শাহদের শাসনের অবসান ঘটাতে ১৯৭৯ সালে লক্ষাধিক ইরানি নাগরিক রাস্তায় নেমেছিলেন। তখন মনে করা হয়েছিল, পিতা থেকে পুত্রের হাতে শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথা হয়তো চিরতরে শেষ হলো। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
সম্প্রতি মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছে। এরপর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁরই দ্বিতীয় ছেলে মুজতবা খামেনি।
ইরানের ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ সেই কাজটিই করল যা সাধারণ ইরানিরা কখনোই চাননি। ইরানিরা কখনোই চান না, ইসলামী প্রজাতন্ত্র একটি রাজবংশে পরিণত হোক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন যে, খামেনির উত্তরাধিকারী হিসেবে মুজতবার এই নিয়োগ তার কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’। বাবার সাথে ওই হামলায় মুজতবার বোন, ভগ্নপতি ও তাদের পুত্র নিহত হন। কয়েকদিন পর তার মা ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
মুজতবার উত্থান ও নেপথ্যের প্রভাব
১৯৬৯ সালে জন্ম নেওয়া মুজতবা তার ভাইদের মতোই ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি কখনোই ‘মুজতাহিদ’ (ইসলামী আইনের সর্বোচ্চ পণ্ডিত) পদমর্যাদা পাননি, যা এই পদের জন্য জরুরি বলে মনে করেন অনেকেই। দীর্ঘ সময় তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও বাবার শাসনব্যবস্থায় তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) এবং দেশের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ওপর তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ইরান পর্যবেক্ষকদের মতে, যদিও তিনি কোনো উচ্চ পদে নেই, তবুও তার প্রভাব নিঃসন্দেহে স্পষ্ট ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, তার বাবার অফিসে কাজ করার সময় তাঁকে ক্রমশ সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল। ২০২১ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন একটি ছবি প্রকাশ পেয়েছিল, যেখানে তাঁর সমর্থকরা তেহরানের রাস্তায় তাঁর পোস্টার বিতরণ করছিল। যা ভবিষ্যতে স্পষ্টত তাঁকে পরবর্তী নেতা হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
অনেকে বিশ্বাস করেন, ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে নির্বাচিত করানোর পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি তখনকার তেহরানের মেয়র আহমাদিনেজাদের পক্ষে আইআরজিসির নেটওয়ার্কগুলোকে সক্রিয় করেছিলেন। আহমাদিনেজাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন খামেনির প্রতিদ্বন্দ্বী আকবর হাশেমি রাফসানজানির সঙ্গে।
২০০৯ সালে, যখন লাখ লাখ ইরানি আহমাদিনেজাদের পুনঃনির্বাচনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, মুজতবা শুধু নেতার ছেলে নন, বরং একজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিও। সেই আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়, যা পরবর্তী দেশীয় সংস্কারমূলক আন্দোলনের অবসান ঘটায়। ২০০৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘মুজতবা বেমিরি, রহবারি রো নাবিনি’, অর্থাৎ ‘মুজতবা, তোমার মৃত্যু হোক যাতে তুমি কখনো ক্ষমতায় বসতে না পারো।’
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন অর্থনীতি দপ্তর অভিযোগ করেছিল, তিনি শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। এবং তিনি তাঁর বাবার ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং গৃহস্থলির দমনমূলক লক্ষ্য’ এগিয়ে নিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ
মুজতবার নিয়োগ ইরানের গণতন্ত্রের আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে, রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং কট্টরপন্থীরা আলি খামেনির নীতিকেই এগিয়ে নিতে চায়। যদিও মুজতবার সরাসরি কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই এবং দেশের বড় কোনো সংস্থা চালানোর রেকর্ডও তাঁর নেই।
সিএনএন-এর কাছে মুজতবার নাম নিশ্চিত হওয়ার আগে বৈরুত-ভিত্তিক কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাহা ইয়াহিয়া বলেন, মুজতবাকে নির্বাচিত করে ইরানের শাসকরা মূলত ‘শাসকগোষ্ঠীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার’ বার্তা দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দেখাতে চায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়।
সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন খাদিজা আক্তার