক মুক্তির জন্য, মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য। কিন্তু ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লংমার্চ ছিল ব্যতিক্রমী এক রাজনৈতিক কর্মসূচি, যার কেন্দ্রে ছিল একটি নদী এবং সেই নদীর পানি। সেই অর্থে এটি শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন।

ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ভারত সরকারের উদ্যোগে ১৯৬০-এর দশকে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যারাজ চালু হয়। কিন্তু তখন থেকেই বাংলাদেশে উদ্বেগ তৈরি হতে থাকে। কারণ গঙ্গার মূল প্রবাহ থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পদ্মা নদী ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।

এই উদ্বেগ অমূলক ছিল না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের বহু নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়। কৃষিতে সেচসংকট তৈরি হয়, মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততাও বৃদ্ধি পায়। ‘পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব ফারাক্কা ব্যারাজ অ্যান্ড ইটস ইফেক্টস অন এনভায়রনমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘উজানের পানি প্রত্যাহার’ বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসেন মাওলানা ভাসানী। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর। কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করতেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তাঁর বয়স প্রায় নব্বইয়ের কাছাকাছি। শারীরিকভাবেও দুর্বল ছিলেন। কিন্তু গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তিনি লং মার্চের ঘোষণা দেন।

১৬ মে রাজশাহী থেকে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক কর্মসূচি। হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নেয়। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, দেশের নানা অঞ্চল থেকে মানুষ ট্রেন, লঞ্চ, বাস ও পায়ে হেঁটে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে পৌঁছেছিল। সেখান থেকে মিছিল গিয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে। আন্দোলনের দাবি ছিল সহজ— ‘পানি চাই’, ‘নদী বাঁচাও’, ‘দেশ বাঁচাও’।

তৎকালীন দৈনিক বাংলায় ফারাক্কা লংমার্চের খবর। ছবি: সংগ্রামের নোটবুক থেকে নেওয়া
তৎকালীন দৈনিক বাংলায় ফারাক্কা লংমার্চের খবর। ছবি: সংগ্রামের নোটবুক থেকে নেওয়া

ফারাক্কা লংমার্চকে দীর্ঘদিন শুধু ‘ভারতবিরোধী’ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এত ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাসানী বারবার বলেছিলেন, পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হবে। অর্থাৎ তিনি নদীকে কেবল কূটনৈতিক বিরোধের বিষয় হিসেবে না দেখে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন।

আজকের ভাষায় যাকে ‘এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস মুভমেন্ট’ বলা হয়, ফারাক্কা লংমার্চের মধ্যে তার প্রাথমিক রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ এটি ছিল এমন এক আন্দোলন, যেখানে পরিবেশগত ক্ষতির বিরুদ্ধে জনগণের রাজনৈতিক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। নদীর পানি কমে গেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জেলে জীবিকা হারাবে, নৌপথ সংকুচিত হবে, মাটির উর্বরতা কমবে— অর্থাৎ পুরো বাস্তুতন্ত্র বদলে যাবে; যার প্রভাব পড়বে পুরো দেশেই। এই বাস্তবতা ভাসানী তখনই উপলব্ধি করেছিলেন। তার ফলেই তিনি সেই সময় হাজার হাজার মানুষকে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নদী সবসময়ই ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশর মতো নিম্নভূমির বদ্বীপ রাষ্ট্রে পানি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও। উজানের দেশ যদি পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ভাটি অঞ্চলের দেশের কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা ও পরিবেশের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। সেই কারণেই ফারাক্কা ইস্যু দ্রুত পানি রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।

ফারাক্কা নিয়ে উদ্বেগ পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণের প্রবণতা, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ও লবণাক্ততার সমস্যা বেড়েছে। নদীভিত্তিক জীবিকা কমে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন ১৯৯৮ সালে স্প্রিঙ্গার জার্নালে প্রকাশিত গবেষক মনিরুল মির্জার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ফারাক্কার কারণে গঙ্গা ও গড়াই নদীর শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, বন, শিল্প ও পানীয় জলের ওপর।

এসব কারণে অনেক গবেষক এখন ফারাক্কা লংমার্চকে বাংলাদেশের পরিবেশ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন। কারণ এখানে নদীকে ‘রিসোর্স’ হিসেবে নয়, ‘লিভিং সিস্টেম’ হিসেবে দেখা হয়েছিল। নদী মানে লোকসংস্কৃতি, ব্যবসা, কৃষি, খাদ্য, স্মৃতি তথা জীবন ধারণের প্রধান অংশ। ফলে নদীর পরিবর্তন মানে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। বর্তমানে বাংলাদেশে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, খরা, এগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গেই পানি ও নদী ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ফারাক্কা নিয়ে ভাসানীর উদ্বেগকে এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

ভাসানী অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে পানির প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আজ যখন তিস্তা চুক্তি, আন্তঃসীমান্ত নদী কিংবা আঞ্চলিক পানি কূটনীতি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন ফারাক্কা লংমার্চ নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল ফারাক্কা কমিটির একাধিক বিবৃতিতেও বারবার বলা হয়েছে, ফারাক্কা শুধু অতীতের কোনো ইস্যু নয়। এটি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলে। সংগঠনটির মতে, একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৯৭০-এর দশকের বাংলাদেশি রাজনীতিতে ‘এনভায়রনমেন্টালিজম’ শব্দটি প্রায় অনুপস্থিত ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতাও ছিল সীমিত। তবু ফারাক্কা লংমার্চের মধ্যে পরিবেশ-সচেতনতার একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি দেখা যায়। সেখানে নদী রক্ষার প্রশ্ন ছিল, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন ছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে ছিল উদ্বেগও।

তথ্যসূত্র: ডাইভারশন অব দ্য গ্যাঞ্জেস ওয়াটার অ্যাট ফারাক্কা, ইমপ্যাক্ট অব দ্য ফারাক্কা ড্যাম অন থ্রেসহোল্ড অব দ্য হাইড্রোলিক ফ্লো রেজিম ইন দ্য লোয়ার গ্যাঞ্জেস রিভার বেসিন ও ইন্ডিয়ান হেজিমনি অন ওয়াটার ফ্লো অব দ্য গ্যাঞ্জেস

সম্পর্কিত