জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন

ভারত উদ্বেগজনক দেশ, ‘র’ নিষিদ্ধে মার্কিন কমিশনের সুপারিশ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

আরএসএস ও গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ লোগো। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব ও লঙ্ঘনের অভিযোগে কট্টরপন্থী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ (র)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)।

সংস্থাটি ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে গত ৪ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতির অবনতি তুলে ধরে এই সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনটির শিরোনাম— ‘ইউএসসিআইআরএফ-এর ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন: প্রধান দেশগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন উন্মোচন’।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ (CPC) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে এবং সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ করছে। শুধু তাই নয়, ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) করার জন্য ভারত সরকারকেই দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ভারত সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে নতুন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করেছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে কারাদণ্ডসহ ধর্মান্তরবিরোধী আইন চালু বা কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ নাগরিক ও ধর্মীয় শরণার্থীদের আটক এবং বেআইনিভাবে বহিষ্কার করার প্রক্রিয়া সহজ করেছে। নজরদারির নামে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সারা বছর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের হয়রানি, উসকানি ও তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চে মহারাষ্ট্রে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সপ্তদশ শতাব্দীর মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের সমাধি অপসারণের দাবি জানালে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী দাঙ্গায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।

জুনে ওড়িশায় ভিএইচপি-র নেতৃত্বে অন্তত ২০টি মুসলিমবিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশ ও সহিংসতায় আটজন আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় পুলিশ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এছাড়া এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার ঘটনার জের ধরে পাঁচ দিনব্যাপী ভারত-পাকিস্তান উত্তজনা সৃষ্টি হয়। এরপর কর্ণাটক ও উত্তর প্রদেশেও মুসলিমবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠে। উত্তরাখণ্ডে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা এক মুসলিম রেস্তোরাঁ মালিককে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে; অথচ রাজ্য পুলিশ উল্টো ওই রেস্তোরাঁটিই বাজেয়াপ্ত করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলার পর ভারত সরকার ‘অবৈধ’ অভিবাসী হিসেবে বিবেচিত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ন্যায্যতা তৈরি করে। গত মে মাসে সরকার ১৫ জন খ্রিষ্টানসহ ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মিয়ানমার উপকূলে নিয়ে গিয়ে লাইফজ্যাকেট ছাড়াই সাঁতরে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও জুলাই মাসে আসাম থেকে শত শত বাংলাভাষী মুসলিমকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপি নেতারা তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেন।

সেপ্টেম্বরে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ বা বিদেশি আইনের নতুন বিধিতে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সন্দেহভাজন ‘বিদেশিদের’ গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকার ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। মে মাসে সংসদে ‘ওয়াকফ বিল’ পাস করা হয়। নতুন বিলে মসজিদ, মাদরাসা ও কবরস্থানের মতো ধর্মীয় সম্পত্তির পরিচালনা পর্ষদে অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এর প্রতিবাদে সহিংসতায় তিনজন নিহত হন। পরে সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট মূল বিধানগুলো স্থগিত করে ফেডারেল পর্ষদে অমুসলিম সদস্য সংখ্যা সীমিত করার নির্দেশ দেয়। একই মাসে উত্তরাখণ্ডে ‘সংখ্যালঘু শিক্ষা রাজ্য কর্তৃপক্ষ’ (ইউএসএএমই) আইন পাস করে মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্ত করা হয় এবং সব সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

কমিশন তাদের সুপারিশে ট্রাম্প প্রশাসনকে বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং এই বিষয়টিকে অস্ত্র বিক্রি ও বাণিজ্য নীতির সঙ্গে যুক্ত করতে। সংস্থাটি টানা সাতবার ভারতকে এই তালিকায় রাখার সুপারিশ করল।

এই তালিকায় ভারত ছাড়াও চীন, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মতো ১৮টি দেশের নাম রয়েছে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের এই কমিশন একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সরকারি সংস্থা। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ করে মার্কিন সরকারকে নীতি নির্ধারণে সুপারিশ করে। তবে এই সুপারিশ মানা বাধ্যতামূলক নয়।

সম্পর্কিত