রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নতুন কোনো দৃষ্টান্ত নয়। কিছুদিন আগেই গুলশানের বস্তিতেও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আমরা দেখেছি। ঢাকা শহরে বারবার আগুন লাগার এই পুনরাবৃত্তি আমাদের সামনে বেশ কিছু পুরোনো ও অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে তুলে ধরছে। আগুন লাগার প্রধান দুটি কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং মানুষের অসচেতনতাকেই সবসময় দায়ী করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজধানীতে এই অগ্নিকাণ্ডের হার এত বেশি কেন এবং লাগলে তা এত দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে কেন?
প্রথমত, ঢাকার অবিশ্বাস্য ঘনবসতি এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এর অন্যতম বড় কারণ। এই শহরে যে পরিমাণ মানুষ এবং ভবন রয়েছে, সেখানে যেকোনো সময় আগুন লাগার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। কালশী বা গুলশানের বস্তির দিকে তাকালে দেখা যায়, মাত্র এক কাঠা জায়গার মধ্যে গাদাগাদি করে বহু পরিবার বসবাস করছে। ঘরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা একেবারে লাগানো। এই দমবন্ধ করা পরিবেশে সামান্য একটা স্ফুলিঙ্গ মুহূর্তের মধ্যে প্রলয়ংকরী রূপ নিতে পারে এবং একবার আগুন লাগলে সবকিছু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বস্তি এলাকার মানুষদের জীবনযাপন পদ্ধতিও এই কাঠামোগত ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বস্তিবাসীদের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ নিয়ে পূর্বপ্রস্তুতি বা সচেতনতার চরম অভাব রয়েছে। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা দাহ্য পদার্থ বা আগুনের ব্যবহার নিয়ে যতটুকু সতর্ক থাকি, সেখানে এই হার অনেক কম। হয়তো অসাবধানে মোমবাতি জ্বালানো হচ্ছে, যেখানে-সেখানে বিড়ি-সিগারেট খেয়ে ফেলা হচ্ছে অথবা ঝুঁকিপূর্ণভাবে চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে কালশীর অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ চিত্রই ফুটিয়ে তোলে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়নি বলে আগুন নেভাতে তাদের বেগ পেতে হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো— বস্তি এলাকায় পানির অভাবের এই দায় কার? এক-দুই বিঘা জায়গায় হাজার হাজার পরিবার যেখানে মানবেতর জীবনযাপন করে, সেখানে আগুন নেভানোর জন্য নিজস্ব পাম্প বা বড় জলাধার থাকবে— এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক?
আসল দায়বদ্ধতা নগর কর্তৃপক্ষের এবং ফায়ার সার্ভিসের নিজের। বিশ্বের প্রতিটি আধুনিক শহরেই অগ্নিনির্বাপণের জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ (Fire Hydrant) থাকে। ফায়ার হাইড্রেন্ট হলো রাস্তার ওপর থাকা এমন একটি বড় পাইপের মুখ, যেখান থেকে ফায়ার ব্রিগেড সরাসরি পানি সংগ্রহ করে কয়েকশো মিটার ভেতরেও আগুন নেভানোর কাজ করতে পারে। মিরপুরে ওয়াসার অফিস আছে, প্রতিটি ভবনে ওয়াসার পানির ছোট পাইপের সংযোগও আছে, কিন্তু সেই সরু পাইপের পানি দিয়ে তো আর এমন ভয়াবহ আগুন নেভানো সম্ভব নয়। ঢাকা শহরে যেহেতু পর্যাপ্ত নদী বা পুকুর নেই, তাই ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা থাকাটা অপরিহার্য। এত বছর পরেও ঢাকা শহরের রাস্তায় এই বেসিক কাঠামোগত ব্যবস্থাটি কেন নেই? সিটি করপোরেশন এবং ফায়ার ফাইটিং ডিপার্টমেন্ট কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না।
আসল দায়বদ্ধতা নগর কর্তৃপক্ষের এবং ফায়ার সার্ভিসের নিজের। বিশ্বের প্রতিটি আধুনিক শহরেই অগ্নিনির্বাপণের জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ (Fire Hydrant) থাকে। ফায়ার হাইড্রেন্ট হলো রাস্তার ওপর থাকা এমন একটি বড় পাইপের মুখ, যেখান থেকে ফায়ার ব্রিগেড সরাসরি পানি সংগ্রহ করে কয়েকশো মিটার ভেতরেও আগুন নেভানোর কাজ করতে পারে।
বর্তমানে শুষ্ক মৌসুম চলছে, প্রচণ্ড গরমে চারপাশ তপ্ত। এ সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তবে শুধু মনে মনে সচেতন হলেই হবে না, সেটির বাস্তব প্রয়োগ থাকতে হবে। রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি— সর্বত্রই এখন গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সিলিন্ডারের পাইপ বা সংযোগ নিয়মিত চেক করা উচিত। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা জানেন যে পেট্রোল পাম্পে আগুন লাগতে পারে, তবুও সেখানে বসেই ধূমপান করেন। একশ জন মানুষের মধ্যে নিরানব্বই জন সচেতন হলেও, মাত্র একজন খামখেয়ালি মানুষের ভুলের কারণে বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
অগ্নিকাণ্ড সাধারণত ছোট কোনো উৎস থেকেই শুরু হয়, এরপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে প্রয়োজন নিজস্ব প্রস্তুতি। উন্নত দেশগুলোতে বছরে অন্তত দু-একবার ‘ফায়ার ড্রিল’ (অগ্নিনির্বাপণ মহড়া) হয়। আগুন লাগলে প্রথমে কি করতে হবে, কোথায় দিয়ে বের হতে হবে, কোথায় জড়ো হতে হবে— তা নিয়ে আগে থেকেই সবার ধারণা থাকে। আমাদের দেশে এর কোনো বালাই নেই। বছরখানেক আগে একটি রেস্তোরাঁয় আগুন লেগে বহু মানুষের প্রাণহানির পেছনে এই বের হওয়ার পথ না জানা এবং প্রস্তুতির অভাবই বড় কারণ ছিল।
বহু বাসাবাড়ি ও ভবনে নামেমাত্র ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ঝোলানো থাকে, যেগুলো হয়তো সাত-আট বছর আগের কেনা। এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ কি না বা এর ব্যবহারবিধি ভবনের বাসিন্দারা জানেন কি না, তার কোনো তদারকি নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব যন্ত্র বিপদের সময় তো কাজ করেই না, উল্টো এগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পরিশেষে বলতে হয়, ঢাকা শহরকে অগ্নিকাণ্ডের এই ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু মানুষের অসচেতনতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিটি কর্পোরেশন নিজেদের কাঠামোগত ব্যর্থতা লুকাতে পারে না। শহরের প্রতিটি মোড়ে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, ভবন ও মার্কেটগুলোতে নিয়মিত ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা করা এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল এই মৃত্যুফাঁদ থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। নতুবা কালশীর মতো আগুন আমাদের পোড়াতেই থাকবে, আর আমরা শুধু দীর্ঘশ্বাসই ফেলব।
লেখক: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক