পবিত্র আশুরা
নাঈমুল আলম মিশু

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশ বছরের পুরোনো ঢাকাকে বলা হয় ‘মসজিদের শহর’। এ শহরের স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হলো শিয়া মসজিদ এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। শুধু একটি উপাসনালয় হিসেবে নয়, ঢাকার বুকে শিয়া ঐতিহ্য এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও সামাজিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল এটি।
বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিয়া ইমামবাড়া ১৬০৮ সালে আমির খান দ্বারা নির্মিত ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিবি কা রওজা। ১৮৬১ সালে এটি সংস্কার করেন ফরাশগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তি আর এম দোশানজি।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ইব্রাহিম খান ফতেহ জঙ্গ নামে একজন শিয়া কর্মচারীকে ১৬১৭ সালে বাংলার সুবাহদারি দেওয়া হয় এবং তিনি তাঁর সঙ্গে অনেক শিয়া সহকর্মীকে ঢাকায় এনেছিলেন। মোগল বাংলার সুন্নি সুবাহদার শাহ সুজার মা, দুই স্ত্রী ও শিক্ষক সবাই ছিলেন শিয়া। শাহ সুজার দরবারিদের মধ্যে অনেকেই শিয়া ছিলেন। এ জন্য ঢাকায় একটি কথা প্রচলিত হয়ে যায়, শাহ সুজা তাঁর সঙ্গে ৩০০ জন শিয়াকে নিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করিয়েছিলেন। যদিও শাহ সুজার বিরোধীরা দিল্লিতে গুজব ছড়াতে শুরু করে, শাহ সুজা শিয়া ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।
১৬৪২ সালে শাহ সুজার শাসনকালে ঢাকার মোগল নৌপ্রধান সৈয়দ মীর মুরাদ হোসেনি দালান নির্মাণ করেন। প্রাথমিকভাবে এর নাম ছিল ‘দালানে মোকাদ্দাসে হোসাইনি’; অর্থাৎ ‘পবিত্র হোসাইনি দালান’। এটিই মূলত ঢাকায় শিয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মোগল বাংলার পরবর্তী দুজন সুবাহদার মীর জুমলা ও শায়েস্তা খাঁও শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন।
নাজাফের মীর সাইয়িদ শাকরুল্লাহ আল-হুসাইনি ছিলেন শাহ সুজা কর্তৃক আনীত শিয়া সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের একজন এবং তিনি নবাব সাইয়িদ ছোটন সাহেবের পূর্বপুরুষ ছিলেন, যাঁর ঢাকার আবুল হাসনাত রোডে বিশাল ভূসম্পত্তি ছিল। সেখানে মোহাম্মদী বেগম ইমামবাড়া রয়েছে, যেটি ১৭০৭ সালে নির্মিত হয়েছিল।
১৭১৭ সাল থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত, তিনটি ধারাবাহিক নবাবি বংশ—নাসিরি, আফশার ও নাজাফি—বাংলায় শাসন করেছিল এবং সকলেই শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিল।
বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ মূলত দাক্ষিণাত্যের একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার পর ইস্পাহানের পারসিক ব্যবসায়ী হাজি শফি তাঁকে শিয়া ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। পরে তিনি তাঁর পথ ধরে কাজ করে যান এবং অবশেষে তিনি বাংলার প্রথম নবাব হন এবং নাসিরি নবাবি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) থেকে বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

দ্বিতীয় নবাবি বংশ (আশফার বংশ) ১৭৪০ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িশ্যা শাসন করেছিল এবং শিয়া বংশোদ্ভূত আলীবর্দী খান দ্বারা এ বংশটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আশফার নবাবি বংশের শেষ ও বাংলার নবাবদের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের হাতে নিহত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শিয়া বংশোদ্ভূত সেনাপতি মীর জাফর, যিনি বাংলার তৃতীয় নবাবি বংশ নাজাফি প্রতিষ্ঠা করেন।
মীর আশরাফ আলি (মৃত্যু ১৮২৯) শিরাজের একজন ধার্মিক শিয়া ছিলেন। তিনি ১৮ শতকে ঢাকায় চলে আসেন, যেখানে তিনি ঢাকার নায়েব-নাজিমদের কাছে একজন জমিদার ও দরবারি হিসেবে বিশিষ্টতা অর্জন করেন। ঢাকা, কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সম্পত্তি, অধীনস্থ কৃষক ও ঢাকা শহরে অসংখ্য দাতব্য কার্যক্রম মীর আশরাফ আলিকে তাঁর সময়ে পূর্ব বাংলার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি করে তোলে। ঢাকার হোসাইনি দালান রোডে ১৮৯১ সালে মীর ইয়াকুব ইমামবাড়া নির্মিত হয়। এটি ২০০৪ সালে শিয়া আঞ্জুমান-ই-হুসাইনি সংস্কার করে।
ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের আগমন এবং তাঁদের ঐতিহ্যের বিকাশ মূলত মোগল আমলের সাথে জড়িত। বিশেষ করে সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল সুবাহদার শাহ সুজার শাসনামলে (১৬৩৯–১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকায় শিয়া সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শাহ সুজার মা মমতাজ মহল এবং তাঁর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।
ঢাকায় মূলত নিজারি ইসমাইলি সম্প্রদায়দের শিয়াদের পাওয়া যায়। ঢাকাজুড়ে আদাবর, পল্টন, মোহাম্মদপুর, জেনেভা ক্যাম্প, বংশাল, মিরপুর, কারবালার মাঠ, ফরাশগঞ্জ ও আজিমপুরের মতো জায়গায় বেশ কিছু ইমামবাড়া ও শিয়া মসজিদ রয়েছে। পুরান ঢাকার হোসাইনি দালান যদি হয় শিয়া ঐতিহ্যের আদি কেন্দ্র, তবে আধুনিক ঢাকার বুকে মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ হলো এই সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড ও রিং রোডের সংযোগস্থলে শিয়া জামে মসজিদটি অবস্থিত। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত জায়গায় শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের যৌথ উদ্যোগে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত। মাওলানা সৈয়দ গুলশান আলী কিবলা এবং সৈয়দ এজাজ হুসাইনী জাফরী ১৯৭০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হুসাইনী ট্রাস্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
মসজিদটি কয়েক বছর পরে ১৯৭৬ সালে স্থাপিত হয়েছে। প্রায় গোলাকৃতির মসজিদটির আয়তন মোট ১৬০০ বর্গফুট। মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি ইমামবাড়া রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির স্থাপত্যে আধুনিকতার পাশাপাশি পারস্য ও মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ দেখা যায়। এর গম্বুজ ও মিনারগুলো বেশ দৃষ্টিনন্দন, যা দূর থেকেই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর নামানুসারেই পুরো এলাকাটি ‘শিয়া মসজিদ মোড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের পশ্চিম দিকে আছে আব্বাসিয়া মাদ্রাসা নামে শিয়াদের একটি প্রতিষ্ঠান। এ মসজিদটি পুনর্নির্মাণ এবং সযত্ন পরিচর্যা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে খুবই আকর্ষণীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। আদি মসজিদ ভবনের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই ধ্বংস হয়ে গেছে; নবনির্মিত মসজিদটি এর উজ্জ্বল গাঢ় রং ও আধুনিক অবয়ব দৃষ্টি-আকর্ষণ করে থাকে।
ঢাকার শিয়া ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে সবচেয়ে প্রথমে আসে পবিত্র মহররম মাসের শোকাবহ অনুষ্ঠানমালার কথা। কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদতের স্মৃতি স্মরণে প্রতিবছর এখানে ব্যাপক কর্মসূচি পালিত হয়। মহররমের ১০ তারিখে (আশুরা) হোসাইনি দালান থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ-সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ‘তাজিয়া’ মিছিল বের করা হয়।
এ সময়ে শিয়া মসজিদ ও ইমামবারাগুলোতে বিশেষ ধরনের খিচুড়ি, হালুয়া ও শরবত (যা ‘তবারক’ নামে পরিচিত) তৈরি করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়, যা ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা সুন্নি মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম হলেও, ঢাকার সংস্কৃতিতে তাঁদের প্রভাব অনস্বীকার্য। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার (যেমন: বাকরখানি, বিভিন্ন ধরনের বিরিয়ানি ও হালুয়া) এবং উৎসব উদযাপনের ধরনে পারস্য ও শিয়া সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে।
ঢাকায় শিয়া মসজিদ বা ইমামবাড়াগুলোর অনুষ্ঠানাদিতে কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষই অংশ নেন না, বরং বহু সুন্নি মুসলিম ও অন্য ধর্মের মানুষও এতে শামিল হন। এটি ঢাকার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহনশীলতা ও সম্প্রীতির প্রতীক।

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশ বছরের পুরোনো ঢাকাকে বলা হয় ‘মসজিদের শহর’। এ শহরের স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হলো শিয়া মসজিদ এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। শুধু একটি উপাসনালয় হিসেবে নয়, ঢাকার বুকে শিয়া ঐতিহ্য এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও সামাজিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল এটি।
বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিয়া ইমামবাড়া ১৬০৮ সালে আমির খান দ্বারা নির্মিত ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিবি কা রওজা। ১৮৬১ সালে এটি সংস্কার করেন ফরাশগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তি আর এম দোশানজি।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ইব্রাহিম খান ফতেহ জঙ্গ নামে একজন শিয়া কর্মচারীকে ১৬১৭ সালে বাংলার সুবাহদারি দেওয়া হয় এবং তিনি তাঁর সঙ্গে অনেক শিয়া সহকর্মীকে ঢাকায় এনেছিলেন। মোগল বাংলার সুন্নি সুবাহদার শাহ সুজার মা, দুই স্ত্রী ও শিক্ষক সবাই ছিলেন শিয়া। শাহ সুজার দরবারিদের মধ্যে অনেকেই শিয়া ছিলেন। এ জন্য ঢাকায় একটি কথা প্রচলিত হয়ে যায়, শাহ সুজা তাঁর সঙ্গে ৩০০ জন শিয়াকে নিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করিয়েছিলেন। যদিও শাহ সুজার বিরোধীরা দিল্লিতে গুজব ছড়াতে শুরু করে, শাহ সুজা শিয়া ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।
১৬৪২ সালে শাহ সুজার শাসনকালে ঢাকার মোগল নৌপ্রধান সৈয়দ মীর মুরাদ হোসেনি দালান নির্মাণ করেন। প্রাথমিকভাবে এর নাম ছিল ‘দালানে মোকাদ্দাসে হোসাইনি’; অর্থাৎ ‘পবিত্র হোসাইনি দালান’। এটিই মূলত ঢাকায় শিয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মোগল বাংলার পরবর্তী দুজন সুবাহদার মীর জুমলা ও শায়েস্তা খাঁও শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন।
নাজাফের মীর সাইয়িদ শাকরুল্লাহ আল-হুসাইনি ছিলেন শাহ সুজা কর্তৃক আনীত শিয়া সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের একজন এবং তিনি নবাব সাইয়িদ ছোটন সাহেবের পূর্বপুরুষ ছিলেন, যাঁর ঢাকার আবুল হাসনাত রোডে বিশাল ভূসম্পত্তি ছিল। সেখানে মোহাম্মদী বেগম ইমামবাড়া রয়েছে, যেটি ১৭০৭ সালে নির্মিত হয়েছিল।
১৭১৭ সাল থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত, তিনটি ধারাবাহিক নবাবি বংশ—নাসিরি, আফশার ও নাজাফি—বাংলায় শাসন করেছিল এবং সকলেই শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিল।
বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ মূলত দাক্ষিণাত্যের একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার পর ইস্পাহানের পারসিক ব্যবসায়ী হাজি শফি তাঁকে শিয়া ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। পরে তিনি তাঁর পথ ধরে কাজ করে যান এবং অবশেষে তিনি বাংলার প্রথম নবাব হন এবং নাসিরি নবাবি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) থেকে বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

দ্বিতীয় নবাবি বংশ (আশফার বংশ) ১৭৪০ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িশ্যা শাসন করেছিল এবং শিয়া বংশোদ্ভূত আলীবর্দী খান দ্বারা এ বংশটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আশফার নবাবি বংশের শেষ ও বাংলার নবাবদের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের হাতে নিহত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শিয়া বংশোদ্ভূত সেনাপতি মীর জাফর, যিনি বাংলার তৃতীয় নবাবি বংশ নাজাফি প্রতিষ্ঠা করেন।
মীর আশরাফ আলি (মৃত্যু ১৮২৯) শিরাজের একজন ধার্মিক শিয়া ছিলেন। তিনি ১৮ শতকে ঢাকায় চলে আসেন, যেখানে তিনি ঢাকার নায়েব-নাজিমদের কাছে একজন জমিদার ও দরবারি হিসেবে বিশিষ্টতা অর্জন করেন। ঢাকা, কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সম্পত্তি, অধীনস্থ কৃষক ও ঢাকা শহরে অসংখ্য দাতব্য কার্যক্রম মীর আশরাফ আলিকে তাঁর সময়ে পূর্ব বাংলার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি করে তোলে। ঢাকার হোসাইনি দালান রোডে ১৮৯১ সালে মীর ইয়াকুব ইমামবাড়া নির্মিত হয়। এটি ২০০৪ সালে শিয়া আঞ্জুমান-ই-হুসাইনি সংস্কার করে।
ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের আগমন এবং তাঁদের ঐতিহ্যের বিকাশ মূলত মোগল আমলের সাথে জড়িত। বিশেষ করে সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল সুবাহদার শাহ সুজার শাসনামলে (১৬৩৯–১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকায় শিয়া সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শাহ সুজার মা মমতাজ মহল এবং তাঁর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।
