জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

আলী লারিজানির বিদায়ে কোন পথে ইরান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

আলী লারিজানি ছিলেন একাধারে রাজনীতিক, নিরাপত্তা প্রধান ও দার্শনিক। তাঁকে বলা হতো ইরানের রেনেসাঁ মানব বা নবজাগরণের মানুষ। ইসরায়েলের হামলায় নিহত এই ইরানি নেতার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি ছিলেন ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোর বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিদের একজন। সামরিক, আইন প্রণয়ন এবং সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর কয়েক দশকের গভীর অভিজ্ঞতা ছিল।

চারবার লারিজানির সাক্ষাৎকার নেওয়া মার্কিন সাংবাদিক ও স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিনের মতে, লারিজানির বিচরণ ছিল সব জায়গায়। লারিজানির শেকড় ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসিতে। একই সঙ্গে তিনি কিছুদিন জাতীয় টেলিভিশনের প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন।

ক্ষমতার করিডোরে এক দীর্ঘ যাত্রা

ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে লারিজানি অনেক প্রভাবশালী পদে ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কেন্দ্র আইআরআইবি-র প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর তিনি ছিলেন ইরানের সংসদের স্পিকার। এছাড়া ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত লারিজানি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ছিলেন। গত বছরের আগস্ট মাসে তাঁকে আবার এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ইরাকে জন্ম নেওয়া লারিজানি আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের একজন আইআরজিসি ভেটেরান বা অভিজ্ঞ যোদ্ধা ছিলেন। সেই যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

লারিজানি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে তিনি পশ্চিমা দর্শন নিয়ে পিএইচডি করেন। তিনি অন্তত ছয়টি দর্শনের বই লিখেছেন। ইমানুয়েল কান্টের বিজ্ঞান ও গণিতবিষয়ক চিন্তাধারার ওপর তিনি একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

পারিবারিক শেকড় ও ক্ষমতার সমীকরণ

ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো হয়তো তাঁর নিয়তিতেই লেখা ছিল। বারবারা স্লাভিনের মতে, লারিজানি অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম পরিবার থেকে এসেছিলেন। তাঁর এক ভাই সাদেক লারিজানি কিছুদিন বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন। আলী খামেনির পর তাঁকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নেতা হিসেবেও ভাবা হচ্ছিল। তাঁর অন্যান্য ভাইদেরও সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল। স্লাভিনের ভাষায়, ওই শাসনব্যবস্থা এক অদ্ভুত ধরনের। ব্যবস্থা আদর্শিক হলেও এখানে পারিবারিক বন্ধনের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।

লারিজানি কেবল বহুমুখী ছিলেন না, ছিলেন একজন চূড়ান্ত বাস্তববাদী নেতা। দেশের ভেতরে এবং বাইরে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি সহজেই যোগাযোগ করতে পারতেন। ইরান এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিনা তুসির মতে, লারিজানি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর মধ্যে বিপুল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তাবিষয়ক যোগ্যতার এক দারুণ সমন্বয় ছিল। তিনি বিভিন্ন দলের মধ্যে মতৈক্য গড়ে তুলতে পারতেন। এই গুণের কারণে সংকটের মুহূর্তে তিনি বিশেষভাবে মূল্যবান হয়ে উঠেছিলেন।

মিডল ইস্ট আইকে তুসি বলেন, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে লারিজানির মৃত্যু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এমন একজন বাস্তববাদী মানুষকে হারাল, যিনি কৌশলকে সমন্বিত নীতিতে রূপ দিতে পারতেন।

যখন যেমন, তখন তেমন

বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যালান এয়ারের মতে, লারিজানি একই সঙ্গে একজন মধ্যপন্থী ও কট্টর নীতিবাদী হতে পারতেন। যখন তিনি চাইতেন, তখন তিনি মধ্যপন্থী হতেন। আবার যখন কট্টরপন্থা তাঁর জন্য সুবিধাজনক হতো, তখন তিনি কট্টরপন্থী হয়ে যেতেন। সহজ কথায় তিনি ছিলেন বাস্তববাদ ও সুবিধাবাদের অত্যন্ত কার্যকর মিশ্রণ।

স্লাভিন বলেন, লারিজানি এমন একজন মানুষ ছিলেন যাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলতে পারত। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে কথাও বলেছেন। স্লাভিন জানান, ২০০৬ সালে তিনি লারিজানির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তখন লারিজানি তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন হ্যাডলির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি চীন ও ইরানের মধ্যে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তিরও অন্যতম রূপকার ছিলেন। ২০২১ এবং ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।

সবাইকে নিয়ে চলার রাজনীতির পাশাপাশি তিনি কঠোর ও আক্রমণাত্মক কথা বলতে পারতেন। কাজের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আপসহীন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর লারিজানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সাবধান হোন, নতুবা আপনারাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি যুদ্ধবাজদের জন্য পরাজয় ও দুর্ভোগের প্রণালিতে পরিণত হবে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি ভেঙে পড়বে?

লারিজানির বহুমুখী প্রতিভা ও অভিজ্ঞতার অভাব ইরান অবশ্যই অনুভব করবে। তবে লারিজানির মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য কোনো চূড়ান্ত পতন ডেকে আনবে না। সিনা তুসি মনে করেন, এই মৃত্যু সরকারের টিকে থাকার জন্য কোনো মৌলিক হুমকি নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি বহুস্তর বিশিষ্ট এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এ ধরনের ক্ষতি সামলে ওঠার জন্যই ব্যবস্থাটি নকশা করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লারিজানিকে ইরানের অঘোষিত নেতা বলা হচ্ছিল। তুসি এই বহুল প্রচলিত ধারণা নাকচ করে বলেন, ইরান এভাবে চলে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এর চূড়ায় থাকেন সর্বোচ্চ নেতা। আর প্রেসিডেন্ট, আইআরজিসি এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তুসি বলেন, লারিজানি প্রভাবশালী ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি ব্যবস্থার ভেতরে থাকা একজন খেলোয়াড় মাত্র। তিনি ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র ছিলেন না।

কট্টরপন্থার নতুন যুগ ও ইসরায়েলের লক্ষ্য

লারিজানির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে তাঁর নিরাপত্তা উপপ্রধান কট্টরপন্থী সাইদ জলিলিকে। অ্যালান এয়ারের মতে, এমন পদক্ষেপ হবে ইরানি শাসনব্যবস্থার ‘কট্টরপন্থায়’ যাওয়ার আরেকটি ধাপ। তিনি বলেন, লারিজানির শূন্যতায় কিছুটা দুর্বলতা তৈরি হবে। কারণ উত্তরসূরি হয়তো তাঁর মতো ততটা যোগ্য হবেন না। কিন্তু এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হবে এই নতুন কট্টরপন্থা।

জানা গেছে, লারিজানি সাবেক সংস্কারপন্থী ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে গোপনে কাজ করছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করার প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া। তাঁরা মোজতবার বিকল্প কোনো প্রার্থী খুঁজছিলেন। সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস আলী খামেনির ছেলেকেই বেছে নিয়েছে। মোজতবাকে একজন কট্টর নীতিবাদী হিসেবে দেখা হয়। তাঁর অধীনে আইআরজিসি আরও বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারে।

অ্যালান এয়ার বলেন, লারিজানির মৃত্যুর পর কোন ব্যক্তিরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন, সেটি এখন আর মূল প্রশ্ন নয়। তার বদলে কোন প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাশালী হবে, সেটিই আসল বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, লারিজানির মৃত্যু ইরানের দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠান আইআরজিসি এবং বাইত-ই রাহবরি বা সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল হয়তো তথাকথিত ‘মূল’ নেতাদের হত্যা করতেই থাকবে। কিন্তু তাঁদের জায়গায় সম্ভবত আরও তরুণ এবং আরও কট্টরপন্থী প্রার্থীরা চলে আসবেন।

বারবারা স্লাভিনও একই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলি গুপ্তহত্যাগুলো কূটনীতির পথ খোঁজার চেয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যেই চালানো হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসরায়েল কি ইরানি সরকারের এমন প্রত্যেক সম্ভাব্য সদস্যকে হত্যা করতেই থাকবে যারা পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে সক্ষম? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগামী দিনগুলোর ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

সম্পর্কিত