জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

ইসরায়েলি-আমিরাতি জোটের ফাঁদে কি পা দিচ্ছে আরব বিশ্ব

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৪৫
এআই জেনারেটেড ছবি

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাতের হুমকি, অন্যদিকে আমেরিকান স্বার্থ রক্ষার মরিয়া চেষ্টা—এই সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলের মানচিত্র ও ক্ষমতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই সংকটের আড়ালে আরেকটি গভীর লড়াই চলছে, যা কেবল অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক চাল এবং ‘খণ্ডন নীতি’র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, ইরানকে দমনের সঙ্গে আরব বিশ্বের সার্বভৌম দেশগুলোকে টুকরো টুকরো করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ইসরায়েলি-আমিরাতি জোটের এই কৌশলী খেলায় একদিকে যেমন পুরনো মিত্রদের মধ্যে ফাটল ধরছে, তেমনি সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধের এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই আমাদের বুঝতে হবে—মধ্যপ্রাচ্যের এই ডামাডোল কি কেবল ধর্মীয় বা আদর্শিক সংঘাত, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আর খনিজ সম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী নীল নকশা? লেখাটি নিবন্ধটি সেই জটিল সমীকরণের বিশ্লেষণ।

আরব স্বার্থের হুমকি

আরব বিশ্বে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছে। রাজপুত্রদের ঝগড়া বা লুণ্ঠিত সম্পদ অথবা জোটের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সুন্নি আরব শাসকদের চিরাচরিত আতঙ্ক দুটি। সেই দুই আতংক ইরান এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। তিউনিসিয়ার বাজিদ শহরে কর্মকর্তাদের দ্বারা খাদ্যসামগ্রীর গাড়ি বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর একজন বিক্রেতার আত্মাহুতির মাধ্যমে এটি শুরু হয়নি। কায়রোতে স্বৈরশাসকের পতনের আহ্বান জানিয়ে কোনো গণবিক্ষোভও হয়নি। তবুও এই পরিবর্তনের প্রভাব ১৫ বছর আগের আরব বসন্তের মতোই ব্যাপক হতে পারে।

ঘটনা হল, মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণত আরব বিশ্বের ‘আসল জাতি’ হিসেবে পরিচিত উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশগুলো তাদের চারপাশে যা ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল স্পষ্টভাবে আর সংযুক্ত আরব আমিরাত পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থানগুলো আয়ত্ত ও নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করেছে। প্রধানত সৌদি আরব ও আলজেরিয়া আর সম্ভবত মিশরও বুঝতে পেরেছে যে তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য এই পরিকল্পনা একটি হুমকি।

পরিকল্পনাটা কী

ইসরায়েলি-আমিরাতি পরিকল্পনাটি সহজ—আরব রাষ্ট্রগুলোকে খণ্ডিত করা, ইয়েমেন এবং হর্ন অফ আফ্রিকার মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। পুরো অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা এবং এর মাধ্যমে এই শতাব্দীর বাকি সময়ের জন্য একটি লাভজনক সামরিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ইসরায়েল বিভিন্ন বক্তৃতা এবং অসংখ্য সফরের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে। এই একই ফর্মুলা তারা সিরিয়ায় ব্যবহার করছে। সেখানে তারা দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজদের একটি সুরক্ষিত অঞ্চল তৈরি করেছে। উত্তরে কুর্দিদের সঙ্গেও একই চেষ্টা চালানা হচ্ছে। এই সব হচ্ছে প্রকাশ্যে এবং ঘোষণা দিয়ে। তারা সিরিয়াকে লিবিয়ায় পরিণত করতে চায়। যার মানে, অর্থপূর্ণ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণহীন একগুচ্ছ যুদ্ধরত অঞ্চলের সমষ্টি। তারা সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে একই নীতি প্রয়োগের চেষ্টা করছে। এর ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হর্ন অফ আফ্রিকায় ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আমিরাতের খেলা

