গবেষণা
স্ট্রিম ডেস্ক

কোনো বন্য প্রাণীকে উদ্ধার করে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু এরপর কী ঘটে? নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, সব ক্ষেত্রে বনে ফিরে পাওয়া স্বাধীনতা নিরাপদ নয়। অনেক সময় সেটিই প্রাণীদের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ হতে পারে।
গবেষণাটি বাংলাদেশের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা ৯টি লজ্জাবতী বানর বা বেঙ্গল স্লো লরিসকে অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে।
আর্থ ম্যাগাজিন জানিয়েছে, গবেষণাটিতে অংশ নিয়েছেন জার্মানির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা প্লামপ্লোরিস, যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের গবেষকেরা। রেডিও কলার ব্যবহার করে কয়েক মাস ধরে প্রতিটি প্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর সেখানেই সামনে আসে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। গত ফেব্রুয়ারিতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
ইদানিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় উদ্ধার হওয়া লজ্জাবতী বানরকে ঘিরে আছে একদল উৎসুক জনতা। এসব বানরদের বন বিভাগ তাদের কাছ থেকে নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছেড়ে দেন। বাংলাদেশের একমাত্র নিশাচর প্রাইমেট হলো লজ্জাবতী বানর। বন উজাড়, সড়ক দুর্ঘটনা, শিকার এবং অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের কারণে এই প্রাণীটি ক্রমাগত হুমকির মুখে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লজ্জাবতী বানরের ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং পোষা প্রাণী হিসেবে চাহিদা বাড়ায় অবৈধ বাণিজ্যও বেড়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অনলাইনে এই প্রাণীর ভিডিও দেখছেন, যা তাদের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ লজ্জাবতী বানর বা বেঙ্গল স্লো লরিসকে হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে বন বিভাগ প্রায়ই পাচারকারী ও অবৈধভাবে পোষা প্রাণী হিসেবে রাখা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই বানর উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর এসব প্রাণীকে সাধারণত সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেকের কাছে এটি সফল সংরক্ষণের গল্প। কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
বনে ছাড়ার আগে উদ্ধার হওয়া বানরগুলোকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত জানকিছড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রে রাখা হয়। সেখানে প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য, ওজন এবং আঘাত পরীক্ষা করা হয়। কয়েকটি বানর উদ্ধার হওয়ার সময় অপুষ্টিতে ভুগছিল, আবার কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বা কুকুরের আক্রমণে আহত হয়েছিল।
ইউরোপের চিড়িয়াখানাগুলোর পরিচর্যা নির্দেশিকা অনুসরণ করে তাদের গাছের আঠা, ফুলের মধুরস, বিভিন্ন পোকামাকড় এবং সবজি খাওয়ানো হয়।
প্রতিটি লরিসের গলায় শরীরের ওজনের তিন শতাংশেরও কম ওজনের একটি ছোট রেডিও কলার পরানো হয়। গবেষকেরা রাতে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং জিপিএসের মাধ্যমে চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করেন। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯টি লজ্জাবতী বানর বনে অবমুক্ত করা হয়।
গবেষণার ফল ছিল উদ্বেগজনক। ৯টির মধ্যে মাত্র দুটি লরিস ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল। তিনটি অবমুক্তির ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়, আর বাকি চারটি কয়েক মাসের মধ্যেই প্রাণ হারায়।
গবেষকেরা চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। প্রতিটি প্রাণীর মাথা, মুখ অথবা আঙুলে গভীর কামড়ের ক্ষত পাওয়া যায়। এসব আঘাত অন্য স্লো লরিসের আক্রমণের ফল। কারণ লজ্জাবতী বানর অত্যন্ত এলাকাকেন্দ্রিক বা টেরিটোরিয়াল প্রাণী। প্রতিটি বানর নিজস্ব একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন কোনো লজ্জাবতী বানর সেই এলাকায় প্রবেশ করলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লজ্জাবতী বানর পৃথিবীর অল্প কয়েকটি বিষধর স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি। তাদের ধারালো দাঁতের কামড়ে বিষ প্রবেশ করতে পারে, ফলে এমন সংঘর্ষ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আয়তন প্রায় ১,২৫০ হেক্টর। এখানে পাহাড়, চা-বাগান এবং প্রাকৃতিক বন রয়েছে। তবে এই একই বন বহু বছর ধরেই উদ্ধার করা স্লো লরিস অবমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্যানের তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণা শুরুর আগের তিন বছরে জানকিছড়া এলাকায় ১৯টি লজ্জাবতী বানর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে আগে থেকেই অনেক স্লো লরিসের বসবাস থাকায় নতুন প্রাণীদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ধার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবমুক্ত করা পাঁচটি বানরের সবকটিই মারা যায়। গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার প্রাণী ছাড়ার ফলে সংঘর্ষের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ একটি বন দেখতে যত বড়ই হোক, এলাকাকেন্দ্রিক প্রাণীদের নিরাপদে বাঁচতে ব্যক্তিগত পরিসর প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যেসব লরিস উদ্ধার কেন্দ্রে বেশি দিন ছিল, তারা বনে ফিরে তুলনামূলক কম দিন বেঁচে ছিল। কিছু প্রাণী আঘাতের চিকিৎসা কিংবা রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট বিলম্বের জন্য দীর্ঘদিন কেন্দ্রে ছিল।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বন্দি অবস্থায় থাকলে প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক টিকে থাকার দক্ষতা হারাতে পারে। ছোট ঘেরে থাকার কারণে পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং গাছে ওঠার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া বয়স্ক প্রাণীদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে। প্রকৃতিতে লজ্জাবতী বানর স্বাভাবিকভাবেই নতুন এলাকায় চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর হঠাৎ অচেনা এলাকায় ছেড়ে দিলে তারা মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।
যে দুটি লরিস বেঁচে ছিল, তাদের আচরণ ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। পুরুষ বানরটি প্রায় ১৮৭ হেক্টর এলাকা ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে স্ত্রী বানরটি প্রায় ৫৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে চলাচল করেছে।
দুজনই অবমুক্তির পর প্রথম কয়েক মাস বিস্তৃত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে, পরে তুলনামূলক ছোট একটি এলাকায় স্থায়ী হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, যারা বেঁচে ছিল তারা বেশি চলাফেরা করত এবং কম সময় বিশ্রাম নিত। আর যেসব লজ্জাবতী বানর মারা গেছে, তারা বেশি সময় সতর্ক অবস্থায় ছিল এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেশি দেখিয়েছে।
এ থেকে ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণেই তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছিল। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দূরে চলে যাওয়াই সম্ভবত বেঁচে থাকা দুটি লরিসকে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ থেকে রক্ষা করেছে।
গবেষকেরা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে বনাঞ্চলের উদ্ভিদ আচ্ছাদনও বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, বেঁচে থাকা এবং মারা যাওয়া—দুই ধরনের লজ্জাবতী বানর প্রায় একই মানের বন ব্যবহার করেছে।
অর্থাৎ শুধু সবুজ বন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। গবেষকদের মতে, খাদ্যের অভাব নয়, বরং নিজেদের মধ্যে এলাকা নিয়ে সংঘর্ষই অধিকাংশ মৃত্যুর প্রধান কারণ।
এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। উদ্ধার করা প্রাণী অবমুক্ত করার আগে ওই এলাকায় প্রাণীর ঘনত্ব, প্রয়োজনীয় এলাকা এবং তাদের আচরণ ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণও অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক আনা নেকারিস বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, উদ্ধার করা বা জব্দ করা প্রাণীকে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া মানেই সফল সংরক্ষণ। কিন্তু লজ্জাবতী বানরের মতো অত্যন্ত এলাকাকেন্দ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিপন্ন অনেক প্রাণীকে জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য দ্রুত বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লজ্জাবতী বানরের মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে সেটিই সবসময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নয়।’
