জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনায় ৪৩ জনের নামে মামলা, হামলার কৌশল নিয়ে তোলপাড়

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যাওয়া ঠেকাতে পথে গভীর গর্ত করে সন্ত্রাসীরা। সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করে সোমবার (২৫ মে) রাতে মামলা করেছে পুলিশ। গত রোববার রাতে ভারী অস্ত্র ও বুলডোজার নিয়ে সেখানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর আগে গত রোববার (২৪ মে) রাতে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বুলডোজার ও ভারী অস্ত্রসহ প্রায় তিন শ লোকের হামলার এই ঘটনায় জড়িত হিসেবে ইয়াসিন বাহিনীর নাম উঠে এলেও এর প্রধানসহ অন্য সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সোহেল রানা একটি মামলা করেছেন। সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, মামলায় ঘটনাস্থল থেকে আটক করা পাঁচজনসহ ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিন শ জনকে আসামি করা হয়েছে। র‍্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেছেন, পুলিশ ও র‍্যাবের স্থায়ী ক্যাম্প উদ্বোধনের আগপর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ, র‍্যাব, এপিবিএন ও আরআরএফ সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সংগৃহীত ছবি
জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সংগৃহীত ছবি

'সামরিক ধাঁচে’ সড়ক কাটা, গুলি ও বুলডোজার

গত সোমবার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২৪ মে) রাত একটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে তিন দিক থেকে গুলি ছোড়া হয়। এতে রাইফেলের পাশাপাশি একে-৪৭-এর মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় অস্থায়ী ক্যাম্পের দেয়ালসহ র‍্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প। এর আগে ওই এলাকার পাঁচটি স্থানে সড়ক আগেই কেটে রাখা হয়েছিল। দুই ঘণ্টার গুলিবর্ষণ শেষে নির্বিঘ্নে চলে যায় প্রায় তিন শ সশস্ত্র ব্যক্তি।

এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববারের রাতে অনেকটা সামরিক কায়দায় হামলা ঘটেছে। হামলার আগে পাঁচটি স্থানে সড়ক কাটা হয়েছিল রিইনফোর্সমেন্ট বা সামরিক শক্তিবৃদ্ধি ঠেকানোর জন্য। পরে তিন দিক থেকে একযোগে গুলিবর্ষণকে সামরিক পরিভাষায় বলে 'ফায়ার অ্যান্ড মুভমেন্ট ট্যাকটিক্স'। শেষে বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের অবকাঠামো ধ্বংস করাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভাঙার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, 'যে চারটি ধাপে অপারেশন চালানো হয়েছে, তা কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী দলের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও কমান্ড কাঠামো আছে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান মনে করেন, এ ধরনের হামলার নকশা আঁকতে এলাকার মানচিত্র, প্রতিটি পথের গভীরতা, সম্ভাব্য সাহায্যকারী দল আসতে কত সময় নেবে—এই সব হিসাব আগে থেকে থাকতে হয়। এটি কোনো পূর্বপ্রস্তুতিহীন হামলা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অভিযান।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে সন্ত্রাসী বাহিনীর সংখ্যা সাধারণত কয়েক ডজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সলিমপুরে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের সশস্ত্র দলকে এক রাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে মোতায়েন করা নিছক গ্যাং-কালচারের লক্ষণ নয়। এর জন্য কমান্ড কাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, লজিস্টিক সক্ষমতা এবং সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রয়োজন হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক এক উপকমিশনার বলছেন, এই বাহিনীর অর্থায়নের উৎসও স্পষ্ট। অস্ত্র কেনা, বুলডোজার ভাড়া করা এবং তিন শ মানুষকে রাতের বেলা পরিচালনা করার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা প্রয়োজন। জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে গড়ে ওঠা তাঁদের সাম্রাজ্যই এই অর্থের জোগান দিয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে হামলায় অভিযুক্ত ইয়াসির বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন। সংগৃহীত ছবি
জঙ্গল সলিমপুরে হামলায় অভিযুক্ত ইয়াসির বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন। সংগৃহীত ছবি

আবারও ইয়াসিন বাহিনীর নাম, তবুও অধরা

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। একই সময়ে আহত হন তিন র‍্যাব সদস্য। এ ঘটনায় ২৯ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়। ওই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন ইয়াসিন। পরে মামলায় চারজন গ্রেপ্তার হলেও তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এদিকে র‍্যাব সদস্য হতাহতের পর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির তিন সহস্রাধিক সদস্যের যৌথ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ হারায় সন্ত্রাসীরা। ওই অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পালিয়ে যান ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিনসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। মার্চের ওই অভিযানের পরই স্বস্তি পেয়েছিল প্রশাসন। ইতিমধ্যে জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, কারাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু আড়াই মাসের মাথায় গত রোববার রাতে প্রায় তিন শ সশস্ত্র লোক নিয়ে হামলা চালিয়েছে ইয়াসিন বাহিনী। এতে ঢাকা পড়েছে মার্চের অভিযানের সাফল্য। গতকাল সোমবার অভিযানের পর র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন যে যৌথ বাহিনীর অভিযানে জঙ্গল সলিমপুর থেকে বিতাড়িত সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপই এই হামলা চালিয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যাওয়া ঠেকাতে পথে গভীর গর্ত করে সন্ত্রাসীরা। সংগৃহীত ছবি
জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যাওয়া ঠেকাতে পথে গভীর গর্ত করে সন্ত্রাসীরা। সংগৃহীত ছবি

