কমানো চাই দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির ঝুঁকি

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২১: ৫০
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতি তুলে ধরতে গিয়ে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে, তার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রায় নজিরবিহীন এ পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটাও বলতে হবে।

বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হওয়ার রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি একটি আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাও ছিল। কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এবং বছরের পর বছর চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সিংহভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মানে যে অবনতি ঘটায়, সেটাও তাদের নামতে বাধ্য করেছিল রাজপথে। গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আবার শিল্প-বাণিজ্যে ধস নামে এবং তাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মচ্যুতি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তাছাড়া ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে আমাদের শ্রম নিয়োজিত রয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কর্মনিয়োজন ও কর্মচ্যুতির স্পষ্ট ছবি নেই। গণঅভ্যুত্থান সৃষ্ট পরিস্থিতির চাপ সেখানেও পড়েছে বৈকি।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকেই বোধগম্য কারণে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমে যায় বলে এর আগেও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছিল। বিশ্বব্যাংক এটা নতুন করে বলল। ২০২৬ সালে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, সেটাও সম্ভব হবে না বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এখান থেকে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারবে বলে তাদের ধারণা। এর প্রধানতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত। জ্বালানি খাতে গত কয়েক মাস আমরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন, তাতে নতুন বিনিয়োগ তো দূর—চলতি বিনিয়োগও কার্যকর থাকতে পারছে না। সংগঠিত শিল্পাঞ্চলের বাইরেও জ্বালানি সংকটের বিষময় ফল পরিলক্ষিত হচ্ছে। আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। তাতে কেবল বেকারত্বের সম্প্রসারণ ঘটছে না; পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ সংকুচিত হয়ে প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়ার। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার শংকা ক্রমে বাড়ছে।

বিশ্বব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার যে তথ্য উল্লেখ করেছে; এর উল্লেখ আমরাও বারংবার করে থাকি বোঝাতে—রাজস্ব আহরণে সরকারের সক্ষমতায় কত অবনতি ঘটেছে! এ অবস্থায় দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বেশি করে ঋণ গ্রহণ ছাড়া সরকারের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত ব্যয় কার্যক্রম পরিচালনার বিকল্প নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে পড়েই হালে বর্ধিত দামে জ্বালানি আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের কাছে ‘বাজেট সহায়তা’ চাইতে হয়েছে। এটাও বিশ্বব্যাংকের নজর এড়ায়নি যে, ইউরিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সার বাংলাদেশকে আমদানি করতে হচ্ছে ৩০ শতাংশের মতো বেশি দামে। এসব খাতে ভর্তুকি এত বাড়ছে যে, সামাজিক সুরক্ষায় নতুন সরকারের ব্যয় বাড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার থাকলেও তার সক্ষমতা ক্ষয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও লক্ষ্যাভিমুখি করার পাশাপাশি এতে ‘রাজনৈতিক বিবেচনা’ সর্বোচ্চ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে দারিদ্র্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় তা অকার্যকর না হয়।

বিশ্বব্যাংকের জোগানো অর্থ জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার আমদানির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোগে এবং সংকটগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় ব্যবহার করা যাবে। সংকটকালে এ ধরনের সহায়তা বাংলাদেশ সরকারকে পরিস্থিতি মোকাবিলার সাহস জোগাবে বৈকি। এও ঠিক, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রিজার্ভ পরিস্থিতি অনুকূলেই রয়েছে। তবে রপ্তানি খাতে ‘পারফরম্যান্স’ খারাপ হতে থাকলে আর জনশক্তি রপ্তানি বিঘ্নিত হলে সেটা ধরে রাখা কঠিন হবে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন বলে জনশক্তি রপ্তানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটাও এখন জরুরি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত