রম্যগল্প
সুমন সাজ্জাদ

ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটো। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। গভীর ঘুমে ডুবে আছেন মশকরাজ্যের রাষ্ট্রপতি মিস পোঁপোঁ। হঠাৎ বেজে উঠল তার লাল টেলিফোন।
সিকিউরিটি চিফ জানালো বিপদের সমূহ শঙ্কা। মানুষের কলোনিতে এক মশা-বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটেছে—ড. বাশার। এই মশকবিজ্ঞানী পরামর্শ দিয়েছেন যেকোনো মূল্যে ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটোকে ‘ডেস্ট্রয়’ করতে হবে।
মিস পোঁপোঁ একটু বিরক্ত হলেন। সিকিউরিটি ফোর্সের কাজই হলো কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে চমকে ওঠা। পোঁপোঁ চুপ করে সবকিছু শুনলেন। পিনপিন করতে করতে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ ঘটাং ঘটাং শব্দ। পিঁপিঁপিঁ করে দৌড়ে এলো সিকিউরিটি ফোর্স, ‘স্যার, একটা বুলডোজার আনা হয়েছে। মানুষেরা এই জঙ্গল পরিষ্কার করবে।’
পোঁপোঁ চোখ কুচকে তাকালেন।
‘তোমাকে না বলেছি মানুষের ভাষায় কথা বলবে না। মানুষের কাছে যা জঙ্গল, মশাদের কাছে তা নিজের দেশ।’
‘সরি স্যার, এইমাত্র জঙ্গল শব্দটা শুনে ভুলে বলে ফেলেছি। সরি স্যার। স্যার…’
‘দশবার সরি বলবে না। তোমাদের মতো মশকবাহিনী আমাদের কেমন শ্রদ্ধা করো, আমার জানা আছে। পৃথিবীর সব মশক-অভ্যুত্থানে তোমাদেরই হাত থাকে।’
সিকিউরিটি ফোর্স ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে।
ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট শব্দ শুনে ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটোর পাঁচটি প্রদেশ থেকে উড়ে এসেছেন পাঁচ গভর্নর। তাদের সবার মুখ গম্ভীর। স্যুয়ারেজ প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডসাকার বললেন, যেকোনো মূল্যে ওই বুলডোজারওয়ালার বারোটা বাজাতে হবে।’
ড্রেইন-সি প্রদেশের গভর্নর মিস রেড চিলি পিঁপিঁ করে উঠলেন, ‘আমার মনে হয়, অরুণাপল্লী হাউজিং প্রজেক্টের প্রেসিডেন্টকে ধরা দরকার। ওর বড় বাড় বেড়েছে।’
‘কেন?’ জিজ্ঞেস করলেন ম্যানহোল প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাড গেইম। জবাব দিলেন ডাস্টবিন প্রদেশের গভর্নর মি. ধুলিয়া, ‘মিস রেড চিলি সম্ভবত ক্লিনিং অপারেশনের কথা বলছেন।’
‘ইয়েস মিস ব্লাড গেইম। আপনি ঠিকই ধরেছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলে লোকটা সুযোগ পেলেই প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে।’ বললেন মিস রেড চিলি।
পাইপ লাইন প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডি বললেন, ‘তাহলে সব কয়টাকেই ধরা হোক।’
দার্শনিকের ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন মিস পোঁপোঁ; বললেন, ‘সমস্যা আরও গভীরে। গোয়েন্দা রিপোর্ট দেখা দরকার।’
গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা গেলো অরুণাপল্লীতে নতুন আটতলা দালান উঠবে। জমিজমা পরিষ্কার করা হবে। এর নেতৃত্বে আছেন হাউজিংয়ের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর খায়রুল। আর তাকে সহায়তা করছেন মশকবিজ্ঞানী ড. বাশার। পুরনো দালানটাকে ভাঙার জন্য আজ বুলডোজার আনা হয়েছে। অল্প কিছুক্ষণ হলো দালান ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে।
জাতীয় সিনেটের সভাচলাকালেই প্রচণ্ড শোরগোল শোনা গেলো। গোয়েন্দাপ্রধান জানালেন সাধারণ মশারা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। যেকোনো সময় তারা কমপ্লিট শাটডাউন শুরু করতে পারে। প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। মিস পোঁপোঁ স্লোগান শুনতে পেলেন—‘মশকরাজ্য ধ্বংস কেন/সরকার জবাব চাই।’, ‘রাজ্য নিয়ে তালবাহানা/চলবে না, চলবে না।’, ‘তুমি কে আমি কে/মশা মশা।’ একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মদন।’
মিস পোঁপোঁ হাসলেন। মানুষের রক্ত খেতে খেতে মশারা সুযোগ পেলেই তাদের কপি করে।
মিস পোঁপোঁ নিজেকে প্রবোধ দিলেন—এসব ভাবার সময় এখন নয়। মানুষের মতো খারাপ প্রাণী পৃথিবীতে একটিও নেই। এই প্রাণীদের ধ্বংস করার মহান ব্রত ছাড়া মশক জাতির আর কোনো লক্ষ্যই থাকতে পারে না।
তবুও সাধারণ মশাদের আন্দোলনকে আমলে নেয়া হলো। বিশেষভাবে দায়ী করা হলো আমলা মশাদের। এরা খেয়েদেয়ে পেটটাকে মোটা বানানো ছাড়া আর কিছু করছে না। অরুণাপল্লী হাউজিং সোসাইটি এতো বড় একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, সেই খবরের কিছুই কেন আমলারা জানে না? কয়েকজন আমলাকে বরখাস্ত করা হলো। মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘আপনারা অ্যারিস্ট্রোক্রেসির নামে আড়ষ্টকাকের মতো বসে থাকবেন না। রাজ্যের কাজে লাগুন।’ গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য গোয়েন্দাপ্রধানকে ভর্ৎসনা করা হলো।
খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেন রাষ্ট্রপতি মিস পোঁপোঁ। এই সেই ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটো—যেখানে গত পনেরটি বছর ধরে গড়ে উঠেছে মশকরাজ্য। তার দাদার স্বপ্ন ছিল মানুষের রক্ত দিয়ে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এক মশকবান্ধব রাজ্য গড়ে তুলবেন। মনে পড়ল তার দাদির বলা সেই কথা, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ সর্গাদপি গরিয়সী।’ আহা, কী আউটস্ট্যান্ডিং মহিলা ছিলেন। মানুষের কথাগুলো দিব্যি মুখস্থ বলতে পারতেন।
জাতীয় সিনেটের অধিবেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মশকরাজ্য জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হলো। মিস পোঁপোঁ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বললেন, ‘আমাদের ন্যাশনাল স্পিরিট ধরে রাখতে হবে। মশাদের জাতীয় ইতিহাসকে মনে রেখে মানুষবিরোধী সংগ্রামে নামতে হবে আমাদের।’
তিন বাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল মি. পয়জন বললেন, ‘উই আর রেডি টু ফাইট, রেডি টু ডাই।’
মানুষবিরোধী এই অভিযানের নাম দেয়া হলো ‘অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট’। জাতীয় সিনেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস করানো হলো। অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ড. বাশার—সে-ই মশার প্রধান শত্রু। মশাদের নিয়ে জাপান থেকে গবেষণা করেছেন। প্রচুর সরকারি প্রজেক্ট বাগিয়েছেন। এমনকি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। এই লোককে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। তবে আগাতে হবে ধীরে-সুস্থে। ছোট ছোট শত্রু মেরে সর্বশেষ আঘাত হানতে হবে ড. বাশারের ওপর।
সামগ্রিক যুদ্ধপরিকল্পনার জন্য দায়িত্ব পেলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল মিস্টার পয়জন। তার সঙ্গে আছেন গোয়েন্দা পরিদপ্তরের প্রধান মিস্টার ব্ল্যাকহ্যাট হাউডি ক্লাউডি।
জরুরি অবস্থা জারির তিন দিন পর মশারা অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। সেনা, নৌ, বিমান সব বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। অরুণাপল্লী হাউজিংয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে মশারা অবস্থান গ্রহণ করল। মশাদের সবাই মাথায় কালো কাপড়ের ফিতা বাঁধল। ওখানে লেখা, ‘মশাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।’
টার্গেট : ১
সন্ধ্যা ৭টা। হাউজিং অফিসের পাশে মোবাইল নিয়ে মেতে আছে বুলডোজারওয়ালা। গেরিলা বাহিনী নিয়ে ওত পেতে আছেন লেফটেনেন্ট জেনারেল মিস্টার পয়জন। গোয়েন্দাপ্রধান জানালেন, ‘ওকে আঘাত করার জন্য মিস রেড চিলিকে লাগবে।’
‘কেন?’
‘স্যার, বিশ্বস্তসূত্রে খবর পেয়েছি বুলডোজারওয়ালার পছন্দ নোরা ফাতেহি।’
‘নোরা ফাতেহি কে?’
‘স্যার। লজ্জার কথা।’
‘যুদ্ধে কোনো লজ্জা নেই। বলো।’
‘স্যার। মানুষের ভাষা যতোটা বুঝেছি তাতে জেনেছি উনি একজন আইটেম গার্ল। সিনেমায় নাচানাচি করেন।’
‘তো…!’
