তবে কি ‘মমতা যুগের’ অবসান হতে যাচ্ছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল গণনা চলছে আজ। ফলাফল যত এগিয়ে আসছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ার তত নড়বড়ে হয়ে উঠছে। গত ১৫ বছরের ‘মমতা শাসন’ এবার যেন কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত (দুপুর আড়াইটা) পাওয়া ভোটের ফলাফল বলছে, বিজেপি ১৯২ আসন ও তৃণমূল কংগ্রেস ৯৫ আসনে এগিয়ে রয়েছে।

২০১১ সালে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর টানা তিন মেয়াদে বড় জয় পেলেও এবারের রাজনৈতিক সমীকরণ একেবারেই ভিন্ন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাইভ মিন্টের বিশ্লেষক গুলাম জিলানির মতে, তৃণমূল কংগ্রেস টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একধরনের ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধী’ হাওয়া বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি তৈরি হয়েছে, যাকে পুঁজি করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের ভিত শক্ত করেছে।

আবার ইকনোমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের লড়াই মূলত দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক আধিপত্য বনাম জাতীয় শক্তির এক বড় সংঘাত হিসেবে আবিভূত হয়েছে। আর এই লড়াইয়ে রসদ যোগাচ্ছে তৃণমূলের দুর্নীতি, প্রশাসন সেচ্ছাচারিতা এবং পরিচয় রাজনীতির মতো ইস্যুগুলো।

নির্বাচনের আগের এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপগুলো থেকে দেখা গেছে, জনমত ভীষণভাবে বিভক্ত। একটি বড় জরিপ বিজেপিকে ১৯২টি আসন দিয়ে নিরঙ্কুশ জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। আবার অন্য কিছু জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বা ‘ঝুলন্ত বিধানসভা’র ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ২০০-র বেশি আসন জয়ের দাবি করে তাঁর আত্মবিশ্বাস বজায় রেখেছেন।

এই নির্বাচনে ভোটারদের রেকর্ড ৯২ শতাংশ উপস্থিতি একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। স্বাধীনতার পর থেকে এত বড় অঙ্কের ভোটদানকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুইভাবে দেখছেন—হয় এটি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিবর্তনের একটি নীরব বিপ্লব, অথবা শাসক দলের সমর্থনে ভোটারদের চূড়ান্ত মেরুকরণ।

আজ সোমবার (৪ মে) সকাল থেকে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো লাইভ আপডেটে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেই পিছিয়ে রয়েছেন। সেখানে ভোটের দৌড়ে বিজেপির এগিয়ে থাকা রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন তুলেছে।

এই পরিস্থিতি তৃণমূল শিবিরে অস্বস্তি বাড়ালেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল প্রক্রিয়াগত ত্রুটির অভিযোগ তুলে লড়াইয়ে টিকে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তৃণমূলের দাবি, ফল শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই আসবে এবং তারা ২০০-র বেশি আসন পাওয়ার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।

অন্যদিকে, বিজেপি শিবির একে তাদের জন্য ‘ঐতিহাসিক জয়’ এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছে। যদিও এসবই প্রাথমিক প্রবণতা এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই জয়ী বা বিজিত বলা সম্ভব নয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এটি সম্ভবত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই। এর মূল কারণ বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি সম্পৃক্ততা। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে বিরোধীরা সফলভাবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা একটি বড় ফ্যাক্টর এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও তৃণমূলের একমাত্র চালিকাশক্তি। ফলে এই লড়াইটি শুধু একটি দলের জয়-পরাজয়ের নয়, বরং এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর মানুষের শেষ আস্থার পরীক্ষা।

এখন পর্যন্ত ভোটের প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ থেকে তিনটি দৃশ্যপট উঠে আসছে। প্রথমত, বিজেপি যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে তা হবে ‘মমতা যুগের’ আনুষ্ঠানিক অবসান। দ্বিতীয়ত, কোনো দলই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে রাজ্যে জোট রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। এবং তৃতীয়ত, সব বাধা ডিঙিয়ে তৃণমূল যদি ক্ষমতায় ফেরে, তবে তা হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্থ মেয়াদের এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।

তথ্যসূত্র: লাইভ মিন্ট, ইকনোমিক টাইমস, এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

সম্পর্কিত