সবাই যা কিনছে, আপনিও কি তাই খুঁজছেন? কেন আমরা ট্রেন্ডের পেছনে ছুটি

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, সব দোকানে সমান ভিড় থাকে না। কিছু নির্দিষ্ট দোকানে মানুষের ভিড় সবচেয়ে বেশি। তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, কেন অনেক মানুষ একই ধরনের পোশাক বা একই দোকানের দিকে ছুটে যায়?

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৩৭
কেন আমরা ট্রেন্ডের পেছনে ছুটি। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঈদ যত এগিয়ে আসে, দোকানগুলোতে তত বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। গাউছিয়া, নিউমার্কেট থেকে শুরু করে বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্ক—সব জায়গাতেই দেখা যায় একই দৃশ্য। নতুন জামা কেনার জন্য মানুষ ভিড় করছে। তীব্র যানজট, ভ্যাপসা গরম আর উপচে পড়া ভিড় ঠেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মানুষ কেনাকাটা করছে।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, সব দোকানে সমান ভিড় থাকে না। কিছু নির্দিষ্ট দোকানে মানুষের ভিড় সবচেয়ে বেশি। তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, কেন অনেক মানুষ একই ধরনের পোশাক বা একই দোকানের দিকে ছুটে যায়? কয়েক বছর আগে যেমন ‘পাখি’ বা ‘কিরণমালা’ নামের জামা ঈদের বাজারে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, অনেক মানুষ দল বেঁধে সেই ডিজাইনের পোশাক কিনছেন।

স্রোতে গা ভাসানো বা ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, অন্যের দেখাদেখি কোনোকিছু করার প্রবণতাকে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বা স্রোতে গা ভাসানো। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। আদিমকাল থেকেই মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করে আসছে। তাই যখন আমরা দেখি আমাদের চারপাশের মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ করছে, তখন আমাদের অনেকের অবচেতন মন সংকেত দেয়, এটাই হয়তো সঠিক।

ঈদের আগে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে ‘লিমিটেড এডিশন’ বা ‘এক্সক্লুসিভ কালেকশন’ বা ‘ঈদ কালেকশন’ ট্যাগ লাগানো পোশাকগুলো সবার আগে বিক্রি হয়ে যায়। কারণ এই ট্যাগগুলো ক্রেতার মনে তাড়াতাড়ি কেনার আকাঙ্খা তৈরি করে।

ঈদে নতুন জামা-কাপড় কেনার পেছনেও এই একই কারণ। যখন দেখি প্রতিবেশী হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ফিরছেন, অফিসের সহকর্মীরা দুপুরের বিরতিতে অনলাইনে জামা খুঁজছেন বা বন্ধুদের আড্ডায় ঈদের কেনাকাটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন আমাদের মস্তিষ্কও সেই দলে যোগ দেওয়ার জন্য তাড়না দেয়। বরং সমাজের বৃহত্তর একটি অংশের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার তাগিদ থেকেই আমরা এই ভিড়ে শামিল হই।

পিছিয়ে পড়ার ভয় বা ‘ফোমো’

বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কাজ করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা সংক্ষেপে ‘ফোমো’। এর মানে হলো অন্যদের আনন্দ বা অভিজ্ঞতা থেকে নিজে বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়।

ঈদের দিন সকালে সবাই নতুন পাঞ্জাবি বা শাড়ি পরে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোড করবে, পাড়াপড়শিরা একে অন্যের পোশাকের প্রশংসা করবে। এই পুরো আনন্দযজ্ঞ থেকে আমি বা আমার সন্তান কি বাদ পড়ে যাবে? এই চাপ থেকে মুক্তি পেতেই আমরা শপিং মলের দিকে ছুটি। জনপ্রিয় ড্রেসগুলো কিনতে চাই।

এ ছাড়া ‘সোশ্যাল প্রুফ’ বা সামাজিক স্বীকৃতি হলো মানুষের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। কারণ মানুষ অন্যের আচরণের ওপর ভিত্তি করে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ঈদের বাজারে কোনো একটি নির্দিষ্ট দোকানে বা ব্র্যান্ডের শোরুমে যখন আমরা উপচে পড়া ভিড় দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেয় যে সেই দোকানের পোশাকের কালেকশন নিশ্চয়ই সবচেয়ে ভালো। ভিড় দেখে আকৃষ্ট হয়ে আমরাও সেই দোকানে ঢুকে পড়ি।

‘স্ক্যারসিটি প্রিন্সিপল’

ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ভালো ডিজাইনের বা ট্রেন্ডি পোশাকগুলো শেষ হয়ে যাবে—এই আশংকাটি ক্রেতাদের মনে প্রবলভাবে কাজ করে।

মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘স্ক্যারসিটি প্রিন্সিপল’ বা দুষ্প্রাপ্যতার নীতি। মানুষের স্বভাব হলো, যে জিনিস সহজে পাওয়া যায় না বা দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেটার প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করা।

‘আউট অফ স্টক’ হয়ে যাওয়ার ভয়

বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ড মানবমনের এই দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করছে। তারা ক্রেতাদের মনে ‘আউট অফ স্টক’ হয়ে যাওয়ার ভয়কে উসকে দিতে নানা প্রচারণা চালায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফেসবুক লাইভ শপিং বা বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর দিকে তাকালেই এর চমৎকার উদাহরণ দেখা যায়।

ঈদের আগে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে ‘লিমিটেড এডিশন’ বা ‘এক্সক্লুসিভ কালেকশন’ বা ‘ঈদ কালেকশন’ ট্যাগ লাগানো পোশাকগুলো সবার আগে বিক্রি হয়ে যায়। কারণ এই ট্যাগগুলো ক্রেতার মনে তাড়াতাড়ি কেনার আকাঙ্খা তৈরি করে।

অন্যদিকে, ফেসবুকের অনলাইন পেজগুলোর লাইভ ভিডিওতে যখন বলা হয়, ‘আপুরা, এই চমৎকার ডিজাইনের ড্রেসটা কিন্তু আর মাত্র দুই পিস আছে, যে আগে ইনবক্স করবে সে-ই পাবে!’ তখন ক্রেতার মনে তাৎক্ষণিক প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। দরকার না থাকলেও শুধু ‘অন্য কেউ কিনে নেওয়ার আগে আমাকেই জিততে হবে’—এই তাড়না থেকে মানুষ অনেকসময় দ্রুত অর্ডার করে ফেলে।

এ ছাড়া জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার বা তারকাদের দিয়ে ঈদের পোশাক পরিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করানোটাও ‘সোশ্যাল প্রুফ’-এর একটি মার্কেটিং কৌশল। জনপ্রিয় তারকা এই পোশাকটি পরেছেন বা অমুক আপু এই ড্রেসটির রিভিউ দিয়েছেন—এটা দেখেই সাধারণ ক্রেতারা ওই নির্দিষ্ট পোশাকের প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, ‘অন্যরা কিনছে বলে নিজেকেও কিনতে হবে’ এই চিন্তা আমাদের প্রভাবিত করলেও, নতুন পোশাক পরে পরিবারের সবাই মিলে ঈদ উদযাপনের যে আনন্দ, তা থেকেও আমরা বঞ্চিত হতে চাই না। তাই স্রোতে গা না ভাসিয়ে, নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু কেনাকাটা করে ঈদকে করে তুলুন আরও আনন্দময়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত