চট্টগ্রামে বন্যার পরে বাড়ছে ডায়রিয়া, হাসপাতালে দুই শতাধিক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের ২৫০ শয্যা মেডিকেল কলেজে ভর্তি ডায়েরিয়া আক্রান্ত রোগী। স্ট্রিম ছবি

চট্টগ্রামে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ইতিমধ্যে দুই শতাধিক আক্রান্ত ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন, যাদের বড় অংশই শিশু।

সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত হয় জেলার বাঁশখালী উপজেলা। এতে চার দিন পানিবন্দী ছিল আকলিমা বেগমের পরিবার। পরে পরিবারের একাধিক সদস্য ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে দেড় বছর বয়সী মেয়ে লামিয়াকে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে।

আকলিমা বেগম বলেন, ‘বন্যার সময় চার দিন বাড়িতে পানি ছিল। পরে পরিবারের প্রায় সবাই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। মেয়েটির অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।’

আকলিমা বেগমদের মতো এবার চট্টগ্রাম নগরীতে জলমগ্ন ছিল পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর এলাকা। এতে পরিবারসহ দুই দিন পানিবন্দী ছিলেন সজীব মিয়া (২২)। পানি নেমে যাওয়ার পর হঠাৎ করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। এখন তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৬ নম্বর ডায়রিয়া কর্নারে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

সজীব বলেন, ‘পানি নেমে যাওয়ার পর ডিপ টিউবওয়েলের পানি পান করি। দুই-তিন দিনের মধ্যেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হই। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।’

সজীব বা লামিয়ার পরিবারের মতো অনেকেই চট্টগ্রামে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু। এদিকে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার (১৮ জুলাই) পর্যন্ত জেলার ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে ১১০ জন ভর্তি রয়েছেন, যাদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। অন্য দিকে নগরীর তিনটি প্রধান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ৯৬ জন, যাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু।

এদিকে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগরের বাবুল কলোনিতে অপরিষ্কার পানির ট্যাংক থেকেই ডায়রিয়ার সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। গত দুই দিনে ওই এলাকা থেকে অন্তত ১৭ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আবদুল মতিন (৭৫) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বোয়ালখালীর বাসিন্দা মো. ইউসুফ (৬০) বলেন, ‘বন্যার পর এলাকায় কয়েক দিন পানি জমে ছিল। এরপর থেকে অনেকেই পেটের সমস্যায় ভুগতে শুরু করে। আমারও ডায়রিয়া ও বমি শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি হই।’

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের রোগী সাতকানিয়ার আঞ্জুমান (৪৫) বলেন, ‘বন্যার কয়েক দিন পরই ডায়রিয়া ও বমি শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি পেয়েছি।’

হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে পটিয়ায় সর্বোচ্চ ২২ জন, ফটিকছড়িতে ১৫, আনোয়ারায় ১৩, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীতে ৯ জন করে, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও মীরসরাইয়ে ৭ জন করে, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডে ৬ জন করে, সাতকানিয়ায় ৫, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ এবং রাউজানে সর্বনিম্ন একজন ভর্তি রয়েছেন। এ ছাড়া জেলায় কর্ণফুলী নামে আরেকটি উপজেলা থাকলেও সেখানে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই।

চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে ৫২টি শিশু ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া মেডিসিন বিভাগের ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ২৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক চিকিৎসাধীন।

চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ২২ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু ওয়ার্ডে চারজন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে বর্তমানে ১৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং ১২ জন প্রাপ্তবয়স্ক।

বাবুল কলোনিতে পানির ট্যাংক থেকে সংক্রমণের ধারণা

চসিকের একটি মেডিকেল দল গতকাল শনিবার সকালে বাবুল কলোনি পরিদর্শন করে আক্রান্তদের সঙ্গে কথা বলে এবং পানির উৎস পরীক্ষা করে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, অপরিষ্কার পানির ট্যাংক থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে।

এলাকার আক্রান্তদের একটি অংশ বর্তমানে মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর মোহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ জন ভর্তি হলেও একজন ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে ১৩ জন চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু ও আটজন প্রাপ্তবয়স্ক।’

ডা. জাকির হোসাইন বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার সময় অধিকাংশ রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসার পর বর্তমানে সবার অবস্থা স্থিতিশীল।’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বন্যার পর ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়লেও স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জেলায় শতাধিক রোগী শনাক্ত হলেও এটি মহামারির পর্যায়ে যায়নি। আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই।’

তবে সিটি করপোরেশনের বাবুল কলোনির বিষয়ে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, সেখানে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পাঠিয়ে পানির উৎস ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজন হলে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাও করা হবে।

সিভিল সার্জন জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যে ৬৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করেছে। পাশাপাশি ওআরএস, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মেডিকেল টিমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি সবাইকে ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করা পানি পান, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডায়রিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত