জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য
সজীব তানভীর

‘সত্যেন’ নামের আক্ষরিক অর্থ—সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তি; যিনি সত্যকে ধারণ করেন কিংবা যাঁর কাছে সত্যই পরম আরাধ্য। আমাদের সত্যেন সেন তাঁর নামের এই আক্ষরিক অর্থের এক জীবন্ত ও মূর্ত উদাহরণ।
বাঙালি জাতির ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক সংকটের সমান্তরালে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ধারা প্রবহমান ছিল। সেই ধারার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন সত্যেন সেন। ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ মুন্সিগঞ্জের সোনারং গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই পরাধীনতার গ্লানি দেখেছিলেন। কিন্তু সেই গ্লানিকে তিনি অবসাদে রূপান্তর না করে পরিণত করেছিলেন দ্রোহের অনলে। আজ যখন আমরা তাঁর ১১৯তম জন্মবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছি, তখন আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন—বর্তমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থবিরতার যুগে সত্যেন সেন কেন আজও অপরিহার্য।
সত্যেন সেনের বিপ্লবী সত্তার গোড়াপত্তন হয়েছিল অনুশীলন সমিতির ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন মেয়াদে মোট প্রায় ১৮ বছর কারাবন্দী ছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ বছর জেল খেটে ১৯৬৩ সালে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছরের কারাবাস তাঁকে কেবল পোড় খাওয়া নেতাই করেনি, বরং এক গভীর জীবনবোধসম্পন্ন চারণে পরিণত করেছিল। তাঁর দর্শনে 'সংস্কৃতির রাজনৈতিকায়ন' কোনো সংকীর্ণ দলীয় ধারণা ছিল না। তা ছিল শোষিতের মুক্তির এক অনিবার্য কৌশল। তাঁর সেই অমোঘ বাণী আজও প্রাসঙ্গিক: ‘সংস্কৃতিহীন রাজনীতি অন্ধ, আর রাজনীতিহীন সংস্কৃতি পঙ্গু।’
১৯৪০-এর দশকে প্রজ্জ্বলিত তেভাগা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সত্যেন সেন ছিলেন কৃষক সংগ্রামের এক নিবেদিতপ্রাণ ও সম্মুখসারির কর্মী। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাত্ত্বিক রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে মাটি ও মানুষের সুর সাধারণ কৃষকদের অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম। নিবারণ পণ্ডিত, হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিংবা বিনয় রায়দের মতো কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পীদের সমান্তরালে তিনিও তখন মেঠো পথে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। আন্দোলনের মূল দাবি ‘লাঙল যার জমি তার’—এই শ্লোগানটিকে তিনি তাঁর অসামান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক অবিনাশী মন্ত্র হিসেবে গেঁথে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও নিজস্ব সংস্কৃতি রুদ্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’। উদীচী ছিল আদর্শ ও গোনমানুষের সংগ্রামের প্ল্যাটফর্ম। তেভাগার দিনগুলোতে তিনি গণসংগীতের দল নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে লড়াইয়ের বীজ বুনেছিলেন। সেখানে গানে গানে উচ্চারিত হতো জমির অধিকারের কথা। সেই সুরই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর পরবর্তীকালের রচনায়। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের দাবি তাঁর লেখনীতে বারবার ফিরে এসেছে। উদীচী আজ অবধি সেই ঐতিহাসিক গান ও শ্লোগানগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে ধারণ করে চলেছে। মূলত গণমানুষের সাথে এই নিবিড় ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কারণেই কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে সত্যেন সেনকে শ্রদ্ধাভরে 'কৃষক আন্দোলনের চারণ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম ও সাংবাদিকতা তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘পদচিহ্ন’, ‘অভিশপ্ত নগরী’ কিংবা ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’-র মতো কালজয়ী গ্রন্থে তিনি নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, ইতিহাসকে কীভাবে বর্তমানের দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ তৎকালীন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিকে রুখে দাঁড়ানোর এক পরোক্ষ কিন্তু সুনিপুণ প্রেরণা জুগিয়েছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখকের কলম কেবল কাল্পনিক জগতের নকশা কাটে না, বরং তা শোষকের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে। সেই দর্শনের প্রতিফলন আমরা দেখি তাঁর সাংবাদিকতায়। দৈনিক সংবাদে তাঁর শাণিত কলামগুলো ছিল আপসহীন সত্যের দলিল, যা সাধারণ মানুষের মনে জাগিয়েছিল সাহস আর শোষক ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের মনে সৃষ্টি করত প্রচ্ছন্ন ভীতি। ইতিহাসের ধুলোপড়া পাতা থেকে লড়াইয়ের বীরত্বগাথা তুলে এনে তিনি তাকে সমকালীন আন্দোলনের হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন—যেখানে তাঁর প্রতিটি অক্ষর হয়ে উঠেছিল এক একটি শাণিত তলোয়ার।
আজ যখন সমাজবাস্তবতায় অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সাংস্কৃতিক স্থবিরতা প্রকট, তখন সত্যেন সেনের আদর্শ আরও বেশি জরুরি। তিনি সারা জীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেছেন। বর্তমান সময়ে যখন বাজারমুখী অপসংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করছে, তখন সত্যেন সেনের অনাড়ম্বর জীবন ও আদর্শ আমাদের পথপ্রদর্শক।
বর্তমানে আমরা যখন ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং অসহিষ্ণুতার এক কঠিন সময় পার করছি, তখন সত্যেন সেনের আদর্শ সবচেয়ে বেশি জরুরি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতিই পারে মানুষের ভেতরের ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিতে। সত্যেন সেনের কাছে 'অসাম্প্রদায়িকতা' কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শন। তিনি জানতেন, বহু বছরের বাংলার লোকসংস্কৃতি (বাউল, জারি, সারি) কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, বরং এটি সকল বাঙালির উত্তরাধিকার। আজকের বিভাজিত সমাজে তাঁর এই সমন্বিত সাংস্কৃতিক চর্চার দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান যুগে বিশ্বায়ন ও করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের মৌলিক ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম যখন শিকড়হীন বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে, তখন সত্যেন সেনের 'গণমুখী সংস্কৃতি' এক জোরালো প্রতিবাদ। তিনি শিখিয়েছেন সংস্কৃতি কেবল সস্তা বিনোদন বা ব্যবসার মাধ্যম নয়। শিল্পের দায়বদ্ধতা আছে সাধারণ মানুষের প্রতি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে আজকের তরুণরা অপসংস্কৃতির বিপরীতে একটি সুস্থ ও রুচিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।
আজকাল রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সত্যেন সেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন যে, রাজনীতি তখনই সার্থক হয় যখন তা সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন ঘটায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পেটের ক্ষুধার আগে মনের ক্ষুধা বা চেতনার মুক্তি প্রয়োজন। আজকের রাজনৈতিক সংকটে যেখানে আদর্শের চেয়ে পেশীশক্তি বা অর্থের দাপট বেশি, সেখানে সত্যেন সেনের ত্যাগী ও নীতিনিষ্ঠ জীবন এক বিশাল নৈতিক শক্তি।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন মহলে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটছে। সত্যেন সেন তাঁর ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ বা ‘ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’-র মতো আকর গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে নির্মোহভাবে ইতিহাস চর্চা করতে হয়। তিনি মনে করতেন, যে জাতি নিজের প্রকৃত ইতিহাস জানে না, তারা সামনে এগোতে পারে না। বর্তমানের পরিচয় সংকটে তাঁর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আমাদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
আজকের অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে সত্যেন সেনের ‘তেভাগা’ বা ‘কৃষক আন্দোলন’-এর চেতনা আজও অম্লান। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের (কৃষক-শ্রমিক) দাবিগুলো নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছে দিতে হয়। বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজনের যুগেও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার প্রেরণা আমরা তাঁর জীবন থেকেই পাই।