আবুধাবির জন্য এই খণ্ডন নীতিটি পরোক্ষ। তারা সুদানে আরএসএফ-কে অর্থায়ন ও অস্ত্র প্রদান এবং একটি বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধে মদত দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। আরএসএফ কমান্ডার হেমেতির সাথে কোনো সম্পর্কের কথাও অস্বীকার করে তারা। হেমেতি মার্কিন ট্রেজারি নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছেন। কিন্তু ইয়েমেনকে ভাগ করে ফেলার নীতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা কৌশল হিসেবে নিয়ে রেখেছে। শুরুতে এটি ছিল ইয়েমেনি স্বৈরশাসকের পতনের পর মুসলিম ব্রাদারহুড বা আল-ইসলাহকে ক্ষমতায় আসা থেকে ঠেকানোর জন্য। এরপর হুথি বা আনসারুল্লাহর হাতে রাজধানী সানার পতন ঘটে। প্রতিটি অভিযান তাদের আসল লক্ষ্যের জন্য একটি আবরণ হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে ছিল এডেনে ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি)-এর ব্যানারে দক্ষিণ ইয়েমেনে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্রকে অর্থায়ন, সশস্ত্রকরণ এবং প্রতিষ্ঠিত করা। এই প্রকল্পটি নতুন কিছু নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ এই আমিরাতের প্রতিটি পদক্ষেপের নেপথ্য মস্তিষ্ক। তিনি এই প্রকল্পকে অতিমাত্রায় বেগবান হয়েছে।

বিন জায়েদ প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিলেন। আবুধাবির নীতি ছিল এসটিসি-কে সামরিকভাবে এতটাই শক্তিশালী করা যাতে তারা নিজেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। সেই রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে। এই পুরো পরিকল্পনা প্রায় বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে ছিল। এসটিসি-র প্রয়োজন ছিল কেবল দেশের পূর্বে অবস্থিত দুটি স্বল্প জনবসতিপূর্ণ কিন্তু ভৌগোলিকভাবে বিশাল প্রদেশ দখল করার । আল-মাহরা এবং হাজরামাউত নামে এই দুই প্রদেশ ইয়েমেনের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু এখানেই বিন জায়েদ তার মারাত্মক ভুলটি করেন। তিনি অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে নিজের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যান। হাজরামাতের সীমান্ত সৌদি আরবের সঙ্গে। রাজধানী মুকাল্লায় এসটিসি-র উপস্থিতি সৌদি রাজশাসককে ক্ষিপ্ত করে তোলে। এটি সৌদি আরবের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়েকআপ কল হিসেবে কাজ করে। সৌদির চোখ থেকে ঠুলি খুলে যায়। তারা অনুভব করে যে তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। তারা যদি এখন ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই খণ্ডন নীতির পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে স্বয়ং এই রাজতন্ত্র। যে দেশটি দীর্ঘকাল ধরে ধীরগতিতে এবং পর্দার আড়ালে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে আসছিল, সেই সৌদি আরব অস্ত্রের ভাষা বেছে নেয়।

সৌদিরা অস্ত্রের ভাষা বেছে নিল

সৌদিরা হাজরামাউত এবং আল-মাহরা পুনর্দখল করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণকে সমর্থন করে। মুকাল্লায় বোমা হামলা করা হয়। এসটিসি পিছু হটতে বাধ্য হয়। তিন দিন পর ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি সৌদিদের অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিত করে। আবুধাবির এক দশক ধরে ধৈর্যের সঙ্গে যা কিছু গুছিয়েছিল সবকিছুর পতন ঘটে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে। সৌদি আরব মুকাল্লা বন্দরে অস্ত্র ও যানবাহনের একটি চালানে বোমা হামলা চালায়। এই আক্রমন করে সৌদি বুঝিয়ে দেয় যে তারা জানে দক্ষিণ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র করার কাজে সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা আছে। কয়েক ঘণ্টা পর আবুধাবি ঘোষণা করে যে তারা ইয়েমেন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করছে। এমনকি তারা সোকোত্রা দ্বীপও ত্যাগ করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমিরাতের গত এক দশকের সমস্ত কাজ, পরিকল্পনা এবং অর্থায়ন ভেঙে পড়ে। এভাবেই মধ্যপ্রাচ্য বদলে যায়। ওভাল অফিসে সাজানো ছবি তোলার মাধ্যমে নয়, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতো শুনতে বিশাল কিন্তু বাস্তবে গভীর স্বার্থপর চুক্তির মাধ্যমেও নয়। সবকিছু বদলে যায় আকস্মিক এবং নিঃশব্দ পতনের মাধ্যমে।

