ড. মো. আবু সালেহ

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা, আত্মসংযম এবং কঠোর ইবাদতের পর ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনের জন্য এক আনন্দগঘন দিন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মানবতার জয়গান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে এই উৎসবটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশ একটি ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঈদ হয়ে উঠতে পারে সেই ‘অদৃশ্য দেয়াল’ ভাঙার প্রধান কারিগর, যা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকে বিভক্ত করে রেখেছে।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'পলিটিক্স'-এ উল্লেখ করেছেন, “মানুষ স্বভাবগতভাবেই একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব”। তাঁর মতে, মানুষ কেবল একাকী টিকে থাকতে পারে না, তার অস্তিত্বের পূর্ণতা আসে সমাজের ভেতরে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। মানুষের প্রতিটি সামাজিক কর্মকাণ্ড, তা হোক পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা ধর্মীয় উৎসব, সবকিছুর ভেতরেই একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সত্তা বিদ্যমান। কারণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং এটি হলো মানুষের পারস্পরিক সংহতি এবং গোষ্ঠীগতভাবে টিকে থাকার একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর যখন উদযাপিত হয়, তখন মানুষের এই ‘রাজনৈতিক সত্তা’টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। উৎসবের আবহে মানুষ যখন একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে, তখন সেখানে কেবল আবেগ থাকে না, থাকে এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা। ফলে ঈদুল ফিতরের মত ধর্মীয় উৎসব সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ‘মদিনা সনদের’ আলোকে দেশ পরিচালনা করবে। মদিনা সনদ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল। ঈদের এই মহতী লগ্নে মদিনা সনদের সেই আদর্শিক বার্তাটি রাজনৈতিক মেলবন্ধনের প্রধান সূত্র হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী যখন মদিনা সনদের কথা বলেন, তখন তা মূলত একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের ইঙ্গিত দেয়। ঈদের নামাজে যখন সরকার প্রধান-জনগণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়, তখন মদিনা সনদের সেই চিরন্তন সাম্যের প্রতিফলনই আমরা দেখতে পাই। মদিনা সনদের আদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা গেলে তা রাজনৈতিক মেলবন্ধন ও সামাজিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
অতীতে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ঈদগুলো ছিল এক অভাবনীয় উল্লাসের। দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের সেই ঈদ ছিল গণতন্ত্রের নতুন ভোরের প্রতীক। ২০২৬ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঈদ সেই নব্বইয়ের স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনে, তবে এর প্রেক্ষাপট আরও আধুনিক ও জটিল।
নব্বইয়ের দশকের রাজনীতি ছিল প্রথাগত দ্বিদলীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু ২০২৬-এর ঈদ রাজনীতিতে আমরা দেখছি নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের আকাঙ্ক্ষা। নব্বইয়ের ঈদ যদি হয় ‘গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’, তবে ২০২৬-এর ঈদ হলো ‘রাষ্ট্রের গুণগত রূপান্তর’ বা রিফর্মেশনের বার্তা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রমজান মাস মানেই হলো ইফতার মাহফিলের রাজনীতি। এটি একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম যেখানে রাজনীতির ‘হার্ড পাওয়ার’ বা কঠোর অবস্থানের বদলে ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার সওয়াব সেই রোজাদারের সমান হবে...”।
২০২৬ সালের চিত্রটি গত দশকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে ইফতার মাহফিলগুলো আর কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ নেই; বরং এগুলো হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন। দীর্ঘকাল যারা রাজনৈতিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক অবস্থানে ছিলেন, পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে তারা পুনরায় তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইফতারের এই মিলনমেলা আজ দল-মত ও শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষকে এক কাতারে শামিল করছে। উৎসবের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতিই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬-এর ঈদে আমরা এক অভূতপূর্ব ‘সামাজিক পুনর্মিলন’ দেখতে পাচ্ছি। দীর্ঘ দেড় দশক যারা রাজনৈতিক কারণে নিজ এলাকায় ফিরতে পারেননি, তারা এই অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের পর স্বদর্পে এলাকায় ফিরছেন। এই ‘শিকড়ে ফেরা’ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর এলাকায় ফিরে তারা যখন প্রতিবেশী ও সাধারণ ভোটারদের সাথে কোলাকুলি করছেন, তখন একটি বিশাল সামাজিক দূরত্ব ঘুচে যাচ্ছে। বিপরীতে, যারা বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোণঠাসা বা চাপের মুখে আছেন, তাদের পরিবারের প্রতিও জয়ী পক্ষগুলোর মানবিক আচরণ প্রদর্শনের এক বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই দ্বিমুখী পরিস্থিতিই মূলত সমাজকে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে, দেশ কি প্রতিশোধের রাজনীতিতে ফিরে যাবে নাকি উদারতার আদর্শে স্থিত হবে?
অ্যারিস্টটলের দর্শনে সমাজ ও রাষ্ট্র অভিন্ন; তাই ধর্মীয় উৎসবের এই বিশাল জমায়েত মূলত একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষের সাথে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও হৃদ্যতার সম্পর্ককে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজি বলা হয়। রাজনীতিবিদরা এই সামাজিক পুঁজিকে ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল’ বা রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করেন।
২০২৬-এর ঈদে যারা নতুন করে মাঠে সক্রিয় হয়েছেন, তারা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে সেই হারানো আস্থা পুননির্মাণের চেষ্টা করছেন। যখন একজন নেতা দম্ভ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি মানুষের ‘আবেগীয় সমর্থন’ লাভ করেন। এই সমর্থনই হলো প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি, যা কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই সাধারণ মানুষের আনুগত্য নিশ্চিত করে।
২০২৬ সালের ঈদ রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ হলো ‘জেনারেশন জেড’ বা তরুণ প্রজন্ম। অভ্যুত্থানের মূল কারিগর এই তরুণরা প্রথাগত দলবাজি বা পেশিশক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে ঈদ মানে কেবল নতুন পোশাক নয়, বরং এটি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। তারা রাজনীতিবিদদের কাছে জবাবদিহিতা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমন্বয় দেখতে চায়।
ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বা শহরের আড্ডায় এই তরুণরা যখন রাজনীতিবিদদের মুখোমুখি হচ্ছে, তারা প্রশ্ন তুলছে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে। তরুণদের এই সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, রাজনীতি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি উৎসবের অপরিহার্য আলোচনার অংশে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির এই উত্তাল সময়ে এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দকে কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছে। এই সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নাগরিকরা অনেক বেশি সচেতন। তারা নেতাদের কাছে কেবল ভাষণ নয়, বরং সংকটের সময়ে পাশে থাকার দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি চায়। রাজনীতিবিদরা যখন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের বিপদে ‘ঈদ উপহার’ বা সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ান, তখন তারা মূলত একটি মানবিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। মানুষের সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতিই দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান শক্তি।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের ঈদ বাংলাদেশের জন্য কেবল উৎসবের দিন নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। অ্যারিস্টটলের দর্শন অনুযায়ী মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক জীব এবং রাজনীতির মূলে যেহেতু মানুষের কল্যাণ, তাই ঈদ থেকে সেই নির্যাস গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার কাজ।
নব্বইয়ের স্মৃতি আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৬ এর এই ঈদ প্রতিহিংসার আগুন নিভিয়ে ভালোবাসার মাধ্যমে একটি নতুন ভোরের সূচনা করুক। অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার এই প্রচেষ্টা যেন কেবল ঈদের দিনের কোলাকুলিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক সম্পর্কের এই মেলবন্ধন যেন জাতীয় ঐক্য ও সহনশীলতার স্থায়ী রূপ লাভ করে। ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
ইমেইলঃ [email protected]

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা, আত্মসংযম এবং কঠোর ইবাদতের পর ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনের জন্য এক আনন্দগঘন দিন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মানবতার জয়গান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে এই উৎসবটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশ একটি ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঈদ হয়ে উঠতে পারে সেই ‘অদৃশ্য দেয়াল’ ভাঙার প্রধান কারিগর, যা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকে বিভক্ত করে রেখেছে।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'পলিটিক্স'-এ উল্লেখ করেছেন, “মানুষ স্বভাবগতভাবেই একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব”। তাঁর মতে, মানুষ কেবল একাকী টিকে থাকতে পারে না, তার অস্তিত্বের পূর্ণতা আসে সমাজের ভেতরে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। মানুষের প্রতিটি সামাজিক কর্মকাণ্ড, তা হোক পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা ধর্মীয় উৎসব, সবকিছুর ভেতরেই একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সত্তা বিদ্যমান। কারণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং এটি হলো মানুষের পারস্পরিক সংহতি এবং গোষ্ঠীগতভাবে টিকে থাকার একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর যখন উদযাপিত হয়, তখন মানুষের এই ‘রাজনৈতিক সত্তা’টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। উৎসবের আবহে মানুষ যখন একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে, তখন সেখানে কেবল আবেগ থাকে না, থাকে এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা। ফলে ঈদুল ফিতরের মত ধর্মীয় উৎসব সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ‘মদিনা সনদের’ আলোকে দেশ পরিচালনা করবে। মদিনা সনদ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল। ঈদের এই মহতী লগ্নে মদিনা সনদের সেই আদর্শিক বার্তাটি রাজনৈতিক মেলবন্ধনের প্রধান সূত্র হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী যখন মদিনা সনদের কথা বলেন, তখন তা মূলত একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের ইঙ্গিত দেয়। ঈদের নামাজে যখন সরকার প্রধান-জনগণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়, তখন মদিনা সনদের সেই চিরন্তন সাম্যের প্রতিফলনই আমরা দেখতে পাই। মদিনা সনদের আদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা গেলে তা রাজনৈতিক মেলবন্ধন ও সামাজিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
অতীতে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ঈদগুলো ছিল এক অভাবনীয় উল্লাসের। দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের সেই ঈদ ছিল গণতন্ত্রের নতুন ভোরের প্রতীক। ২০২৬ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঈদ সেই নব্বইয়ের স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনে, তবে এর প্রেক্ষাপট আরও আধুনিক ও জটিল।
নব্বইয়ের দশকের রাজনীতি ছিল প্রথাগত দ্বিদলীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু ২০২৬-এর ঈদ রাজনীতিতে আমরা দেখছি নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের আকাঙ্ক্ষা। নব্বইয়ের ঈদ যদি হয় ‘গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’, তবে ২০২৬-এর ঈদ হলো ‘রাষ্ট্রের গুণগত রূপান্তর’ বা রিফর্মেশনের বার্তা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রমজান মাস মানেই হলো ইফতার মাহফিলের রাজনীতি। এটি একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম যেখানে রাজনীতির ‘হার্ড পাওয়ার’ বা কঠোর অবস্থানের বদলে ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার সওয়াব সেই রোজাদারের সমান হবে...”।
২০২৬ সালের চিত্রটি গত দশকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে ইফতার মাহফিলগুলো আর কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ নেই; বরং এগুলো হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন। দীর্ঘকাল যারা রাজনৈতিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক অবস্থানে ছিলেন, পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে তারা পুনরায় তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইফতারের এই মিলনমেলা আজ দল-মত ও শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষকে এক কাতারে শামিল করছে। উৎসবের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতিই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬-এর ঈদে আমরা এক অভূতপূর্ব ‘সামাজিক পুনর্মিলন’ দেখতে পাচ্ছি। দীর্ঘ দেড় দশক যারা রাজনৈতিক কারণে নিজ এলাকায় ফিরতে পারেননি, তারা এই অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের পর স্বদর্পে এলাকায় ফিরছেন। এই ‘শিকড়ে ফেরা’ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর এলাকায় ফিরে তারা যখন প্রতিবেশী ও সাধারণ ভোটারদের সাথে কোলাকুলি করছেন, তখন একটি বিশাল সামাজিক দূরত্ব ঘুচে যাচ্ছে। বিপরীতে, যারা বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোণঠাসা বা চাপের মুখে আছেন, তাদের পরিবারের প্রতিও জয়ী পক্ষগুলোর মানবিক আচরণ প্রদর্শনের এক বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই দ্বিমুখী পরিস্থিতিই মূলত সমাজকে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে, দেশ কি প্রতিশোধের রাজনীতিতে ফিরে যাবে নাকি উদারতার আদর্শে স্থিত হবে?
অ্যারিস্টটলের দর্শনে সমাজ ও রাষ্ট্র অভিন্ন; তাই ধর্মীয় উৎসবের এই বিশাল জমায়েত মূলত একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষের সাথে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও হৃদ্যতার সম্পর্ককে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজি বলা হয়। রাজনীতিবিদরা এই সামাজিক পুঁজিকে ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল’ বা রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করেন।
২০২৬-এর ঈদে যারা নতুন করে মাঠে সক্রিয় হয়েছেন, তারা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে সেই হারানো আস্থা পুননির্মাণের চেষ্টা করছেন। যখন একজন নেতা দম্ভ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি মানুষের ‘আবেগীয় সমর্থন’ লাভ করেন। এই সমর্থনই হলো প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি, যা কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই সাধারণ মানুষের আনুগত্য নিশ্চিত করে।
২০২৬ সালের ঈদ রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ হলো ‘জেনারেশন জেড’ বা তরুণ প্রজন্ম। অভ্যুত্থানের মূল কারিগর এই তরুণরা প্রথাগত দলবাজি বা পেশিশক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে ঈদ মানে কেবল নতুন পোশাক নয়, বরং এটি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। তারা রাজনীতিবিদদের কাছে জবাবদিহিতা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমন্বয় দেখতে চায়।
ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বা শহরের আড্ডায় এই তরুণরা যখন রাজনীতিবিদদের মুখোমুখি হচ্ছে, তারা প্রশ্ন তুলছে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে। তরুণদের এই সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, রাজনীতি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি উৎসবের অপরিহার্য আলোচনার অংশে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির এই উত্তাল সময়ে এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দকে কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছে। এই সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নাগরিকরা অনেক বেশি সচেতন। তারা নেতাদের কাছে কেবল ভাষণ নয়, বরং সংকটের সময়ে পাশে থাকার দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি চায়। রাজনীতিবিদরা যখন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের বিপদে ‘ঈদ উপহার’ বা সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ান, তখন তারা মূলত একটি মানবিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। মানুষের সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতিই দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান শক্তি।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের ঈদ বাংলাদেশের জন্য কেবল উৎসবের দিন নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। অ্যারিস্টটলের দর্শন অনুযায়ী মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক জীব এবং রাজনীতির মূলে যেহেতু মানুষের কল্যাণ, তাই ঈদ থেকে সেই নির্যাস গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার কাজ।
নব্বইয়ের স্মৃতি আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৬ এর এই ঈদ প্রতিহিংসার আগুন নিভিয়ে ভালোবাসার মাধ্যমে একটি নতুন ভোরের সূচনা করুক। অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার এই প্রচেষ্টা যেন কেবল ঈদের দিনের কোলাকুলিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক সম্পর্কের এই মেলবন্ধন যেন জাতীয় ঐক্য ও সহনশীলতার স্থায়ী রূপ লাভ করে। ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
ইমেইলঃ [email protected]

বিএনপি সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আহমেদুল কবির। তবে তিনিও মনে করেন, শুধু সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে নারীকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
৬ ঘণ্টা আগে
ঈদুল ফিতর ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আসলে শুরু হয় রোজা শুরুর আগেই। আমদানিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে বেসরকারি খাত। খাদ্যসহ কিছু পণ্যসামগ্রী আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় আরও আগে। সরকার প্রয়োজনে কর-শুল্ক ছাড় দেয় ওইসব পণ্যের বাজার শান্ত রাখতে। আমদানিতে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংক খাত।
১৪ ঘণ্টা আগে
ঈদ, পূজা বা কোনো সরকারি ছুটি এলেই ঢাকা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ চলে যায় গ্রাম নামক শিকড়ে। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপ—সব জায়গাতেই তখন উঠে আসে ‘ফাঁকা ঢাকা’র গল্প।
১৬ ঘণ্টা আগে
ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে তেহরানের এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী নাও হতে পারে। তদুপরি, এই প্রভাব সবখানে সমান নয়।
১ দিন আগে