ঢাকায় মূলত নিজারি ইসমাইলি সম্প্রদায়দের শিয়াদের পাওয়া যায়। ঢাকাজুড়ে আদাবর, পল্টন, মোহাম্মদপুর, জেনেভা ক্যাম্প, বংশাল, মিরপুর, কারবালার মাঠ, ফরাশগঞ্জ ও আজিমপুরের মতো জায়গায় বেশ কিছু ইমামবাড়া ও শিয়া মসজিদ রয়েছে। পুরান ঢাকার হোসাইনি দালান যদি হয় শিয়া ঐতিহ্যের আদি কেন্দ্র, তবে আধুনিক ঢাকার বুকে মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ হলো এই সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড ও রিং রোডের সংযোগস্থলে শিয়া জামে মসজিদটি অবস্থিত। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত জায়গায় শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের যৌথ উদ্যোগে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত। মাওলানা সৈয়দ গুলশান আলী কিবলা এবং সৈয়দ এজাজ হুসাইনী জাফরী ১৯৭০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হুসাইনী ট্রাস্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
মসজিদটি কয়েক বছর পরে ১৯৭৬ সালে স্থাপিত হয়েছে। প্রায় গোলাকৃতির মসজিদটির আয়তন মোট ১৬০০ বর্গফুট। মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি ইমামবাড়া রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির স্থাপত্যে আধুনিকতার পাশাপাশি পারস্য ও মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ দেখা যায়। এর গম্বুজ ও মিনারগুলো বেশ দৃষ্টিনন্দন, যা দূর থেকেই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর নামানুসারেই পুরো এলাকাটি ‘শিয়া মসজিদ মোড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের পশ্চিম দিকে আছে আব্বাসিয়া মাদ্রাসা নামে শিয়াদের একটি প্রতিষ্ঠান। এ মসজিদটি পুনর্নির্মাণ এবং সযত্ন পরিচর্যা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে খুবই আকর্ষণীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। আদি মসজিদ ভবনের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই ধ্বংস হয়ে গেছে; নবনির্মিত মসজিদটি এর উজ্জ্বল গাঢ় রং ও আধুনিক অবয়ব দৃষ্টি-আকর্ষণ করে থাকে।
ঢাকার শিয়া ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে সবচেয়ে প্রথমে আসে পবিত্র মহররম মাসের শোকাবহ অনুষ্ঠানমালার কথা। কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদতের স্মৃতি স্মরণে প্রতিবছর এখানে ব্যাপক কর্মসূচি পালিত হয়। মহররমের ১০ তারিখে (আশুরা) হোসাইনি দালান থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ-সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ‘তাজিয়া’ মিছিল বের করা হয়।
এ সময়ে শিয়া মসজিদ ও ইমামবারাগুলোতে বিশেষ ধরনের খিচুড়ি, হালুয়া ও শরবত (যা ‘তবারক’ নামে পরিচিত) তৈরি করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়, যা ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা সুন্নি মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম হলেও, ঢাকার সংস্কৃতিতে তাঁদের প্রভাব অনস্বীকার্য। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার (যেমন: বাকরখানি, বিভিন্ন ধরনের বিরিয়ানি ও হালুয়া) এবং উৎসব উদযাপনের ধরনে পারস্য ও শিয়া সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে।
ঢাকায় শিয়া মসজিদ বা ইমামবাড়াগুলোর অনুষ্ঠানাদিতে কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষই অংশ নেন না, বরং বহু সুন্নি মুসলিম ও অন্য ধর্মের মানুষও এতে শামিল হন। এটি ঢাকার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহনশীলতা ও সম্প্রীতির প্রতীক।
.png)

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
১ ঘণ্টা আগে
পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবারা থেকে বের হয়েছেন শত শত মানুষ। তাদের গায়ে কালো পোশাক। মুখে ধ্বণি—ইয়া হোসেন… ইয়া হোসেন। কাঁধে কারবালার প্রতীকী সমাধি। তারা হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে।
২ ঘণ্টা আগে
ইসলাম ধর্মে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখ বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা পালন করেন—আশুরা। বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের কাছে এটি খুবই তাতপর্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর একটি দিন। তবে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি সব দেশে একইভাবে পালিত হয় না। অঞ্চল, ইতিহাস, এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আশুরা এ
২ ঘণ্টা আগে
আশুরা এলেই পুরান ঢাকার হোসেনি দালান আবারও প্রাণ ফিরে পায়। কালো পোশাকে শোকযাত্রা, ‘ইয়া হোসেন’ ধ্বনি, তাজিয়া মিছিল—সব মিলিয়ে এটি শুধু শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় আচার নয়, বরং ঢাকার শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। অনেকেই ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে এটিকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শোকের এক সম্মিল
৩ ঘণ্টা আগে