‘স্যার, পোশাক-আশাকের ঠিকঠিকানা নাই। মানুষেরা বলে ‘স্বল্পবসনা’।
‘তো..!’
‘বুলডোজারওয়ালা যখন নোরার ভিডিও দেখে তব্দা মেরে যাবে তখন কামড়ালে ভালো হয়। আর এর জন্য একজন সুন্দরী নারী মশা দরকার।’
‘তুমি কি এসব বানিয়ে বলছ?’
‘নাহ, স্যার। আমাদের মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবালের তথ্যমতে। কনসালট্যান্ট হিসেবে উনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। ডাকব উনাকে?’
‘ডাকো।’
জেনারেল পয়জন স্বাগত জানালেন মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবালকে।
‘আচ্ছা, ড. ক্যানিবাল, মানুষকে কামড়ানোর সঙ্গে সংগীতের কোনো সম্পর্ক আছে?’
ড. ক্যানিবাল বললেন, ‘অবশ্যই, মিস্টার পয়জন! মানুষ খুবই সংগীতমুগ্ধ প্রাণী। আমাদের গান ছাড়া সারা দুনিয়ার সমস্ত গান ওরা পছন্দ করে। ওরা যখন কনসার্টে গান শোনে আর নাচানাচি করে তখন টেরও পায় না কতগুলো মশা এসে ওদের পায়ে কামড়ে দিয়েছে।’
‘স্বল্পবসনাদের ব্যাপারটা বুঝি নি।’
‘স্বল্পবসনাদের গান শুনতে বা দেখতে বাঙালি পুরুষরা খুবই আনন্দ বোধ করে। ওই সময় তারা কোথায় হারিয়ে যায়, বলা মুশকিল। কোনো পুরুষ মানুষকে কামড়ে দেয়ার এটিই উত্তম সময়। শাকিরা, জেনিফার লোপেজ, কেটি পেরি, সানি লিওনি, নোরা ফাতেহি যে গানে আছেন সে গানের দর্শককে কামড়ানো পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ।’
বললেন, ‘গুড পয়েন্ট। বুঝতে পেরেছি।’
মনুষ্যনিধনের কথা বলতেই রেড চিলি সানন্দ সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। মশকবাহিনীগুলোকে সতর্ক করা হলো বুলডোজারওয়ালাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। বুলডোজারওয়ালা ততক্ষণ বসে বসে আয়েশ করে ‘দিলবার দিলবার’ আর ‘কুসু কুসু’ গান দেখতে থাকল।
সব মশা হিন্দি জানে না। কেউ কেউ হিন্দিতে ওস্তাদ। নোরা ফাতেহির গান শুনে তারা ধুম মাচালে নাচ জুড়ে দিল। মিস্টার পয়জন সতর্ক করলেন—এটা যুদ্ধের সময়, নাচার সময় নয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে নাচা উচিত। অবশ্য নাচের এমনই তাল—তার পক্ষেও তাল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। মিস্টার পয়জন এই প্রথম নোরা ফাতেহিকে দেখলেন। মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল জেনারেল পয়জনের কানে কানে বললেন, ‘হানিট্র্যাপ!’ তারপর পাশেই ঝিমুনিরত এক সিকিউরিটি গার্ডের রক্ত পান করে দুজন ব্যাপারটিকে উদযাপন করলেন, ‘চিয়ার্স!’
উড়তে উড়তে চলে এলেন মিস রেড চিলি। ক্যাটওয়াক করতে করতে দাঁড়ালেন। শিকার তখনও বসে বসে ‘কুসু কুসু’ গান টেনে টেনে দেখছে। ‘দর্দ-এ-দিল কি রাহাত তু... ধাড়কানো কি মান্নাত তু... হুসনে কা দারিয়া হু ম্যাঁ, অর মেরা সাহিল তু’—এই লাইনগুলো বাজার সঙ্গে সঙ্গে কুট করে কামড়ে দিলেন মিস রেড চিলি। চিৎকার করে বললেন, ‘আয়, তোর সাহিলগিরি দেখাচ্ছি!’
বুলডোজারওয়ালা ঠাস করে একটা চড় মারলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বুলডোজারওয়ালার মাংসে ঢুকে গেছে তীক্ষ্ণ শুঁড়। প্রচণ্ড জ্বলুনি। মিস রেড চিলি শাঁই করে উড়ে চলে গেলেন নিরাপদ দূরত্বে।
টার্গেট : ২
হাউজিং সোসাইটির সভাপতির বয়স ৫৮। রিটায়ার্ড আর্মি। ‘ডিসিপ্লিন’ ‘ডিসিপ্লিন’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। মশকবাহিনীর এবারের টার্গেট অবসরপ্রাপ্ত মেজর খায়রুল সাহেব। ড্রইংরুমে বসে তিনি টিভি দেখছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেন।
স্ত্রী রুমে ঢুকতেই মেজর সাহেব চমকে উঠলেন। কারণ তিনি এখন আর খবর দেখতে পারবেন না। তারই খবর আছে। মিসেস মেজর বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, ‘জানালা বন্ধ করো নাই কেন! সারা দিন বসে বসে খবর!’
অথচ মেজর সাহেব একটু আগেই জানালা বন্ধ করেছেন। মিসেস মেজরের আচরণ জেনারেলের মতো। মেজর মশাইয়ের হাত থেকে রিমোটটা কেড়ে নিলেন। চ্যানেল পাল্টে তিনি ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ দেখতে বসলেন। কোথায় রাশিয়া, কোথায় ইউক্রেন! মেজর খায়রুল মুহূর্তের মধ্যেই মার্কিন সাম্র্যাজ্যবাদের মুখোমুখি হলেন এবং নিজের সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। অতঃপর একান্ত বাধ্য স্বামীর মতো তিনিও ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ দেখতে থাকলেন।
তিন গ্রুপে বিভক্ত মশারা এসব দেখছিল। টার্গেট নম্বর ২-কে ঘায়েল করার জন্য নেতৃত্বে আছেন ডাস্টবিন প্রদেশের গভর্নর মি ধুলিয়া। মেজর সাহেবের কথা ভেবে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘বেচারা’।
ধুলিয়া ভাবলেন, মিসেস মেজরকে মজা দেখানো দরকার। গ্রুপ তিনটিকে ঘন ঘন আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। মশারা উড়ে গিয়ে মিসেস মেজরের কানে পিনপিন শব্দ তুলে অস্থির করে ফেলল। কেউ কেউ কামড়াতে থাকল তার হাতে, কানে, পায়ে। মিসেস মেজর ঠাস ঠাস করে চড় কষতে লাগলেন। মহিলার ফর্সা চামড়া লাল হয়ে গেলো। মেজর খায়রুলকে শুনিয়ে হম্বিতম্বি করে বললেন, ‘কী মশা মারার ক্রিম নিয়ে আসছো! হাতে পায়ে ঘষেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তুমি আসলে কোনো কাজেরই না। হাঁটুর নিচে বুদ্ধি তোমার।’
খায়রুল সাহেবের ইচ্ছে হলো বলবেন, ‘ক্রিম কি আমি বানাইছি!’ কিন্তু ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ লাগার ভয়ে কিছু না বলে কথাটা কুত করে গিলে ফেললেন।
এর মধ্যে মশকবাহিনীর কাছে খবর এলো মশাদের মেজর জেনারেল মিস্টার পয়জন অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। খুব বেশি না, মানুষ মেজরের স্ত্রীকে তিনি একটিমাত্র কামড় দিয়েছিলেন। তাতেই অজ্ঞান। তিন বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত তাকে তুলে নিয়ে গেলো কর্নার শেলফের এক কোনায়; খায়রুল সাহেবের ব্যাজ ও ক্রেস্টগুলোর আড়ালে মশারা লুকিয়ে পড়ল।
জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করা হলো, ঘটনা কী? মিস্টার পয়জন গোঙাতে গোঙাতে জবাব দিলেন, ‘মহিলার রক্ত খুবই টক্সিক—তিক্তবিষ!’ বলেই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল বললেন, ‘এটা খুবই সাধারণ মানের বিষ। রানি ক্লিওপেট্রার বিষ আরও টক্সিক। প্রমাণ আছে ইতিহাসে।’
মিসেস মেজর খায়রুল মশাদের আক্রমণে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে টিভির সামনে থেকে উঠে গেলেন। খায়রুল সাহেব খুশি হয়ে আবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের খবর দেখতে বসলেন। এই সুযোগে মশাদের প্রশিক্ষিত বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। মশা মারার ব্যাট হাতে নিয়ে মেজর খায়রুল উঠে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে দেখলেন ড্রইং রুমের জানালা খোলা। জানালা খুলল কে? সোফার পাশে মোবাইল চার্জে রেখেছিলেন—আইফোন সেভেন্টিন। মোবাইল গায়েব। তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। মেজর খায়রুল মশা মারার কথা ভুলে গেলেন।
