
ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের এমন একটি স্তর যেখানে ওজোন গ্যাস থাকে। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০ থেকে ৩০ কিমি উপরে অবস্থিত। ফরাসি পদার্থবিদ চার্লস ফ্যব্রি ও হেনরি বুইসন ১৯১৩ সালে ওজোন স্তর আবিষ্কার করেন। এই স্তরের কারণেই সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে আসতে পারে না। কেননা ওজোন এই ক্ষতিকর রশ্মিটি শোষণ করে নেয়।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি মানবদেহের ত্বক এমনকি হাড়ের ক্যান্সারেরও সৃষ্টি করতে পারে। তবে এটি প্রায় ৯৭ থেকে ৯৯ ভাগই শোষিত হয়ে যায় ওজোন স্তরে। এভাবে ওজোন স্তর আমাদের ও সকল প্রাণীজগতের রক্ষা করে চলছে।
তবে নানা কারণে ওজোন স্তরের ক্ষতি হওয়ায় প্রাণিকুল হুমকির মুখে পড়ছে। সিএফসি বা ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এমন একটি গ্যাস যা ওজোন স্তরের ক্ষতি করে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, অ্যারোসোল, ফোম প্রভৃতি তৈরিতে সিএফসি ব্যবহার হয়। ওজোন স্তরকে বাঁচাতে হলে এই গ্যাসের ব্যবহার কমাতে হবে। অবশ্য, ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থ ও এইচএফসি আমদানির ওপর কঠোরনিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিং চালু থাকায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সিএফসির পাশাপাশি হাইড্রোকার্বন, মিথাইল ব্রোমাইড, নাইট্রাস অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাসগুলোর ব্যবহার কমানো জরুরি। এজন্য আমাদের ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি অ্যারোসল ও বিভিন্ন স্প্রে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ এতে ক্ষতিকর গ্যাস বা প্রোপেল্যান্ট থাকে। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রে ব্যবহৃত গ্যাসও ওজোন স্তরের ক্ষতি করে।
ওজোন স্তর সুরক্ষায় ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে ‘মন্ট্রিয়েল চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এটি কার্যকর হয় ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সময়ের প্রয়োজনে চুক্তিটি ৯ বার সংশোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের আগস্টে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে ‘কিগালি সংশোধনী’ও অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ।
এই চুক্তির সুফল হিসেবে অ্যান্টার্কটিকার ওজোন স্তরের ফাটল অনেকটাই কমে এসেছে। একটি তথ্য মতে, ২০০৮ সালে ওজোন স্তরের ফাটলের পরিমাণ ছিল ২৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। ২০০৯ সালে এটি হয়েছে ২৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওজোন স্তরের এই ক্ষত ধীরে ধীরে সেরে উঠছে এবং ২০৬৬ সালের মধ্যে এটি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ভিয়েনা কনভেনশন ও মন্ট্রিয়েল চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থ কম ব্যবহার করছে এবং পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ২০১০ সালেই দেশে সিএফসি, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং মিথাইল ক্লোরোফর্মের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর ২০১২ সালে ওষুধ শিল্পে সিএফসি এবং রেফ্রিজারেটরের ফোম তৈরিতে এইচসিএফসি গ্যাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২০ সালের মধ্যে দেশে ৩৫ শতাংশ এইচসিএফসি ব্যবহার বন্ধ হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এটি আরও ৬৭.৫০ শতাংশ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। মন্ট্রিয়েল প্রোটোকল সফলভাবে বাস্তবায়নের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ একাধিকবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে।
ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের নানা ধরনের রোগ বেড়ে যেতে পারে। কাশি, হাঁপানি, চোখ ও গলার জ্বালাপোড়ার পাশাপাশি ক্যানসারের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। এছাড়া চোখের ছানি পড়ার হারও বেড়ে যেতে পারে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে উদ্ভিদের ওপরও। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যাবে এবং ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে।
১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্ট্রিয়েল চুক্তি হয়। এই দিনটিকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিকভাবে ১৬ সেপ্টেম্বরকে ‘ওজোন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ওজোন দিবস ২০২৬-এর এবারের প্রতিপাদ্য হলো— "শীতল গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ"।
বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে এসি ও ফ্রিজের লাগামহীন ব্যবহার ওজোন স্তরের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে। বাংলাদেশ মন্ট্রিয়েল চুক্তি বাস্তবায়নে সফলতা দেখালেও এসির ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে এসি বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজারে। আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
পরিবেশের স্বার্থে আমাদের এসির ব্যবহার কমাতে হবে। একটি এসি হয়তো কেবল একটি ঘরকে ঠান্ডা করতে পারে, কিন্তু একটি গাছ পুরো পৃথিবীকে শীতল করতে সাহায্য করে। তাই বিজ্ঞানীরা এসির বদলে বেশি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। বেশি গাছ লাগালেই আমাদের পৃথিবী শান্ত ও শীতল হবে। সুরক্ষিত থাকবে ওজোন স্তর এবং আমরা বাঁচব নানা রোগবালাই থেকে।
- লেখক: পরিবেশ বিষয়ক লেখক।
.png)
-40e58c.jpeg)







