লেখা:

কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর শিক্ষা কল্পনাও করা যায় না। এই বাস্তবতায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের অপরিহার্য দাবি। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি একটি যুগোপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বর্তমান সরকারের একটি উদ্যোগ। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যেক শিক্ষকের হাতে (প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য) একটি করে ট্যাব পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা আধুনিক ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা এবং কলেজ পর্যায়ের সব শিক্ষকের হাতে এই ট্যাব তুলে দেওয়া হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। ফলে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে পাঠ্যবই ও মুখস্থনির্ভর ব্যাখ্যার মধ্যে। কিন্তু একটি ট্যাব থাকলে শিক্ষক সহজেই ভিডিও, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল স্লাইড, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে পাঠকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন।
বিজ্ঞানের জটিল বিষয়, গণিতের কঠিন সূত্র কিংবা ইতিহাসের ঘটনাবলি চিত্র ও ভিডিওর মাধ্যমে উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো দ্রুত ও গভীরভাবে বুঝতে পারে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং শেখার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। একই সঙ্গে শিক্ষকও একঘেয়ে পাঠদান থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলভাবে ক্লাস পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আরও ইতিবাচক ও কার্যকর হয়, যা শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। একটি ট্যাব শুধু পাঠদানের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষকের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শেখার উপকরণ। ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষকরা অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্স, ওয়েবিনার, গবেষণা-প্রবন্ধ, নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
এর ফলে তারা নিজেদের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করতে পারবেন। গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকরা অনেক সময় আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন; ট্যাব সেই বৈষম্য কমাতে পারে। যখন শিক্ষক নিজেই আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবেন, তখন তার পাঠদান আরও মানসম্মত হবে। এতে শিক্ষকের আত্মমর্যাদা ও পেশাগত সম্মান বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ শিক্ষকসমাজ গঠনে সহায়ক হবে।
কর্মসূচিটি শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে শহর ও গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এখনও স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা প্রায় অনুপস্থিত।
যদি প্রত্যেক শিক্ষক একটি ট্যাব পান এবং সেখানে মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংযুক্ত থাকে, তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরাও শহরের শিক্ষার্থীদের মতো একই মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, বড় ফন্ট বা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। এভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করা সম্ভব, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষায় প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আফ্রিকার বহু দেশে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষাসামগ্রীর সংকট শিক্ষার প্রধান অন্তরায় ছিল।
অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বই বা আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিটি শিশুর হাতে স্বল্পমূল্যের, টেকসই ও বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ল্যাপটপ তুলে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরাই শেখার সুযোগ পায়। ওই কর্মসূচির আওতায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিশেষভাবে তৈরি ‘এক্সও, ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। এসব ল্যাপটপে ইন্টারনেট সুবিধা, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার, ডিজিটাল বই, গণিত ও বিজ্ঞানের ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ্লিকেশন সংযুক্ত ছিল।
বিদ্যুৎ সমস্যার কথা বিবেচনা করে অনেক ল্যাপটপে সৌরশক্তি ব্যবহারের সুবিধাও রাখা হয়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের শিশুরাও নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। কর্মসূচিটির একটি বড় সাফল্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ও কৌতূহল বৃদ্ধি। শিক্ষক না থাকলেও শিশুরা ল্যাপটপের মাধ্যমে পড়াশোনা করতে পারত। তারা একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, ছবি আঁকা, গল্প লেখা ও প্রোগ্রামিং শেখার মতো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের শেখার আগ্রহ বেড়েছিল বেড়েছে এবং স্কুলে উপস্থিতির হারও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যদিও ওই কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। অনেক অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল ছিল, ফলে অনলাইন সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় ল্যাপটপ ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আফ্রিকায় “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচি শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আজও বিবেচিত। এটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র অঞ্চলেও মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ আরও উন্নত ও টেকসই হলে আফ্রিকার শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ৬৫,৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১ জন। তবে সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন। তাহলে এত বিপুল সংখ্যক ট্যাব কোত্থেকে আসবে, বিদেশ থেকে নাকি দেশে উৎপাদিত হবে?