অবৈধ বসতি থেকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী আলী আক্কাস ও তাঁর লোকজন। পরে র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর তাঁর সহযোগীরা এলাকাটি ভাগ করে নেয়। এর ধারাবাহিকতায় মাথা তোলে ‘ইয়াসিন বাহিনী’ ও ‘রোকন বাহিনী’ নামে প্রধান দুটি গ্রুপ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ সাল থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে বসতি শুরু হয়। সলিমপুরের পুরো ছিন্নমূল এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয় ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য। একসময় ওই অংশে এসে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। তবে বর্তমানে সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি উচ্চবিত্তরাও জায়গা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারাও আছেন। এ ছাড়া আলীনগর এলাকাটি ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে পরিচালিত হলেও তাঁর পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে ইয়াসিনের হাতে। মূলত এই সমিতি দেখাশোনা করেন ইয়াসিনের ছোট ভাই ওমর ফারুক ও ভাগনে আনোয়ার। আরও রয়েছেন নুরুল হক ভাণ্ডারি, মোর্শেদ, কালা ফারুক, মেহেদী হাসানসহ কয়েকজন। মার্চে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর তাঁরাও সবাই গা-ঢাকা দিয়েছেন।

এলাকাবাসী জানান, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা ছিল রোকন এবং আলীনগর এলাকা ছিল ইয়াসিনের দখলে। তাঁরা দেশের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের স্বল্পমূল্যে পাহাড়ে ঘর করার সুযোগ করে দিতেন। নিজেরা গড়ে তুলেছিলেন অস্ত্র ও মাদকের সাম্রাজ্য। নগরী ও আশপাশের জেলার সন্ত্রাসীদের কাছে নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে এই দুর্গম অঞ্চলটি। সলিমপুরের পাহাড়ে অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০০৪ সালে একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২০১০ সালে স্থানীয় লাল বাদশা ও আক্কাসের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই বছরের ২৩ মে র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আক্কাস নিহত হন। এরপর ছিন্নমূল এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিভিন্নজনের কাছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, একসময় আমিন টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ইয়াসিন। ছিন্নমূল এলাকার নেতা আলী আক্কাসের সঙ্গে সলিমপুরে আসেন তিনি। এরপর আক্কাস ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ নিলে ইয়াসিন নেন আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ে দুর্গম জঙ্গলের আড়ালে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে দেশের প্রচলিত আইন চলত না বললেই চলে। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ইয়াসিন বাহিনী দশকের পর দশক ধরে একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তুলেছে। স্থানীয় মানুষের আশ্রয়-প্রশ্রয়, অস্ত্রের মজুত, অর্থের উৎস এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র সংগঠনের আদল নিচ্ছে।

কোথায় থেকে এল একে-৪৭, কী বার্তা দেয়

রোববার হামলায় একে-৪৭-এর মতো আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাকে উদ্বেগের বিষয় মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এই অস্ত্র বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। একযোগে একাধিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার জানান দিচ্ছে যে ইয়াসিন বাহিনীর লজিস্টিক নেটওয়ার্ক অনেক গভীরে প্রোথিত। এ ছাড়া অস্ত্রসহ নিরাপদে পালানোর ‘রুট ম্যানেজমেন্ট’ আগে থেকে করা না থাকলে এটি সম্ভব হতো না।

চট্টগ্রামের ওই সাবেক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভাণ্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো পলাতক। দলের প্রধান এলাকার বাইরে থেকেও বাহিনীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা গ্রুপের পরিপক্বতার ইঙ্গিত। ফলে 'নেতা ধরলে বাহিনী শেষ হয়ে যাবে'—এই ধারণায় মোকাবিলা করা বিপজ্জনক।

মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, 'বুলডোজার ও আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসহ তিন শ মানুষ অপারেশন শেষে নির্বিঘ্নে ফিরে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি হামলা নয়। এটি একটি বার্তা যে, "আমরা গেছি, কিন্তু শেষ হয়ে যাইনি।" সেই বার্তার জবাব রাষ্ট্র কীভাবে দেয়, তার ওপর নির্ভর করছে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের ভবিষ্যৎ।'

মার্চে বড় অভিযানের পর তিন মাসেও মূল নেতারা ধরা না পড়ায় তাঁরা কোথায় থেকে কীভাবে যোগাযোগ রাখছেন, তাঁদের সহায়তাকারীদের নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রোববার রাতে হামলায় ইয়াসিন, রোকন বা যারাই জড়িত থাকুক, সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

সম্পর্কিত