মতামত

বাংলাদেশের জন্য কেমন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ২২: ১৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল সংবিধানের বিধান বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ক্ষমতা থেকে বিদায়ের প্রেক্ষাপটেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কম রাষ্ট্রপতিই সম্পূর্ণ নির্ভার ও বিতর্কহীনভাবে বঙ্গভবন ত্যাগ করতে পেরেছেন। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের বিদায় ঘটেছে সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর, তবুও সেই বিদায় সব সময় রাজনৈতিকভাবে নির্বিঘ্ন ছিল না। কারও বিদায় ঘটেছে রাজনৈতিক সংকট, কারও ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পরিবর্তন, আবার কারও ক্ষেত্রে পদত্যাগ বা অপসারণের আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। ফলে বঙ্গভবনে প্রবেশ যেমন রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রতীক, তেমনি সেখান থেকে বিদায়ের ইতিহাসও বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিবর্তন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সেই ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর আগে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সময়ে আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করেন। যদিও প্রত্যেকের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রপতির পদ কখনোই সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে স্বাস্থ্যগত কারণ উল্লেখ করলেও তাঁর বিদায় এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং রাষ্ট্রপতির অবস্থান নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। ফলে তাঁর বিদায়ের মূল্যায়নও কেবল পদত্যাগপত্রের ভাষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ইতিহাসের আলোকে তা নির্ধারিত হবে। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—বাংলাদেশের জন্য কেমন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন?

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। সংবিধান অনুযায়ী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতির কার্যকারিতা কেবল সংবিধানের লিখিত বিধান দ্বারা নির্ধারিত হয় না। সরকার গঠন, সাংবিধানিক সংকট, ক্ষমতার রূপান্তর কিংবা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির বিচক্ষণতা, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক প্রজ্ঞা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে গবেষক লুডগার হেল্মস তাঁর প্রেসিডেন্টস, প্রাইম মিনিস্টার্স অ্যান্ড চ্যান্সেলর্স: এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ ইন ওয়েস্টার্ন ডেমোক্রেসিস (২০০৫) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তিগত গুণাবলির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা নির্ধারিত হয় সাংবিধানিক ক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিবেশের মাধ্যমে। অর্থাৎ, কোনো নির্বাহী নেতার কার্যকারিতা তাঁর আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ক্ষমতা কতটা দায়িত্বশীল ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তার ওপরও নির্ভর করে।

রাষ্ট্রপতিকে কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরং সংবিধানের ধারাবাহিকতা, রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও ঐকমত্যভিত্তিক করা, সংসদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। একই সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা ও প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন হয়েছে। তাই একজন রাষ্ট্রপতির মূল্যায়ন তাঁর হাতে কত ক্ষমতা ছিল, তা দিয়ে নয়; বরং তিনি সেই ক্ষমতা কতটা সংবিধানসম্মত, দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা দিয়েই হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকারিতা প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেমন সংবিধান, সরকারব্যবস্থার ধরন এবং ক্ষমতা বণ্টনের রীতি; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবেশ, যেমন দলীয় ব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের নেতৃত্বের কার্যকারিতা তাঁর আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাস্তবে কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, তার ওপর নির্ভর করে। তবে এই প্রভাব সব দেশে সমান নয়; বরং সাংবিধানিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তা ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে, একজন রাষ্ট্রপতির প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর ক্ষমতার পরিমাণে নয়, বরং তাঁর সাংবিধানিক প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের মধ্যেই নিহিত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত সীমিত হলেও, তাঁর কার্যকর নেতৃত্বের পরিধি কেবল সংবিধানের ভাষা দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, দলীয় ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংকট এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির ওপরও নির্ভর করে। ফলে একই সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা ও প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রধানত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও, সরকার গঠন, সাংবিধানিক সংকট, জরুরি অবস্থা কিংবা ক্ষমতার রূপান্তরের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতা তুলনামূলকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। সংবিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেনি; ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক পরিচয় আর কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক। তাই তাঁর প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশা—তিনি ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে সংবিধান, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।

সাংবিধানিক বিধান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক রীতিনীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় সংবিধানের লিখিত বিধানে পাওয়া যায় না; বরং গণতান্ত্রিক প্রথা, রাজনৈতিক সংযম এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার মধ্যেই এর কার্যকর দিকনির্দেশনা নিহিত থাকে। তাই রাষ্ট্রপতির প্রকৃত শক্তি তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বে নয়; বরং সংবিধানের প্রতি অবিচল আনুগত্য, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, নৈতিক সাহস এবং জনগণের আস্থার মধ্যেই নিহিত।

রাষ্ট্রপতিকে কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরং সংবিধানের ধারাবাহিকতা, রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও ঐকমত্যভিত্তিক করা, সংসদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবিধানিক রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংযম এবং গণতান্ত্রিক আচরণের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির কার্যকারিতা কেবল সংবিধানের লিখিত বিধানের ওপর নির্ভর করে না; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অঙ্গীকারের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল। রাষ্ট্রপতির পদকে মর্যাদাবান করে তোলে তাঁর ক্ষমতা নয়; বরং সংবিধানের প্রতি তাঁর আনুগত্য, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

  • ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত