ওয়ায়েজ কুরুনির মতামত
লেখা:

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের তুরস্ক সফর এবং অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে (এডিএফ) অংশগ্রহণও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে শুধু সফর, চুক্তি বা বাড়তে থাকা বাণিজ্যের দিকে তাকালে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, কেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশ তুরস্কের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
এর উত্তর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও এর সঙ্গে জড়িত।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই ‘সীমিত পরিসরে’ পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।
এর প্রভাব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও দেখা গেছে। দীর্ঘদিন দুই দেশের সম্পর্ক খুব একটা এগোয়নি। সরাসরি বিমান চলাচলও বছরের পর বছর বন্ধ ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক, একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও অনেক কমে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকলেও তার কূটনৈতিক পরিসর পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল না।
এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন একটি ধারা দেখা যাচ্ছে। অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে খলিলুর রহমানের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েই ভাবছে না; বরং আঞ্চলিক পর্যায়েও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়।
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে, যেখানে একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। এর অর্থ ভারতবিরোধিতা নয়, একটি দেশের ওপর বেশি নির্ভর না করে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানো।
এই চিন্তাধারা বাংলাদেশের জন্য নতুনও নয়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েও বাংলাদেশ তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিল। সে সময় মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ ওআইসিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং সার্ক গঠনের প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজকের বাংলাদেশ অনেকটা সেই ধারণার কাছাকাছি ফিরছে। তবে এবারের পার্থক্য হলো, বাংলাদেশ শুধু নিজের পররাষ্ট্রনীতি বদলানো নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে আগ্রহী।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার আরও কার্যকর সার্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কারণ বিশ্বের অন্যান্য সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় অভ্যন্তরীণ ঐক্য কম। তাই বাংলাদেশ এখন শুধু নিজের স্থিতিশীলতাই নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহী। তুরস্কের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক মূলত পাকিস্তান কেন্দ্রিক ছিল। সেই সম্পর্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা বদলাচ্ছে। অঞ্চলটি এখন আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয়।
এই পরিস্থিতিতে শুধু একটি অংশীদারের ওপর নির্ভর করলে তুরস্কের সুযোগ সীমিত হতে পারে। বাংলাদেশ এখানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রথমত, বাংলাদেশের আকার ও অর্থনীতি। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় জনবহুল রাষ্ট্র। গত এক দশকে এদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি দ্রুত বাড়তে থাকা একটি ভোক্তা বাজার।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থান করার কারণে দেশটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। এসব উদ্যোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করছে। ফলে বাংলাদেশ শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং আঞ্চলিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও উঠে আসছে।
চতুর্থত, তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশ তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও এখন প্রতিরক্ষা খাতে অংশীদারত্বের পরিধি বাড়াতে চাইছে, আর তুরস্ক সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
মানবিক ক্ষেত্রেও তুরস্কের ভূমিকা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর বিভিন্ন তুর্কি সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তুরস্ক সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তৈরি পোশাক, অবকাঠামো, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন খাতে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
এ সম্পর্কের গুরুত্ব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেও দেখা যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল আঙ্কারায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার তুরস্ক সফর করেন অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে অংশ নিতে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ তুরস্ককে শুধু একটি বন্ধুপ্রতিম দেশ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও দেখছে।
দক্ষিণ এশিয়া এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতিও অঞ্চলটির রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এমন সময়ে যেসব দেশ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলতে পারে, তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোতে চাইছে। কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার বদলে দেশটি একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিরও মিল রয়েছে, যেখানে বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তুরস্কের জন্য তাই বাংলাদেশকে শুধু একটি বাজার বা বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে আঙ্কারা।
এ জন্য বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনেরও প্রয়োজন নেই। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করা এবং মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পরিসরে বিকল্প ও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে তুরস্কের জন্য বাংলাদেশ একটি বড় বাজার, গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তাই বর্তমান সময়কে শুধু দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশ এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতির দিকে এগোচ্ছে। আর তুরস্কও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে।
আজ যে সম্পর্কের উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
(ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের তুরস্ক সফর এবং অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে (এডিএফ) অংশগ্রহণও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে শুধু সফর, চুক্তি বা বাড়তে থাকা বাণিজ্যের দিকে তাকালে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, কেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশ তুরস্কের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
এর উত্তর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও এর সঙ্গে জড়িত।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই ‘সীমিত পরিসরে’ পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।
এর প্রভাব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও দেখা গেছে। দীর্ঘদিন দুই দেশের সম্পর্ক খুব একটা এগোয়নি। সরাসরি বিমান চলাচলও বছরের পর বছর বন্ধ ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক, একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও অনেক কমে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকলেও তার কূটনৈতিক পরিসর পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল না।
এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন একটি ধারা দেখা যাচ্ছে। অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে খলিলুর রহমানের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েই ভাবছে না; বরং আঞ্চলিক পর্যায়েও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়।
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে, যেখানে একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। এর অর্থ ভারতবিরোধিতা নয়, একটি দেশের ওপর বেশি নির্ভর না করে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানো।
এই চিন্তাধারা বাংলাদেশের জন্য নতুনও নয়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েও বাংলাদেশ তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিল। সে সময় মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ ওআইসিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং সার্ক গঠনের প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজকের বাংলাদেশ অনেকটা সেই ধারণার কাছাকাছি ফিরছে। তবে এবারের পার্থক্য হলো, বাংলাদেশ শুধু নিজের পররাষ্ট্রনীতি বদলানো নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে আগ্রহী।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার আরও কার্যকর সার্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কারণ বিশ্বের অন্যান্য সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় অভ্যন্তরীণ ঐক্য কম। তাই বাংলাদেশ এখন শুধু নিজের স্থিতিশীলতাই নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহী। তুরস্কের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক মূলত পাকিস্তান কেন্দ্রিক ছিল। সেই সম্পর্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা বদলাচ্ছে। অঞ্চলটি এখন আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয়।
এই পরিস্থিতিতে শুধু একটি অংশীদারের ওপর নির্ভর করলে তুরস্কের সুযোগ সীমিত হতে পারে। বাংলাদেশ এখানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রথমত, বাংলাদেশের আকার ও অর্থনীতি। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় জনবহুল রাষ্ট্র। গত এক দশকে এদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি দ্রুত বাড়তে থাকা একটি ভোক্তা বাজার।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থান করার কারণে দেশটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। এসব উদ্যোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করছে। ফলে বাংলাদেশ শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং আঞ্চলিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও উঠে আসছে।
চতুর্থত, তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশ তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও এখন প্রতিরক্ষা খাতে অংশীদারত্বের পরিধি বাড়াতে চাইছে, আর তুরস্ক সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
মানবিক ক্ষেত্রেও তুরস্কের ভূমিকা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর বিভিন্ন তুর্কি সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তুরস্ক সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তৈরি পোশাক, অবকাঠামো, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন খাতে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
এ সম্পর্কের গুরুত্ব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেও দেখা যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল আঙ্কারায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার তুরস্ক সফর করেন অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে অংশ নিতে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ তুরস্ককে শুধু একটি বন্ধুপ্রতিম দেশ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও দেখছে।
দক্ষিণ এশিয়া এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতিও অঞ্চলটির রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এমন সময়ে যেসব দেশ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলতে পারে, তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোতে চাইছে। কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার বদলে দেশটি একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিরও মিল রয়েছে, যেখানে বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তুরস্কের জন্য তাই বাংলাদেশকে শুধু একটি বাজার বা বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে আঙ্কারা।
এ জন্য বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনেরও প্রয়োজন নেই। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করা এবং মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পরিসরে বিকল্প ও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে তুরস্কের জন্য বাংলাদেশ একটি বড় বাজার, গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তাই বর্তমান সময়কে শুধু দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশ এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতির দিকে এগোচ্ছে। আর তুরস্কও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে।
আজ যে সম্পর্কের উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
(ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

এপ্রিল মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির দেয়াল ভেঙে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি সংঘাতের আগুন। লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরান ও ইয়েমেনের ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরানের মূল ভূখ
২ ঘণ্টা আগে
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এমন প্রতিটি ভূকম্পনের পরই দেশজুড়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়।
৪ ঘণ্টা আগে
প্রকৃতির এই মৃদু সতর্কবার্তা কি আমরা টের পাচ্ছি? রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি দূরে নয় (৪০০-৪২০ কিলোমিটার)।
৪ ঘণ্টা আগে
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন বিশ্লেষক ও গবেষক। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২১ ঘণ্টা আগে