জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরা আর আমাদের উন্নয়নপাঠ

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ১৭: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই দাবি করেছিলেন গত ১০ মে ঢাকা লেডিস ক্লাবে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এর ঠিক ১৫ দিনের মাথায় গত ২৫ মে টাঙ্গাইলে যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে ট্রাক উল্টে নিহত হন ১৫ জন।

বাসের চেয়ে কম ভাড়ায় বাড়ি যেতে পারবেন—এই আশায় তারা উঠেছিলেন রডবোঝাই একটি ট্রাকে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রডবোঝাই ট্রাকটি যাত্রী নিয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। সরাতৈল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে পড়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। গণমাধ্যমের খবর বলছে, নিহতদের সবাই শ্রমজীবী ও দিনমজুর।

তাঁরা ঢাকা শহরে বিভিন্ন কাজ করতেন। পরিবারকে ভালো রাখতে গিয়ে মানুষগুলো ঢাকা শহরে মানবেতর জীবন-যাপন করেন। ঈদে বাড়ি ফেরার সময়েও যাদের চিন্তা থাকে, কিছু কম পয়সায় যদি বাড়ি যাওয়া যায়। উপরন্তু ঈদের সময় বাস ও ট্রেনে টিকিট পাওয়াও সহজ নয়। সব মিলিয়ে যে মানুষগুলোর ঈদযাত্রা পরিণত হলো মরণযাত্রায়—তার দায় কার? রাষ্ট্র কি এই মৃত্যুর দায় নেবে?

এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এই ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাক চালকের ভুল। এ কথার সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ কম। চালকের ভুল, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং বেপরোয়ো গতিই যে অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী—সেটি নির্মম বাস্তবতা।

কিন্তু যে শ্রমজীবী মানুষগুলো বাস বা ট্রেনে না উঠে বা উঠতে না পেরে রডবোঝাই ট্রাকে বাড়ির দিকে রওনা হলেন, তাদের কী দোষ? গরিব হওয়াই তাদের অপরাধ? ঈদের সময় বোঝাই ট্রাক; লঞ্চের ছাদে; লোকাল ও লক্করঝক্কর বাসে হাজারো গরিব মানুষকে দুই ঈদের সময় এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যেতে হয় কেন? বছরের দুটি ঈদেই আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগ হয়। সারা বছর তাদের যেসব কাজ জমে থাকে, সেগুলো ঈদের ছুটিতে গিয়ে করতে হয়। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে যেভাবে পারে বাড়ির পথে রওনা হয়।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল মানুষ যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারে এবং ঈদ শেষে ঢাকায় আসতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। এটা ঠিক যে, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশ এবং যে দেশে ঈদের সময় প্রায় পৌনে এক কোটি মানুষ রাজধানী ছেড়ে যায়। সবার জন্য আরামদায়ক ও স্বস্তিদায়ক গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রকে একটি সিস্টেম অন্তত গড়ে তুলতে হয়। পরিবহন খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে হয়। ঈদের সময় সরকারি ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত যানবাহনের ব্যবস্থা করা গেলে এবং প্রতিটা রুটে ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়ানো গেলে অনেক বেশি মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।

রাস্তাঘাটে যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পদক্ষেপের কথা বলা হয়। কিন্তু প্রতি বছরই এগুলো কথার ফুলঝুরিতে পরিণত হয়। মানুষের ভোগান্তি কমে না। শুধু অতিরিক্ত জনসংখ্যার দোহাই দিয়ে যেমন দায় ও দায়িত্ব এড়ানো যায় না, তেমনি এত বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশে যেকোনো সিস্টেম সফল করা যে বেশ কঠিন—সেই সত্যটিও উপলব্ধি করা দরকার। কিন্তু রাষ্ট্র তার সমর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু করতে পারছে কি না, সেটি হচ্ছে প্রশ্ন। এই জায়গায় বিরাট শূন্যতা রয়ে গেছে। রয়ে গেছে বলেই রাষ্ট্রের যাবতীয় উন্নয়ন মুখথুবড়ে পড়ে ঈদযাত্রায় এসে।

গত রোজার ঈদের যাত্রাও সুখকর হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ১১৬ জন, বাসযাত্রী ৪১ জন, ট্রাক-পিকআপ আরোহী ১৩ জন, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৫০ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নছিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ৯ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ২ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ।

এসব দুর্ঘটনার পেছনে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণেকেই দায়ী করা হয়। সমস্যাগুলো সমাধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে সড়কে প্রাণহানির দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হয়।

এবারের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি হবে না; এবারের ঈদযাত্রা অতীতের চেয়ে ভালো হবে—টিভি ক্যামেরার সামনে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এই বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য। প্রতি বছর সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল আর ভয়াবহ যানজটে ভোগান্তিতেই তা স্পষ্ট হয়।

চারিদিকে উন্নয়নের ছড়াছড়ি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু। ঢাকা শহরে মেট্রোরেল। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। আরও কত কী! কিন্তু এইসব উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে কতজন? আমাদের সব উন্নয়ন কেন ঈদযাত্রায় এসে আছড়ে পড়ে?

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অধীনে রেলপথ সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়কপথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে। নৌপরিবহন উন্নত ও জনবান্ধব করতে হবে। বিআরটিসির রুট বিস্তৃত করে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঈদযাত্রায় পোশাকশ্রমিকেরা যাতে পর্যায়ক্রমে ছুটি উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পোশাকশ্রমিকদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে পরবর্তী সব ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে।

আমাদের সকল উন্নয়ন যে ঈদযাত্রায় এসে মার খায়। এখানে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, সেতু, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে। কিন্তু ঈদের সময় যে প্রায় পৌনে এক কোটি মানুষ একসঙ্গে ঢাকা ছাড়ে। এই বিশাল চাপ সামাল দেওয়ার মতো সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

বলাই হয়, বাংলাদেশ একটি প্রকল্পশাসিত রাষ্ট্র। এখানে সবকিছু প্রকল্পনির্ভর। প্রকল্প মানেই বাজেট। প্রকল্প মানেই কমিশন। সুতরাং কোন প্রকল্প কত কোটি মানুষের উপকারে আসবে, তার চেয়ে বেশি বিবেচনায় থাকে এই প্রকল্প থেকে রাজনীতিবিদ, তাদের নেতাকর্মী, আমলা, ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ারসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কার কত কমিশন থাকবে। কে কত টাকা এখান থেকে কামাবেন।

আমাদের উন্নয়নগুলোর মূল ফোকাস থাকে দৃশ্যমানতা। অর্থাৎ মানুষকে দেখানো হয় যে এই দেখো বিরাট প্রকল্প। কিন্তু ওই বিরাট প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য যেসব আনুষঙ্গিক বিষয় প্রয়োজন। অনেক সময় সেগুলোর অনুপস্থিতি প্রকল্পের সফলতা ম্লান করে দেয়। যেমন চওড়া রাস্তা বা সেতু নির্মাণ করা হলো, কিন্তু ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট দুর্বল। রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং। অদক্ষ চালকের হাতে স্টিয়ারিং। একজন চালককে দিয়ে একটানা ২৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি গাড়ি চালানো; তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না দেয়া—এরকম বহুবিধ কারণে উন্নত রাস্তা ও সেতুর সুফল মানুষ নাও ভোগ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুরো বাংলাদেশ একটি শহরের ভেতরে খাবি খায়। সেই শহরটির নাম ঢাকা। বছরের পর বছর ধরে এই শহরের বিকেন্দ্রীকরণের গল্পগুলো শুধু কাগজের পাতাতেই লুটোপুটি খায়। শ্রমজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকার—সকলের অবধারিত গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। কেন প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ঢাকা শহরকে ছড়িয়ে দেয়া গেল না বা যাচ্ছে না? কেন সবকিছু ঢাকাতেই হতে হবে? কেন সকল কাজের সুযোগ একটি শহরে সীমিত হয়ে পড়বে? কেন হাওরে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না? কেন সেই মানুষগুলোকে দলে দলে ঢাকায় এসে অটোরিকশার চালক হতে হয়? এই কেনগুলোর উত্তর কি রাষ্ট্র খুঁজেছে? কেন কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকের এত সংকট এবং এই সংকটের ফলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কৃষি যে কী ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছে, সেই খবর কি আমরা রাখি?

কৃষির যতই যান্ত্রিকীকরণ হোক না কেন, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির ফলে হাওরে যখন আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার প্রয়োজন হলো, তখন ওই ধান মেশিনে মাড়াই করার সুযোগ ছিল না। সেখানে প্রয়োজন ছিল শ্রমিকের। কিন্তু প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ঝড় বাদল অতিবৃষ্টি আর বন্যার দেশে সব সময় সব সমাধান মেশিন দেবে না, দেয় না। এটা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।

কিন্তু কৃষিশ্রমিক কিংবা শ্রমজীবী মানুষেরা যে নিজের জেলা বা উপজেলায় কিংবা গ্রামে বসবাস করবেন, বছরের অন্য সময়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। সারা দেশে সেরকম কাজের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারেও রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে যে, কীভাবে সারা দেশের মানুষের ঢাকায় আসা বন্ধ করা যায়। কীভাবে জেলা উপজেলা হাসপাতালেই মানুষের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। না হয় শুধু ঈদ আসবে ঈদ যাবে, শত শত মানুষের ঈদযাত্রা পরিণত হবে সংবাদমাধ্যমের দুর্ঘটনার সংবাদে। টকশোর টেবিলে ঝড় উঠবে। কিন্তু হাজারো উন্নয়নের কোলাহলে চাপা পড়ে যাবে নিহত শ্রমিকের স্বজনের কান্নার আওয়াজ।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত