ক্লিয়ার ফ্রেমের পর্যালোচনা
স্ট্রিম ডেস্ক

বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ যে সরু সমুদ্রপথ দিয়ে যায়, সেই 'হরমুজ প্রণালী' আবার খুলে দিতে পারে ইরান। তবে তার জন্য ইরান একটি চমকপ্রদ প্রস্তাব দিয়েছে। অনেকের কাছে সেই শর্ত ভয়ানক—তেলবাহী জাহাজগুলোকে তেলের দাম মেটাতে হবে কেবল চীনা ইউয়ানে। ডলারে নয়, ইউরোতেও নয়, কেবল ইউয়ানে। ইরানের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে কিছু তেলবাহী জাহাজ যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে। তবে শর্ত একটাই—লেনদেন হতে হবে চীনা মুদ্রায়। এটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা গত ৫২ বছর ধরে চলে আসা মার্কিন ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার একাধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে আসল প্রশ্নটি শুধু তেল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—ইরান কেন এমনটা করছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানাবে? আর যদি বিশ্ব তেলের বাজার দুটি আলাদা মুদ্রায় ভাগ হয়ে যায়, তবে কেমন হবে?
আজ যা ঘটছে তা বুঝতে হলে আমাদের ৫০ বছরেরও বেশি পেছনে তাকাতে হবে। ১৯৭৪ সালে বিশ্ববাজারে তেল সংকট হয়। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিল। চুক্তিটি ছিল খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। তা হল এই যে সৌদি আরব এবং পরবর্তীতে ওপেক-ভুক্ত দেশগুলো কেবল মার্কিন ডলারেই তেল বিক্রি করবে। বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সুরক্ষা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বিশ্ব বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে। এই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার জন্ম হয়। আর তা পুরো পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।
সেই থেকে পৃথিবীর যে দেশেরই তেলের প্রয়োজন হতো, তাকে মার্কিন ডলার মজুদ করতে হতো। জাপান, জার্মানি, ভারত, এমনকি চীনেরও ডলারের প্রয়োজন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন মুদ্রার এক বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। এই চাহিদা ওয়াশিংটনকে এক অসাধারণ ক্ষমতা দেয়। যখন পুরো বিশ্বের আপনার মুদ্রার প্রয়োজন হয়, তখন আপনি অমোঘ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারত। পারত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে। কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থাই ছিল মার্কিন বিশ্ব ক্ষমতার মূল ভিত্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের এই বিরোধ আজ নতুন নয়। এটি গত ৪০ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক শত্রুতাপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংক এবং ইরানের সাথে ব্যবসা করা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো।
তেল বিক্রিই ইরানের আয়ের প্রধান উৎস। তাই এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ছিল বিধ্বংসী। ইরান হঠাৎ এক বড় সমস্যায় পড়ে। তারা তেল উৎপাদন করতে পারত ঠিকই, কিন্তু বিশ্ববাজারে তা বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ব্যাংক ইরানের সঙ্গে লেনদেন করতে অস্বীকার করে। জাহাজ কোম্পানিগুলো ইরানের পণ্য পরিবহন এড়িয়ে চলতে থাকে। ফলে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার খোঁজ শুরু করে। তখন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে চীন।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। তাদের অর্থনীতির জন্য প্রচুর তেলের প্রয়োজন। অন্যদিকে ইরানের কাছে বিশাল তেলের মজুদ থাকলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্রেতা ছিল সীমিত। এইসব মিলে একটি ব্যবসায়িক জোট তৈরি হয়। ২০২১ সালে ইরান ও চীন একটি ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, চীন ইরানের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। বিনিময়ে ইরান তাদের সস্তায় তেল দেবে।
তবে এই জোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। চীন বিশ্বজুড়ে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল। অনেক বছর ধরেই বেইজিং মার্কিন ডলারের ওপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। আর তেলের বাজার হলো সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। যদি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য 'তেল' ইউয়ানে কেনাবেচা শুরু হয়, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ইরান বিষয়টি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল।
পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র 'হরমুজ প্রণালী'। তারা এখন সেই অস্ত্র ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এই প্রণালীটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া। এই ছোট পথ দিয়েই প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইরানের মতো বড় তেল উৎপাদনকারীরা এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর ফল হবে তাৎক্ষণিক। তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর পর ঠিক এমনটাই ঘটতে শুরু করেছিল। ইরান যখন হরমুজে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করল, তখন বিশ্ব তেলের বাজার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, সংকট আরও বাড়লে দাম ১৫০ বা এমনকি ২০০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে। হঠাৎ বিশ্ব বুঝতে পারল—যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখনও ইরানের হাতে।
