রাতুল আল আহমেদ

পুরো জুলাই মরণপণ লড়াই করে যখন ৫ আগস্ট গণভবনের দেয়াল ধ্বসে পড়ল আর হড়পা বানের মতো ঢুকে পড়ল বাংলাদেশের মানুষ, আক্ষরিক অর্থেই সেখানে কোনো এক শ্রেণির মানুষ ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান আশ্চর্যজনকভাবে রূপ নিয়েছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে। ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, বামপন্থী কর্মী থেকে ধর্মীয় রক্ষণশীলরাও। পনের বছরের স্বৈরতন্ত্র তাদের নিয়ে এসেছিল একমাত্র দাবির ছাতার নিচে—‘খুনি হাসিনা গদি ছাড়’।
কিন্তু ঢেউ থিতিয়ে আসার পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের কঠিন কাজ শুরু হতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এল এক চেনা ও বিপজ্জনক ছায়া। দেখা গেল, দাবি উঠতে থাকল কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আন্দোলনেই সফল হয়েছে জুলাই। একদিকে ইসলামপন্থী দলগুলো বলতে শুরু করল তারাই ছিল আন্দোলনের সম্মুখসারিতে, আবার পতিত আওয়ামী লীগও দাবি করতে লাগল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে দেশ এখন ‘জঙ্গীদের’ হাতে। এছাড়াও দুইপক্ষই দাবি করতে থাকে সাতচল্লিশের যথার্থ উত্তরাধিকার চব্বিশ।
প্রেক্ষিত ছাড়া এসব বক্তব্যকে নিছক সত্যের অপলাপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এ এক গভীর ঐতিহাসিক বিপদ। এ অঞ্চল এর আগেও গণদাবিকে একটি মতাদর্শের বয়ানে সীমিত করার চেষ্টা চালিয়েছিল ক্ষমতার। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল গণদাবির মুখে গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভাঙন। ফলে ২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে আমাদের ১৯৪৭ সালের সতর্কবার্তায় মনোযোগ দিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।
বর্তমানের বিপদ বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে অতীতের ট্র্যাজেডিতে। সংশোধনবাদী ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, ইতিমধ্যে এটি একাডেমিয়ায় প্রমাণিত, চল্লিশের দশকের পাকিস্তান আন্দোলন কোনো একরৈখিক, বিশুদ্ধ ধর্মতাত্ত্বিক অভিযান ছিল না। এ আন্দোলন ছিল এক বিশাল ভঙ্গুর ছাতা, যার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল তাঁর বিখ্যাত বই দ্য সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান-এ আর্কাইভ ঘেঁটে দেখিয়েছেন, জিন্নাহর অধীনে মুসলিম লীগ কোনো অখণ্ড বা একক আদর্শিক সংগঠন ছিল না। বরং বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি ও বামঘেঁষা সংস্কারবাদী বাংলা প্রদেশ মুসলিম লীগ, পাঞ্জাবের রক্ষণশীল ‘ইউনিয়নিস্ট’ জমিদার এবং সিন্ধুর আঞ্চলিক নেতাদের এক জটিল জোট, যাদেরকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিকতাবাদী নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
ট্র্যাজেডি এই যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্তেই মুসলিম লীগ তার জোটসঙ্গীদের পরিত্যাগ করে। যে বহুত্ববাদ তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছিল, তা ঝেড়ে ফেলে তারা রাষ্ট্রকে একটিমাত্র রাষ্ট্র-অনুমোদিত পরিচয়ের মধ্যে জোর করে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
সে সময়ের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরা এই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলুফলক ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, যেখানে মুসলমানপ্রধান অঞ্চল নিয়ে একাধিক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব উত্থাপনকারী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক দ্রুতই বুঝেছিলেন যে বাঙালি কৃষকের বৈচিত্র্যময়, আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করে ফেলছে কেন্দ্রীভূত, স্বৈরাচার অভিজাত শ্রেণি। ১৯৪১ সালেই লীগের হাইকমান্ডের স্বৈরাচারী প্রবণতার প্রতিবাদে লিয়াকত আলী খানকে লেখা এক চিঠিতে শেরে বাংলা লিখেছিলেন—‘আমি এই সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের মনে করিয়ে দিতে চাই, তারা যদি মুসলমান সংখ্যাধিক্য অঞ্চলসমূহের রাজনীতি নিয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করেন, তাতে কিন্তু সমগ্র ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। অন্তত আমি কখনোই ৩ কোটি ত্রিশ লাখ মুসলমানের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব বাইরের কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেব না, তা সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন।’
স্বাভাবিকভাবেই শেরে বাংলার এ সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র দাবি করেছিল নিরঙ্কুশ আনুগত্য। এই একরৈখিক মোহের সবচেয়ে স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালের মার্চে, যখন জিন্নাহ ঢাকায় দাঁড়িয়ে এমন এক ঘোষণা দেন, যা কার্যত বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু, অন্য কিছু নয়; এবং যে কেউ এর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়াবে, সে পাকিস্তানের শত্রু বলে গণ্য হবে।
অপরদিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম, যাকে পরবর্তীতে অনেকেই ব্যাখ্যা করেছেন সমাজতান্ত্রিক গুণাবলি সম্পন্ন এক মুসলমান নেতা, তিনি পাকিস্তানকে কল্পনা করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ হিসেবে, এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা থাকবে শ্রমিক আর কৃষকের হাতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ এবং স্থানীয় জমিদারি শোষণ, উভয় থেকেই মুক্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের একরৈখিক, স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি যখন বাংলাকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন হাশিম গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের এই ক্ষয় নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন এবং সতর্ক করেছিলেন যে চাপিয়ে দেওয়া একটি কেন্দ্র অনিবার্যভাবে পূর্ববঙ্গকে নিছক এক উপনিবেশে পরিণত করবে।
এমনকি সে সময়ের প্রথিতযশা ইসলামি চিন্তাবিদরাও উপমহাদেশকে সংকীর্ণ মতাদর্শগত খোপে বন্দি করার চেষ্টার বিপদ চিহ্নিত করেছিলেন। জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের নেতা হুসাইন আহমদ মাদানি ধর্মতাত্ত্বিক ও সাম্রাজ্যবিরোধী উভয় যুক্তিতেই দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি ‘মুত্তাহিদা কওমিয়ত’ বা যৌথ জাতীয়তাবাদের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বহুত্ববাদী ভারতে সহাবস্থান করতে পেরেছে ঐতিহাসিকভাবেই, এবং সেটাই করা উচিত। কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনকে তিনি অভিহিত করেছিলেন এক বিপজ্জনক মরীচিকা হিসেবে, যা ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিরই ফসল।
শেরে বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি, হাশিমের সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন, মাদানির যৌথ জাতীয়তাবাদ— এই সব কণ্ঠস্বরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এমন এক রাষ্ট্র, যা দাবি করেছিল মতাদর্শগত শুদ্ধতা। পরিণাম হয়েছিল বিপর্যয়কর। বহুত্ববাদী সমাজকে জোর করে একরৈখিক ছাঁচে ফেলার চেষ্টায় পাকিস্তান রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল সেই জনগণকেই, যারা তাকে ভোট দিয়েছিল। একরৈখিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেনি, বরং ভেঙে দিয়েছিল। তার হাত ধরেই এসেছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের জন্ম।
এটা ভুলে গেলে চলবে না যে জুলাই অভ্যুত্থান ছিল সাধারণ মানুষের বিজয়। এর পেছনে কাজ করেছে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপ, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক ধ্বংস, আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার নির্মম দমন। আমার মনে পড়ে, মীর মুগ্ধ ১৮ জুলাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন—‘...আমাদের আন্দোলনে ছাত্র প্রয়োজন, কোনো উদ্দেশ্য হাসিলকারী নেতা নয়।’