এসটিসি নেতা আইদারুস আল-জুবাইদিকে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল কর্তৃক রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ২৪ ঘণ্টার জন্য তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। সৌদি আরব পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে ইয়েমেন থেকে আল-জুবাইদিকে বের করে আনার জন্য একটি গোপন অভিযান পরিচালনার অভিযোগ আনে। এটি ছিল ওই অঞ্চলের আধিপত্য বিস্তারের জন্য জন্য সবচেয়ে খারাপ দিন। রাজতন্ত্রের অনুমোদিত সৌদি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাতে তোলপাড় শুরু হয়। এক পোস্টে একটি সৌদি এফ-১৬ বিমানকে ইংরেজি গান বাজিয়ে আকাশে উড়তে দেখা যায়। গানের কথাগুলো ছিল, ‘আমাদের গুহায় সিংহের ভয় দেখিয়েছিল, আমরা সেই গুহায় ঢুকে কাউকে খুঁজে পাইনি।’

সৌদি রাজপুত্র আর বিন জায়েদ

সৌদি রাজপুত্র এমবিএস যখন একজন তরুণ অপরিচিত রাজপুত্র ছিলেন, তখন আমিরাতের বিন জায়েদ ওয়াশিংটন, ট্রাম্প গোষ্ঠী এবং শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বিন সালমানকে। এমবিএস সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার জন্য তাঁর আমিরাতি প্রতিবেশীর কাছে ঋণী। আর নতুন রাজপুত্রকে ইসরায়েল-বান্ধব করার কৌশলের নেপথ্যে ছিলেন বিন জায়েদ। তিনি সিংহাসনের দাবিদার এই রাজপুত্র আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে গোপন বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুরু ও শিষ্যের মধ্যে বিবাদ ঘটল। এমবিএস বা তাঁর অনুসারীরা কেউ বদলাননি। তারা এখনও সেই একই মানুষ। কোনো সৌদি ভিন্নমতাবলম্বীকে গায়েব করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দ্বিতীয়বার চিন্তা করার কিছু নেই। মানবাধিকার তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয় না।

আমিরাতি পরিকল্পনার ওপর আক্রমণাত্মক অনেক টুইট ‘কলাম্বাস’ নামক কেউ একজন পোস্ট করেন। নির্ভরযোগ্যভাবে এই কলাম্বাসকে সৌদ আল-কাহতানি বলে মনে করা হয়। আল-কাহতানি ইস্তাম্বুলের কনস্যুলেটে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তদারকি করেছিলেন। ইয়েমেনে সৌদির চূড়ান্ত পদক্ষেপ যখন চলমান, সেই সময়ই সৌদি রাজা এবং যুবরাজ ফিলিস্তিনিদের জন্য অনুদান দিতে জাতীয় পর্যায়ে সৌদি প্রচারণা চালান। এখন পর্যন্ত ৭০০ মিলিয়ন রিয়াল সংগ্রহ হয়েছে। সংগ্রহ এখনও চলছে।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে রাজতন্ত্র পরিচালনাকারী মানুষগুলো বদলায়নি। কিন্তু যা বদলেছে তা হলো এই যে তারা অবশেষে বুঝতে পেরেছে যে আমিরাতি এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক পরিকল্পনাগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব ও রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। যেকোনো সৌদি শাসক গোষ্ঠীর জন্য একটি চরম সীমা। আমিরাতও জানে যে প্রতিবেশীর সাথে বেশি ঝামেলা করা যাবে না। সৌদি আরবের জনসংখ্যা ৩ কোটি ৫৫ লক্ষ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা ১ কোটি। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ১০ লক্ষ নাগরিক। গল্পের এখানেই শেষ।

মধ্যপ্রাচ্যে অন্তহীন চক্র

ব্যর্থ আমেরিকান হস্তক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী ইসরায়েলি দখলের অন্তহীন চক্র থেকে যারা মুক্তি খুঁজছেন, তাদের কাছে সৌদির এই সচেতনতা স্বাগত জানানোর মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও সমস্ত সামরিক ক্ষমতার অধিকারী। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গাজা, দক্ষিণ লেবানন, দক্ষিণ সিরিয়ায় অনন্তকাল পর্যন্ত যুদ্ধ এবং দখলদারি চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখার কেউ নেই।

ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতে পারে। গ্রিনল্যান্ডে বিশেষ বাহিনীর একটি দল নামিয়ে বরফে পতাকা পুঁতে একে মার্কিন সার্বভৌম অঞ্চল ঘোষণা করতে পা আমেরিকা। ট্রাম্প দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ইরানকে বোমা মারতে পারেন। কথা না শুনলে তিনি বিশ্বের যেকোনো অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। কেউ এই কথা অস্বীকার করছে না। কিন্তু তিনি বা নেতানিয়াহু কেউই তাদের আগ্রাসনের পরিণাম সামাল দিতে পারবেন না। ঠিক যেমন জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণের পর সাত বছরের গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেননি।

আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য ইসরায়েল স্পষ্ট এবং প্রকাশ্যভাবে নিজের পরিকল্পনা জানায়। সৌদি রাজতন্ত্রকে একই কাজ করতে হবে তার প্রয়োজন নেই। তারা তা করবেও না। কিন্তু তারা সেই দুই বন্ধুর জীবন খুব কঠিন করে তোলা শুরু করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে গৃহযুদ্ধ এবং সংঘাতের বীজ বপনকারী সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েল। তাদের আশকারাতেই আমেরিকা এবং ইসরায়েল নিজেদের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্প তার সবশেষ টুইটে যা বলেছেন তা হলো—ভেনিজুয়েলা কেবল সেই টাকা দিয়েই আমেরিকান জিনিসপত্র কিনতে পারবে, যা তারা নিজেদের তেল বিক্রি করে আয় করবে। আর সেই তেল আবার আমেরিকা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে যাচ্ছে। এটি ক্ষমতায় মত্ত একজন প্রেসিডেন্টের চরম অহংকারের উদাহরণ। ট্রাম্প কি আদৌও মানচিত্র দেখেছেন? ভেনিজুয়েলা আয়তনে ইরাকের চেয়ে দ্বিগুণ বড়। দেশটি মূলত ঘন জঙ্গলে ঘেরা। আর ওখানকার মানুষজন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহু মনে করেন তারা যখন যা খুশি তা-ই করতে পারেন। কোনো একজন আরব নেতার তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে 'না' বলার সময় অনেক আগেই হয়ে গেছে।

হালনাগাদ

এর মধ্যে বেশ কিছু বিষয় ভূ-রাজনীতিতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার 'ঠান্ডা লড়াই' এবং কৌশলগত ভিন্নতা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়।

যে ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে প্রথমেই, তা এখন আরও প্রকট। সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত এখন ওপেকের তেল উৎপাদন নীতি থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং আফ্রিকার বিনিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপরের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। সৌদি আরব এখন নিজেকে আরব বিশ্বের একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই চেষ্টা আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

হাজরামাউত এবং আল-মাহরা নিয়ে উত্তেজ এখনও বিদ্যমান। সৌদি আরব সেখানে ‘হাজরামাউত নেশনস কাউন্সিল’ গঠন করে আমিরাত-পন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে হুথিদের সাথে লোহিত সাগরে পশ্চিমা বিশ্বের যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তাতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে। সৌদি আরব এখন হুথিদের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। আমিরাত তা খুব একটা পছন্দ করছে না।

২০২৪-এর শুরুতে ইথিওপিয়া এবং সোমালিল্যান্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে সোমালিয়া এবং মিশরের মতো দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়েছে। আরব আমিরাত এই অঞ্চলে বন্দর ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। আর সৌদি আরব সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমর্থন দিয়ে আমিরাতের এই প্রভাব বলয়কে চ্যালেঞ্জ করছে।

গাজা যুদ্ধের পর থেকে সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি পুরোপুরি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের শর্তের ওপর ঝুলে গেছে। সৌদিরা ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশাল তহবিল সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে সৌদি আরব ওআইসি এবং আরব লীগের মাধ্যমে একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখছে। এই চাপ আমিরাত বা ইসরায়েলের একক আধিপত্যের পরিকল্পনার বিপরীতে কাজ করছে।

গত দুই বছরে সৌদি আরবের আমিরাত-ইসরায়েল পরিকল্পনার বিপরীতে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া বিষয়টি বাস্তব প্রমাণিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের ডিক্টেশনে চলে না।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে লিখিত

সম্পর্কিত