তিন নম্বর টার্গেটকে আক্রমণ করার আগে মিস পোঁপোঁ জাতীয় সিনেটের অধিবেশন ডাকলেন—জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। ড. বাশারের বাসাটা মশাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই অভিযানে অনেক প্রাণক্ষয় হতে পারে। জাতিকে জানানো দরকার—কত ঝুঁকির ভেতর রাজ্য পরিচালনা করতে হয়।
ড. বাশারের বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জানালা ও বারান্দায় নেট দেয়া। প্রতিটি রুমে আছে মশা মারার ব্যাট, অ্যারোসোল, ইলেকট্রিক নেট। ড. বাশারের বাচ্চারা কয়েল পছন্দ করে না। আর তাই এই বাসায় কয়েল ও কয়েলদানি নেই। মশারা খুব সতর্কতার সঙ্গে এই বাসায় ঢুকবে। কিন্তু কীভাবে ঢুকবে তা নিয়ে চিন্তিত।
পাইপলাইন প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডি গেরিলা হামালায় অভিজ্ঞ। এই অভিযানে তিনি সর্বাত্মক সহায়তা করবেন। মিস ব্লাডি বললেন, ‘ড. বাশারের রান্না ঘরে মাছ কাটার একটা জায়গা আছে। সকাল বেলার পর ওখানে কোনো কাটাকুটির কাজ হয় না। ওই পাইপলাইন ধরে আমরা ঢুকব।’
গোয়েন্দাপ্রধান বললেন, ‘ওই ফ্ল্যাটের সব পয়েন্টে অবস্থান নিতে হবে।’
মেজর জেনারেল মি. পয়জন বললেন, ‘দলবদ্ধভাবে নয়। আলাদা আলাদাভাবে ঢুকতে হবে।’
মানুষ-গবেষক বললেন, ‘মানুষেরা অত্যন্ত ধূর্ত। ব্যাঘ্রের সাহস, শৃগালের ধূর্ততা, গোখরোর বিষ—এই তিনে মানুষ। তবু ভয় নেই। কবি বলেছেন, জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে।’
মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘মনে রাখতে হবে ড. বাশার মশক জাতির প্রধান শত্রু। আমাদের মনে রাখতে হবে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ম্যালেরিয়ায় আমরা কোটি কোটি মানুষ মেরেছি। আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী। আমরাই মেরেছি মহাবীর আলেকজান্ডারকে। মানুষের অধিপত্য নিপাত যাক, মশকতন্ত্র মুক্তি পাক।’
চারদিকে শোরগোল পড়ে গেলো, ‘হেইল মিস পোঁপোঁ, হেইল মিস পোঁপোঁ, হেইল মিস পোঁপোঁ’। হাত তুলে সবাই পোঁপোঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানালো।
টার্গেট ৩
ড. বাশার রিডিং রুমে আর্টিকেল লিখছেন। লেখার ফাঁকেই গবেষণার বিষয় নিয়ে কথা বললেন এক জাপানি প্রফেসরের সঙ্গে কথা। আগামী মাসে টোকিওতে মশাবিষয়ক একটা কনফারেন্সে অংশ নেবেন ড. বাশার। এবারের বিষয় ‘জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে মশাখেকো মশা তৈরি করা যায়।’
মশারা ঘাপটি মেরে সব কথা শুনছিল। খুব চটে গেলেন মিস পোঁপোঁ। জেনারেল মিস্টার পয়জন হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘মানুষ মানুষের মাংস খেলেও মশারা কখনো মশার মাংস খায় না। মাইন্ড ইট।’
মশারা পিন পিন করে মশাদের জাতীয় কবির লেখা রণসংগীত গাইতে লাগল—
পিন পিন পিন
মানুষ খেয়ে দাঁত রঙিন
আমরা সবাই ফুটাবো pin,
সামনে আনবো নতুন দিন,
পিন পিন পিন!
মিস পোঁপো সবাইকে সাবধানে মিশন পরিচালনা করতে বললেন। একটু আগে দুরবিন দিয়ে তিনি একটি মশক নিবারণী যন্ত্র দেখতে পেয়েছেন। ড. বাশার পায়ের কাছে রেখে দিয়েছেন। প্রয়োজন হলেই ছক্কা হাঁকাবেন। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে জানা গেছে ড. বাশার ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইলের একজন বিগ ফ্যান। অতএব সাবধান।
জেনারেল পয়জন একজন সাধারণ সৈনিক মশাকে পাঠালেন। ড. বাশার ধুম করে একটা চড় কষলেন। সৈনিক মশাটি তার বাম হাত ভেঙে যুদ্ধশিবিরে ফিরে এলো। মশকবাহিনী সতর্ক। জেনারেল বললেন, ‘যতোটা সম্ভব আমাদের নীরবতা পালন করতে হবে।’
মিস ব্লাড সাকার একটু বেশি কথা বলেন। তার ভেতর বিপ্লবী চেতনা প্রবল। বললেন, ‘ওহ, নো! নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা। আমরা চাই সরবতা।’ বলেই তিনি পিন পিন পিন করতে লাগলেন। ড. বাশার তার মশকনিবারণী যন্ত্রটি ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে এলেন। প্রাণ বাঁচাতে মশকবাহিনী পড়িমরি করে যে যার মতো লুকিয়ে পড়ল।
কেটে গেলো একদিন। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। মিস পোঁপোঁ লুকিয়ে আছেন ড. বাশারের পুরনো জুতার ভেতর। সঙ্গে দুজন সৈনিক মশা। পোঁপোঁ খুবই বিরক্ত হয়ে আছেন। ব্লাড সাকারের বিপ্লবী খেলা তিনি পছন্দ করেন না। তার জন্যই প্রথম দিনের মিশন ব্যর্থ হলো। মনে মনে বললেন, ‘এইসব বিপ্লবী হঠকারিতা রক্তপাতের কারণ।’ মিস পোঁপোঁ ভেবেচিন্তে একজন সৈনিক মশাকে ঘটনাস্থলে রেকি করতে পাঠালেন।
ড. বাশার তখন ড্রইংরুমে ফ্যামিলি মিটিঙে বসেছেন। সবার মুখ খুব গম্ভীর। হাউজিং সোসাইটির সভাপতি মেজর খায়রুল সাহেব অসুস্থ—কী যেন হয়েছে। বুলডোজারওয়ালাও বাড়ি গিয়ে আর আসছে না। সৈনিক মশা এসব খবর পৌঁছে দিল মিস পোঁপোঁর কাছে। ড. বাশারের চিন্তিত মুখ কল্পনা করে পোঁপোঁ খুশিতে আটখানা। মানুষের দুর্ভোগেই মশাদের আনন্দ।
চিন্তায় চিন্তায় কেটে গেলো আরও একদিন।
পরদিন রাতে হঠাৎ করে সেই জুতার ভেতর ঢুকলেন এক মুখোশ ঢাকা মশা। মিস পোঁপোঁ চিনতে পারলেন—মিস্টার পয়জন। মিস পোঁপোঁ স্বস্তি বোধ করলেন। পয়জন জানালেন ড. বাশার ইদানীং রিডিং রুমে বসেন না। বেশির ভাগ সময় বেডরুমেই কাটান। বাইরেও যান না। ফোনে প্রচুর কথা বলেন। আলাপের বিষয়বস্তু ঠিক বোঝা যায় না। তবে গুরুতর কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এই একটা সুযোগ। মশাদের প্রাচীন দার্শনিক আরস্তু মশকুল্লাহ খান বলেছেন, ‘বিক্ষিপ্ত মানুষকে কামড়ানোর আনন্দ আপরিসীম।’
মিস পোঁপোঁ সব মশাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন। জানালেন, মশকরাজ্যের ঐক্য ধরে রাখতে হলে দ্রুত অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট সমাপ্ত করতে হবে। ড. বাশারের এই ফ্ল্যাট নামক টর্চার সেল থেকে বের হতে হবে। ডক্তরের দুর্বলতার এই মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে।
মিস্টার পয়জনের সশ্রস্ত্র নিরাপত্তায় মিস পোঁপোঁ জুতা থেকে বেরিয়ে এলেন। সোজা চলে গেলেন ড. বাশারের রিডিং রুমের বুক শেলফের সব চেয়ে ওপরের তাকে। জায়াগাটা বেশ নিরাপদ। ধীরে ধীরে সবাই সেখানে জড়ো হতে আরম্ভ করল।
মিস ব্লাড সাকারও এসেছেন। লজ্জায় তার মাথা কাটা যাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে আরও বেশি বিপ্লবী মনে হলো। মিস পোঁপোঁ ভাবলেন, এতো আত্মবিশ্বাস কোত্থেকে আসে, কে জানে! তার একজন রুশ বয়ফ্রেন্ড ছিল। সে বলত, ‘সারা পৃথিবীতেই কিছু মদন থাকে, আট-দশজন লোকের হাউকাউ শুনলেও যারা নিজেকে লেনিন ভাবতে শুরু করে।’
মিস পোঁপোঁ পুরনো প্রসঙ্গ টানলেন না। গোয়েন্দাপ্রধানকে মিস্টার ব্ল্যাকহ্যাট হাউডি ক্লাউডিকে ডাকলেন। তিনি বললেন, ‘রিপোর্ট আমাদের অনুকূলে।’ ড. বাশারের পুরো পরিবার ইদানীং বেডরুমের বাইরেও বের হয় না। বাসার সবাই যার যার রুমে থাকে। মোবাইলে খবর দেখে। বুয়াদের বাসায় ঢোকা বন্ধ।
পাঁচ জন পুরুষ সৈনিকের একটি দলকে ড. বাশারের বেডরুমে পাঠানো হলো। তারা বাধাহীনভাবে আরামে রক্ত খেয়ে ফিরে এলো। তাদের খুশিতে-বাকবাকুম চেহারা দেখে সবাই অবাক।
মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘আমি ভাবতাম মশকসাম্রাজ্যে পুরুষ মশারা নিতান্ত অকর্মণ্য ও অলস। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পুরুষের ক্ষমতায়নে আমি অত্যন্ত খুশি।’ রক্তশোষণ প্রক্রিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ দানের জন্য তিনি মিস ব্লাড গেইম, মিস ব্লাড সাকার ও মিস রেড চিলি—এই তিন নারী নেত্রীকে ধন্যবাদ দিলেন। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘মিশন এখনও ইনকমপ্লিট। তবে মিশন ইমপসিবল নয়।’
একটা প্রশ্ন সবার মনেই ঘুরছে—ড. বাশার কেন রিডিং রুমে আসছেন না? তিনি কি জাপানে যাবেন না? বাশার কি গবেষণা করে মশকবিরোধী নতুন কোনো ফন্দি আঁটছেন? মানুষ-বিশেষজ্ঞ ড. ক্যানিবাল সতর্ক করলেন, ‘মানুষের নীরবতা খুবই ভয়াবহ। যুদ্ধশাস্ত্রে শত্রুর নীরবতা ব্যাপকতর যুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করে।’
মশকবাহিনী ভাবল, বাশারকে যেভাবেই হোক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। পুরুষ মশাদের দিয়ে কাজ হবে না। নারী মশাদের পাঠাতে হবে। মিস্টার পয়জন মুচকি হাসলেন, ‘হানি ট্র্যাপ!’ বুলডোজারওয়ালার কথা মনে পড়ল। বেচারা যে কোথায় আছে, কে জানে। ড. বাশারের বাসায় ঢোকার পর থেকে বাইরের কোনো খবরই জানা যাচ্ছে না।
অভিযানের সর্বাধিনায়ক হিসেবে মিস্টার পয়জন রাতের পরিকল্পনা করলেন।
মিস্টার পয়জনসহ নারীনেত্রীরা ড. বাশারের বেডরুমে ঢুকলেন। বাশার তখন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে প্রলাপ বকছেন। পানি খাবেন বলে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ধপাস করে পড়ে গেলেন। শব্দ শুনে অন্য রুম থেকে বাসার বাকি লোকজন দৌড়ে এলো। আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে মশকবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করল।
চিৎকার করে উঠলেন জেনারেল মিস্টার পয়জন, ‘শত্রু খতম!’ তার দাবি, তিনি কামড় দেয়ার পরপরই নির্মূল হয়েছেন ড. বাশার। নারী নেত্রীরা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ পোষণ করলেও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কোনো প্রশ্ন তুললেন না। তারা এও ভাবলেন, মাস্টারমাইন্ড যে-ই হোক-না-কেন মিশন সাকসেসফুল হলেই হলো।
মশারা খেয়াল করল, ড. বাশারের বাসায় অভূতপূর্ব নীরবতা নেমে এসেছে। বাড়িতে কেউ নেই। কোথায় গেল সব? ঘটনার কোনো সুরাহা করা গেলো না। বিভিন্ন গুপ্তাঞ্চল থেকে মশারা বেরিয়ে এসে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে ঘুরে দেখল। কেউ নেই। আশ্চর্য নীরবতার ভেতর মশারা তাদের প্রাথমিক জয়ের গন্ধ পেল। সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো ড. বাশারকে খুঁজে লাভ নেই। শত্রু নিধন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। আপাতত মশকরাজ্যে ফেরা যাক। এবার আর তাদের কষ্ট করতে হলো না, পাইপ লাইন ধরে বের হতে হলো না। কে যেন জানালার কাচ ভেঙে রেখে গেছে; সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে মশারা মশকরাজ্যে প্রবেশ করল।
মনে হলো কয়েক যুগ তারা কাটিয়ে ফেলেছে। ঢুকে দেখল মশকরাজ্য অক্ষত আছে। বুলডোজারটায় প্রায় মরচে ধরে গেছে। রাজ্যের নাগরিকেরাও শান্ত। রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মিস্টার ধুলিয়া একবার ক্যু করার চিন্তা করেছিলেন। নানাজন উসকানোর চেষ্টাও করেছিল। পরে ভাবলেন মশক-সংবিধান লঙ্ঘন করে খামোখা ক্ষমতায় গিয়ে লাভ নেই—দুই দিনের দুনিয়া।
জাতীয় দুর্যোগে মিস্টার ধুলিয়ার নেতৃত্বে সবাই খুশি হলেন। মিস পোঁপোঁ আবারও মনে করিয়ে দিলেন, মশকজাতির উন্নয়নে পুরুষের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। বারবার করে বললেন, ‘A mosquito can be destroyed but not defeated.' লেফটেন্যান্ট জেনারেল পয়জনকে অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট-এ নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ‘বীরচূড়ামণি’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। জেনারেল পয়জন তার ধন্যবাদ বক্তৃতায় বললেন, ‘এই বীরত্ব আমার একার নয়। মশকরাজ্যের সবাই এর অংশীদার। আমি মশকরাজ্যবাসীকে আমার উপাধি উৎসর্গ করছি। কবি বলেছেন, ‘‘জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে/সে জাতির নাম মশক-জাতি/মানুষ প্রাণীর রক্তে লালিত/একই রবি শশী মোদের সাথী।’’
ভাষণ দিতে দিতেই জেনারেল পয়জন মুচকি হাসি হাসলেন। সত্যি কথাটা তিনি জানেন। আর তা হলো, অরুণাপল্লী হাউজিঙের সিকিউরিটি সিস্টেম খুবই দুর্বল। হাউজিং সোসাইটির সভাপতি মেজর খায়রুল সাহেবের আইফোনটা আসলে চুরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয় বুলডোজারওয়ালার ডেঙ্গু হয়েছে। তারও চেয়ে বড় খবর হলো, ড. বাশার করোনায় আক্রান্ত—কোনো মশার কামড়ে তিনি অসুস্থ নন।
মশকরাজ্যে এই রোগের নাম এখনও ছড়ায়নি। চীনে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ড. বাশার তাই জাপানে যেতে পারেননি। মশা নিয়ে গবেষণায় আপাতত মুলতুবি। মানুষ এখন গবেষণা করছে করোনা নিয়ে। মহামারি ঘোষণা করায় অরুণাপল্লীর হাউজিং প্রকল্পের এক্সটেনশনের কাজ বন্ধ। অদূর ভবিষ্যতে সেই কাজ হবে কিনা সন্দেহ। সোসাইটির অধিকাংশ মানুষের দাবি হাউজিং প্রকল্পে একটা গোরস্তান করা হোক। মশকরাজ্য গোরস্তানে রূপান্তরিত হলেও মশাদের কোনো সমস্যা নেই। মশারা নির্বিঘ্নে সেখানে থাকতে পারবে। মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল বলেন, ‘পৃথিবীর সব গোরস্তানেই মশা থাকে।’
জেনারেল পয়জন এই কথাগুলো বলতে পারতেন। কিন্তু বলবেন না। কারণ মশকরাজ্যের আগামী নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন। তার আগে গোয়েন্দপ্রধানকে খতম করতে হবে। কারণ রহস্যময় সত্যটা তারও জানা। গুপ্ত সত্য যে জানে, সে-ই শত্রু।

ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটো। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। গভীর ঘুমে ডুবে আছেন মশকরাজ্যের রাষ্ট্রপতি মিস পোঁপোঁ। হঠাৎ বেজে উঠল তার লাল টেলিফোন।
সিকিউরিটি চিফ জানালো বিপদের সমূহ শঙ্কা। মানুষের কলোনিতে এক মশা-বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটেছে—ড. বাশার। এই মশকবিজ্ঞানী পরামর্শ দিয়েছেন যেকোনো মূল্যে ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটোকে ‘ডেস্ট্রয়’ করতে হবে।
মিস পোঁপোঁ একটু বিরক্ত হলেন। সিকিউরিটি ফোর্সের কাজই হলো কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে চমকে ওঠা। পোঁপোঁ চুপ করে সবকিছু শুনলেন। পিনপিন করতে করতে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ ঘটাং ঘটাং শব্দ। পিঁপিঁপিঁ করে দৌড়ে এলো সিকিউরিটি ফোর্স, ‘স্যার, একটা বুলডোজার আনা হয়েছে। মানুষেরা এই জঙ্গল পরিষ্কার করবে।’
পোঁপোঁ চোখ কুচকে তাকালেন।
‘তোমাকে না বলেছি মানুষের ভাষায় কথা বলবে না। মানুষের কাছে যা জঙ্গল, মশাদের কাছে তা নিজের দেশ।’
‘সরি স্যার, এইমাত্র জঙ্গল শব্দটা শুনে ভুলে বলে ফেলেছি। সরি স্যার। স্যার…’
‘দশবার সরি বলবে না। তোমাদের মতো মশকবাহিনী আমাদের কেমন শ্রদ্ধা করো, আমার জানা আছে। পৃথিবীর সব মশক-অভ্যুত্থানে তোমাদেরই হাত থাকে।’
সিকিউরিটি ফোর্স ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে।
ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট শব্দ শুনে ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটোর পাঁচটি প্রদেশ থেকে উড়ে এসেছেন পাঁচ গভর্নর। তাদের সবার মুখ গম্ভীর। স্যুয়ারেজ প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডসাকার বললেন, যেকোনো মূল্যে ওই বুলডোজারওয়ালার বারোটা বাজাতে হবে।’
ড্রেইন-সি প্রদেশের গভর্নর মিস রেড চিলি পিঁপিঁ করে উঠলেন, ‘আমার মনে হয়, অরুণাপল্লী হাউজিং প্রজেক্টের প্রেসিডেন্টকে ধরা দরকার। ওর বড় বাড় বেড়েছে।’
‘কেন?’ জিজ্ঞেস করলেন ম্যানহোল প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাড গেইম। জবাব দিলেন ডাস্টবিন প্রদেশের গভর্নর মি. ধুলিয়া, ‘মিস রেড চিলি সম্ভবত ক্লিনিং অপারেশনের কথা বলছেন।’
‘ইয়েস মিস ব্লাড গেইম। আপনি ঠিকই ধরেছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলে লোকটা সুযোগ পেলেই প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে।’ বললেন মিস রেড চিলি।
পাইপ লাইন প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডি বললেন, ‘তাহলে সব কয়টাকেই ধরা হোক।’
দার্শনিকের ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন মিস পোঁপোঁ; বললেন, ‘সমস্যা আরও গভীরে। গোয়েন্দা রিপোর্ট দেখা দরকার।’
গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা গেলো অরুণাপল্লীতে নতুন আটতলা দালান উঠবে। জমিজমা পরিষ্কার করা হবে। এর নেতৃত্বে আছেন হাউজিংয়ের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর খায়রুল। আর তাকে সহায়তা করছেন মশকবিজ্ঞানী ড. বাশার। পুরনো দালানটাকে ভাঙার জন্য আজ বুলডোজার আনা হয়েছে। অল্প কিছুক্ষণ হলো দালান ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে।
জাতীয় সিনেটের সভাচলাকালেই প্রচণ্ড শোরগোল শোনা গেলো। গোয়েন্দাপ্রধান জানালেন সাধারণ মশারা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। যেকোনো সময় তারা কমপ্লিট শাটডাউন শুরু করতে পারে। প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। মিস পোঁপোঁ স্লোগান শুনতে পেলেন—‘মশকরাজ্য ধ্বংস কেন/সরকার জবাব চাই।’, ‘রাজ্য নিয়ে তালবাহানা/চলবে না, চলবে না।’, ‘তুমি কে আমি কে/মশা মশা।’ একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মদন।’
মিস পোঁপোঁ হাসলেন। মানুষের রক্ত খেতে খেতে মশারা সুযোগ পেলেই তাদের কপি করে।
মিস পোঁপোঁ নিজেকে প্রবোধ দিলেন—এসব ভাবার সময় এখন নয়। মানুষের মতো খারাপ প্রাণী পৃথিবীতে একটিও নেই। এই প্রাণীদের ধ্বংস করার মহান ব্রত ছাড়া মশক জাতির আর কোনো লক্ষ্যই থাকতে পারে না।
তবুও সাধারণ মশাদের আন্দোলনকে আমলে নেয়া হলো। বিশেষভাবে দায়ী করা হলো আমলা মশাদের। এরা খেয়েদেয়ে পেটটাকে মোটা বানানো ছাড়া আর কিছু করছে না। অরুণাপল্লী হাউজিং সোসাইটি এতো বড় একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, সেই খবরের কিছুই কেন আমলারা জানে না? কয়েকজন আমলাকে বরখাস্ত করা হলো। মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘আপনারা অ্যারিস্ট্রোক্রেসির নামে আড়ষ্টকাকের মতো বসে থাকবেন না। রাজ্যের কাজে লাগুন।’ গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য গোয়েন্দাপ্রধানকে ভর্ৎসনা করা হলো।
খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেন রাষ্ট্রপতি মিস পোঁপোঁ। এই সেই ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটো—যেখানে গত পনেরটি বছর ধরে গড়ে উঠেছে মশকরাজ্য। তার দাদার স্বপ্ন ছিল মানুষের রক্ত দিয়ে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এক মশকবান্ধব রাজ্য গড়ে তুলবেন। মনে পড়ল তার দাদির বলা সেই কথা, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ সর্গাদপি গরিয়সী।’ আহা, কী আউটস্ট্যান্ডিং মহিলা ছিলেন। মানুষের কথাগুলো দিব্যি মুখস্থ বলতে পারতেন।
জাতীয় সিনেটের অধিবেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মশকরাজ্য জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হলো। মিস পোঁপোঁ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বললেন, ‘আমাদের ন্যাশনাল স্পিরিট ধরে রাখতে হবে। মশাদের জাতীয় ইতিহাসকে মনে রেখে মানুষবিরোধী সংগ্রামে নামতে হবে আমাদের।’
তিন বাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল মি. পয়জন বললেন, ‘উই আর রেডি টু ফাইট, রেডি টু ডাই।’
মানুষবিরোধী এই অভিযানের নাম দেয়া হলো ‘অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট’। জাতীয় সিনেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস করানো হলো। অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ড. বাশার—সে-ই মশার প্রধান শত্রু। মশাদের নিয়ে জাপান থেকে গবেষণা করেছেন। প্রচুর সরকারি প্রজেক্ট বাগিয়েছেন। এমনকি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। এই লোককে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। তবে আগাতে হবে ধীরে-সুস্থে। ছোট ছোট শত্রু মেরে সর্বশেষ আঘাত হানতে হবে ড. বাশারের ওপর।
সামগ্রিক যুদ্ধপরিকল্পনার জন্য দায়িত্ব পেলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল মিস্টার পয়জন। তার সঙ্গে আছেন গোয়েন্দা পরিদপ্তরের প্রধান মিস্টার ব্ল্যাকহ্যাট হাউডি ক্লাউডি।
জরুরি অবস্থা জারির তিন দিন পর মশারা অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। সেনা, নৌ, বিমান সব বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। অরুণাপল্লী হাউজিংয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে মশারা অবস্থান গ্রহণ করল। মশাদের সবাই মাথায় কালো কাপড়ের ফিতা বাঁধল। ওখানে লেখা, ‘মশাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।’
টার্গেট : ১
সন্ধ্যা ৭টা। হাউজিং অফিসের পাশে মোবাইল নিয়ে মেতে আছে বুলডোজারওয়ালা। গেরিলা বাহিনী নিয়ে ওত পেতে আছেন লেফটেনেন্ট জেনারেল মিস্টার পয়জন। গোয়েন্দাপ্রধান জানালেন, ‘ওকে আঘাত করার জন্য মিস রেড চিলিকে লাগবে।’
‘কেন?’
‘স্যার, বিশ্বস্তসূত্রে খবর পেয়েছি বুলডোজারওয়ালার পছন্দ নোরা ফাতেহি।’
‘নোরা ফাতেহি কে?’
‘স্যার। লজ্জার কথা।’
‘যুদ্ধে কোনো লজ্জা নেই। বলো।’
‘স্যার। মানুষের ভাষা যতোটা বুঝেছি তাতে জেনেছি উনি একজন আইটেম গার্ল। সিনেমায় নাচানাচি করেন।’
‘তো…!’
‘স্যার, পোশাক-আশাকের ঠিকঠিকানা নাই। মানুষেরা বলে ‘স্বল্পবসনা’।
‘তো..!’
‘বুলডোজারওয়ালা যখন নোরার ভিডিও দেখে তব্দা মেরে যাবে তখন কামড়ালে ভালো হয়। আর এর জন্য একজন সুন্দরী নারী মশা দরকার।’
‘তুমি কি এসব বানিয়ে বলছ?’
‘নাহ, স্যার। আমাদের মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবালের তথ্যমতে। কনসালট্যান্ট হিসেবে উনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। ডাকব উনাকে?’
‘ডাকো।’
জেনারেল পয়জন স্বাগত জানালেন মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবালকে।
‘আচ্ছা, ড. ক্যানিবাল, মানুষকে কামড়ানোর সঙ্গে সংগীতের কোনো সম্পর্ক আছে?’
ড. ক্যানিবাল বললেন, ‘অবশ্যই, মিস্টার পয়জন! মানুষ খুবই সংগীতমুগ্ধ প্রাণী। আমাদের গান ছাড়া সারা দুনিয়ার সমস্ত গান ওরা পছন্দ করে। ওরা যখন কনসার্টে গান শোনে আর নাচানাচি করে তখন টেরও পায় না কতগুলো মশা এসে ওদের পায়ে কামড়ে দিয়েছে।’
‘স্বল্পবসনাদের ব্যাপারটা বুঝি নি।’
‘স্বল্পবসনাদের গান শুনতে বা দেখতে বাঙালি পুরুষরা খুবই আনন্দ বোধ করে। ওই সময় তারা কোথায় হারিয়ে যায়, বলা মুশকিল। কোনো পুরুষ মানুষকে কামড়ে দেয়ার এটিই উত্তম সময়। শাকিরা, জেনিফার লোপেজ, কেটি পেরি, সানি লিওনি, নোরা ফাতেহি যে গানে আছেন সে গানের দর্শককে কামড়ানো পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ।’
বললেন, ‘গুড পয়েন্ট। বুঝতে পেরেছি।’
মনুষ্যনিধনের কথা বলতেই রেড চিলি সানন্দ সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। মশকবাহিনীগুলোকে সতর্ক করা হলো বুলডোজারওয়ালাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। বুলডোজারওয়ালা ততক্ষণ বসে বসে আয়েশ করে ‘দিলবার দিলবার’ আর ‘কুসু কুসু’ গান দেখতে থাকল।
সব মশা হিন্দি জানে না। কেউ কেউ হিন্দিতে ওস্তাদ। নোরা ফাতেহির গান শুনে তারা ধুম মাচালে নাচ জুড়ে দিল। মিস্টার পয়জন সতর্ক করলেন—এটা যুদ্ধের সময়, নাচার সময় নয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে নাচা উচিত। অবশ্য নাচের এমনই তাল—তার পক্ষেও তাল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। মিস্টার পয়জন এই প্রথম নোরা ফাতেহিকে দেখলেন। মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল জেনারেল পয়জনের কানে কানে বললেন, ‘হানিট্র্যাপ!’ তারপর পাশেই ঝিমুনিরত এক সিকিউরিটি গার্ডের রক্ত পান করে দুজন ব্যাপারটিকে উদযাপন করলেন, ‘চিয়ার্স!’
উড়তে উড়তে চলে এলেন মিস রেড চিলি। ক্যাটওয়াক করতে করতে দাঁড়ালেন। শিকার তখনও বসে বসে ‘কুসু কুসু’ গান টেনে টেনে দেখছে। ‘দর্দ-এ-দিল কি রাহাত তু... ধাড়কানো কি মান্নাত তু... হুসনে কা দারিয়া হু ম্যাঁ, অর মেরা সাহিল তু’—এই লাইনগুলো বাজার সঙ্গে সঙ্গে কুট করে কামড়ে দিলেন মিস রেড চিলি। চিৎকার করে বললেন, ‘আয়, তোর সাহিলগিরি দেখাচ্ছি!’
বুলডোজারওয়ালা ঠাস করে একটা চড় মারলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বুলডোজারওয়ালার মাংসে ঢুকে গেছে তীক্ষ্ণ শুঁড়। প্রচণ্ড জ্বলুনি। মিস রেড চিলি শাঁই করে উড়ে চলে গেলেন নিরাপদ দূরত্বে।
টার্গেট : ২
হাউজিং সোসাইটির সভাপতির বয়স ৫৮। রিটায়ার্ড আর্মি। ‘ডিসিপ্লিন’ ‘ডিসিপ্লিন’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। মশকবাহিনীর এবারের টার্গেট অবসরপ্রাপ্ত মেজর খায়রুল সাহেব। ড্রইংরুমে বসে তিনি টিভি দেখছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেন।
স্ত্রী রুমে ঢুকতেই মেজর সাহেব চমকে উঠলেন। কারণ তিনি এখন আর খবর দেখতে পারবেন না। তারই খবর আছে। মিসেস মেজর বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, ‘জানালা বন্ধ করো নাই কেন! সারা দিন বসে বসে খবর!’
অথচ মেজর সাহেব একটু আগেই জানালা বন্ধ করেছেন। মিসেস মেজরের আচরণ জেনারেলের মতো। মেজর মশাইয়ের হাত থেকে রিমোটটা কেড়ে নিলেন। চ্যানেল পাল্টে তিনি ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ দেখতে বসলেন। কোথায় রাশিয়া, কোথায় ইউক্রেন! মেজর খায়রুল মুহূর্তের মধ্যেই মার্কিন সাম্র্যাজ্যবাদের মুখোমুখি হলেন এবং নিজের সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। অতঃপর একান্ত বাধ্য স্বামীর মতো তিনিও ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ দেখতে থাকলেন।
তিন গ্রুপে বিভক্ত মশারা এসব দেখছিল। টার্গেট নম্বর ২-কে ঘায়েল করার জন্য নেতৃত্বে আছেন ডাস্টবিন প্রদেশের গভর্নর মি ধুলিয়া। মেজর সাহেবের কথা ভেবে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘বেচারা’।
ধুলিয়া ভাবলেন, মিসেস মেজরকে মজা দেখানো দরকার। গ্রুপ তিনটিকে ঘন ঘন আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। মশারা উড়ে গিয়ে মিসেস মেজরের কানে পিনপিন শব্দ তুলে অস্থির করে ফেলল। কেউ কেউ কামড়াতে থাকল তার হাতে, কানে, পায়ে। মিসেস মেজর ঠাস ঠাস করে চড় কষতে লাগলেন। মহিলার ফর্সা চামড়া লাল হয়ে গেলো। মেজর খায়রুলকে শুনিয়ে হম্বিতম্বি করে বললেন, ‘কী মশা মারার ক্রিম নিয়ে আসছো! হাতে পায়ে ঘষেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তুমি আসলে কোনো কাজেরই না। হাঁটুর নিচে বুদ্ধি তোমার।’
খায়রুল সাহেবের ইচ্ছে হলো বলবেন, ‘ক্রিম কি আমি বানাইছি!’ কিন্তু ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ লাগার ভয়ে কিছু না বলে কথাটা কুত করে গিলে ফেললেন।
এর মধ্যে মশকবাহিনীর কাছে খবর এলো মশাদের মেজর জেনারেল মিস্টার পয়জন অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। খুব বেশি না, মানুষ মেজরের স্ত্রীকে তিনি একটিমাত্র কামড় দিয়েছিলেন। তাতেই অজ্ঞান। তিন বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত তাকে তুলে নিয়ে গেলো কর্নার শেলফের এক কোনায়; খায়রুল সাহেবের ব্যাজ ও ক্রেস্টগুলোর আড়ালে মশারা লুকিয়ে পড়ল।
জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করা হলো, ঘটনা কী? মিস্টার পয়জন গোঙাতে গোঙাতে জবাব দিলেন, ‘মহিলার রক্ত খুবই টক্সিক—তিক্তবিষ!’ বলেই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল বললেন, ‘এটা খুবই সাধারণ মানের বিষ। রানি ক্লিওপেট্রার বিষ আরও টক্সিক। প্রমাণ আছে ইতিহাসে।’
মিসেস মেজর খায়রুল মশাদের আক্রমণে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে টিভির সামনে থেকে উঠে গেলেন। খায়রুল সাহেব খুশি হয়ে আবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের খবর দেখতে বসলেন। এই সুযোগে মশাদের প্রশিক্ষিত বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। মশা মারার ব্যাট হাতে নিয়ে মেজর খায়রুল উঠে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে দেখলেন ড্রইং রুমের জানালা খোলা। জানালা খুলল কে? সোফার পাশে মোবাইল চার্জে রেখেছিলেন—আইফোন সেভেন্টিন। মোবাইল গায়েব। তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। মেজর খায়রুল মশা মারার কথা ভুলে গেলেন।
তিন নম্বর টার্গেটকে আক্রমণ করার আগে মিস পোঁপোঁ জাতীয় সিনেটের অধিবেশন ডাকলেন—জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। ড. বাশারের বাসাটা মশাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই অভিযানে অনেক প্রাণক্ষয় হতে পারে। জাতিকে জানানো দরকার—কত ঝুঁকির ভেতর রাজ্য পরিচালনা করতে হয়।
ড. বাশারের বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জানালা ও বারান্দায় নেট দেয়া। প্রতিটি রুমে আছে মশা মারার ব্যাট, অ্যারোসোল, ইলেকট্রিক নেট। ড. বাশারের বাচ্চারা কয়েল পছন্দ করে না। আর তাই এই বাসায় কয়েল ও কয়েলদানি নেই। মশারা খুব সতর্কতার সঙ্গে এই বাসায় ঢুকবে। কিন্তু কীভাবে ঢুকবে তা নিয়ে চিন্তিত।
পাইপলাইন প্রদেশের গভর্নর মিস ব্লাডি গেরিলা হামালায় অভিজ্ঞ। এই অভিযানে তিনি সর্বাত্মক সহায়তা করবেন। মিস ব্লাডি বললেন, ‘ড. বাশারের রান্না ঘরে মাছ কাটার একটা জায়গা আছে। সকাল বেলার পর ওখানে কোনো কাটাকুটির কাজ হয় না। ওই পাইপলাইন ধরে আমরা ঢুকব।’
গোয়েন্দাপ্রধান বললেন, ‘ওই ফ্ল্যাটের সব পয়েন্টে অবস্থান নিতে হবে।’
মেজর জেনারেল মি. পয়জন বললেন, ‘দলবদ্ধভাবে নয়। আলাদা আলাদাভাবে ঢুকতে হবে।’
মানুষ-গবেষক বললেন, ‘মানুষেরা অত্যন্ত ধূর্ত। ব্যাঘ্রের সাহস, শৃগালের ধূর্ততা, গোখরোর বিষ—এই তিনে মানুষ। তবু ভয় নেই। কবি বলেছেন, জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে।’
মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘মনে রাখতে হবে ড. বাশার মশক জাতির প্রধান শত্রু। আমাদের মনে রাখতে হবে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ম্যালেরিয়ায় আমরা কোটি কোটি মানুষ মেরেছি। আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী। আমরাই মেরেছি মহাবীর আলেকজান্ডারকে। মানুষের অধিপত্য নিপাত যাক, মশকতন্ত্র মুক্তি পাক।’
চারদিকে শোরগোল পড়ে গেলো, ‘হেইল মিস পোঁপোঁ, হেইল মিস পোঁপোঁ, হেইল মিস পোঁপোঁ’। হাত তুলে সবাই পোঁপোঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানালো।
টার্গেট ৩
ড. বাশার রিডিং রুমে আর্টিকেল লিখছেন। লেখার ফাঁকেই গবেষণার বিষয় নিয়ে কথা বললেন এক জাপানি প্রফেসরের সঙ্গে কথা। আগামী মাসে টোকিওতে মশাবিষয়ক একটা কনফারেন্সে অংশ নেবেন ড. বাশার। এবারের বিষয় ‘জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে মশাখেকো মশা তৈরি করা যায়।’
মশারা ঘাপটি মেরে সব কথা শুনছিল। খুব চটে গেলেন মিস পোঁপোঁ। জেনারেল মিস্টার পয়জন হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘মানুষ মানুষের মাংস খেলেও মশারা কখনো মশার মাংস খায় না। মাইন্ড ইট।’
মশারা পিন পিন করে মশাদের জাতীয় কবির লেখা রণসংগীত গাইতে লাগল—
পিন পিন পিন
মানুষ খেয়ে দাঁত রঙিন
আমরা সবাই ফুটাবো pin,
সামনে আনবো নতুন দিন,
পিন পিন পিন!
