ইনস্ক্রিপ্টের লেখা

মমতার বাংলাদেশ মন্তব্যে জল্পনা তুঙ্গে

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিস্ফোরক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। গত ২ জুন ধর্নামঞ্চ থেকে তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এক অভিযুক্তকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার তদন্তে উঠে আসা কিছু তথ্য প্রকাশ্যে না আনার জন্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

কলকাতার ধর্মতলায় ওয়াই-চ্যানেলে ধর্নায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা একটা বড় খুনিকে এসটিএফ অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার সেই অধিকার নেই। কিন্তু আমার মুখ্য বক্তব্য হলো, তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গ) চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে।’

মমতার কথায়, তদন্তের সময় এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছিল যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথা ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার।’

মমতার দাবি, ওই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেন, আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়। এটা দেশের স্বার্থে।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ঘটনার নাম উল্লেখ করেননি। কিন্তু তিনি যে কয়েকটি সূত্র দিয়েছেন, তা থেকেই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তিনি বলেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল এবং পরে এসটিএফ তাকে গ্রেপ্তার করে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, তিনি সম্ভবত শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গই তুলেছেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনা। সেই ঘটনার তদন্ত, অভিযুক্তদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য নতুন করে পুরনো প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, ঢাকার পল্টন এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে। সেদিন জুম্মার নামাজ শেষে তিনি একটি রিকশায় করে যাচ্ছিলেন। দুপুর প্রায় ২টা ২৫ মিনিট নাগাদ একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই হামলাকারী তাঁর রিকশার কাছে এসে গুলি চালায়। পুলিশের দাবি, মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে হাদির মাথায় গুলি করে। পুরো ঘটনাটি আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, অবরোধ এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান।

তদন্তকারীদের বাংলাদেশের পুলিশ দাবি করে, হাদি হত্যা মামলার দুই প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে আসে। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে এসটিএফ। পরে তদন্তে ফিলিপ সাংমা নামে এক সীমান্ত-দালালের নামও সামনে আসে, যিনি অভিযুক্তদের ভারতে প্রবেশে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ।

বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাদি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের জনপরিসরে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠছিলেন। জুলাই-পরবর্তী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন এবং একাধিক বিতর্কিত বিষয়ে সরব অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হতে পারে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের দাখিল করা চার্জশিটে ১৭ জনের নাম উঠে আসে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, হামলার পরিকল্পনা, অর্থ জোগান এবং ঘাতকদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা—সবই একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে করা হয়েছিল। চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন।

তবে অভিযুক্তদের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শিবির শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তদন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার জন্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে এখনও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তদন্তকারীদের দাবি ও অভিযুক্তদের অস্বীকার—দুই পক্ষের বক্তব্যই সমানভাবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

এই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তদন্ত চলাকালীন কিছু নাম উঠে এসেছিল, যেগুলি জনসমক্ষে আসেনি। ফলে হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সীমান্তপারের যোগাযোগ এবং তদন্তের অপ্রকাশিত তথ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

তবে এখনও পর্যন্ত তৃণমূল নেত্রী স্পষ্টভাবে জানাননি তিনি ঠিক কোন হত্যাকাণ্ডের কথা বলছিলেন। তাঁর বক্তব্যে এমন কোনো নামও নেই, যা থেকে নির্দিষ্টভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। কিন্তু রাজনৈতিক ভাষণের মধ্যেই তিনি এমন ইঙ্গিত রেখে গিয়েছেন, যা দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।

ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি সত্যিই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো নাম উঠে এসে থাকে, তাহলে সেই তথ্য এতদিন প্রকাশ্যে এল না কেন? আবার অন্য একটি অংশের মত, কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য বা সরকারি নথি ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।

ভারতের রাজনৈতিক মহলেও এই মন্তব্যের তাৎপর্য কম নয়। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে দাবি করেছেন, তাঁকে তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এই অভিযোগ সত্য হলে তা কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাজের ধরন এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ তদন্তের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অমিত শাহ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও মমতার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। ফলে অভিযোগ এবং পাল্টা ব্যাখ্যার মধ্যবর্তী একটি ধূসর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে জল্পনাই আপাতত সবচেয়ে বেশি।

এই প্রসঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে একটি সংবেদনশীল এলাকা। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার, অপরাধী চক্রের গতিবিধি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। ফলে তৃণমূল নেত্রীর মন্তব্য সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বোঝাতে চেয়েছেন রাজ্য প্রশাসনের কাছে এমন বহু তথ্য রয়েছে, যা জনসমক্ষে কখনও আসেনি। সেই কারণেই তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে ‘তথ্য ভাণ্ডার’ এবং ‘সত্য ভাণ্ডার’-এর প্রসঙ্গ।

তবে বাস্তবতা হলো, এখনও পর্যন্ত এই পুরো বিতর্ক অনুমান এবং ইঙ্গিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কোনো সরকারি তদন্ত রিপোর্ট, আদালতের নথি বা প্রশাসনিক তথ্য সামনে আসেনি। ফলে মমতার বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে যতই তাৎপর্যপূর্ণ হোক না কেন, তার পূর্ণ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।

  • তনভিয়া বড়ুয়া: রাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত