কাউসার হামিদ জাওয়াদ

ইমাজিন করেন তখন ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স কিছুই নাই। ঘরের সবাই একসাথে বইসা বিটিভি দেখতেছেন। রাত আটটার বাতাবি লেবুর নিউজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা। নিউজ শেষ হইলেই কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি মিউজিক বাইজা উঠল। এই মিউজিক শুনার জন্যই এতোক্ষণ অপেক্ষা! মিউজিক শেষ হওয়ার পরে বহু করতালির ভেতর দিয়া টিভির পর্দায় আইসা হাজির হইলেন হানিফ সংকেত।
হ্যাঁ, ইত্যাদির কথাই বলতেছিলাম, বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান।
এইবার বের হয়া আসেন ইমাজিনেশন থেকা। সাল ২০২৬। বাংলাদেশের আর্ট-কালচারে অবদানের জন্য ইত্যাদির লাইফলাইন হানিফ সংকেত স্বাধীনতা পদক পাইছেন। চান্স অনেক বেশি, এই লেখা পড়ার আগে খবরটা আপনি জানতেন না। ঠিক যেমন লাস্ট কবে ইত্যাদি দেখছেন, সেটাও মনে নাই আপনার।

একসময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে আইকনিক টিভি প্রোগ্রাম আজকে আউট অব কনভার্সেশন কীভাবে হইলো? আগের সেই হাইপ এখন আর কেন নাই? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন কেঁচো খুঁড়তে নামতেছি । সাপ বাইর হবে, নাকি তেলের খনি, পুরা লেখা পড়লে জানা যাবে।
ইত্যাদি কেমন প্রোগ্রাম, এইটা সবাই মোটামুটি জানে। তাও একটু উইকিপিডিয়াগিরি করা যাক। হেটার্সরা বলবে লেখা বড় করার ধান্ধা।
ইত্যাদি বাংলাদেশে সবচে লম্বা সময় প্রচারিত টিভি প্রোগ্রাম। একইসাথে, পৃথিবীর সবচে লম্বা সময় ধইরা প্রচারিত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হওয়ার কারণে ইত্যাদির একেকটা এপিসোড কয়েকটা ছোটো সেগমেন্ট নিয়া হয় । প্রায় সব সেগমেন্টই স্ক্রিপ্টেড। নানা-নাতি, মামা-ভাইগ্না, বিদেশি প্রোগ্রামের বাংলা ডাবিং, বিদেশিদের বাংলাদেশি বানায়া কাবজাব করানো–এইগুলা ছিল ইত্যাদির সবচেয়ে পপুলার সেগমেন্ট। উপস্থাপন করেন হানিফ সংকেত, যার উপস্থাপনের ভঙ্গিমাই ইত্যাদির অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ড সিগনেচার।
ইত্যাদির প্রথম এপিসোড প্রচারিত হয় ১৯৮৯ সালে। শুরুতে টিভি স্টুডিওতে শ্যুট হইলেও, ৯০-এর দশকে ইত্যাদি আউটডোরে শিফট করে। একেক এপিসোড একেক জেলায় শ্যুট করার উদ্দেশ্য ছিলো, আলাদা সেগমেন্টের মাধ্যমে ওই জেলার কালচার, উচ্চারণ, লাইফস্টাইল আর হিস্টোরিকাল জায়গাগুলার সাথে অডিয়েন্সরে পরিচয় করায়া দেওয়া। কাজেই বলা যায়, ইত্যাদি খালি এন্টারটেইনমেন্ট প্রোগ্রাম থাকেনাই, একরকম কালচারাল ম্যাপিং প্রজেক্টও হয়া উঠছিল।
অ্যাজ আ টিভি প্রোগ্রাম, ইত্যাদি ছিলো ন্যাশনাল টেলিভিশনের জন্য প্রায় পারফেক্ট একটা অনুষ্ঠান। ফ্যামিলি শো, কোনো ভালগারিটি নাই। সো কল্ড ‘সুস্থ’ বিনোদন দেওয়াই ছিলো ইত্যাদির মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন সোশ্যাল ইস্যুতে সফটকোর স্যাটায়ার করলেও, ইত্যাদি কোনো পার্টিকুলার এজেন্ডা প্রচার করে নাই। কোনো কমিউনিটি, এস্টাবলিশমেন্ট বা রাজনৈতিক শক্তির সাথেও ক্ল্যাশে যায় নাই। একইসাথে, নিজেদের অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কালচার, উচ্চারণ, লাইফস্টাইল আর ঐতিহাসিক জায়গাগুলা দেখাইতো ইত্যাদি। ন্যাশনাল টেলিভিশনের জন্য এর চেয়ে বেশি উপযোগী কোনো ‘অল ইন ওয়ান’ প্রোগ্রাম খুব কমই পাওয়া যাইত।
ইত্যাদির উত্থান এবং জনপ্রিয়তা
ইত্যাদি বাংলাদেশের সবচে লম্বা সময় ধইরা প্রচারিত প্রোগ্রাম হইলেও, দেশের প্রথম ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছিল ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’। হানিফ সংকেতের মিডিয়া জগতে প্রথম পা রাখাও এই প্রোগ্রামের ভেতর দিয়া। অর্থাৎ, ইত্যাদির আগেই সেইম ফরম্যাটে প্রোগ্রাম বানানো হইছে এবং অডিয়েন্সও ফরম্যাটটার সাথে পরিচিত ছিল।

ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বা রিয়ালিটি শোগুলা সারা দুনিয়াতেই ৭০ থেকা ৯০ এর দশক পর্যন্ত রমরমা সময় পার করছে । অডিয়েন্স প্রেফারেন্সের চেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিলো টিভি মিডিয়ার স্ট্রাকচার। টিভি মিডিয়ার প্রথম জমানায় বেশিরভাগ দেশেই চ্যানেল ছিলো হাতে গোনা দুই-তিনটা। কী ধরনের প্রোগ্রাম প্রচারিত হবে, সেই ডিসিশান নেয়ার বার্গেইনিং পাওয়ার ছিলো মিডিয়ার হাতে। কারণ অডিয়েন্সের হাতে কোনো অল্টারনেটিভ ছিলো না।