মিস পোঁপো সবাইকে সাবধানে মিশন পরিচালনা করতে বললেন। একটু আগে দুরবিন দিয়ে তিনি একটি মশক নিবারণী যন্ত্র দেখতে পেয়েছেন। ড. বাশার পায়ের কাছে রেখে দিয়েছেন। প্রয়োজন হলেই ছক্কা হাঁকাবেন। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে জানা গেছে ড. বাশার ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইলের একজন বিগ ফ্যান। অতএব সাবধান।
জেনারেল পয়জন একজন সাধারণ সৈনিক মশাকে পাঠালেন। ড. বাশার ধুম করে একটা চড় কষলেন। সৈনিক মশাটি তার বাম হাত ভেঙে যুদ্ধশিবিরে ফিরে এলো। মশকবাহিনী সতর্ক। জেনারেল বললেন, ‘যতোটা সম্ভব আমাদের নীরবতা পালন করতে হবে।’
মিস ব্লাড সাকার একটু বেশি কথা বলেন। তার ভেতর বিপ্লবী চেতনা প্রবল। বললেন, ‘ওহ, নো! নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা। আমরা চাই সরবতা।’ বলেই তিনি পিন পিন পিন করতে লাগলেন। ড. বাশার তার মশকনিবারণী যন্ত্রটি ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে এলেন। প্রাণ বাঁচাতে মশকবাহিনী পড়িমরি করে যে যার মতো লুকিয়ে পড়ল।
কেটে গেলো একদিন। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। মিস পোঁপোঁ লুকিয়ে আছেন ড. বাশারের পুরনো জুতার ভেতর। সঙ্গে দুজন সৈনিক মশা। পোঁপোঁ খুবই বিরক্ত হয়ে আছেন। ব্লাড সাকারের বিপ্লবী খেলা তিনি পছন্দ করেন না। তার জন্যই প্রথম দিনের মিশন ব্যর্থ হলো। মনে মনে বললেন, ‘এইসব বিপ্লবী হঠকারিতা রক্তপাতের কারণ।’ মিস পোঁপোঁ ভেবেচিন্তে একজন সৈনিক মশাকে ঘটনাস্থলে রেকি করতে পাঠালেন।
ড. বাশার তখন ড্রইংরুমে ফ্যামিলি মিটিঙে বসেছেন। সবার মুখ খুব গম্ভীর। হাউজিং সোসাইটির সভাপতি মেজর খায়রুল সাহেব অসুস্থ—কী যেন হয়েছে। বুলডোজারওয়ালাও বাড়ি গিয়ে আর আসছে না। সৈনিক মশা এসব খবর পৌঁছে দিল মিস পোঁপোঁর কাছে। ড. বাশারের চিন্তিত মুখ কল্পনা করে পোঁপোঁ খুশিতে আটখানা। মানুষের দুর্ভোগেই মশাদের আনন্দ।
চিন্তায় চিন্তায় কেটে গেলো আরও একদিন।
পরদিন রাতে হঠাৎ করে সেই জুতার ভেতর ঢুকলেন এক মুখোশ ঢাকা মশা। মিস পোঁপোঁ চিনতে পারলেন—মিস্টার পয়জন। মিস পোঁপোঁ স্বস্তি বোধ করলেন। পয়জন জানালেন ড. বাশার ইদানীং রিডিং রুমে বসেন না। বেশির ভাগ সময় বেডরুমেই কাটান। বাইরেও যান না। ফোনে প্রচুর কথা বলেন। আলাপের বিষয়বস্তু ঠিক বোঝা যায় না। তবে গুরুতর কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এই একটা সুযোগ। মশাদের প্রাচীন দার্শনিক আরস্তু মশকুল্লাহ খান বলেছেন, ‘বিক্ষিপ্ত মানুষকে কামড়ানোর আনন্দ আপরিসীম।’
মিস পোঁপোঁ সব মশাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন। জানালেন, মশকরাজ্যের ঐক্য ধরে রাখতে হলে দ্রুত অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট সমাপ্ত করতে হবে। ড. বাশারের এই ফ্ল্যাট নামক টর্চার সেল থেকে বের হতে হবে। ডক্তরের দুর্বলতার এই মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে।
মিস্টার পয়জনের সশ্রস্ত্র নিরাপত্তায় মিস পোঁপোঁ জুতা থেকে বেরিয়ে এলেন। সোজা চলে গেলেন ড. বাশারের রিডিং রুমের বুক শেলফের সব চেয়ে ওপরের তাকে। জায়াগাটা বেশ নিরাপদ। ধীরে ধীরে সবাই সেখানে জড়ো হতে আরম্ভ করল।
মিস ব্লাড সাকারও এসেছেন। লজ্জায় তার মাথা কাটা যাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে আরও বেশি বিপ্লবী মনে হলো। মিস পোঁপোঁ ভাবলেন, এতো আত্মবিশ্বাস কোত্থেকে আসে, কে জানে! তার একজন রুশ বয়ফ্রেন্ড ছিল। সে বলত, ‘সারা পৃথিবীতেই কিছু মদন থাকে, আট-দশজন লোকের হাউকাউ শুনলেও যারা নিজেকে লেনিন ভাবতে শুরু করে।’
মিস পোঁপোঁ পুরনো প্রসঙ্গ টানলেন না। গোয়েন্দাপ্রধানকে মিস্টার ব্ল্যাকহ্যাট হাউডি ক্লাউডিকে ডাকলেন। তিনি বললেন, ‘রিপোর্ট আমাদের অনুকূলে।’ ড. বাশারের পুরো পরিবার ইদানীং বেডরুমের বাইরেও বের হয় না। বাসার সবাই যার যার রুমে থাকে। মোবাইলে খবর দেখে। বুয়াদের বাসায় ঢোকা বন্ধ।
পাঁচ জন পুরুষ সৈনিকের একটি দলকে ড. বাশারের বেডরুমে পাঠানো হলো। তারা বাধাহীনভাবে আরামে রক্ত খেয়ে ফিরে এলো। তাদের খুশিতে-বাকবাকুম চেহারা দেখে সবাই অবাক।
মিস পোঁপোঁ বললেন, ‘আমি ভাবতাম মশকসাম্রাজ্যে পুরুষ মশারা নিতান্ত অকর্মণ্য ও অলস। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পুরুষের ক্ষমতায়নে আমি অত্যন্ত খুশি।’ রক্তশোষণ প্রক্রিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ দানের জন্য তিনি মিস ব্লাড গেইম, মিস ব্লাড সাকার ও মিস রেড চিলি—এই তিন নারী নেত্রীকে ধন্যবাদ দিলেন। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘মিশন এখনও ইনকমপ্লিট। তবে মিশন ইমপসিবল নয়।’
একটা প্রশ্ন সবার মনেই ঘুরছে—ড. বাশার কেন রিডিং রুমে আসছেন না? তিনি কি জাপানে যাবেন না? বাশার কি গবেষণা করে মশকবিরোধী নতুন কোনো ফন্দি আঁটছেন? মানুষ-বিশেষজ্ঞ ড. ক্যানিবাল সতর্ক করলেন, ‘মানুষের নীরবতা খুবই ভয়াবহ। যুদ্ধশাস্ত্রে শত্রুর নীরবতা ব্যাপকতর যুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করে।’
মশকবাহিনী ভাবল, বাশারকে যেভাবেই হোক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। পুরুষ মশাদের দিয়ে কাজ হবে না। নারী মশাদের পাঠাতে হবে। মিস্টার পয়জন মুচকি হাসলেন, ‘হানি ট্র্যাপ!’ বুলডোজারওয়ালার কথা মনে পড়ল। বেচারা যে কোথায় আছে, কে জানে। ড. বাশারের বাসায় ঢোকার পর থেকে বাইরের কোনো খবরই জানা যাচ্ছে না।
অভিযানের সর্বাধিনায়ক হিসেবে মিস্টার পয়জন রাতের পরিকল্পনা করলেন।
মিস্টার পয়জনসহ নারীনেত্রীরা ড. বাশারের বেডরুমে ঢুকলেন। বাশার তখন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে প্রলাপ বকছেন। পানি খাবেন বলে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ধপাস করে পড়ে গেলেন। শব্দ শুনে অন্য রুম থেকে বাসার বাকি লোকজন দৌড়ে এলো। আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে মশকবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করল।
