ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন/তালাবদ্ধ ছিল পাঁচ সিঁড়ির চারটিই, মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ময়মনসিংহ

মমেক হাসপাতালে আগুনের পর এখনো কাটেনি আতঙ্ক। স্ট্রিম ছবি
মমেক হাসপাতালে আগুনের পর এখনো কাটেনি আতঙ্ক। স্ট্রিম ছবি

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও হাসপাতালের নতুন ভবনের ছয়তলার শিশু ওয়ার্ডের একটি গুদামঘরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল। ফায়ার সার্ভিস গিয়ে ওই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই সময় একটি সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হন অনেকে। এবারও একই ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্য নাকচ করলেও হুড়োহুড়িতে আহত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করছেন স্বজনেরা। আরও চারজনের মৃত্যু নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি। তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, হাসপাতালের সিঁড়িগুলোর গেট তালাবদ্ধ থাকা নিয়ে।

পাঁচ সিঁড়ির চারটিই থাকে তালাবদ্ধ

হৃদরোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মাকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেলের নতুন ভবনের চারতলায় হৃদরোগ বিভাগে আছেন জামালপুরের ইসলামপুরের ইয়াসমিন। সোমবার সন্ধ্যায় ভবনটিতে আগুন লাগলে অন্যদের মতো তিনিও মাকে নিয়ে প্রাণভয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে একসঙ্গে সবাই নামতে গিয়ে মানুষের হুড়োহুড়ি আর চাপে পড়ে তিনি নিজেও আহত হন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হারিয়েছেন ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র, পরীক্ষার রিপোর্ট, কাপড়ের ব্যাগ ও সবচেয়ে জরুরি টাকা। সব হারিয়ে মাকে এখন কীভাবে চিকিৎসা করাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিশেহারা তিনি। একই পরিস্থিতি অনেক রোগী ও স্বজনের।

হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির চারটিই তালাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ। স্ট্রিম ছবি
হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির চারটিই তালাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ। স্ট্রিম ছবি

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আটতলা নতুন ভবনটিতে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি রয়েছে। লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালা দেওয়া থাকে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার গেটে তালা ঝুলছে। ব্যবহার না হওয়ায় কয়েকটি গেটে ধরেছে মরিচাও। গতকাল অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনেরা এসব গেট ও তালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কয়েকটি গেট এখনো ভাঙা অবস্থায় আছে।

তালাবদ্ধ সিঁড়ির কী দরকার

আটতলার কেবিনে মেয়েকে নিয়ে আছেন ফারিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর আতঙ্কে সবাই ছোটাছুটি শুরু করে। আমরাও বের হই। দেখতে পাই কেবিনের পাশের সিঁড়িটিতে তালা দেওয়া। ইট দিয়ে তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু তালা না ভাঙ্গলেও সিটকিনির আংটা ভেঙ্গে ফেলা হয়। কিন্তু এক সিঁড়ি নিচে গিয়ে দেখি সেখানেও তালা দেওয়া। উপায় না পেয়ে আবার কেবিনে ফিরে আসি আর কান্না করতে থাকি। মনে হচ্ছিল আজই শেষ দিন।’

মমেক হাসপাতালে আগুনে আতঙ্কিত স্বজন-রোগীরা ইট দিয়ে তালা ভেঙে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। স্ট্রিম ছবি
মমেক হাসপাতালে আগুনে আতঙ্কিত স্বজন-রোগীরা ইট দিয়ে তালা ভেঙে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। স্ট্রিম ছবি

আরেক রোগীর স্বজন আশরাফ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিঁড়ি যদি তালাবদ্ধই রাখা হয় তাহলে সিঁড়ি বানানোর দরকার কী ছিল। সিঁড়িগুলো খোলা থাকলে একটি মাত্র সিঁড়িতে এমন হুড়োহুড়িও হতো না আর হতাহতও হত না। বাধ্য হয়ে সবাইকে একটি সিঁড়ি দিয়েই নামতে হয়েছে।

নাতনিকে নিয়ে হাসপাতালের অষ্টম তলার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে আছেন ভালুকার রাজিয়া খাতুন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর শিশুদের নিয়ে একটি কক্ষের এক কোণে সরে যাই। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় পুরো জায়গা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। নিচে নামার কোনো সুযোগ কেউ পায়নি। নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন ১০০-১৫০ মানুষকে এক কোণে নিয়ে রাখেন। এসময় আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অনেকেই বমি করছিলেন, কারও মাথা ঘুরছিল। শিশুদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।

সিঁড়ি বন্ধে নিরাপত্তার অজুহাত

নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি দিয়ে নিয়মিত মানুষ চলাচল করেন জানিয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক বলেন, অন্য সিঁড়িগুলো সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। নিরাপত্তার কারণে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়। তবে আজ সিঁড়িগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুর তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর হাসপাতালের একটি রেজিস্টারের পাতার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া হতাহত ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে ওই রেজিস্টারের তথ্যের মিল আছে। রেজিস্টারের পাতাটি হাসপাতালের বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।

রেজিস্টারের ওই পাতায় পাঁচজনের তথ্য আছে। তাদের মধ্যে ফুলবাড়িয়া উপজেলার জাহানারা বেগম (৫০) ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের নামের পাশে ‘ব্রট ডেড’ (মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা) লেখা আছে।

রেজিস্টার অনুযায়ী, তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে মারা যান। স্বজনদের দাবি, তারা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন।

মমেকে আগুনের ক্ষতচিহ্ন । স্ট্রিম ছবি
মমেকে আগুনের ক্ষতচিহ্ন । স্ট্রিম ছবি

অন্যদিকে পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের ভূগী জাওয়ানী গ্রামের আইয়ুব আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগম (৫০) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮) সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে মারা যান বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এই চারজনের মৃত্যুর বিষয়ে মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, পদদলিত হয়ে মারা গেলে শরীরে যে ধরনের চিহ্ন বা উপসর্গ থাকার কথা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা ওই চারজনের শরীরে তেমন কোনো চিহ্ন পাননি। তারা কীভাবে মারা গেছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।

হাসপাতালের রেজিস্টারে চারজনকে ‘ব্রট ডেড’ এবং ঘটনার ধরন হিসেবে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লেখার বিষয়ে মাইনউদ্দিন খান বলেন, ঘটনার পর কতজন হাসপাতালে এসেছেন, তার হিসাব রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট নার্স রেজিস্টারে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লিখে ওই চারজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে তারা আগুনে মারা গেছেন।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। তিনি নিজেই সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি আছেন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত