এক্সপ্লেইনার

শিক্ষিত পরিবারেও কেন ‘বাল্যবিবাহ’

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাল্যবিবাহ একসময় ছিল গ্রামাঞ্চলের এক প্রথাগত সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, এটি শুধুমাত্র গরীব বা পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের বিষয় নয়। এখন ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি আলোচিত শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। লুবাবা মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর বাল্যবিবাহ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যার চিহ্ন।

বাংলাদেশে এখনও ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে হওয়া একটি উদ্বেগজনক বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করে। বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি নারী ১৮ বছরের আগে বিয়ে করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার অভাব, সামাজিক রীতিনীতি এবং পারিবারিক চাপ এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

একুশ শতকেও কেন ‘বাল্যবিবাহ’ থামছে না

ইউনিসেফের ‘ফিয়ার ফর গার্লস সেফটি’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, গরীব পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে মেয়েদের শিশু বয়েসে বিয়ে দিচ্ছে। তারা মনে করে, মেয়েকে বিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলে খরচ কমবে। এদিকে, শিক্ষিত ও ধনী পরিবারেও দেখা যায়, সামাজিক মর্যাদা, জটিল সম্পর্ক বা সময়মতো সন্তানের নিরাপত্তার কারণে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইউনিসেফের গবেষকেরা বলছেন, বাল্যবিবাহের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও তা ধ্বংসাত্মক। কিশোরী বয়সে মা হওয়ার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া মেয়েরা বাল্যবিবাহের কারণে প্রায়শই তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারে না। ফলে তাদের জন্য আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুই শিক্ষক—নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেন তাঁদের এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কম বয়সে যৌতুক কম লাগে—এই ধারণা এবং মেয়ের বিয়ে ‘সম্মানের বিষয়’—এই বিশ্বাসের কারণে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাচ্ছে না।

আইন ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সে অবৈধ। তবে আইন থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার, স্থানীয় কর্মকর্তা বা সমাজের চাপের কারণে বাল্যবিবাহ গোপনে সম্পন্ন হয়। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও সচেতনতার অভার তো রয়েছেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজরদারির অভাব। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে গ্রামাঞ্চলে প্রতিনিয়ত বাল্যবিবাহ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন কঠোর করা যথেষ্ট নয়; সামাজিক মনোভাব ও লিঙ্গভিত্তিক ধারণা পরিবর্তন করাও জরুরি। বিশেষ করে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ব্র্যাকের একটি গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর অঞ্চলে বাল্যবিবাহের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি চট্টগ্রাম ও সিলেটের অঞ্চলের তুলনায়। এছাড়াও চর অঞ্চলের ভৌগলিক ও পারিবারিক বৈশিষ্ট্য যেমন: শিক্ষা, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলে।

বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে তা কার্যকর করতে হলে কেবল আইন নয়, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক সচেতনতা এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আনা জরুরি।

প্রচলিত শিক্ষা কি আমাদের ‘শিক্ষিত’ করতে পারছে

শিক্ষা হলো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষায় সচেতন কিশোরীরা নিজের অধিকার, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের বিষয়ে সচেতন থাকে। পাশাপাশি, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে পরিবারও বুঝতে পারবে, মেয়েদের বয়স অনুযায়ী বিয়ে করা কতটা জরুরি। বিভিন্ন এনজিও ও সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, শিক্ষা বন্ধ হলে বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়। তারা উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেছে, এখানে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় বাল্যবিবাহের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।

তবে বিপরীত চিত্রও আছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিবাহ দেখা যাচ্ছে। এর সবশেষ উদাহরণ সিমরিন লুবাবা। লুবাবার পরিবার শিক্ষিত এবং সে নিজেও পড়াশোনা করছে। তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে—এমন নয়। তারপরও কেন বিয়ে হলো লুবাবার?

এর উত্তর পাওয়া যাবে জাহিদুল ইসলাম, নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেনের গবেষণায়। ফিলিপাইন সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে— শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের কারণ মূলত তিনটি। ১. প্রেম, সম্পর্ক বা ‘বদনাম’ এড়াতে দ্রুত বিয়ে। ২. ‘মেয়ের বয়স হয়ে গেছে’—এই চাপ এবং ৩. সমাজ কী বলবে—এই ভয়।

এছাড়া শিক্ষিত পরিবারেও মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা রয়েছে। কর্নেল ল স্কুলের লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত ‘চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ: কজ, কন্সিকোয়েন্স অ্যান্ড লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, মেয়েদের যৌন হয়রানি সম্পর্কে পরিবারগুলোর মধ্যে একধরনের ভয় রয়েছে। তারা মনে করে, দ্রুত বিয়ে দিলে মেয়ে যৌন হয়রানি থেকে নিরাপদ থাকবে। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের এসব ধারনা ও বিশ্বাস প্রকট। শুধু তথাকথিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে এসব ধারনা ও বিশ্বাস ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বখ্যাত গবেষণা জার্নাল স্প্রিংগারে ২০২৪ সালে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ওই প্রবন্ধে বাংলাদেশি গবেষক শান্তা আক্তার মিম, আবু সাঈদ মো. আল মামুন, আবু সায়েম, আব্দুল ওয়াদুদ ও গোলাম হোসেন লিখেছেন, বেশির ভাগ শিক্ষিত পরিবার মনে করে, ‘ভালো পাত্র’ পাওয়ার জন্য মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিতে হয়। এই বদ্ধমূল ধারনার কারণেও শিক্ষিত সমাজে বাল্যবিবাহ দেখা যাচ্ছে।

ওই একই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার মনে করে, মেয়েদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা বিপজ্জনক। কোনো মেয়ে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে অতিরিক্ত স্বাধীন হয়ে যায় বলে তাদের ধারনা। তাই তারা স্কুলে পড়া অবস্থাতেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়।

কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় কারণও বাল্যবিবাহকে প্রভাবিত করে। যেমন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম হিমালয়ান জার্নাল অব হিউম্যানিটিস অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিসে প্রকাশিত গবেষণায় বলেছেন, ধর্মগুরুরা ‘অল্প বয়সে বিয়ে ভালো’—এমন বক্তব্য দেন। তাঁদের বক্তব্য সমাজের শিক্ষিত শ্রেণিকেও প্রভাবিত করে।

সমাজ ও পরিবার উভয়ের দায়িত্ব

বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাল্যবিবাহ রোধে পরিবার ও সমাজ— উভয়েরই বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিবার যদি মেয়ের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়, স্বাস্থ্য ও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের অধিকার দেয়, তাহলে বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সমাজ যদি সচেতন হয়, কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে, সঠিক প্রেরণা দেয়, তাহলে এই প্রথাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হবে। তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যেও যেহেতু বাল্যবিবাহ নিয়ে সঠিক ধারনা, বিশ্বাস ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে, সেহেতু প্রচিলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিক্ষা যে মানুষকে খুব একটা সচেতন করতে পারছে না—এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তাই শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত