২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থান। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। হাসিনার আমলেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের এমন অভাবনীয় উত্থান হয়তো কেউই প্রত্যাশা করেনি। মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছে দলটি।
জামায়াতের এই বিশাল প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে আসার কৌশল। বর্তমান আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি তাদের পুরোনো ধর্মীয় ভাবমূর্তি কিছুটা আড়ালে রেখেছে। এর বদলে নিজেদের ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ বা প্রথাবিরোধী হিসেবে তুলে ধরছে।
জামায়াতের অতীত ইতিহাস অবশ্য বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানের পক্ষে অর্থাৎ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে, ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমানের দেশ হলেও, বাংলাদেশে মধ্যপন্থী ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির এক গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে।
তাই জামায়াত এবার নিজেদের পরিবর্তন, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের রূপকার হিসেবে তুলে ধরেছে। এত দিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূলত দুটি বড় দল পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে— সদ্য নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। এই দুটি দলকেই অনেকটা পারিবারিক ব্যবসার মতো পরিচালনা করা হয়েছে। আর তাদের শাসনামলে দুর্নীতিও হয়েছে লাগামহীন। এই অবস্থার বিপরীতেই জামায়াত নিজেদের এক নতুন ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
জামায়াতের সবচেয়ে মাস্টারস্ট্রোক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে। গত বছর বড় বড় প্রায় সব ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির জয়লাভ করে। তবে তারা এখন ক্যাম্পাসে কোরআনের বাণী প্রচারের চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
তারা স্টাডি সেশন বা পাঠচক্র চালাচ্ছে, ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণমূলক গ্রুপ তৈরি করছে, এমনকি হলের নষ্ট ফ্যানও ঠিক করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একটি ‘হিজাব র্যালি’র আয়োজন করে। ইসলামপন্থীদের রাজনীতিতে আগ্রহী নন এমন অনেক নারী শিক্ষার্থীও এই র্যালিতে অংশ নেন। অর্থাৎ ইসলামি হিজাব এখন আত্মপরিচয় প্রকাশের এক নতুন, তারুণ্যদীপ্ত ও ‘কাউন্টার-কালচারাল’ (প্রচলিত ধারণার বাইরের) মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির ছাত্রদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়েছিল জামায়াত। এই জোটের কারণে নতুন এনসিপির অনেক তারকা প্রার্থী দল ছাড়লেও, নির্বাচনে অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে জয়লাভ করেন। মূলত এই জোটের মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বা ‘পলিটিক্যাল ফেসলিফ্ট’ করেছে। অভ্যুত্থানের বিজয়ী পক্ষে জামায়াত সফলভাবে জায়গা করে নিতে পেরেছে।
জামায়াত এখন আর হিসাবের বাইরে রাখার মতো কোনো শক্তি নয়। তবে দলটির আসল দর্শন কী, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত নই তাদের দর্শন আসলে কী।’
এর একটি বড় কারণ হলো—জামায়াত বর্তমানে মডারেট বা মধ্যপন্থী এবং হার্ডলাইনার বা কট্টরপন্থী, এই দুই ভাগে বিভক্ত। স্বয়ং দলের আমিরের অনেক মন্তব্যও অপ্রত্যাশিত। মূল চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে বেফাঁস কথা বলে তিনি অনেক সময় নারীদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছেন। যেমন, তিনি একবার বলেছিলেন—সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো জৈবিক কারণে নারীদের পক্ষে রাজনৈতিক নেতা হওয়া কঠিন। যে দেশে কয়েক দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রীরা দেশ শাসন করেছেন, সেখানে এমন মন্তব্য নিশ্চিতভাবেই বিস্ময়কর!
জামায়াত এখন স্বপ্ন দেখছে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করার। ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান একেবারে ছকে বাঁধা ‘সেন্টার-রাইট’ বা ডানপন্থী ধাঁচের উত্তর দেন। তাঁর কথায়—ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা সাজানো এবং দুর্নীতিবাজ ও দলবাজ আমলাদের লাগাম টেনে ধরাই তাদের লক্ষ্য।
তত্ত্বগতভাবে জামায়াত শরিয়াহ আইনে বিশ্বাসী। তবে শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, শরিয়াহ মানে কেবলই ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ। এত চমৎকার ও অস্পষ্ট নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা সত্যিই কঠিন। আর হয়তো এটাই তাদের আসল কৌশল। শেষ পর্যন্ত জামায়াত আসলে ঠিক কেমন বাংলাদেশ গড়তে চায়, তা হয়তো কেবল আল্লাহই/ঈশ্বরই জানেন!
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইকনোমিস্ট’-এর নিবন্ধ থেকে অনূদিত