ইরান জানে তারা সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট চীন রাশিয়ার সম্মিলিত বাজেটের চেয়েও বেশি। কিন্তু ইরানের প্রথাগত যুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই। তাদের কৌশল হলো 'অপ্রতিসম ক্ষমতা' ব্যবহার করা। সহজ কথায়, ইরান সামরিক শক্তিতে না পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বল জায়গায় আঘাত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করে বিশ্বজুড়ে এমন এক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা, যা বিরোধীদের রাজনৈতিক আপস করতে বাধ্য করবে। আর প্রণালী খোলার শর্ত হিসেবে ইউয়ানে তেল বিক্রির দাবি তুলে তারা আসলে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইরান যদি সত্যিই ইউয়ানে লেনদেন বাধ্য করতে চায়, তবে ওয়াশিংটনের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। সেগুলো এরকম:
সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো: পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এর মধ্যে থাকতে পারে বিমানবাহী রণতরী পাঠানো, তেলবাহী জাহাজকে পাহারা দেওয়া বা ইরানের নৌ-ঘাঁটিতে হামলা চালানো। তবে এতে একটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।
অর্থনৈতিক পাল্টা আক্রমণ: ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। যারা ইউয়ানে তেল কিনবে (যেমন চীনা কোম্পানি), তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা। তবে চীন যদি সরাসরি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তবে তা কার্যকর করা কঠিন হবে।
কূটনৈতিক চাপ: সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো মিত্র দেশগুলোকে ডলারে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে বাধ্য করা।
কৌশলগত জ্বালানি মজুদ ব্যবহার: বাজার শান্ত রাখতে নিজেদের বিশাল তেলের মজুদ বাজারে ছেড়ে দেওয়া। এটি সাময়িক সময়ের জন্য কাজ করলেও চিরস্থায়ী সমাধান নয়।
এই লড়াইয়ের ফল হবে বিশাল। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে ইরানের সাথে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করছে। ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা দরকার। আবার তারা মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল। ফলে তারা কোনো এক পক্ষ নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
যদি ইউয়ানে তেল বিক্রি শুরু হয়, তবে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে চীনের। ডলারের বদলে নিজেদের মুদ্রায় তেল কিনতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব অনেক বেড়ে যাবে। রাশিয়াও একে সমর্থন দিতে পারে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা আগেই ডলারের ওপর আগ্রহ হারিয়েছে। ব্রিকস দেশগুলোও (ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা) ধীরে ধীরে বিকল্প মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পৃথিবী এখন তেলের জন্য দুটি আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। একপাশে চলবে ডলারের বাজার, অন্যপাশে বিকল্প মুদ্রা বা ইউয়ানের বাজার। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি খণ্ডিত হয়ে পড়বে।
তবে ইরানের এই কৌশলে বড় ঝুঁকিও আছে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে, তবে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ তাদের আয়ের প্রধান উৎসই হলো তেল রপ্তানি। তাই তেহরানকে চাপের মুখে থাকার পাশাপাশি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
সবশেষে, তেলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যতের বিশ্ব ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? কয়েক দশক ধরে বিশ্ব মার্কিন ডলারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এখন চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং রাশিয়ার প্রতিরোধ সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইরানের এই 'ইউয়ান প্রস্তাব' হয়তো সেই বড় পরিবর্তনেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ।
হরমুজ প্রণালীর এই সংকটে একটি বিষয় পরিষ্কার—মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া একটি জলপথ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। পারস্য উপসাগরের লড়াই আসলে একুশ শতকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করবার লড়াই।
ক্লিয়ার ফ্রেম একটি আমেরিকান রাজনীতি ও অর্থনীতি পর্যালোচনা সংস্থা

বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ যে সরু সমুদ্রপথ দিয়ে যায়, সেই 'হরমুজ প্রণালী' আবার খুলে দিতে পারে ইরান। তবে তার জন্য ইরান একটি চমকপ্রদ প্রস্তাব দিয়েছে। অনেকের কাছে সেই শর্ত ভয়ানক—তেলবাহী জাহাজগুলোকে তেলের দাম মেটাতে হবে কেবল চীনা ইউয়ানে। ডলারে নয়, ইউরোতেও নয়, কেবল ইউয়ানে। ইরানের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে কিছু তেলবাহী জাহাজ যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে। তবে শর্ত একটাই—লেনদেন হতে হবে চীনা মুদ্রায়। এটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা গত ৫২ বছর ধরে চলে আসা মার্কিন ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার একাধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে আসল প্রশ্নটি শুধু তেল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—ইরান কেন এমনটা করছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানাবে? আর যদি বিশ্ব তেলের বাজার দুটি আলাদা মুদ্রায় ভাগ হয়ে যায়, তবে কেমন হবে?
আজ যা ঘটছে তা বুঝতে হলে আমাদের ৫০ বছরেরও বেশি পেছনে তাকাতে হবে। ১৯৭৪ সালে বিশ্ববাজারে তেল সংকট হয়। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিল। চুক্তিটি ছিল খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। তা হল এই যে সৌদি আরব এবং পরবর্তীতে ওপেক-ভুক্ত দেশগুলো কেবল মার্কিন ডলারেই তেল বিক্রি করবে। বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সুরক্ষা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বিশ্ব বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে। এই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার জন্ম হয়। আর তা পুরো পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।
সেই থেকে পৃথিবীর যে দেশেরই তেলের প্রয়োজন হতো, তাকে মার্কিন ডলার মজুদ করতে হতো। জাপান, জার্মানি, ভারত, এমনকি চীনেরও ডলারের প্রয়োজন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন মুদ্রার এক বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। এই চাহিদা ওয়াশিংটনকে এক অসাধারণ ক্ষমতা দেয়। যখন পুরো বিশ্বের আপনার মুদ্রার প্রয়োজন হয়, তখন আপনি অমোঘ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারত। পারত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে। কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থাই ছিল মার্কিন বিশ্ব ক্ষমতার মূল ভিত্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের এই বিরোধ আজ নতুন নয়। এটি গত ৪০ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক শত্রুতাপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংক এবং ইরানের সাথে ব্যবসা করা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো।
তেল বিক্রিই ইরানের আয়ের প্রধান উৎস। তাই এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ছিল বিধ্বংসী। ইরান হঠাৎ এক বড় সমস্যায় পড়ে। তারা তেল উৎপাদন করতে পারত ঠিকই, কিন্তু বিশ্ববাজারে তা বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ব্যাংক ইরানের সঙ্গে লেনদেন করতে অস্বীকার করে। জাহাজ কোম্পানিগুলো ইরানের পণ্য পরিবহন এড়িয়ে চলতে থাকে। ফলে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার খোঁজ শুরু করে। তখন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে চীন।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। তাদের অর্থনীতির জন্য প্রচুর তেলের প্রয়োজন। অন্যদিকে ইরানের কাছে বিশাল তেলের মজুদ থাকলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্রেতা ছিল সীমিত। এইসব মিলে একটি ব্যবসায়িক জোট তৈরি হয়। ২০২১ সালে ইরান ও চীন একটি ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, চীন ইরানের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। বিনিময়ে ইরান তাদের সস্তায় তেল দেবে।
তবে এই জোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। চীন বিশ্বজুড়ে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল। অনেক বছর ধরেই বেইজিং মার্কিন ডলারের ওপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। আর তেলের বাজার হলো সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। যদি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য 'তেল' ইউয়ানে কেনাবেচা শুরু হয়, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ইরান বিষয়টি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল।
পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র 'হরমুজ প্রণালী'। তারা এখন সেই অস্ত্র ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এই প্রণালীটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া। এই ছোট পথ দিয়েই প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইরানের মতো বড় তেল উৎপাদনকারীরা এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর ফল হবে তাৎক্ষণিক। তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর পর ঠিক এমনটাই ঘটতে শুরু করেছিল। ইরান যখন হরমুজে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করল, তখন বিশ্ব তেলের বাজার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, সংকট আরও বাড়লে দাম ১৫০ বা এমনকি ২০০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে। হঠাৎ বিশ্ব বুঝতে পারল—যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখনও ইরানের হাতে।
ইরান জানে তারা সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট চীন রাশিয়ার সম্মিলিত বাজেটের চেয়েও বেশি। কিন্তু ইরানের প্রথাগত যুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই। তাদের কৌশল হলো 'অপ্রতিসম ক্ষমতা' ব্যবহার করা। সহজ কথায়, ইরান সামরিক শক্তিতে না পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বল জায়গায় আঘাত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করে বিশ্বজুড়ে এমন এক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা, যা বিরোধীদের রাজনৈতিক আপস করতে বাধ্য করবে। আর প্রণালী খোলার শর্ত হিসেবে ইউয়ানে তেল বিক্রির দাবি তুলে তারা আসলে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইরান যদি সত্যিই ইউয়ানে লেনদেন বাধ্য করতে চায়, তবে ওয়াশিংটনের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। সেগুলো এরকম:
সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো: পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এর মধ্যে থাকতে পারে বিমানবাহী রণতরী পাঠানো, তেলবাহী জাহাজকে পাহারা দেওয়া বা ইরানের নৌ-ঘাঁটিতে হামলা চালানো। তবে এতে একটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।
অর্থনৈতিক পাল্টা আক্রমণ: ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। যারা ইউয়ানে তেল কিনবে (যেমন চীনা কোম্পানি), তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা। তবে চীন যদি সরাসরি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তবে তা কার্যকর করা কঠিন হবে।
কূটনৈতিক চাপ: সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো মিত্র দেশগুলোকে ডলারে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে বাধ্য করা।
কৌশলগত জ্বালানি মজুদ ব্যবহার: বাজার শান্ত রাখতে নিজেদের বিশাল তেলের মজুদ বাজারে ছেড়ে দেওয়া। এটি সাময়িক সময়ের জন্য কাজ করলেও চিরস্থায়ী সমাধান নয়।
এই লড়াইয়ের ফল হবে বিশাল। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে ইরানের সাথে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করছে। ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা দরকার। আবার তারা মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল। ফলে তারা কোনো এক পক্ষ নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
যদি ইউয়ানে তেল বিক্রি শুরু হয়, তবে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে চীনের। ডলারের বদলে নিজেদের মুদ্রায় তেল কিনতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব অনেক বেড়ে যাবে। রাশিয়াও একে সমর্থন দিতে পারে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা আগেই ডলারের ওপর আগ্রহ হারিয়েছে। ব্রিকস দেশগুলোও (ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা) ধীরে ধীরে বিকল্প মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পৃথিবী এখন তেলের জন্য দুটি আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। একপাশে চলবে ডলারের বাজার, অন্যপাশে বিকল্প মুদ্রা বা ইউয়ানের বাজার। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি খণ্ডিত হয়ে পড়বে।
তবে ইরানের এই কৌশলে বড় ঝুঁকিও আছে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে, তবে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ তাদের আয়ের প্রধান উৎসই হলো তেল রপ্তানি। তাই তেহরানকে চাপের মুখে থাকার পাশাপাশি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
সবশেষে, তেলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যতের বিশ্ব ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? কয়েক দশক ধরে বিশ্ব মার্কিন ডলারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এখন চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং রাশিয়ার প্রতিরোধ সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইরানের এই 'ইউয়ান প্রস্তাব' হয়তো সেই বড় পরিবর্তনেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ।
হরমুজ প্রণালীর এই সংকটে একটি বিষয় পরিষ্কার—মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া একটি জলপথ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। পারস্য উপসাগরের লড়াই আসলে একুশ শতকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করবার লড়াই।
ক্লিয়ার ফ্রেম একটি আমেরিকান রাজনীতি ও অর্থনীতি পর্যালোচনা সংস্থা

পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে দেশেটির নির্বাচন কমিশন। গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) বিকেলে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এই তারিখ প্রকাশ করে। পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় ভোট হবে। ২৩ এপ
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হওয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যে বসবাসকারী শিয়া মুসলমানরা এবার ঈদের উৎসব উদযাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রদিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ২০০ জন। আহতদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই খবর জানানো হয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তালেবান সরকার। তবে ইসলামাবাদ এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে