মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার তার মেয়াদের প্রথম বাজেট পেশের আগমুহূর্তে মূল্যস্ফীতির যে খবর মিলল, তা নেতিবাচক। গত মে মাসে এটা বেড়ে হয়েছে ৯.৪২ শতাংশ। এপ্রিলেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। এর আগে টানা ক’মাস ৯-এর নিচে থাকায় প্রত্যাশা জন্মেছিল, মূল্যস্ফীতি হয়তো আরও কমবে। প্রায় চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির নিচে পিষ্ট হওয়ায় এটা কিছুটা কমে এলেই সংবাদমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে খবরটি প্রচার করে। এর কিছুদিন পরই আবার মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে প্রমাদ গোনে সাধারণ মানুষ। কেননা মূল্যস্ফীতির চাপে অব্যাহতভাবে কমছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। সঞ্চয় ভেঙে, এমনকি ঋণ করে চলতে হচ্ছে অনেককে। 

মূল্যস্ফীতিতে দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী বড় হচ্ছে ক্রমে। তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গভীরভাবে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও কাটছাঁটে যাচ্ছে নিত্যপণ্য কেনার ধারায় থাকতে গিয়ে। কেননা চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম ইত্যাদি না কিনে টিকে থাকা অসম্ভব। মাঝে ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণে ন্যূনতম পুষ্টির উৎস থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। এদিকে, বোরো উত্তোলনের কালেও চালের দাম বাড়তির দিকে। এ অবস্থায় কোরবানি ঈদের আগে ট্রাকসেল শুরু করেছিল টিসিবি। 

গত মাসে ঈদের ছুটিতে বাজারে বাড়তি অর্থ সরবরাহের কারণেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার বড় কারণ বিদেশ ও শহরাঞ্চল থেকে অর্থ প্রবাহিত হওয়া। এপ্রিল-মে’তে মূল্যস্ফীতি বাড়ার প্রত্যক্ষ কারণ অবশ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা। ইরান যুদ্ধে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার কথা সবারই জানা। সরকার বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বলে বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য। তবে এর বহুমুখি প্রভাবের শিকার সাধারণ মানুষ কোনো ব্যাখ্যা মানতে চায় না। মূল্যস্ফীতির প্রভাব এড়িয়ে চলতে সক্ষম মানুষ তো কমই রয়েছে দেশে। এর সুফলও পাচ্ছে একদল মানুষ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব বাড়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের। সাপ্লাই চেইনে আরও যেসব সমস্যা রয়েছে, তা দূর করার। এতে মূল্যস্ফীতির মধ্যেও পণ্যবাজার কিছুটা হলেও সহনীয় থাকবে। 

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মূল্যস্ফীতি ‘ডাবল ডিজিট’ থেকে নামিয়ে আনার চেষ্টা সফল হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকার ছিল এটা আরও কমানোর। আসছে অর্থবছরে মূল্যস্ফীতিকে সাড়ে সাত শতাংশে রাখার কথা বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় বাজেটেও সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষত নিত্যপণ্য ও সাধারণ সেবার দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, এমন কর প্রস্তাব করা যাবে না। তেমন কিছু ঘটলেও সেটা দ্রুত সংশোধন করতে হবে। মুদ্রানীতি দিয়ে যেটুকু লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল, সেটাকে জোরালো করতে সঙ্গতিপূর্ণ রাজস্বনীতিও প্রয়োগ করতে হবে। কমাতে হবে পণ্যবাজারের বিকৃতি। 

মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বিস্তৃত করতে হবে। নতুন চালু করা কর্মসূচিগুলোর সম্প্রসারণও প্রয়োজন। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিতে সযত্ন নজর দিতে হবে। আর কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে বিনিয়োগ বাড়িয়ে। অর্থবহ কর্মসংস্থান না হলে আবার দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি টেকসই হবে না। মূল্যস্ফীতির কিছুটা বৃদ্ধিও তখন অসহনীয় হয়ে উঠবে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির ভেতর দিয়েই যাচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত