মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পদক্ষেপ চাই পাশাপাশি

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ২১: ০১
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

গেল অর্থবছরে হওয়া গড় মূল্যস্ফীতি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কমলেও গত তিন মাস ধরে এটা ৯ শতাংশের বেশি থাকা উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে শেখ হাসিনার শাসনামলে ডাবল ডিজিটে পৌঁছেছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাস, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এটা ১২ শতাংশ ছাড়ানোর সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল আরও বেশি। খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কম বিরূপ প্রভাব ফেলে না। আর মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকলে এর অভিঘাত হয় সুতীব্র। সেটাও অব্যাহতভাবে ঘটে চলেছে। এতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে আরও।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি হ্রাসে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগী হওয়ায় কিছু সুফল মিলেছিল। গত দুই রমজানে পণ্যবাজার অশান্ত না হওয়ায় মোটামুটি আশ্বস্ত ছিল মানুষ। তবে সেই সময়েও সরকারের প্রতিশ্রুতিমাফিক মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা যায়নি। এজন্য বাজার ব্যবস্থার ত্রুটিকেও দায়ী করে বলা হচ্ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। চার মাসের বেশি সময় হয়ে গেল নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। তারা নতুন বাজেট বাস্তবায়নও শুরু করেছেন। তাতে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও গেল তিন মাস ধরে এটা ৯ শতাংশের বেশি থেকে যাওয়া দেখে মনে হয়, কাজটি মোটেও সহজ হবে না।

চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি কেন উচ্চ পর্যায়ে, তার কারণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে এটা কীভাবে কিছুটা কমিয়ে আনা গিয়েছিল, সেটাও আমাদের জীবন্ত অভিজ্ঞতা। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। হালে বাংলাদেশ ব্যাংককে দেখা গেল নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় ‘নীতি সুদহার’ বর্তমান স্তরেই রাখতে। বেসরকারি খাত থেকে ঋণের সুদ কমানোর জোরালো দাবি থাকলেও মূল্যস্ফীতি কমানোর সুতীব্র চাহিদার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে সায় দেয়নি। বাজেটেও সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যাতে বিশেষ করে নিত্যপণ্য ও জরুরি সেবার দাম বাড়ে। এগুলোর দাম কমিয়ে জনসাধারণকে স্বস্তি দিতেই বরং সরকার আগ্রহী। তাতে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিতেও মনে হয় তারা প্রস্তুত। মেয়াদের প্রথম বছরে এমনটা অপ্রত্যাশিতও নয়। তবে দেখতে হবে, এসব পদক্ষেপের প্রত্যাশিত প্রভাব বাজারে পড়ছে কতটা। নিত্যপণ্যের দাম কমানোর পদক্ষেপ বাজার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেই খুব একটা সুফল দেয় না বলে আমাদের অভিজ্ঞতা।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়াতে হওয়ায় গত তিন মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়তির দিকে আছে, এটা সবার জানা। সম্প্রতি জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমে আসায় দেশে এর দাম কমানোর দাবিও জোরালো। সরকার নিজেও তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ অবস্থায় আমরা দেখতে চাইব, সহজে মূল্যস্ফীতি কমানোর এই সুযোগ সরকার দ্রুত গ্রহণ করে কিনা। মাঝে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয় ভর্তুকি কমিয়ে আনার যুক্তিতে। এরও প্রভাব ছিল মূল্যস্ফীতিতে। নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষ এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সঞ্চয় ভেঙে, অনেক ক্ষেত্রে ঋণও নিতে হচ্ছে তাদের। প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

গত দুই বছরে কর্মহীনতাও বেড়েছে অনেক। নিয়মিতভাবে শ্রমবাজারে আসা মানুষ সহজে কাজ পাবে—বিনিয়োগের এমন পরিবেশও অনুপস্থিত। কাজের সুযোগ বাড়লে উচ্চ মূল্যস্ফীতিও কিছুটা সয়ে যায়। এখন এটা কমিয়ে আনার পদক্ষেপের সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে। সুদের হার কমানোর পরিস্থিতি না থাকলে অন্যান্য ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ জোরদার করে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোটাও জরুরি। বিস্তৃত করতে হবে বিদেশে কাজের সুযোগ। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পরীক্ষিত পদক্ষেপগুলোর প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিও হবে উপকৃত।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত