নেপালের বন্যায় মা-বাবা হারানো শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
স্ট্রিম ডেস্ক

‘দ্রুত ওপরে ওঠো। শুধু উঠবে, পেছনে তাকিয়ো না।’
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে ৯ বছরের রাম ঠাকুরকে এভাবেই বলছিলেন মা। পেছনে তখন ধেয়ে আসছে বন্যার কাদা-পাথরের পানি। চারপাশে মানুষের চিৎকার। তখনো হাত ধরে দ্রুত ওপরে উঠতে ছেলেকে সাহায্য করছিলেন রাম ঠাকুরের মা।
হুড়োহুড়িতে একপর্যায়ে মায়ের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাম। তবে মায়ের কথা মনে রেখে প্রাণপণে ওপরে উঠছিল রাম। আরও ওপরে উঠে একপর্যায়ে পেছনে তাকায় সে। বন্যার পানি তখনো কাছাকাছিই গর্জন করছিল। কিন্তু সেখানে তার মা আর ছিলেন না।
২৬ আগস্টের সেই ঘটনার পর প্রায় চার সপ্তাহ কেটে গেছে। রাম এখন নেপালের নুয়াকোট জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে। একই আশ্রয়কেন্দ্রের আরও ২৬ শিশুর মতো প্রতিদিন সে-ও অপেক্ষা করে- হয়তো মা-বাবা ফিরে আসবেন।
রামের মতো আরও পাঁচ শতাধিক শিশু এখন নেপালের বন্যাকবলিত বিভিন্ন জেলার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আছে। তাদের মা-বাবা মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ। কেউ খুঁজে পাওয়া কোনো স্বজনের সঙ্গে আছে, কেউ একেবারেই একা।

আইনগতভাবে এদের সবাইকে এখনো এতিম বলা যাচ্ছে না। নেপালের আইনে সাধারণত ১২ বছর নিখোঁজ থাকার পর কাউকে মৃত ঘোষণা করা যায়। তবে দুর্যোগের ক্ষেত্রে এ আইনে ছাড় দেওয়ার সুযোগ আছে। সে জন্য স্বজনদের জেলা আদালতে আবেদন করে বিচারিকভাবে মৃত্যুর ঘোষণা নিতে হয়।
এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এখন পড়ে আছে বহু শিশুর জীবন। মা-বাবা কোথায়, তাঁরা আদৌ বেঁচে আছেন কি না- নুন্যতম সেটুকুও জানতে না পেরে তাদের দিন কাটছে আশ্রয়কেন্দ্রে।
গত আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছেন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫ হাজার।
বন্যার দিন থেকে অপেক্ষা
২৬ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছিল রাম। তার বাবা তখনও বাড়িতেই ছিলেন। সকাল ১০টায় কাজে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। পর্যটকদের গাইড ও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
হঠাৎ চারপাশ থেকে চিৎকার ভেসে আসে, ‘দৌড়াও, বন্যা!’
এরপর নিরাপদ জায়গার খোঁজে ওপরে উঠতে থাকেন মা-ছেলে। হাঁটা থেকে একপর্যায়ে দৌড়াতে হয় তাঁদের। আরও ১৩ জনের সঙ্গে প্রায় এক দিন পাহাড়ের ওপর আটকে ছিল সে। পরে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার তাঁদের উদ্ধার করে।
এখন আশ্রয়কেন্দ্রে আরও ২৬ শিশুর সঙ্গে থাকে সে। সেদিন দুপুরে শিশুদের সঙ্গে শাক ও ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছিল রাম। পছন্দের খাবার পাওয়ার চেয়ে তার কাছে এখন বড় বিষয় মা-বাবার কোনো খবর না পাওয়া। খেতে খেতেই রাম বলছিল, ‘মা আর বাবা দুজনেই সাঁতার জানতেন। তাই এত দিনে তো তাঁদের ফিরে আসার কথা।’
আশ্রয়কেন্দ্রের একজন পরামর্শক জানান, কাছাকাছি কোথাও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনলেই রাম বাইরে ছুটে যায়। প্রতিবারই সে মনে করে, এবার হয়তো তাঁর মা-বাবাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে।
এই অপেক্ষা শুধু রামের একার নয়। বন্যার পর বহু শিশুর জীবন এখন আটকে আছে একই প্রশ্নে- মা-বাবা কোথায়?
পরিবারের অপেক্ষায় হাজারো শিশু
নেপালের ন্যাশনাল চাইল্ড রাইটস কাউন্সিল ও সেভ দ্য চিলড্রেনের চলতি মাসের এক মূল্যায়নে এই সংকটের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন এক হাজারের বেশি শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক শিশুর সঙ্গে কোনো স্বজন নেই। এছাড়া ৪৩৯ শিশু মা-বাবাকে ছাড়া অন্য স্বজনদের সঙ্গে থাকছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন নেপালের প্রোগ্রাম পরিচালক আয়ুশ যোশি আলজাজিরাকে বলেন, বন্যার পর অনেক শিশুকেই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে।
ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা লিওন মুওনি জানান, বন্যায় ৩২ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত ১৮ শিশুকে তাদের মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