চিৎকার করে উঠলেন জেনারেল মিস্টার পয়জন, ‘শত্রু খতম!’ তার দাবি, তিনি কামড় দেয়ার পরপরই নির্মূল হয়েছেন ড. বাশার। নারী নেত্রীরা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ পোষণ করলেও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কোনো প্রশ্ন তুললেন না। তারা এও ভাবলেন, মাস্টারমাইন্ড যে-ই হোক-না-কেন মিশন সাকসেসফুল হলেই হলো।
মশারা খেয়াল করল, ড. বাশারের বাসায় অভূতপূর্ব নীরবতা নেমে এসেছে। বাড়িতে কেউ নেই। কোথায় গেল সব? ঘটনার কোনো সুরাহা করা গেলো না। বিভিন্ন গুপ্তাঞ্চল থেকে মশারা বেরিয়ে এসে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে ঘুরে দেখল। কেউ নেই। আশ্চর্য নীরবতার ভেতর মশারা তাদের প্রাথমিক জয়ের গন্ধ পেল। সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো ড. বাশারকে খুঁজে লাভ নেই। শত্রু নিধন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। আপাতত মশকরাজ্যে ফেরা যাক। এবার আর তাদের কষ্ট করতে হলো না, পাইপ লাইন ধরে বের হতে হলো না। কে যেন জানালার কাচ ভেঙে রেখে গেছে; সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে মশারা মশকরাজ্যে প্রবেশ করল।
মনে হলো কয়েক যুগ তারা কাটিয়ে ফেলেছে। ঢুকে দেখল মশকরাজ্য অক্ষত আছে। বুলডোজারটায় প্রায় মরচে ধরে গেছে। রাজ্যের নাগরিকেরাও শান্ত। রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মিস্টার ধুলিয়া একবার ক্যু করার চিন্তা করেছিলেন। নানাজন উসকানোর চেষ্টাও করেছিল। পরে ভাবলেন মশক-সংবিধান লঙ্ঘন করে খামোখা ক্ষমতায় গিয়ে লাভ নেই—দুই দিনের দুনিয়া।
জাতীয় দুর্যোগে মিস্টার ধুলিয়ার নেতৃত্বে সবাই খুশি হলেন। মিস পোঁপোঁ আবারও মনে করিয়ে দিলেন, মশকজাতির উন্নয়নে পুরুষের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। বারবার করে বললেন, ‘A mosquito can be destroyed but not defeated.' লেফটেন্যান্ট জেনারেল পয়জনকে অপারেশন ড. ডেভিল হান্ট-এ নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ‘বীরচূড়ামণি’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। জেনারেল পয়জন তার ধন্যবাদ বক্তৃতায় বললেন, ‘এই বীরত্ব আমার একার নয়। মশকরাজ্যের সবাই এর অংশীদার। আমি মশকরাজ্যবাসীকে আমার উপাধি উৎসর্গ করছি। কবি বলেছেন, ‘‘জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে/সে জাতির নাম মশক-জাতি/মানুষ প্রাণীর রক্তে লালিত/একই রবি শশী মোদের সাথী।’’
ভাষণ দিতে দিতেই জেনারেল পয়জন মুচকি হাসি হাসলেন। সত্যি কথাটা তিনি জানেন। আর তা হলো, অরুণাপল্লী হাউজিঙের সিকিউরিটি সিস্টেম খুবই দুর্বল। হাউজিং সোসাইটির সভাপতি মেজর খায়রুল সাহেবের আইফোনটা আসলে চুরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয় বুলডোজারওয়ালার ডেঙ্গু হয়েছে। তারও চেয়ে বড় খবর হলো, ড. বাশার করোনায় আক্রান্ত—কোনো মশার কামড়ে তিনি অসুস্থ নন।
মশকরাজ্যে এই রোগের নাম এখনও ছড়ায়নি। চীনে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ড. বাশার তাই জাপানে যেতে পারেননি। মশা নিয়ে গবেষণায় আপাতত মুলতুবি। মানুষ এখন গবেষণা করছে করোনা নিয়ে। মহামারি ঘোষণা করায় অরুণাপল্লীর হাউজিং প্রকল্পের এক্সটেনশনের কাজ বন্ধ। অদূর ভবিষ্যতে সেই কাজ হবে কিনা সন্দেহ। সোসাইটির অধিকাংশ মানুষের দাবি হাউজিং প্রকল্পে একটা গোরস্তান করা হোক। মশকরাজ্য গোরস্তানে রূপান্তরিত হলেও মশাদের কোনো সমস্যা নেই। মশারা নির্বিঘ্নে সেখানে থাকতে পারবে। মানুষ-গবেষক ড. ক্যানিবাল বলেন, ‘পৃথিবীর সব গোরস্তানেই মশা থাকে।’
জেনারেল পয়জন এই কথাগুলো বলতে পারতেন। কিন্তু বলবেন না। কারণ মশকরাজ্যের আগামী নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন। তার আগে গোয়েন্দপ্রধানকে খতম করতে হবে। কারণ রহস্যময় সত্যটা তারও জানা। গুপ্ত সত্য যে জানে, সে-ই শত্রু।

আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ এলো ২০০৩ সালে। তখন আমার হাইস্কুল যাত্রা শেষের দিকে। কৈশোরের ওই সময়টার আগ পর্যন্ত আমাদের, মানে আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের ভাই-বোনদের ঈদ অভিজ্ঞতা খানিকটা অন্যরকম। স্মৃতি হাতড়ে যা মেলে, তা এ নিমিষেই গল্প করা সম্ভব। তবে সেই আবেগ হয়তো আরব্য রজনীর গল্পের চেয়েও টানটান।
১ ঘণ্টা আগে
১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, শনিবার। বর্ষপঞ্জির চিরায়ত নিয়মে অগ্রহায়ণের কুয়াশামাখা মেঘলা আকাশ আর ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে আকাশে উঠেছিল শাওয়ালের চাঁদ। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে দিনটি ছিল এক পবিত্র উৎসবের, কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বদ্বীপ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওই এক ফালি চাঁদ কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনেনি।
১ ঘণ্টা আগে
বিশ্বাস করবেন না কথাটা! কিন্তু সত্যিই কেউ আমাকে অলওয়েজ ফলো করে। বাজারের ব্যাগ নিয়ে যখন বের হই, সিঁড়ি দিয়ে নামছি তখন থেকে ফলো করা শুরু। থপথপ করে পিছনের দিকে আওয়াজ হয়। পিছনে হাজারবার তাকিয়েও কিছু দেখতে পারিনি; নাকি চোখের সমস্যা বুঝতে পারি না।
১৩ ঘণ্টা আগে
প্রকৃতিতে কী খেয়াল চলছে কে জানে। মাটি অনুর্বর, পানি-বাতাস দূষিত। গ্রীষ্মের দেশে হঠাৎ করেই তুষারপাতের মতো শহরে ‘সত্যযুগ’ নেমে এল যেন। চারপাশের সবকিছু আগের মতোই আছে, ভৌত-অবকাঠামোর কোনো বদল চোখে পড়ে না। শুধু সবাই যা বলছে, নীরবেই তা ফলে যাচ্ছে, নয়তো উল্টো শোনা যাচ্ছে।
১৪ ঘণ্টা আগে