অধ্যাপক নেকারিস বলেন, ‘প্রাণীর আচরণ, বন্দিদশায় কাটানো সময় এবং যে এলাকায় অবমুক্ত করা হবে সেখানে আগে থেকেই কত প্রাণী রয়েছে—এসব না বুঝে অবমুক্ত করলে তা উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
গবেষণার প্রধান লেখক হাসান আল রাজি বলেন, ‘বাংলাদেশে উদ্ধার করে আবার বনে ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। স্লো লরিসসহ অনেক বন্য প্রাণী উদ্ধার করে পরে আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হচ্ছে।’
তার মতে, এটি প্রমাণ করে মানুষ বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই এই অবমুক্তি সঠিকভাবে করা হয় না। বনভিত্তিক প্রাণীর জন্য অবমুক্তির স্থান অনেক সময় পরিবেশগত উপযুক্ততার বদলে যাতায়াত বা প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনা করে নির্বাচন করা হয়। ফলে কিছু বন কার্যত উদ্ধার করা প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার স্থানে পরিণত হয়েছে এবং এখন আর সেগুলো উপযুক্ত অবমুক্তি এলাকা নয়।’
আল রাজির মতে, যদিও গবেষণাটি লজ্জাবতী বানরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে, তবে একই ধরনের সমস্যা অন্যান্য অনেক বন্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও ঘটছে বলে তাঁরা মনে করেন।

কোনো বন্য প্রাণীকে উদ্ধার করে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু এরপর কী ঘটে? নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, সব ক্ষেত্রে বনে ফিরে পাওয়া স্বাধীনতা নিরাপদ নয়। অনেক সময় সেটিই প্রাণীদের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ হতে পারে।
গবেষণাটি বাংলাদেশের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা ৯টি লজ্জাবতী বানর বা বেঙ্গল স্লো লরিসকে অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে।
আর্থ ম্যাগাজিন জানিয়েছে, গবেষণাটিতে অংশ নিয়েছেন জার্মানির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা প্লামপ্লোরিস, যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের গবেষকেরা। রেডিও কলার ব্যবহার করে কয়েক মাস ধরে প্রতিটি প্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর সেখানেই সামনে আসে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। গত ফেব্রুয়ারিতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
ইদানিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় উদ্ধার হওয়া লজ্জাবতী বানরকে ঘিরে আছে একদল উৎসুক জনতা। এসব বানরদের বন বিভাগ তাদের কাছ থেকে নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছেড়ে দেন। বাংলাদেশের একমাত্র নিশাচর প্রাইমেট হলো লজ্জাবতী বানর। বন উজাড়, সড়ক দুর্ঘটনা, শিকার এবং অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের কারণে এই প্রাণীটি ক্রমাগত হুমকির মুখে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লজ্জাবতী বানরের ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং পোষা প্রাণী হিসেবে চাহিদা বাড়ায় অবৈধ বাণিজ্যও বেড়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অনলাইনে এই প্রাণীর ভিডিও দেখছেন, যা তাদের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ লজ্জাবতী বানর বা বেঙ্গল স্লো লরিসকে হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে বন বিভাগ প্রায়ই পাচারকারী ও অবৈধভাবে পোষা প্রাণী হিসেবে রাখা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই বানর উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর এসব প্রাণীকে সাধারণত সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেকের কাছে এটি সফল সংরক্ষণের গল্প। কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
বনে ছাড়ার আগে উদ্ধার হওয়া বানরগুলোকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত জানকিছড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রে রাখা হয়। সেখানে প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য, ওজন এবং আঘাত পরীক্ষা করা হয়। কয়েকটি বানর উদ্ধার হওয়ার সময় অপুষ্টিতে ভুগছিল, আবার কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বা কুকুরের আক্রমণে আহত হয়েছিল।
ইউরোপের চিড়িয়াখানাগুলোর পরিচর্যা নির্দেশিকা অনুসরণ করে তাদের গাছের আঠা, ফুলের মধুরস, বিভিন্ন পোকামাকড় এবং সবজি খাওয়ানো হয়।
প্রতিটি লরিসের গলায় শরীরের ওজনের তিন শতাংশেরও কম ওজনের একটি ছোট রেডিও কলার পরানো হয়। গবেষকেরা রাতে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং জিপিএসের মাধ্যমে চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করেন। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯টি লজ্জাবতী বানর বনে অবমুক্ত করা হয়।
গবেষণার ফল ছিল উদ্বেগজনক। ৯টির মধ্যে মাত্র দুটি লরিস ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল। তিনটি অবমুক্তির ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়, আর বাকি চারটি কয়েক মাসের মধ্যেই প্রাণ হারায়।
গবেষকেরা চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। প্রতিটি প্রাণীর মাথা, মুখ অথবা আঙুলে গভীর কামড়ের ক্ষত পাওয়া যায়। এসব আঘাত অন্য স্লো লরিসের আক্রমণের ফল। কারণ লজ্জাবতী বানর অত্যন্ত এলাকাকেন্দ্রিক বা টেরিটোরিয়াল প্রাণী। প্রতিটি বানর নিজস্ব একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন কোনো লজ্জাবতী বানর সেই এলাকায় প্রবেশ করলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লজ্জাবতী বানর পৃথিবীর অল্প কয়েকটি বিষধর স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি। তাদের ধারালো দাঁতের কামড়ে বিষ প্রবেশ করতে পারে, ফলে এমন সংঘর্ষ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আয়তন প্রায় ১,২৫০ হেক্টর। এখানে পাহাড়, চা-বাগান এবং প্রাকৃতিক বন রয়েছে। তবে এই একই বন বহু বছর ধরেই উদ্ধার করা স্লো লরিস অবমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্যানের তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণা শুরুর আগের তিন বছরে জানকিছড়া এলাকায় ১৯টি লজ্জাবতী বানর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে আগে থেকেই অনেক স্লো লরিসের বসবাস থাকায় নতুন প্রাণীদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ধার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবমুক্ত করা পাঁচটি বানরের সবকটিই মারা যায়। গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার প্রাণী ছাড়ার ফলে সংঘর্ষের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ একটি বন দেখতে যত বড়ই হোক, এলাকাকেন্দ্রিক প্রাণীদের নিরাপদে বাঁচতে ব্যক্তিগত পরিসর প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যেসব লরিস উদ্ধার কেন্দ্রে বেশি দিন ছিল, তারা বনে ফিরে তুলনামূলক কম দিন বেঁচে ছিল। কিছু প্রাণী আঘাতের চিকিৎসা কিংবা রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট বিলম্বের জন্য দীর্ঘদিন কেন্দ্রে ছিল।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বন্দি অবস্থায় থাকলে প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক টিকে থাকার দক্ষতা হারাতে পারে। ছোট ঘেরে থাকার কারণে পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং গাছে ওঠার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া বয়স্ক প্রাণীদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে। প্রকৃতিতে লজ্জাবতী বানর স্বাভাবিকভাবেই নতুন এলাকায় চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর হঠাৎ অচেনা এলাকায় ছেড়ে দিলে তারা মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।
যে দুটি লরিস বেঁচে ছিল, তাদের আচরণ ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। পুরুষ বানরটি প্রায় ১৮৭ হেক্টর এলাকা ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে স্ত্রী বানরটি প্রায় ৫৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে চলাচল করেছে।
দুজনই অবমুক্তির পর প্রথম কয়েক মাস বিস্তৃত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে, পরে তুলনামূলক ছোট একটি এলাকায় স্থায়ী হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, যারা বেঁচে ছিল তারা বেশি চলাফেরা করত এবং কম সময় বিশ্রাম নিত। আর যেসব লজ্জাবতী বানর মারা গেছে, তারা বেশি সময় সতর্ক অবস্থায় ছিল এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেশি দেখিয়েছে।
এ থেকে ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণেই তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছিল। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দূরে চলে যাওয়াই সম্ভবত বেঁচে থাকা দুটি লরিসকে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ থেকে রক্ষা করেছে।
গবেষকেরা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে বনাঞ্চলের উদ্ভিদ আচ্ছাদনও বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, বেঁচে থাকা এবং মারা যাওয়া—দুই ধরনের লজ্জাবতী বানর প্রায় একই মানের বন ব্যবহার করেছে।
অর্থাৎ শুধু সবুজ বন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। গবেষকদের মতে, খাদ্যের অভাব নয়, বরং নিজেদের মধ্যে এলাকা নিয়ে সংঘর্ষই অধিকাংশ মৃত্যুর প্রধান কারণ।
এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। উদ্ধার করা প্রাণী অবমুক্ত করার আগে ওই এলাকায় প্রাণীর ঘনত্ব, প্রয়োজনীয় এলাকা এবং তাদের আচরণ ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণও অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক আনা নেকারিস বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, উদ্ধার করা বা জব্দ করা প্রাণীকে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া মানেই সফল সংরক্ষণ। কিন্তু লজ্জাবতী বানরের মতো অত্যন্ত এলাকাকেন্দ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিপন্ন অনেক প্রাণীকে জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য দ্রুত বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লজ্জাবতী বানরের মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে সেটিই সবসময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নয়।’
অধ্যাপক নেকারিস বলেন, ‘প্রাণীর আচরণ, বন্দিদশায় কাটানো সময় এবং যে এলাকায় অবমুক্ত করা হবে সেখানে আগে থেকেই কত প্রাণী রয়েছে—এসব না বুঝে অবমুক্ত করলে তা উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
গবেষণার প্রধান লেখক হাসান আল রাজি বলেন, ‘বাংলাদেশে উদ্ধার করে আবার বনে ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। স্লো লরিসসহ অনেক বন্য প্রাণী উদ্ধার করে পরে আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হচ্ছে।’
তার মতে, এটি প্রমাণ করে মানুষ বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই এই অবমুক্তি সঠিকভাবে করা হয় না। বনভিত্তিক প্রাণীর জন্য অবমুক্তির স্থান অনেক সময় পরিবেশগত উপযুক্ততার বদলে যাতায়াত বা প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনা করে নির্বাচন করা হয়। ফলে কিছু বন কার্যত উদ্ধার করা প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার স্থানে পরিণত হয়েছে এবং এখন আর সেগুলো উপযুক্ত অবমুক্তি এলাকা নয়।’
আল রাজির মতে, যদিও গবেষণাটি লজ্জাবতী বানরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে, তবে একই ধরনের সমস্যা অন্যান্য অনেক বন্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও ঘটছে বলে তাঁরা মনে করেন।
.png)

একসময় বাংলাদেশের বন-জঙ্গল, তৃণভূমি আর জলাভূমি ছিল বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ঘাসভূমিতে দৌড়ে বেড়াত নীলগাই, সুন্দরবনের আশপাশে বিচরণ করত একশৃঙ্গ গন্ডার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে ঘুরে বেড়াত বনমহিষ।
২ ঘণ্টা আগে
সারা দিনের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমের পর মানুষ অপেক্ষায় থাকে রাতের একটু শীতলতার। কিন্তু সেই স্বস্তিটুকুও এখন আর মিলছে না। বরং দিনের চেয়ে রাতের তাপমাত্রা এখন বাড়ছে আরও দ্রুতগতিতে।
২৩ জুন ২০২৬
পুরোপুরি চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর প্রাণীরা যখন সুস্থ্য হয়ে উঠবে তখন তাদের অবমুক্ত করা হবে। এর আগ পর্যন্ত তাদের ওখানেই রাখা হবে।
১৪ জুন ২০২৬
প্রতিবছর মৌসুমি ও আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশ। এতে প্রাণহানিও ঘটছে প্রতিবছর। তবে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
১২ জুন ২০২৬