১৯৮৯ সালে ইত্যাদি শুরুর সময়ে চ্যানেলের সংখ্যা ছিলো মাত্র একটা। যেকোনো প্রোগ্রামের প্রথম এপিসোড দিয়াই তখন সারাদেশের মানুষরে রিচ করা যাইতেছে। তার উপরে ইত্যাদি ছিলো আগেকার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলার চেয়ে বেটার প্রোডাক্ট। এরকম মার্কেটে মাত্র একটা ভালো এপিসোড করতে পারলেই ফিরা তাকানোর দরকার পড়ে না। ইত্যাদির উত্থান আর পপুলারিটি পাওয়ার পেছনে এইটা ছিল বিশাল ফ্যাক্টর, যেটারে ব্রডকাস্ট মনোপলি এডভান্টেজ বলা যায়।
ইত্যাদি একটা পিওর বাংলাদেশি ঘটনা হয়ে উঠতে পারছিলো। সব সময় তারা বাংলাদেশরে রিপ্রেজেন্ট কইরা গেছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি, গুপ্ত নভেলিস্ট জীবনানন্দ দাস বলছিলেন, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়। ইত্যাদিরও একটা ইভেনচুয়াল ডেক্লাইন ঘটছে। এখন আর কেউ বইসা থাকে না কবে ইত্যাদি হবে।
চলেন, আমরা সিআইডি ইন্সপেক্টর দায়া হয়ে একটু পাতা লাগাই ইত্যাদির হাইপ হারানোর পিছে কোন কোন ফ্যাক্টর কাজ করছে।

বাংলাদেশের মানুষ টিভিতে কি দেখবে, দীর্ঘদিন সেই দায়িত্ব বিটিভি কান্ধে তুইলা রাখছিলো । ১৯৯২ সালে ডিশ লাইন বৈধ হওয়ার ভেতর দিয়া ইন্টারন্যাশনাল টিভি চ্যানেলগুলা এই দেশে ঢুকার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক একটা টিভি এনভায়রনমেন্ট গইড়া উঠতে আরো সময় লাগে। প্রথম বাংলাদেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা আসে ১৯৯৭ সালে। সারা দেশে স্যাটেলাইট ছড়াইতে আরো কয়েক বছর লাইগা যায়।
অর্থাৎ, ইত্যাদি প্রায় এক যুগের বেশি সময় একচ্ছত্রভাবে ডমিনেট কইরা গেসে টিভি মিডিয়াতে। একপ্রকার মনোপলি এটেনশন তারা ধইরা রাখছিলো।
স্যাটেলাইট টিভি আসার পরে রিমোট দিয়া চ্যানেল ঘুরানো হয়া গেল মানুষের রেগুলার অভ্যাস। আগে মানুষ ভাবতো, টিভিতে এখন কী দেখাইতেছে । স্যাটেলাইট আসার পরে মানুষ ভাবতে শুরু করলো, কোন চ্যানেলে কী দেখাইতেছে। এই ছোট্ট শিফটটাই আসলে গেম চেঞ্জ কইরা দিলো।
ফলে, ন্যাশনাল চ্যানেল হিসেবে বিটিভির আপিল কমতে থাকলো। মানুষের হাতে এখন অল্টারনেটিভ আছে। বড় ইনভেস্টমেন্ট আর অ্যাডভার্টাইজিং রেভিনিউ প্রাইভেট চ্যানেলগুলারে সুযোগ করে দিলো বেটার টিভি এক্সপেরিয়েন্স দেয়ার। বিটিভি পইড়া রইল বাতাবি লেবু নিয়াই।
ফলাফল অডিয়েন্স বিটিভি থিকা মুভ অন করল। কেউ কেউ ফিরা আসতো ইত্যাদি অথবা নিজেদের পছন্দের অনুষ্ঠান দেখার জন্য। কিন্তু গ্রামের বাড়ির মতোই বিটিভিতে অডিয়েন্সের ফিরা আসাটা কখনোই পার্মানেন্ট হয় নাই। সুতরাং বলা যায়, ইত্যাদির হাইপ কমার ঘটনা বিটিভি জমানার পতনের সাথে গভীরভাবে কানেক্টেড।
১৯৮৯ সালে যখন ইত্যাদি শুরু হয়, প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারাটা স্মার্টনেসের একটা লক্ষণ ছিলো। একইসাথে মিডিয়াতে কাজ করার জন্য এইটা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক স্কিল। হানিফ সংকেত তার পূর্বসূরি ফজলে লোহানীর মতো শুধু প্রমিত বাংলায় কথা বলায় থামেন নাই, জিনিসটারে আরেক লেভেলে নিয়া গেছেন। ছন্দ মিলায়া রসায়া কথা বলতে পারা এবং উইট ব্যবহার করা ছিলো তার উপস্থাপনার সিগনেচার স্টাইল। বাংলাদেশি টিভি মিডিয়াতে এই ধরনের রিদমিক আর উইটি উপস্থাপনা আর কেউ করতে পারে নাই।
কিন্তু এই ভঙ্গিমার জন্ম এমন এক সময়ে, যখন পপ কালচারের মেইন কনস্যুমার ছিলো জেন-এক্স, মিলেনিয়ালদের আগের প্রজন্ম। তখন প্রমিত বাংলায় কথা বলার মানে ছিলো মোটাদাগে শিক্ষিত আর রুচিশীল হওয়ার একটা ঘটনা।
অতঃপর স্যাটেলাইট চ্যানেল আসলো। মিলেনিয়ালরা টিনেইজ এবং ইয়াং হইলেন। বদলাইতে শুরু করলো বাংলাদেশের পপ কালচারের ভাষা। ছবিয়াল গং, নব্বইয়ের ঢাকাই কবি-সাহিত্যিকরা প্রমিত বাংলারে সাইডে রেখে কমন মানুষের ভাষারে পপ-কালচারে নিয়ে আসলো। এরপর সোশাল মিডিয়া আর জেন-জি ইন্টারনেট কালচার এই পরিবর্তন আরও স্পিড আপ করলো।
পপ কালচারের পানি এতদিনে অনেক দুর গড়াইছে।
আজকের মিম কালচার জমানায় প্রমিত বাংলায় ছন্দ মিলায়ে উইটি কথা বলতে পারায় সেই আগের আপিল আর নাই। মানুষটা যদি হানিফ সংকেত হয়, তখন কিছুটা আগ্রহ নিয়া মানুষ শোনে। কারণ তিনি এই স্টাইলের জনক তিনিই।
প্রশ্নটা তাই সোজা, একই উপস্থাপনার ভঙ্গিমা ইউস করে আজকের দিনে নতুন কেউ ‘হানিফ সংকেত’ হইতে পারবে?
উত্তরটা হইতেসে, না।
অ্যাপলিটিকাল হিউমার
ইত্যাদির কমেডি স্কিটগুলাতে বিভিন্ন রকমের হিউমার থাকতো। কিছু থাকতো পার্সোনাল সম্পর্ক কেন্দ্রিক, যেমন নানা-নাতির সেগমেন্ট। কিছু স্যাটায়ার স্কিট থাকতো সোশাল ইস্যু নিয়া। ঐ স্কিটগুলাতে বিভিন্ন সোশাল ইস্যুর ওপরে কমেন্টারি থাকলেও আলাদা সাবস্ট্যান্স খুব একটা পাওয়া যায় না।
ন্যাশনাল টেলিভিশনের প্রোগ্রাম হওয়ার কারনে স্কিটগুলাতে কোনো এস্টাবলিশমেন্টের দিকে আঙ্গুল তোলা বা সরাসরি ইঙ্গিত করার ঘটনা প্রায় নাই বললেই চলে।
ইন্টারনেট আসার পরে সাবস্ট্যান্স ছাড়া হিউমারের আপিল কমতে শুরু করে। সেইসাথে বাংলাদেশ পার করসে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামল। যেখানে মিম বানানোর জন্যও মানুষ জেলে গেছে। স্বাধীনভাবে কথা বলার স্পেস ছিলো না। এই সময়টাতে হিউমার আর মিম অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠসে মানুষের প্রতিবাদ আর ক্ষোভ দেখানোর ভাষা।
এই জায়গাতেই ইত্যাদি পিছায়া পড়ে।
কারণ, ইত্যাদির হিউমার ছিলো অ্যাপলিটিকাল। সোশ্যাল ইস্যুগুলা নিয়া কথা বললেও, সেই ইস্যুগুলার গভীরে থাকা স্ট্রাকচারাল, ইন্সটিটিউশনাল বা পলিটিকাল কারণগুলারে টাচ করা হইতো না। বরং নৈতিকতার জায়গা থেইকা সমস্যাগুলা ডিল করা হইতো।
আজকের অডিয়েন্স আর সময় কোনোটাই সেই জায়গায় থাইমা নাই। এই হাইলি পলিটিসাইজড দুনিয়াতে হিউমার কনজামশনের সময়ে মানুশ জাস্ট হিউমার না, আরো বেশি কিছু খোঁজে । সেইটা মিম হোক, স্ট্যান্ডাপ কমেডি অথবা টিভি শো।
মার্কেটিংয়ের দুনিয়াতে অ্যাড ফ্যাটিগ বইলা একটা টার্ম আছে। একটা ব্র্যান্ডের কমিউনিকেশন বারবার দেখতে দেখতে অডিয়েন্স যখন আগ্রহ হারায়া ফেলে, ঐ অবস্থাটারে বলা হয় অ্যাড ফ্যাটিগ।
একইভাবে, মিডিয়াতেও ফরম্যাট ফ্যাটিগ নামের একটা জিনিস আছে। সেইম ফরম্যাটের কনটেন্ট বারবার দেখতে দেখতে মানুষ ইন্টারেস্ট হারায়া ফেলে। একটা সাকসেসফুল টিভি প্রোগ্রাম যদি দীর্ঘদিন নিজেদের ফরম্যাট না বদলায়, তাহলে ফরম্যাট ফ্যাটিগ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। যেটা ইত্যাদির সাথে হইছে ।
ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমরা দেখি, দীর্ঘসময় ধইরা তাদের সেগমেন্টগুলা প্রায় একই ফর্মুলা বছরের পর বছর ইউজ কইরা চলতেসে। একসময় অডিয়েন্স ইত্যাদি দেখতো ইউনিক, অনেক রকমের এন্টারটেইনমেন্ট সেগমেন্টে ভরা একটা প্রোগ্রাম হিসেবে। কিন্তু আজকে কেউ ইত্যাদি দেখতে বসলে, অনেক ক্ষেত্রেই আগেই আন্দাজ করতে পারে স্যাটায়ার স্কিটগুলায় কী ধরনের পাঞ্চলাইন আসতে যাইতেছে।
এইটা কোয়ালিটির সমস্যা না, ইনোভেশনের সমস্যা।
আজকের দিনে বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এত বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট দেইখা মানুষ অভ্যস্ত হয়া গেছে। ফলে তাদের অ্যাটেনশন ধইরা রাখতে গেলে কনটেন্ট ফরম্যাটে ক্রমাগত চেইঞ্জ নিয়া আসতে হয়।
এই জায়গাতেই ইত্যাদি একটু পিছাইয়া পড়ছে কারণ, এখনও তারা অনেকটাই সেই পুরানা টিভি প্রোগ্রাম ফরম্যাটের ভেতরেই আটকা।
একসময় ইত্যাদির নতুন এপিসোড মানেই ছিলো ছোটখাটো একটা জাতীয় ঘটনা। অনুষ্ঠান কবে হবে, কখন হবে, এইগুলা জানার ভেতরেও একটা আলাদা এক্সাইটমেন্ট ছিলো। কারণ তখন সব অডিয়েন্স ছিলো এক জায়গাতে, টেলিভিশনে। চ্যানেল কম, অপশন কম, আর ফুল ফ্যামিলি একসাথে টিভি দেখার মজবুত কালচার ছিল।
ফলে ইত্যাদি একটা টিভি প্রোগ্রামের বাইরে একটা কালেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স হয়া উঠত বাংলাদেশের মানুষের জন্য। একই সময়ে আপনি ইত্যাদি দেখতেসেন, পাশের বাসার মানুষও দেখতেসে। পরের দিন স্কুল-কলেজ-অফিসে সেইটার আলাপও হইতেসে। এই শেয়ার্ড ভিউয়িং কালচারটাই ইত্যাদিরে আলাদা একটা ঘটনা বানাইসিল।
কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে অডিয়েন্স এখন আর এক জায়গায় নাই। বরং ছড়ানো ছিটানো। কেউ ইউটিউবে শর্টস দেখতেসে, কেউ টিকটকে স্ক্রল করতেসে, কেউ ওটিটিতে সিরিজ, কেউ ফেসবুকে রিল।
মানে, আগে যেই মনোযোগ একটা বড় স্ক্রিনের সামনে একসাথে জমা হইতো, এখন সেই মনোযোগ হাজার টুকরায় ভাগ হয়া গেসে। এই অবস্থায় ইত্যাদি ভালো লাগলেও, তারে আর আগের মতো ‘মাস্ট ওয়াচ’ বানানো যায় না। মানুষ এখন কনটেন্ট কনসিউম করে নিজের সময়মতো, নিজের ডিভাইসে, নিজের অ্যালগরিদমের ভেতর। ফলে ইত্যাদি এখনো কালচারাল মেমোরি হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু পুরানা অর্থে ন্যাশনাল টেলিভিশন ইভেন্ট আর না।
এখন ইত্যাদি একটা কনটেন্ট, ইভেন্ট না।
এই ‘নাই হয়া যাওয়া’ টা খুবই সরল একটা কথা। কিন্তু রিয়ালিটি আরও জটিল।
এইটা সত্য ইত্যাদি এখন আর আগের মতো হাইপ তুলতে পারে না। এর কারণগুলা নিয়াই এতক্ষণ আলোচনা করলাম আমরা। টেলিভিশনের জন্য বানানো একটা প্রোগ্রামের ইভেনচুয়াল ডেকলাইন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।
কিন্তু ইত্যাদি একদম হারায়া যায় নাই।
এখনো ইত্যাদির জেলাভিত্তিক শ্যুটিংগুলাতে প্রচুর মানুষ হয়। ২০২৫ সালে ঠাকুরগাঁয়ে মানুষের চাপে বিশৃঙ্খলার কারণে শ্যুটিং বন্ধ হয়া গেছিল। এইসব ঘটনা প্রমাণ করে মানুষের আগ্রহ এখনো শেষ হয় নাই। ইউটিউবে ইত্যাদির পুরানা অনেক এপিসোডে কয়েক মিলিয়ন ভিউ আছে। মানুষ এখনো রিওয়াচ করে।
অর্থাত, হাইপ হারায় ফেললেও ইত্যাদি একদম নাই হয়া যায় নাই। এখনো খুবই তাজা একটা ন্যাশনাল মেমোরি। খুব নিকটবর্তী একটা নস্টালজিয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইত্যাদির প্রেজেন্স, পুরানা এপিসোডগুলার আপলোড করা, সেগমেন্টগুলা নিয়া আলাদা রিলস, শর্টস বানায়া রাখা টিভি প্রোগ্রাম হিসাবে ইত্যাদিকে মানুষের মেমোরিতে ফ্রেশ থাকতে হেল্প করতেছে । ফলে, ইত্যাদি আর শুধু একটা টিভি প্রোগ্রাম না, বাংলাদেশের পপকালচার টাইমলাইনের একটা আর্কাইভালেও পরিণত হইছে।
সবশেষে
আজকের অ্যালগরিদম-সেন্ট্রিক, পার্সোনালাইজড পপকালচারের জমানায় একসাথে একসময়ে সেইম কনটেন্ট এনজয় করার কালচার প্রায় নাই হয়া গেছে। কালেক্টিভ ভিউয়িং এক্সপেরিয়ান্সের ফিলিংসটাও সাথে হারায়া গেছে । এখন মানুষের অপশনের অভাব নাই, কিন্তু এই অপশনের এভেইলেবিলিটি শেয়ারড ন্যাশনাল মোমেন্টগুলা আমাদের থেকে ছিনায়া নিছে।
এই জায়গায় ইত্যাদি একটা ব্রিজ হয়ে দাঁড়ায়া আছে।
দুই জমানার মাঝখানে দাঁড়ানো একটা টিভি প্রোগ্রাম। একদিকে ব্রডকাস্ট আমলের কালেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স, আরেকদিকে অ্যালগরিদমিক জমানার একাকীত্ব।
ইত্যাদি জাস্ট একটা টিভি প্রোগ্রাম না, বরং একটা কালেক্টিভ সময়ের রেলিক।
ইত্যাদির উত্থান, পপুলারিটি গেইন করা, আর হাইপ হারায়া ফেলা, সবই আসলে বাংলাদেশের মিডিয়া আর পপ-কালচারের বদলাইতে থাকা বাস্তবতার প্রতিফলন।
লেখা অলরেডি শেষ। আপনারা চাইলে এইখানেই লিভ মারতে পারেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা পারসোনাল মেমোরি শেয়ার করি।
২০২৩ সালের কোনো একদিন। আমি তখন এমবিএ করতেছি। ক্যাম্পাস থেকা দুপুরে বাইর হইয়া আজিজ সুপার মার্কেটের ফুটপাতে হাঁইটা যাইতেছি।
হঠাৎ উল্টাদিক থেইকা আগত একজন মানুষের দিকে চোখ পড়ল। চেহারাটা চেনা চেনা লাগতেসিল। আবার মনে হইতেসিল, মেবি ভুল হইতেছে।
দুই-তিন সেকেন্ড ভ্রু কুচকায়া লোকটার দিকে তাকায়া থাকলাম। উনি নোটিশ করছেন কি না জানি না। লোকটা আমারে ক্রস কইরা চলে গেল।
আমি পেছনে তাকাইলাম। তখনো বুঝার চেষ্টা করতেছি, এইটা কি আসলেই ঐ লোক?
লোকটাও হাটতে হাটতেই পেছনে ফিরা তাকাইল।
আমার দিকে তাকায়া হাসিমুখে বললো, ভালো আছেন?
তখনই আমি শিওর হইলাম, এইটা হানিফ সংকেত।
সামনাসামনি কখনো দেখি নাই, তাই প্রথমে চিনতে পারতেছিলাম না। আমি হাসি দিয়া সালামের ভঙ্গিতে হাত উঠাইলাম। উনিও হাসতে হাসতে জবাবে হাত উঠাইলেন।
তারপর আমরা দুইজন দুইদিকে হাঁইটা চইলা গেলাম।

ইমাজিন করেন তখন ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স কিছুই নাই। ঘরের সবাই একসাথে বইসা বিটিভি দেখতেছেন। রাত আটটার বাতাবি লেবুর নিউজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা। নিউজ শেষ হইলেই কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি মিউজিক বাইজা উঠল। এই মিউজিক শুনার জন্যই এতোক্ষণ অপেক্ষা! মিউজিক শেষ হওয়ার পরে বহু করতালির ভেতর দিয়া টিভির পর্দায় আইসা হাজির হইলেন হানিফ সংকেত।
হ্যাঁ, ইত্যাদির কথাই বলতেছিলাম, বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান।
এইবার বের হয়া আসেন ইমাজিনেশন থেকা। সাল ২০২৬। বাংলাদেশের আর্ট-কালচারে অবদানের জন্য ইত্যাদির লাইফলাইন হানিফ সংকেত স্বাধীনতা পদক পাইছেন। চান্স অনেক বেশি, এই লেখা পড়ার আগে খবরটা আপনি জানতেন না। ঠিক যেমন লাস্ট কবে ইত্যাদি দেখছেন, সেটাও মনে নাই আপনার।

একসময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে আইকনিক টিভি প্রোগ্রাম আজকে আউট অব কনভার্সেশন কীভাবে হইলো? আগের সেই হাইপ এখন আর কেন নাই? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন কেঁচো খুঁড়তে নামতেছি । সাপ বাইর হবে, নাকি তেলের খনি, পুরা লেখা পড়লে জানা যাবে।
ইত্যাদি কেমন প্রোগ্রাম, এইটা সবাই মোটামুটি জানে। তাও একটু উইকিপিডিয়াগিরি করা যাক। হেটার্সরা বলবে লেখা বড় করার ধান্ধা।
ইত্যাদি বাংলাদেশে সবচে লম্বা সময় প্রচারিত টিভি প্রোগ্রাম। একইসাথে, পৃথিবীর সবচে লম্বা সময় ধইরা প্রচারিত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হওয়ার কারণে ইত্যাদির একেকটা এপিসোড কয়েকটা ছোটো সেগমেন্ট নিয়া হয় । প্রায় সব সেগমেন্টই স্ক্রিপ্টেড। নানা-নাতি, মামা-ভাইগ্না, বিদেশি প্রোগ্রামের বাংলা ডাবিং, বিদেশিদের বাংলাদেশি বানায়া কাবজাব করানো–এইগুলা ছিল ইত্যাদির সবচেয়ে পপুলার সেগমেন্ট। উপস্থাপন করেন হানিফ সংকেত, যার উপস্থাপনের ভঙ্গিমাই ইত্যাদির অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ড সিগনেচার।
ইত্যাদির প্রথম এপিসোড প্রচারিত হয় ১৯৮৯ সালে। শুরুতে টিভি স্টুডিওতে শ্যুট হইলেও, ৯০-এর দশকে ইত্যাদি আউটডোরে শিফট করে। একেক এপিসোড একেক জেলায় শ্যুট করার উদ্দেশ্য ছিলো, আলাদা সেগমেন্টের মাধ্যমে ওই জেলার কালচার, উচ্চারণ, লাইফস্টাইল আর হিস্টোরিকাল জায়গাগুলার সাথে অডিয়েন্সরে পরিচয় করায়া দেওয়া। কাজেই বলা যায়, ইত্যাদি খালি এন্টারটেইনমেন্ট প্রোগ্রাম থাকেনাই, একরকম কালচারাল ম্যাপিং প্রজেক্টও হয়া উঠছিল।
অ্যাজ আ টিভি প্রোগ্রাম, ইত্যাদি ছিলো ন্যাশনাল টেলিভিশনের জন্য প্রায় পারফেক্ট একটা অনুষ্ঠান। ফ্যামিলি শো, কোনো ভালগারিটি নাই। সো কল্ড ‘সুস্থ’ বিনোদন দেওয়াই ছিলো ইত্যাদির মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন সোশ্যাল ইস্যুতে সফটকোর স্যাটায়ার করলেও, ইত্যাদি কোনো পার্টিকুলার এজেন্ডা প্রচার করে নাই। কোনো কমিউনিটি, এস্টাবলিশমেন্ট বা রাজনৈতিক শক্তির সাথেও ক্ল্যাশে যায় নাই। একইসাথে, নিজেদের অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কালচার, উচ্চারণ, লাইফস্টাইল আর ঐতিহাসিক জায়গাগুলা দেখাইতো ইত্যাদি। ন্যাশনাল টেলিভিশনের জন্য এর চেয়ে বেশি উপযোগী কোনো ‘অল ইন ওয়ান’ প্রোগ্রাম খুব কমই পাওয়া যাইত।
ইত্যাদির উত্থান এবং জনপ্রিয়তা
ইত্যাদি বাংলাদেশের সবচে লম্বা সময় ধইরা প্রচারিত প্রোগ্রাম হইলেও, দেশের প্রথম ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছিল ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’। হানিফ সংকেতের মিডিয়া জগতে প্রথম পা রাখাও এই প্রোগ্রামের ভেতর দিয়া। অর্থাৎ, ইত্যাদির আগেই সেইম ফরম্যাটে প্রোগ্রাম বানানো হইছে এবং অডিয়েন্সও ফরম্যাটটার সাথে পরিচিত ছিল।

ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বা রিয়ালিটি শোগুলা সারা দুনিয়াতেই ৭০ থেকা ৯০ এর দশক পর্যন্ত রমরমা সময় পার করছে । অডিয়েন্স প্রেফারেন্সের চেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিলো টিভি মিডিয়ার স্ট্রাকচার। টিভি মিডিয়ার প্রথম জমানায় বেশিরভাগ দেশেই চ্যানেল ছিলো হাতে গোনা দুই-তিনটা। কী ধরনের প্রোগ্রাম প্রচারিত হবে, সেই ডিসিশান নেয়ার বার্গেইনিং পাওয়ার ছিলো মিডিয়ার হাতে। কারণ অডিয়েন্সের হাতে কোনো অল্টারনেটিভ ছিলো না।
১৯৮৯ সালে ইত্যাদি শুরুর সময়ে চ্যানেলের সংখ্যা ছিলো মাত্র একটা। যেকোনো প্রোগ্রামের প্রথম এপিসোড দিয়াই তখন সারাদেশের মানুষরে রিচ করা যাইতেছে। তার উপরে ইত্যাদি ছিলো আগেকার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলার চেয়ে বেটার প্রোডাক্ট। এরকম মার্কেটে মাত্র একটা ভালো এপিসোড করতে পারলেই ফিরা তাকানোর দরকার পড়ে না। ইত্যাদির উত্থান আর পপুলারিটি পাওয়ার পেছনে এইটা ছিল বিশাল ফ্যাক্টর, যেটারে ব্রডকাস্ট মনোপলি এডভান্টেজ বলা যায়।
ইত্যাদি একটা পিওর বাংলাদেশি ঘটনা হয়ে উঠতে পারছিলো। সব সময় তারা বাংলাদেশরে রিপ্রেজেন্ট কইরা গেছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি, গুপ্ত নভেলিস্ট জীবনানন্দ দাস বলছিলেন, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়। ইত্যাদিরও একটা ইভেনচুয়াল ডেক্লাইন ঘটছে। এখন আর কেউ বইসা থাকে না কবে ইত্যাদি হবে।
চলেন, আমরা সিআইডি ইন্সপেক্টর দায়া হয়ে একটু পাতা লাগাই ইত্যাদির হাইপ হারানোর পিছে কোন কোন ফ্যাক্টর কাজ করছে।

বাংলাদেশের মানুষ টিভিতে কি দেখবে, দীর্ঘদিন সেই দায়িত্ব বিটিভি কান্ধে তুইলা রাখছিলো । ১৯৯২ সালে ডিশ লাইন বৈধ হওয়ার ভেতর দিয়া ইন্টারন্যাশনাল টিভি চ্যানেলগুলা এই দেশে ঢুকার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক একটা টিভি এনভায়রনমেন্ট গইড়া উঠতে আরো সময় লাগে। প্রথম বাংলাদেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা আসে ১৯৯৭ সালে। সারা দেশে স্যাটেলাইট ছড়াইতে আরো কয়েক বছর লাইগা যায়।
অর্থাৎ, ইত্যাদি প্রায় এক যুগের বেশি সময় একচ্ছত্রভাবে ডমিনেট কইরা গেসে টিভি মিডিয়াতে। একপ্রকার মনোপলি এটেনশন তারা ধইরা রাখছিলো।
স্যাটেলাইট টিভি আসার পরে রিমোট দিয়া চ্যানেল ঘুরানো হয়া গেল মানুষের রেগুলার অভ্যাস। আগে মানুষ ভাবতো, টিভিতে এখন কী দেখাইতেছে । স্যাটেলাইট আসার পরে মানুষ ভাবতে শুরু করলো, কোন চ্যানেলে কী দেখাইতেছে। এই ছোট্ট শিফটটাই আসলে গেম চেঞ্জ কইরা দিলো।
ফলে, ন্যাশনাল চ্যানেল হিসেবে বিটিভির আপিল কমতে থাকলো। মানুষের হাতে এখন অল্টারনেটিভ আছে। বড় ইনভেস্টমেন্ট আর অ্যাডভার্টাইজিং রেভিনিউ প্রাইভেট চ্যানেলগুলারে সুযোগ করে দিলো বেটার টিভি এক্সপেরিয়েন্স দেয়ার। বিটিভি পইড়া রইল বাতাবি লেবু নিয়াই।
ফলাফল অডিয়েন্স বিটিভি থিকা মুভ অন করল। কেউ কেউ ফিরা আসতো ইত্যাদি অথবা নিজেদের পছন্দের অনুষ্ঠান দেখার জন্য। কিন্তু গ্রামের বাড়ির মতোই বিটিভিতে অডিয়েন্সের ফিরা আসাটা কখনোই পার্মানেন্ট হয় নাই। সুতরাং বলা যায়, ইত্যাদির হাইপ কমার ঘটনা বিটিভি জমানার পতনের সাথে গভীরভাবে কানেক্টেড।
১৯৮৯ সালে যখন ইত্যাদি শুরু হয়, প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারাটা স্মার্টনেসের একটা লক্ষণ ছিলো। একইসাথে মিডিয়াতে কাজ করার জন্য এইটা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক স্কিল। হানিফ সংকেত তার পূর্বসূরি ফজলে লোহানীর মতো শুধু প্রমিত বাংলায় কথা বলায় থামেন নাই, জিনিসটারে আরেক লেভেলে নিয়া গেছেন। ছন্দ মিলায়া রসায়া কথা বলতে পারা এবং উইট ব্যবহার করা ছিলো তার উপস্থাপনার সিগনেচার স্টাইল। বাংলাদেশি টিভি মিডিয়াতে এই ধরনের রিদমিক আর উইটি উপস্থাপনা আর কেউ করতে পারে নাই।
কিন্তু এই ভঙ্গিমার জন্ম এমন এক সময়ে, যখন পপ কালচারের মেইন কনস্যুমার ছিলো জেন-এক্স, মিলেনিয়ালদের আগের প্রজন্ম। তখন প্রমিত বাংলায় কথা বলার মানে ছিলো মোটাদাগে শিক্ষিত আর রুচিশীল হওয়ার একটা ঘটনা।
অতঃপর স্যাটেলাইট চ্যানেল আসলো। মিলেনিয়ালরা টিনেইজ এবং ইয়াং হইলেন। বদলাইতে শুরু করলো বাংলাদেশের পপ কালচারের ভাষা। ছবিয়াল গং, নব্বইয়ের ঢাকাই কবি-সাহিত্যিকরা প্রমিত বাংলারে সাইডে রেখে কমন মানুষের ভাষারে পপ-কালচারে নিয়ে আসলো। এরপর সোশাল মিডিয়া আর জেন-জি ইন্টারনেট কালচার এই পরিবর্তন আরও স্পিড আপ করলো।
পপ কালচারের পানি এতদিনে অনেক দুর গড়াইছে।
আজকের মিম কালচার জমানায় প্রমিত বাংলায় ছন্দ মিলায়ে উইটি কথা বলতে পারায় সেই আগের আপিল আর নাই। মানুষটা যদি হানিফ সংকেত হয়, তখন কিছুটা আগ্রহ নিয়া মানুষ শোনে। কারণ তিনি এই স্টাইলের জনক তিনিই।
প্রশ্নটা তাই সোজা, একই উপস্থাপনার ভঙ্গিমা ইউস করে আজকের দিনে নতুন কেউ ‘হানিফ সংকেত’ হইতে পারবে?
উত্তরটা হইতেসে, না।
অ্যাপলিটিকাল হিউমার
ইত্যাদির কমেডি স্কিটগুলাতে বিভিন্ন রকমের হিউমার থাকতো। কিছু থাকতো পার্সোনাল সম্পর্ক কেন্দ্রিক, যেমন নানা-নাতির সেগমেন্ট। কিছু স্যাটায়ার স্কিট থাকতো সোশাল ইস্যু নিয়া। ঐ স্কিটগুলাতে বিভিন্ন সোশাল ইস্যুর ওপরে কমেন্টারি থাকলেও আলাদা সাবস্ট্যান্স খুব একটা পাওয়া যায় না।
ন্যাশনাল টেলিভিশনের প্রোগ্রাম হওয়ার কারনে স্কিটগুলাতে কোনো এস্টাবলিশমেন্টের দিকে আঙ্গুল তোলা বা সরাসরি ইঙ্গিত করার ঘটনা প্রায় নাই বললেই চলে।
ইন্টারনেট আসার পরে সাবস্ট্যান্স ছাড়া হিউমারের আপিল কমতে শুরু করে। সেইসাথে বাংলাদেশ পার করসে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামল। যেখানে মিম বানানোর জন্যও মানুষ জেলে গেছে। স্বাধীনভাবে কথা বলার স্পেস ছিলো না। এই সময়টাতে হিউমার আর মিম অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠসে মানুষের প্রতিবাদ আর ক্ষোভ দেখানোর ভাষা।
এই জায়গাতেই ইত্যাদি পিছায়া পড়ে।
কারণ, ইত্যাদির হিউমার ছিলো অ্যাপলিটিকাল। সোশ্যাল ইস্যুগুলা নিয়া কথা বললেও, সেই ইস্যুগুলার গভীরে থাকা স্ট্রাকচারাল, ইন্সটিটিউশনাল বা পলিটিকাল কারণগুলারে টাচ করা হইতো না। বরং নৈতিকতার জায়গা থেইকা সমস্যাগুলা ডিল করা হইতো।
আজকের অডিয়েন্স আর সময় কোনোটাই সেই জায়গায় থাইমা নাই। এই হাইলি পলিটিসাইজড দুনিয়াতে হিউমার কনজামশনের সময়ে মানুশ জাস্ট হিউমার না, আরো বেশি কিছু খোঁজে । সেইটা মিম হোক, স্ট্যান্ডাপ কমেডি অথবা টিভি শো।
মার্কেটিংয়ের দুনিয়াতে অ্যাড ফ্যাটিগ বইলা একটা টার্ম আছে। একটা ব্র্যান্ডের কমিউনিকেশন বারবার দেখতে দেখতে অডিয়েন্স যখন আগ্রহ হারায়া ফেলে, ঐ অবস্থাটারে বলা হয় অ্যাড ফ্যাটিগ।
একইভাবে, মিডিয়াতেও ফরম্যাট ফ্যাটিগ নামের একটা জিনিস আছে। সেইম ফরম্যাটের কনটেন্ট বারবার দেখতে দেখতে মানুষ ইন্টারেস্ট হারায়া ফেলে। একটা সাকসেসফুল টিভি প্রোগ্রাম যদি দীর্ঘদিন নিজেদের ফরম্যাট না বদলায়, তাহলে ফরম্যাট ফ্যাটিগ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। যেটা ইত্যাদির সাথে হইছে ।
ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমরা দেখি, দীর্ঘসময় ধইরা তাদের সেগমেন্টগুলা প্রায় একই ফর্মুলা বছরের পর বছর ইউজ কইরা চলতেসে। একসময় অডিয়েন্স ইত্যাদি দেখতো ইউনিক, অনেক রকমের এন্টারটেইনমেন্ট সেগমেন্টে ভরা একটা প্রোগ্রাম হিসেবে। কিন্তু আজকে কেউ ইত্যাদি দেখতে বসলে, অনেক ক্ষেত্রেই আগেই আন্দাজ করতে পারে স্যাটায়ার স্কিটগুলায় কী ধরনের পাঞ্চলাইন আসতে যাইতেছে।
এইটা কোয়ালিটির সমস্যা না, ইনোভেশনের সমস্যা।
আজকের দিনে বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এত বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট দেইখা মানুষ অভ্যস্ত হয়া গেছে। ফলে তাদের অ্যাটেনশন ধইরা রাখতে গেলে কনটেন্ট ফরম্যাটে ক্রমাগত চেইঞ্জ নিয়া আসতে হয়।
এই জায়গাতেই ইত্যাদি একটু পিছাইয়া পড়ছে কারণ, এখনও তারা অনেকটাই সেই পুরানা টিভি প্রোগ্রাম ফরম্যাটের ভেতরেই আটকা।
একসময় ইত্যাদির নতুন এপিসোড মানেই ছিলো ছোটখাটো একটা জাতীয় ঘটনা। অনুষ্ঠান কবে হবে, কখন হবে, এইগুলা জানার ভেতরেও একটা আলাদা এক্সাইটমেন্ট ছিলো। কারণ তখন সব অডিয়েন্স ছিলো এক জায়গাতে, টেলিভিশনে। চ্যানেল কম, অপশন কম, আর ফুল ফ্যামিলি একসাথে টিভি দেখার মজবুত কালচার ছিল।
ফলে ইত্যাদি একটা টিভি প্রোগ্রামের বাইরে একটা কালেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স হয়া উঠত বাংলাদেশের মানুষের জন্য। একই সময়ে আপনি ইত্যাদি দেখতেসেন, পাশের বাসার মানুষও দেখতেসে। পরের দিন স্কুল-কলেজ-অফিসে সেইটার আলাপও হইতেসে। এই শেয়ার্ড ভিউয়িং কালচারটাই ইত্যাদিরে আলাদা একটা ঘটনা বানাইসিল।
কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে অডিয়েন্স এখন আর এক জায়গায় নাই। বরং ছড়ানো ছিটানো। কেউ ইউটিউবে শর্টস দেখতেসে, কেউ টিকটকে স্ক্রল করতেসে, কেউ ওটিটিতে সিরিজ, কেউ ফেসবুকে রিল।
মানে, আগে যেই মনোযোগ একটা বড় স্ক্রিনের সামনে একসাথে জমা হইতো, এখন সেই মনোযোগ হাজার টুকরায় ভাগ হয়া গেসে। এই অবস্থায় ইত্যাদি ভালো লাগলেও, তারে আর আগের মতো ‘মাস্ট ওয়াচ’ বানানো যায় না। মানুষ এখন কনটেন্ট কনসিউম করে নিজের সময়মতো, নিজের ডিভাইসে, নিজের অ্যালগরিদমের ভেতর। ফলে ইত্যাদি এখনো কালচারাল মেমোরি হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু পুরানা অর্থে ন্যাশনাল টেলিভিশন ইভেন্ট আর না।
এখন ইত্যাদি একটা কনটেন্ট, ইভেন্ট না।
এই ‘নাই হয়া যাওয়া’ টা খুবই সরল একটা কথা। কিন্তু রিয়ালিটি আরও জটিল।
এইটা সত্য ইত্যাদি এখন আর আগের মতো হাইপ তুলতে পারে না। এর কারণগুলা নিয়াই এতক্ষণ আলোচনা করলাম আমরা। টেলিভিশনের জন্য বানানো একটা প্রোগ্রামের ইভেনচুয়াল ডেকলাইন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।
কিন্তু ইত্যাদি একদম হারায়া যায় নাই।
এখনো ইত্যাদির জেলাভিত্তিক শ্যুটিংগুলাতে প্রচুর মানুষ হয়। ২০২৫ সালে ঠাকুরগাঁয়ে মানুষের চাপে বিশৃঙ্খলার কারণে শ্যুটিং বন্ধ হয়া গেছিল। এইসব ঘটনা প্রমাণ করে মানুষের আগ্রহ এখনো শেষ হয় নাই। ইউটিউবে ইত্যাদির পুরানা অনেক এপিসোডে কয়েক মিলিয়ন ভিউ আছে। মানুষ এখনো রিওয়াচ করে।
অর্থাত, হাইপ হারায় ফেললেও ইত্যাদি একদম নাই হয়া যায় নাই। এখনো খুবই তাজা একটা ন্যাশনাল মেমোরি। খুব নিকটবর্তী একটা নস্টালজিয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইত্যাদির প্রেজেন্স, পুরানা এপিসোডগুলার আপলোড করা, সেগমেন্টগুলা নিয়া আলাদা রিলস, শর্টস বানায়া রাখা টিভি প্রোগ্রাম হিসাবে ইত্যাদিকে মানুষের মেমোরিতে ফ্রেশ থাকতে হেল্প করতেছে । ফলে, ইত্যাদি আর শুধু একটা টিভি প্রোগ্রাম না, বাংলাদেশের পপকালচার টাইমলাইনের একটা আর্কাইভালেও পরিণত হইছে।
সবশেষে
আজকের অ্যালগরিদম-সেন্ট্রিক, পার্সোনালাইজড পপকালচারের জমানায় একসাথে একসময়ে সেইম কনটেন্ট এনজয় করার কালচার প্রায় নাই হয়া গেছে। কালেক্টিভ ভিউয়িং এক্সপেরিয়ান্সের ফিলিংসটাও সাথে হারায়া গেছে । এখন মানুষের অপশনের অভাব নাই, কিন্তু এই অপশনের এভেইলেবিলিটি শেয়ারড ন্যাশনাল মোমেন্টগুলা আমাদের থেকে ছিনায়া নিছে।
এই জায়গায় ইত্যাদি একটা ব্রিজ হয়ে দাঁড়ায়া আছে।
দুই জমানার মাঝখানে দাঁড়ানো একটা টিভি প্রোগ্রাম। একদিকে ব্রডকাস্ট আমলের কালেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স, আরেকদিকে অ্যালগরিদমিক জমানার একাকীত্ব।
ইত্যাদি জাস্ট একটা টিভি প্রোগ্রাম না, বরং একটা কালেক্টিভ সময়ের রেলিক।
ইত্যাদির উত্থান, পপুলারিটি গেইন করা, আর হাইপ হারায়া ফেলা, সবই আসলে বাংলাদেশের মিডিয়া আর পপ-কালচারের বদলাইতে থাকা বাস্তবতার প্রতিফলন।
লেখা অলরেডি শেষ। আপনারা চাইলে এইখানেই লিভ মারতে পারেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা পারসোনাল মেমোরি শেয়ার করি।
২০২৩ সালের কোনো একদিন। আমি তখন এমবিএ করতেছি। ক্যাম্পাস থেকা দুপুরে বাইর হইয়া আজিজ সুপার মার্কেটের ফুটপাতে হাঁইটা যাইতেছি।
হঠাৎ উল্টাদিক থেইকা আগত একজন মানুষের দিকে চোখ পড়ল। চেহারাটা চেনা চেনা লাগতেসিল। আবার মনে হইতেসিল, মেবি ভুল হইতেছে।
দুই-তিন সেকেন্ড ভ্রু কুচকায়া লোকটার দিকে তাকায়া থাকলাম। উনি নোটিশ করছেন কি না জানি না। লোকটা আমারে ক্রস কইরা চলে গেল।
আমি পেছনে তাকাইলাম। তখনো বুঝার চেষ্টা করতেছি, এইটা কি আসলেই ঐ লোক?
লোকটাও হাটতে হাটতেই পেছনে ফিরা তাকাইল।
আমার দিকে তাকায়া হাসিমুখে বললো, ভালো আছেন?
তখনই আমি শিওর হইলাম, এইটা হানিফ সংকেত।
সামনাসামনি কখনো দেখি নাই, তাই প্রথমে চিনতে পারতেছিলাম না। আমি হাসি দিয়া সালামের ভঙ্গিতে হাত উঠাইলাম। উনিও হাসতে হাসতে জবাবে হাত উঠাইলেন।
তারপর আমরা দুইজন দুইদিকে হাঁইটা চইলা গেলাম।

কী যে একটা টাইম কাটাইতেছি আমরা! সারা দুনিয়ায় যুদ্ধ লাইগা আছে। ইভেন কি যারা সরাসরি যুদ্ধ করতেছে না, তারাও শান্তিতে নাই। এক ধরনের ক্রনিক টেনশনে আছে কখন কার মিসাইল ঘাড়ে আইসা পড়ে!
২ দিন আগে
আমাদের মরা মরা সিনেমা হলগুলো ভরা হয় ঈদে, অপেক্ষাকৃত কম আবর্জনা দিয়া। এর একটা কারণ হইলো, আমাদের আসলে দলবল নিয়া যাওয়ার জায়গা কম, তার উপর ইন্ডাস্ট্রি যা দিতেছে, তার বাইরে অপশনও নাই, আমরা তাই অগত্যাই একেকটা হাবিজাবি সিনেমারে হিট বানাই বক্স অফিসে।
৪ দিন আগে
ল্যাংটা শব্দটার মধ্যে একটা অস্বস্তি আছে। একটা মধ্যবিত্ত ট্যাবু আছে। আর ইন্টারনেটের একটা নিয়ম হচ্ছে যেখানে একটু ট্যাবুর গন্ধ আছে, সেইটাই দ্রুত জনপ্রিয় হয়।
৫ দিন আগে
বাস্তব দুনিয়া লজিকে চললেও ইন্টারনেটের দুনিয়া তেমন লজিক গুনে না। কিন্তু রেগুলার লাইফে আমরা যে পরিমাণ প্রেশারে থাকি, যত স্ট্রেস আমাদের ওপর দিয়া যায়, তাতে অনেক সময় নেট দুনিয়ার ইলজিক্যাল আর মিনিংলেস ব্যাপারস্যাপার আমাদের স্ট্রেস রিলিফের সুযোগ কইরা দেয়।
৮ দিন আগে