হামের প্রাদুর্ভাব: সচেতনতা ও ধৈর্যই ইসলামের শিক্ষা

হাম আক্রান্ত শিশু। ছবি: সংগৃহীত

কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বাড়ছে ভিড়। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল দেশে হাম সংক্রমণে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি সংক্রমণজনিত রোগ। এটি খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের মধ্যেই এর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। সময়মতো চিকিৎসা ও টিকা দেওয়া না হলে মৃত্যুসহ নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।

রোগ মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। তবে একজন মুমিনের কাছে রোগ কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, এক ধরনের পরীক্ষাও। এর মাধ্যমে আল্লাহ রোগীর মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তার গুনাহ মাফ করেন। রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘কোনো মুসলিমের ওপর যে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা পেরেশানি আসে—এমনকি একটি কাঁটা বিঁধলেও—এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।’ (সহীহ বুখারী)

রোগ ও সংক্রমণ বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলাম একদিকে আল্লাহর ওপর ভরসার করার কথা বলে, অন্যদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন—‘কোনো এলাকায় মহামারী দেখা দিলে সেখানে প্রবেশ করবে না এবং যেখানে অবস্থান করছ সেখানে মহামারী হলে সেখান থেকে বের হবে না।’ (সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)

অর্থাৎ, রোগের ব্যাপারে উদাসীনতা কখনোই তাওয়াক্কুল বা আস্থা নয়; বরং সচেতনতা অবলম্বন করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের অংশ।

টিকাদান: ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ববোধ

সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার জন্য তিনি চিকিৎসাও নির্ধারণ করেননি’। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে—হামের মতো রোগ প্রতিরোধে টিকা সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তাই একজন অভিভাবকের জন্য সন্তানের টিকাদান নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—আমানত রক্ষার বিষয়। কারণ একজনের অবহেলা শুধু নিজের পরিবার নয়, পুরো সমাজকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

আমাদের করণীয়

এই পরিস্থিতিতে কিছু দায়িত্ব স্পষ্ট—শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, আক্রান্তদের আলাদা রাখা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। একই সঙ্গে আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মী আচরণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো কেবল ইসলাম বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্দেশনা নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধের অংশ।

সতর্কতার পর তাওয়াক্কুল

সব সতর্কতার পরও যদি কেউ আক্রান্ত হয়, তখন হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা—এটাই মুমিনের পরিচয়। হাদিসে রোগাক্রান্ত হলে মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে; আর তা তার ধৈর্যের প্রতিদান হিসেবে প্রাপ্ত হবে।

হাম আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং তাওয়াক্কুল—এই তিনের সমন্বয়েই একজন মুমিন এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা

সম্পর্কিত