আইডিএফের আশঙ্কা/দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০৫০ সালে ২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়াতে পারে
স্ট্রিম ডেস্ক

একসময় ডায়াবেটিসকে ভাবা হতো বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি রোগ। এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। শহর-গ্রাম, কর্মজীবী-গৃহিণী, তরুণ-বয়স্ক—সমাজের প্রায় সব স্তরেই ডায়াবেটিসের উপস্থিতি বাড়ছে।
বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দেড় কোটির কাছাকাছি থাকলেও ২০৫০ সাল নাগাদ তা বেড়ে ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ জানেনই না, তাঁদের শরীরে রোগটি বাসা বেঁধেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) সর্বশেষ ডায়াবেটিস অ্যাটলাস বলছে, বাংলাদেশে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বয়সের কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করলে বাংলাদেশের ডায়াবেটিসের হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ডায়াবেটিসের বয়সভিত্তিক হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই আক্রান্ত মানুষের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়নি। অর্থাৎ আনুমানিক ৫৪ লাখ ২৬ হাজার মানুষ জানেন না, তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
সামনে আরও বড় ঢেউ, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
আইডিএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০–৭৯ বছর বয়সী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০৫০ সালে বেড়ে ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি হতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ২৬ বছরে রোগীর সংখ্যা বাড়বে প্রায় ৬৬ শতাংশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। আইডিএফের সর্বশেষ হিসাবে এই অঞ্চলে ২০–৭৯ বছর বয়সী ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৬৯ লাখ। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ১৮ কোটি ৪৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে অঞ্চলটিতে ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যয় ১১৫০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৭৫০ কোটি ডলার হতে পারে।
আইডিএফ বলছে, বাংলাদেশে ২০–৭৯ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৯১ লাখ মানুষের রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ ‘প্রি ডায়াবেটিস’ পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন বিপুল একটি জনগোষ্ঠীর ইঙ্গিত দেয়।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি শুধু মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। নগরায়ণ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, বয়স বাড়া এবং পারিবারিক ঝুঁকি—সব মিলিয়ে ডায়াবেটিসের বোঝা তৈরি হয়।
আইডিএফের হিসাবেই বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের বয়স-ভিত্তিক হার ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের চেয়ে বেশি।

চিকিৎসাতেও বদল আসছে
বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিয়েও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এত দিন চিকিৎসার মূল লক্ষ্য ছিল রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার। এখন গবেষণার বড় একটি অংশ রোগের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা কমানো এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দিকে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় টাইপ-১ ডায়াবেটিসে জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট ব্যবহারের সঙ্গে হৃদরোগ ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীর ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, জিএলপি-১ ওষুধ শুরু করা রোগীদের বড় ধরনের হৃদরোগজনিত ঘটনার পাঁচ বছরের ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল। শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগের ঝুঁকিও কম ছিল। তবে এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা, তাই ফলাফলকে সরাসরি কার্যকারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অন্যদিকে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে স্টেম সেল থেকে তৈরি ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ নিয়েও গবেষণা এগোচ্ছে। ২০২৬ সালে নেচার রিভিউ অ্যান্ডোক্রাইনোলজিতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, স্টেম সেল থেকে তৈরি প্যানক্রিয়াটিক বেটা সেল ও ইজলেট এখন টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য চিকিৎসা ও গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে এসব কোষ মানবদেহের স্বাভাবিক বেটা সেলের কতটা কাছাকাছি এবং প্রতিস্থাপনের পর কতটা কার্যকর ও নিরাপদ থাকবে—এসব প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে শর্করা মাপার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আঙুলে সুচ ফুটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে রক্তের শর্করা মাপার পাশাপাশি কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং বা সিজিএম প্রযুক্তি শরীরে গ্লুকোজের ওঠানামা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করেছে।
অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ
আইডিএফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যয় প্রায় ১১৫০ কোটি ডলার। বাংলাদেশে এর পরিমাণ প্রায় ১০৩ কোটি ডলার। ২০–৭৯ বছর বয়সী একজন ডায়াবেটিস রোগীর পেছনে বাংলাদেশে গড় স্বাস্থ্যব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৪ ডলার।
এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর পড়লে ডায়াবেটিস শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়।
.png)

-23faa3-256x144.webp)



-ab4e20.jpeg)