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল বা আইসিটি ডিভিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন হাইটেক পার্কে এ ধরনের ল্যাপটপ বানানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, এবং এতে অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। কর্মসূচিটি সফল হলে এ ধরনের ল্যাপটপ আশেপাশের দেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে। তবে বিদেশ থেকে আমদানি কিংবা দেশেই উৎপাদিত হোক না কেন, এটি নিয়ে যেন কেউ কোনো বাণিজ্য করার সুযোগ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট, অ্যানিমেশন, শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজিতে উচ্চারণ সহ উন্নত সফটওয়্যার তৈরির কাজ এখনই হাতে নেওয়া উচিত। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটি এক্সপার্টদের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি তৈরি করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি কেবল একটি প্রযুক্তি বিতরণমূলক উদ্যোগ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের প্রতীক।
তবে এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, ট্যাব বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্যাবের রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং মানসম্মত কনটেন্ট সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত মূল্যায়ন ও তদারকির মাধ্যমে দেখতে হবে ট্যাবগুলো সত্যিই শিক্ষাদানে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।
যদি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যায়, তবে এই কর্মসূচি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জাতির মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতা উন্নত হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর শিক্ষা কল্পনাও করা যায় না। এই বাস্তবতায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের অপরিহার্য দাবি। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি একটি যুগোপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বর্তমান সরকারের একটি উদ্যোগ। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যেক শিক্ষকের হাতে (প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য) একটি করে ট্যাব পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা আধুনিক ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা এবং কলেজ পর্যায়ের সব শিক্ষকের হাতে এই ট্যাব তুলে দেওয়া হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। ফলে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে পাঠ্যবই ও মুখস্থনির্ভর ব্যাখ্যার মধ্যে। কিন্তু একটি ট্যাব থাকলে শিক্ষক সহজেই ভিডিও, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল স্লাইড, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে পাঠকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন।
বিজ্ঞানের জটিল বিষয়, গণিতের কঠিন সূত্র কিংবা ইতিহাসের ঘটনাবলি চিত্র ও ভিডিওর মাধ্যমে উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো দ্রুত ও গভীরভাবে বুঝতে পারে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং শেখার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। একই সঙ্গে শিক্ষকও একঘেয়ে পাঠদান থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলভাবে ক্লাস পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আরও ইতিবাচক ও কার্যকর হয়, যা শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। একটি ট্যাব শুধু পাঠদানের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষকের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শেখার উপকরণ। ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষকরা অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্স, ওয়েবিনার, গবেষণা-প্রবন্ধ, নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
এর ফলে তারা নিজেদের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করতে পারবেন। গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকরা অনেক সময় আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন; ট্যাব সেই বৈষম্য কমাতে পারে। যখন শিক্ষক নিজেই আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবেন, তখন তার পাঠদান আরও মানসম্মত হবে। এতে শিক্ষকের আত্মমর্যাদা ও পেশাগত সম্মান বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ শিক্ষকসমাজ গঠনে সহায়ক হবে।
কর্মসূচিটি শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে শহর ও গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এখনও স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা প্রায় অনুপস্থিত।
যদি প্রত্যেক শিক্ষক একটি ট্যাব পান এবং সেখানে মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংযুক্ত থাকে, তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরাও শহরের শিক্ষার্থীদের মতো একই মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, বড় ফন্ট বা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। এভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করা সম্ভব, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষায় প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আফ্রিকার বহু দেশে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষাসামগ্রীর সংকট শিক্ষার প্রধান অন্তরায় ছিল।
অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বই বা আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিটি শিশুর হাতে স্বল্পমূল্যের, টেকসই ও বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ল্যাপটপ তুলে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরাই শেখার সুযোগ পায়। ওই কর্মসূচির আওতায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিশেষভাবে তৈরি ‘এক্সও, ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। এসব ল্যাপটপে ইন্টারনেট সুবিধা, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার, ডিজিটাল বই, গণিত ও বিজ্ঞানের ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ্লিকেশন সংযুক্ত ছিল।
বিদ্যুৎ সমস্যার কথা বিবেচনা করে অনেক ল্যাপটপে সৌরশক্তি ব্যবহারের সুবিধাও রাখা হয়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের শিশুরাও নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। কর্মসূচিটির একটি বড় সাফল্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ও কৌতূহল বৃদ্ধি। শিক্ষক না থাকলেও শিশুরা ল্যাপটপের মাধ্যমে পড়াশোনা করতে পারত। তারা একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, ছবি আঁকা, গল্প লেখা ও প্রোগ্রামিং শেখার মতো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের শেখার আগ্রহ বেড়েছিল বেড়েছে এবং স্কুলে উপস্থিতির হারও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যদিও ওই কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। অনেক অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল ছিল, ফলে অনলাইন সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় ল্যাপটপ ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আফ্রিকায় “ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড” কর্মসূচি শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আজও বিবেচিত। এটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র অঞ্চলেও মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ আরও উন্নত ও টেকসই হলে আফ্রিকার শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ৬৫,৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১ জন। তবে সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন। তাহলে এত বিপুল সংখ্যক ট্যাব কোত্থেকে আসবে, বিদেশ থেকে নাকি দেশে উৎপাদিত হবে?
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল বা আইসিটি ডিভিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন হাইটেক পার্কে এ ধরনের ল্যাপটপ বানানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, এবং এতে অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। কর্মসূচিটি সফল হলে এ ধরনের ল্যাপটপ আশেপাশের দেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে। তবে বিদেশ থেকে আমদানি কিংবা দেশেই উৎপাদিত হোক না কেন, এটি নিয়ে যেন কেউ কোনো বাণিজ্য করার সুযোগ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট, অ্যানিমেশন, শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজিতে উচ্চারণ সহ উন্নত সফটওয়্যার তৈরির কাজ এখনই হাতে নেওয়া উচিত। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটি এক্সপার্টদের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি তৈরি করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি কেবল একটি প্রযুক্তি বিতরণমূলক উদ্যোগ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের প্রতীক।
তবে এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, ট্যাব বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্যাবের রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং মানসম্মত কনটেন্ট সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত মূল্যায়ন ও তদারকির মাধ্যমে দেখতে হবে ট্যাবগুলো সত্যিই শিক্ষাদানে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।
যদি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যায়, তবে এই কর্মসূচি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জাতির মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতা উন্নত হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যেই ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হলো। এই সংঘাত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হয়ে দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিত
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে মাজার বা ওরসে হামলার ঘটনা নতুন নয়; কিন্তু মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার এই প্রবণতা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
২১ ঘণ্টা আগে
কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন স্ট্রিমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ আর সেগুলো কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
১ দিন আগে
রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো বিচার বিভাগ। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্
১ দিন আগে