সত্যেন সেন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষ নন, তিনি একটি অবিরাম বয়ে চলা নদীর মতো—যার স্রোত আজও শোষিত মানুষের মনে সাহস জোগায়। মশাল হাতে তিনি যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তার দায়বদ্ধতা এখন বর্তমান প্রজন্মের ওপর। দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েক দশকে এক সংকীর্ণ প্রচেষ্টায় সত্যেন সেনের কর্ম ও জীবনকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে আটকে রাখার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তাঁর ব্যাপ্তি কোনো দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সকল মানুষের, সকল লাঞ্ছিত প্রাণের কণ্ঠস্বর।
সময় এসেছে সেই কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে তাঁকে প্রকৃত গণমানুষের বিস্তৃত আঙিনায় নিয়ে আসার। তাঁর জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজকে জঞ্জালমুক্ত করার শপথ নেওয়ার এখনই সময়। তাঁর ১১৯তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ গড়ার লড়াইয়ে তাঁর দেখানো পথে অবিচল থাকা। সত্যেন সেনের স্মৃতি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং তাঁর আদর্শকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের হাতিয়ার করে তোলার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব।

‘সত্যেন’ নামের আক্ষরিক অর্থ—সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তি; যিনি সত্যকে ধারণ করেন কিংবা যাঁর কাছে সত্যই পরম আরাধ্য। আমাদের সত্যেন সেন তাঁর নামের এই আক্ষরিক অর্থের এক জীবন্ত ও মূর্ত উদাহরণ।
বাঙালি জাতির ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক সংকটের সমান্তরালে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ধারা প্রবহমান ছিল। সেই ধারার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন সত্যেন সেন। ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ মুন্সিগঞ্জের সোনারং গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই পরাধীনতার গ্লানি দেখেছিলেন। কিন্তু সেই গ্লানিকে তিনি অবসাদে রূপান্তর না করে পরিণত করেছিলেন দ্রোহের অনলে। আজ যখন আমরা তাঁর ১১৯তম জন্মবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছি, তখন আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন—বর্তমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থবিরতার যুগে সত্যেন সেন কেন আজও অপরিহার্য।
সত্যেন সেনের বিপ্লবী সত্তার গোড়াপত্তন হয়েছিল অনুশীলন সমিতির ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন মেয়াদে মোট প্রায় ১৮ বছর কারাবন্দী ছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ বছর জেল খেটে ১৯৬৩ সালে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছরের কারাবাস তাঁকে কেবল পোড় খাওয়া নেতাই করেনি, বরং এক গভীর জীবনবোধসম্পন্ন চারণে পরিণত করেছিল। তাঁর দর্শনে 'সংস্কৃতির রাজনৈতিকায়ন' কোনো সংকীর্ণ দলীয় ধারণা ছিল না। তা ছিল শোষিতের মুক্তির এক অনিবার্য কৌশল। তাঁর সেই অমোঘ বাণী আজও প্রাসঙ্গিক: ‘সংস্কৃতিহীন রাজনীতি অন্ধ, আর রাজনীতিহীন সংস্কৃতি পঙ্গু।’
১৯৪০-এর দশকে প্রজ্জ্বলিত তেভাগা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সত্যেন সেন ছিলেন কৃষক সংগ্রামের এক নিবেদিতপ্রাণ ও সম্মুখসারির কর্মী। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাত্ত্বিক রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে মাটি ও মানুষের সুর সাধারণ কৃষকদের অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম। নিবারণ পণ্ডিত, হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিংবা বিনয় রায়দের মতো কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পীদের সমান্তরালে তিনিও তখন মেঠো পথে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। আন্দোলনের মূল দাবি ‘লাঙল যার জমি তার’—এই শ্লোগানটিকে তিনি তাঁর অসামান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক অবিনাশী মন্ত্র হিসেবে গেঁথে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও নিজস্ব সংস্কৃতি রুদ্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’। উদীচী ছিল আদর্শ ও গোনমানুষের সংগ্রামের প্ল্যাটফর্ম। তেভাগার দিনগুলোতে তিনি গণসংগীতের দল নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে লড়াইয়ের বীজ বুনেছিলেন। সেখানে গানে গানে উচ্চারিত হতো জমির অধিকারের কথা। সেই সুরই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর পরবর্তীকালের রচনায়। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের দাবি তাঁর লেখনীতে বারবার ফিরে এসেছে। উদীচী আজ অবধি সেই ঐতিহাসিক গান ও শ্লোগানগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে ধারণ করে চলেছে। মূলত গণমানুষের সাথে এই নিবিড় ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কারণেই কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে সত্যেন সেনকে শ্রদ্ধাভরে 'কৃষক আন্দোলনের চারণ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম ও সাংবাদিকতা তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘পদচিহ্ন’, ‘অভিশপ্ত নগরী’ কিংবা ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’-র মতো কালজয়ী গ্রন্থে তিনি নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, ইতিহাসকে কীভাবে বর্তমানের দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ তৎকালীন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিকে রুখে দাঁড়ানোর এক পরোক্ষ কিন্তু সুনিপুণ প্রেরণা জুগিয়েছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখকের কলম কেবল কাল্পনিক জগতের নকশা কাটে না, বরং তা শোষকের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে। সেই দর্শনের প্রতিফলন আমরা দেখি তাঁর সাংবাদিকতায়। দৈনিক সংবাদে তাঁর শাণিত কলামগুলো ছিল আপসহীন সত্যের দলিল, যা সাধারণ মানুষের মনে জাগিয়েছিল সাহস আর শোষক ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের মনে সৃষ্টি করত প্রচ্ছন্ন ভীতি। ইতিহাসের ধুলোপড়া পাতা থেকে লড়াইয়ের বীরত্বগাথা তুলে এনে তিনি তাকে সমকালীন আন্দোলনের হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন—যেখানে তাঁর প্রতিটি অক্ষর হয়ে উঠেছিল এক একটি শাণিত তলোয়ার।
আজ যখন সমাজবাস্তবতায় অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সাংস্কৃতিক স্থবিরতা প্রকট, তখন সত্যেন সেনের আদর্শ আরও বেশি জরুরি। তিনি সারা জীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেছেন। বর্তমান সময়ে যখন বাজারমুখী অপসংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করছে, তখন সত্যেন সেনের অনাড়ম্বর জীবন ও আদর্শ আমাদের পথপ্রদর্শক।
বর্তমানে আমরা যখন ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং অসহিষ্ণুতার এক কঠিন সময় পার করছি, তখন সত্যেন সেনের আদর্শ সবচেয়ে বেশি জরুরি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতিই পারে মানুষের ভেতরের ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিতে। সত্যেন সেনের কাছে 'অসাম্প্রদায়িকতা' কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শন। তিনি জানতেন, বহু বছরের বাংলার লোকসংস্কৃতি (বাউল, জারি, সারি) কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, বরং এটি সকল বাঙালির উত্তরাধিকার। আজকের বিভাজিত সমাজে তাঁর এই সমন্বিত সাংস্কৃতিক চর্চার দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান যুগে বিশ্বায়ন ও করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের মৌলিক ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম যখন শিকড়হীন বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে, তখন সত্যেন সেনের 'গণমুখী সংস্কৃতি' এক জোরালো প্রতিবাদ। তিনি শিখিয়েছেন সংস্কৃতি কেবল সস্তা বিনোদন বা ব্যবসার মাধ্যম নয়। শিল্পের দায়বদ্ধতা আছে সাধারণ মানুষের প্রতি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে আজকের তরুণরা অপসংস্কৃতির বিপরীতে একটি সুস্থ ও রুচিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।
আজকাল রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সত্যেন সেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন যে, রাজনীতি তখনই সার্থক হয় যখন তা সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন ঘটায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পেটের ক্ষুধার আগে মনের ক্ষুধা বা চেতনার মুক্তি প্রয়োজন। আজকের রাজনৈতিক সংকটে যেখানে আদর্শের চেয়ে পেশীশক্তি বা অর্থের দাপট বেশি, সেখানে সত্যেন সেনের ত্যাগী ও নীতিনিষ্ঠ জীবন এক বিশাল নৈতিক শক্তি।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন মহলে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটছে। সত্যেন সেন তাঁর ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ বা ‘ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’-র মতো আকর গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে নির্মোহভাবে ইতিহাস চর্চা করতে হয়। তিনি মনে করতেন, যে জাতি নিজের প্রকৃত ইতিহাস জানে না, তারা সামনে এগোতে পারে না। বর্তমানের পরিচয় সংকটে তাঁর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আমাদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
আজকের অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে সত্যেন সেনের ‘তেভাগা’ বা ‘কৃষক আন্দোলন’-এর চেতনা আজও অম্লান। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের (কৃষক-শ্রমিক) দাবিগুলো নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছে দিতে হয়। বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজনের যুগেও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার প্রেরণা আমরা তাঁর জীবন থেকেই পাই।
সত্যেন সেন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষ নন, তিনি একটি অবিরাম বয়ে চলা নদীর মতো—যার স্রোত আজও শোষিত মানুষের মনে সাহস জোগায়। মশাল হাতে তিনি যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তার দায়বদ্ধতা এখন বর্তমান প্রজন্মের ওপর। দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েক দশকে এক সংকীর্ণ প্রচেষ্টায় সত্যেন সেনের কর্ম ও জীবনকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে আটকে রাখার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তাঁর ব্যাপ্তি কোনো দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সকল মানুষের, সকল লাঞ্ছিত প্রাণের কণ্ঠস্বর।
সময় এসেছে সেই কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে তাঁকে প্রকৃত গণমানুষের বিস্তৃত আঙিনায় নিয়ে আসার। তাঁর জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজকে জঞ্জালমুক্ত করার শপথ নেওয়ার এখনই সময়। তাঁর ১১৯তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ গড়ার লড়াইয়ে তাঁর দেখানো পথে অবিচল থাকা। সত্যেন সেনের স্মৃতি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং তাঁর আদর্শকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের হাতিয়ার করে তোলার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব।

“নেতানিয়াহু কি মারা গেছে?”, “যুদ্ধ কবে থামবে?”, “তেলের দামের কী হবে?”—এসব কথাই এখন ভাসছে গ্রামের বাতাসে। হাতে থাকা চীনা স্মার্টফোন আর দুর্বল থ্রি-জি/ফোর-জি নেটওয়ার্ক সম্বল করেই ৫,০০০ কিলোমিটার দূরের এক যুদ্ধকে তারা যেন নিজেদের উঠোনে নিয়ে এসেছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
সব জায়গাতেই এখন একটাই প্রশ্ন: বাংলায় কি আবার ক্ষমতায় আসবে তৃণমূল, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে বিজেপি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিভিন্ন সংস্থা ও মিডিয়া হাউস এরইমধ্যে মতামত সমীক্ষা বা ‘ওপিনিয়ন পোল’ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সেসব পোলের ফলাফল বলছে, লড়াই এখনো তৃণমূল বনাম বিজেপি, কিন্তু আগের মতো একতরফা নয়।
১৮ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তার উচ্চস্বর কিছুটা নিচু করে সম্প্রতি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইরানের কাছে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। জবাবে ইরান ৫ দফা শর্ত দিয়ে যা যা বলেছে, যুদ্ধ বন্ধের জন্য সেগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক এবং ন্যূনতম যৌক্তিক শর্ত।
১ দিন আগে
আপনার নেগ্রোনি নামিয়ে রাখুন, প্রাডা হ্যান্ডব্যাগ সরিয়ে দিন এবং হাতে তুলে নিন একটি পেপারব্যাক বই। পরের বার কেউ যখন আপনার ছবি তুলতে ফোন বের করবে, তখন লিপস্টিক নয়, বরং পড়ার চশমা হাতে নিন। কারণ এখন বুদ্ধিমত্তাই নতুন আকর্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
১ দিন আগে