তবু ইতিহাস প্রমাণ করে, সুসংগঠিত রাজনৈতিক যন্ত্র জনগণের আত্মত্যাগ ছিনিয়ে নিতে বিশেষভাবে পারদর্শী। মুক্তিযুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগ পকেটে পুরেছিল মুক্তিযুদ্ধকে। একইভাবে হাসিনা রেজিমের পতনকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টায় সুবিধাবাদীরা মুছে দিতে চাইছে সেই ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার্থী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, বামপন্থী কর্মী আর সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অবদান, যারা এই অভ্যুত্থানের মেরুদণ্ড ছিলেন।
এই সংশোধনবাদ শুধু ঐতিহাসিকভাবে ভুল নয়—এটি রাজনৈতিকভাবেও বিস্ফোরক। বাংলাদেশ মৌলিকভাবেই এক সংমিশ্রিত জাতি। এর সাংস্কৃতিক ডিএনএ বাঙালি ঐতিহ্য, ইসলামি বিশ্বাস, হিন্দু উত্তরাধিকার আর আদিবাসী সংস্কৃতির এক প্রাচীন, পরস্পরবিজড়িত বুনন। নাগরিকদের নিজ পরিচয়ের কোনো অংশ কেটে বাদ দিতে বাধ্য করে এই দেশ শাসনের যেকোনো চেষ্টা তেমনই ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হবে, যেমন ব্যর্থ হয়েছিল ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর উর্দু ফরমান।
তা ছাড়া ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া প্রজন্ম পঞ্চাশের দশকের নীরব, অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী নয়। তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক এজেন্সি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মনে রাখতে হবে, তারা রাজপথে রক্ত ঝরাননি একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরতন্ত্রকে একটি ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করার জন্য। তারা লড়েছিলেন কর্তৃত্ববাদের গোটা কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য।
নিজের বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত বিজয় নিহিত থাকবে না কোনো একটি পক্ষের অন্য পক্ষের ওপর আধিপত্যে, বরং এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠায়, যা সবাইকে সমানভাবে রক্ষা করতে সক্ষম। ১৯৪৭ সালের ভূতেরা যেন ২০২৪ সালের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারে, সেই দায়িত্ব এখন আমাদেরই।

পুরো জুলাই মরণপণ লড়াই করে যখন ৫ আগস্ট গণভবনের দেয়াল ধ্বসে পড়ল আর হড়পা বানের মতো ঢুকে পড়ল বাংলাদেশের মানুষ, আক্ষরিক অর্থেই সেখানে কোনো এক শ্রেণির মানুষ ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান আশ্চর্যজনকভাবে রূপ নিয়েছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে। ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, বামপন্থী কর্মী থেকে ধর্মীয় রক্ষণশীলরাও। পনের বছরের স্বৈরতন্ত্র তাদের নিয়ে এসেছিল একমাত্র দাবির ছাতার নিচে—‘খুনি হাসিনা গদি ছাড়’।
কিন্তু ঢেউ থিতিয়ে আসার পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের কঠিন কাজ শুরু হতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এল এক চেনা ও বিপজ্জনক ছায়া। দেখা গেল, দাবি উঠতে থাকল কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আন্দোলনেই সফল হয়েছে জুলাই। একদিকে ইসলামপন্থী দলগুলো বলতে শুরু করল তারাই ছিল আন্দোলনের সম্মুখসারিতে, আবার পতিত আওয়ামী লীগও দাবি করতে লাগল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে দেশ এখন ‘জঙ্গীদের’ হাতে। এছাড়াও দুইপক্ষই দাবি করতে থাকে সাতচল্লিশের যথার্থ উত্তরাধিকার চব্বিশ।
প্রেক্ষিত ছাড়া এসব বক্তব্যকে নিছক সত্যের অপলাপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এ এক গভীর ঐতিহাসিক বিপদ। এ অঞ্চল এর আগেও গণদাবিকে একটি মতাদর্শের বয়ানে সীমিত করার চেষ্টা চালিয়েছিল ক্ষমতার। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল গণদাবির মুখে গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভাঙন। ফলে ২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে আমাদের ১৯৪৭ সালের সতর্কবার্তায় মনোযোগ দিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।
বর্তমানের বিপদ বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে অতীতের ট্র্যাজেডিতে। সংশোধনবাদী ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, ইতিমধ্যে এটি একাডেমিয়ায় প্রমাণিত, চল্লিশের দশকের পাকিস্তান আন্দোলন কোনো একরৈখিক, বিশুদ্ধ ধর্মতাত্ত্বিক অভিযান ছিল না। এ আন্দোলন ছিল এক বিশাল ভঙ্গুর ছাতা, যার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল তাঁর বিখ্যাত বই দ্য সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান-এ আর্কাইভ ঘেঁটে দেখিয়েছেন, জিন্নাহর অধীনে মুসলিম লীগ কোনো অখণ্ড বা একক আদর্শিক সংগঠন ছিল না। বরং বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি ও বামঘেঁষা সংস্কারবাদী বাংলা প্রদেশ মুসলিম লীগ, পাঞ্জাবের রক্ষণশীল ‘ইউনিয়নিস্ট’ জমিদার এবং সিন্ধুর আঞ্চলিক নেতাদের এক জটিল জোট, যাদেরকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিকতাবাদী নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
ট্র্যাজেডি এই যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্তেই মুসলিম লীগ তার জোটসঙ্গীদের পরিত্যাগ করে। যে বহুত্ববাদ তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছিল, তা ঝেড়ে ফেলে তারা রাষ্ট্রকে একটিমাত্র রাষ্ট্র-অনুমোদিত পরিচয়ের মধ্যে জোর করে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
সে সময়ের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরা এই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলুফলক ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, যেখানে মুসলমানপ্রধান অঞ্চল নিয়ে একাধিক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব উত্থাপনকারী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক দ্রুতই বুঝেছিলেন যে বাঙালি কৃষকের বৈচিত্র্যময়, আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করে ফেলছে কেন্দ্রীভূত, স্বৈরাচার অভিজাত শ্রেণি। ১৯৪১ সালেই লীগের হাইকমান্ডের স্বৈরাচারী প্রবণতার প্রতিবাদে লিয়াকত আলী খানকে লেখা এক চিঠিতে শেরে বাংলা লিখেছিলেন—‘আমি এই সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের মনে করিয়ে দিতে চাই, তারা যদি মুসলমান সংখ্যাধিক্য অঞ্চলসমূহের রাজনীতি নিয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করেন, তাতে কিন্তু সমগ্র ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। অন্তত আমি কখনোই ৩ কোটি ত্রিশ লাখ মুসলমানের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব বাইরের কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেব না, তা সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন।’
স্বাভাবিকভাবেই শেরে বাংলার এ সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র দাবি করেছিল নিরঙ্কুশ আনুগত্য। এই একরৈখিক মোহের সবচেয়ে স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালের মার্চে, যখন জিন্নাহ ঢাকায় দাঁড়িয়ে এমন এক ঘোষণা দেন, যা কার্যত বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু, অন্য কিছু নয়; এবং যে কেউ এর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়াবে, সে পাকিস্তানের শত্রু বলে গণ্য হবে।
অপরদিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম, যাকে পরবর্তীতে অনেকেই ব্যাখ্যা করেছেন সমাজতান্ত্রিক গুণাবলি সম্পন্ন এক মুসলমান নেতা, তিনি পাকিস্তানকে কল্পনা করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ হিসেবে, এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা থাকবে শ্রমিক আর কৃষকের হাতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ এবং স্থানীয় জমিদারি শোষণ, উভয় থেকেই মুক্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের একরৈখিক, স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি যখন বাংলাকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন হাশিম গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের এই ক্ষয় নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন এবং সতর্ক করেছিলেন যে চাপিয়ে দেওয়া একটি কেন্দ্র অনিবার্যভাবে পূর্ববঙ্গকে নিছক এক উপনিবেশে পরিণত করবে।
এমনকি সে সময়ের প্রথিতযশা ইসলামি চিন্তাবিদরাও উপমহাদেশকে সংকীর্ণ মতাদর্শগত খোপে বন্দি করার চেষ্টার বিপদ চিহ্নিত করেছিলেন। জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের নেতা হুসাইন আহমদ মাদানি ধর্মতাত্ত্বিক ও সাম্রাজ্যবিরোধী উভয় যুক্তিতেই দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি ‘মুত্তাহিদা কওমিয়ত’ বা যৌথ জাতীয়তাবাদের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বহুত্ববাদী ভারতে সহাবস্থান করতে পেরেছে ঐতিহাসিকভাবেই, এবং সেটাই করা উচিত। কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনকে তিনি অভিহিত করেছিলেন এক বিপজ্জনক মরীচিকা হিসেবে, যা ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিরই ফসল।
শেরে বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি, হাশিমের সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন, মাদানির যৌথ জাতীয়তাবাদ— এই সব কণ্ঠস্বরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এমন এক রাষ্ট্র, যা দাবি করেছিল মতাদর্শগত শুদ্ধতা। পরিণাম হয়েছিল বিপর্যয়কর। বহুত্ববাদী সমাজকে জোর করে একরৈখিক ছাঁচে ফেলার চেষ্টায় পাকিস্তান রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল সেই জনগণকেই, যারা তাকে ভোট দিয়েছিল। একরৈখিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেনি, বরং ভেঙে দিয়েছিল। তার হাত ধরেই এসেছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের জন্ম।
এটা ভুলে গেলে চলবে না যে জুলাই অভ্যুত্থান ছিল সাধারণ মানুষের বিজয়। এর পেছনে কাজ করেছে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপ, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক ধ্বংস, আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার নির্মম দমন। আমার মনে পড়ে, মীর মুগ্ধ ১৮ জুলাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন—‘...আমাদের আন্দোলনে ছাত্র প্রয়োজন, কোনো উদ্দেশ্য হাসিলকারী নেতা নয়।’
তবু ইতিহাস প্রমাণ করে, সুসংগঠিত রাজনৈতিক যন্ত্র জনগণের আত্মত্যাগ ছিনিয়ে নিতে বিশেষভাবে পারদর্শী। মুক্তিযুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগ পকেটে পুরেছিল মুক্তিযুদ্ধকে। একইভাবে হাসিনা রেজিমের পতনকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টায় সুবিধাবাদীরা মুছে দিতে চাইছে সেই ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার্থী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, বামপন্থী কর্মী আর সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অবদান, যারা এই অভ্যুত্থানের মেরুদণ্ড ছিলেন।
এই সংশোধনবাদ শুধু ঐতিহাসিকভাবে ভুল নয়—এটি রাজনৈতিকভাবেও বিস্ফোরক। বাংলাদেশ মৌলিকভাবেই এক সংমিশ্রিত জাতি। এর সাংস্কৃতিক ডিএনএ বাঙালি ঐতিহ্য, ইসলামি বিশ্বাস, হিন্দু উত্তরাধিকার আর আদিবাসী সংস্কৃতির এক প্রাচীন, পরস্পরবিজড়িত বুনন। নাগরিকদের নিজ পরিচয়ের কোনো অংশ কেটে বাদ দিতে বাধ্য করে এই দেশ শাসনের যেকোনো চেষ্টা তেমনই ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হবে, যেমন ব্যর্থ হয়েছিল ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর উর্দু ফরমান।
তা ছাড়া ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া প্রজন্ম পঞ্চাশের দশকের নীরব, অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী নয়। তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক এজেন্সি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মনে রাখতে হবে, তারা রাজপথে রক্ত ঝরাননি একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরতন্ত্রকে একটি ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করার জন্য। তারা লড়েছিলেন কর্তৃত্ববাদের গোটা কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য।
নিজের বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত বিজয় নিহিত থাকবে না কোনো একটি পক্ষের অন্য পক্ষের ওপর আধিপত্যে, বরং এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠায়, যা সবাইকে সমানভাবে রক্ষা করতে সক্ষম। ১৯৪৭ সালের ভূতেরা যেন ২০২৪ সালের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারে, সেই দায়িত্ব এখন আমাদেরই।
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
১২ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