তবে এখনো যেসব শিশুর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি সমস্যা- বন্যার পরের মানসিক ধাক্কা।
এর স্পষ্ট উদাহরণ ধাদিং জেলার একটি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা চার বছরের শিবানি তামা। শিশুটির মা-বাবা দুজনেরই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু মেয়েটি এখন আর কারও সঙ্গে কথা বলে না। যে এলাকায় তাঁরা থাকত, সেটিও তার ভালোভাবে মনে নেই। এখন পর্যন্ত তাকে নিতে আসেননি কোনো স্বজনও।
উদ্ধারকারী দল ও পরামর্শকদের সে শুধু জানিয়েছে, বন্যার সময় সে স্কুলে ছিল। শিক্ষকরা তখন অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাকে দ্রুত পাহাড়ের দিকে যেতে বলেন।
শিবানির বিষয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মী ইয়ামুনা ভট্টরাই আলজাজিরাকে বলেন, ‘সে কারও সঙ্গে কথা বলে না। চুল আঁচড়াতে দেয় না। পোশাকও বদলাতে চায় না। অনেক সময় একটানা দুই-তিন দিন একই পোশাক পরে থাকে।’
ভট্টরাইয়ের চোখে শিবানির এই নীরবতা শুধু একটি শিশুর আচরণ নয়। বন্যার পর এমন অনেক শিশুকেই তিনি দেখেছেন, যারা প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তাঁদের জন্য মানসিক সহায়তা জরুরি বলে মনে করেন এই সহায়তাকর্মী।
বয়সের চেয়ে বড় যখন দায়িত্ব
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রসুয়া। জেলাটির ১০ বছর বয়সী সানজু লামা তার দুই বছর বয়সী ভাইকে নিয়ে দাদির বাড়িতে যাচ্ছিল। পথে অপরিচিত কয়েকজন মানুষ তাদের টেনে নিয়ে বন্যার পানি থেকে রক্ষা করেন।
ততক্ষণে পানিতে তলিয়ে গেছে তাদের বাড়ি। সে সময় বাড়িতে থাকার কথা থাকলেও সানজুর মা-বাবা এখনো নিখোঁজ।
সানজু এখন সারাক্ষণ শক্ত করে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে রাখে। জোরে কোনো শব্দ হলেই চমকে ওঠে। নাম ধরে ডাকলেও ভয় পায়। রাতে ঘুমের মধ্যেও ভয় পেয়ে জেগে ওঠে।
তারপরও ছোটভাইকে আগলে রেখে নিজেকে ব্যস্ত রাখে সানজু। দিনের বড় একটা সময় তাকে ইংরেজি কবিতা পড়ে শোনায়। ভট্টরাই বলেন, ‘এখন তারা দুজনই দুজনের।’
বন্যায় মা-বাবা হারানো অনেক শিশুর জন্য এখন এটাই বাস্তবতা। নিজের যত্ন নেওয়ার মতো কাজও তারা আগে কখনো করেনি। এদের প্রায় কেউই জানে না কীভাবে গোসল করতে হয়, পোশাক বদলাতে হয় বা নিজের হাতে খাবার খেতে হয়। আবার কেউ বাধ্য হচ্ছে নিজের বয়সের চেয়ে বেশি দায়িত্ব নিয়ে ছোট ভাই-বোনের দেখাশোনা করতে।
নিরাপদ আশ্রয়েও অনিশ্চয়তা
শিশুদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো খেলনা, বই ও পড়াশোনার সামগ্রী দিয়েছে। কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্য খেলার জায়গাও তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু অনেক শিশুর কাছে এসব এখনো আনন্দের বিষয় হয়ে ওঠেনি। তারা চুপচাপ থাকে, অন্যমনস্ক হয়ে যায়। অনেকেই এসব খেলনা হাতেও নেয় না।
সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তা আয়ুশ যোশি বলেন, কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকেরা এমন শিশুদের দেখেছেন, যাদের মা-বাবা নিখোঁজ। কিন্তু তাদেরকে খেলার জন্য দেওয়া পুতুলের ঘরে মা-বাবাসহ একটি পরিবার সাজাচ্ছে।
যোশির ভাষায়, এসব শিশু হয়তো ঠিক বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে বা কেন ঘটেছে। আগামীকাল কী হবে, এমনকি ভবিষ্যৎ কী—সেটিও তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গার সংকটও আছে। অনেক শিশুকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। আবার বন্যার পর শিশু পাচার ও শিশুশ্রমের ঝুঁকি থাকায় স্বজন পরিচয়ে কেউ এলেই শিশুকে তার হাতে তুলে দেওয়া যাচ্ছে না।
বন্যায় শুধু আশ্রয় নয় থেমে গেছে শিশুদের পড়াশোনাও। ইউনিসেফের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৮টি স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। আরও ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তীরবর্তী আরও বহু স্কুল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশুর শিক্ষাজীবন।
আর তাই বন্যার পানি নেমে গেলেই এই শিশুদের সংকট শেষ হচ্ছে না। কারও সামনে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের অপেক্ষা, কারও সামনে মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার কঠিন সময়। আবার অনেকের স্কুলে ফেরার পথ এখনও অনিশ্চিত।
নুয়াকোটের আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যা নামে। দিন শেষে শিশুরা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর চলে যায়। তবে, রাম ঠাকুর কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে থাকে। কাছাকাছি কোথাও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে কান পেতে থাকে সে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে তার একই অপেক্ষা। সে বিশ্বাস করে, কোনো একদিন মা-বাবা ফিরে আসবেন।
সেদিনের মতো আজও পেছনে তাকিয়ে থাকে রাম—তবে এবার বন্যার পানির উচ্চতা দেখতে নয়, এখন তাঁর চোখে শুধুই মা-বাবাকে দেখার অনন্ত অপেক্ষা।
.png)






