ড. খালিদুর রহমান

রাজবাড়ী শহরের কাপড় বাজারে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও মারধরের অভিযোগের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা জাকিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সময় এক যুবক তাকে লাথি দেয়। পরে আরেক যুবক লাথি মারে এবং আরেক ব্যক্তি তাকে ধাক্কা দেয়। পেছনে থাকা এক পুলিশ সদস্য প্রথম হামলাকারীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে বলে ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও কীভাবে কয়েকজন ব্যক্তি একজন নারীকে প্রকাশ্যে আঘাত করার সুযোগ পেলেন?
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাসমুল হক জানিয়েছেন, শনিবার দুপুরে ঘটনাটি ঘটে এবং কোনো পক্ষই লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তিনি আরও বলেছেন, পুলিশ তখনও ভাইরাল ভিডিও দেখেনি; ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানতে লিখিত অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকাশ্য স্থানে সংঘটিত সহিংসতার দৃশ্য যদি ভিডিওতে ধারণ হয়ে থাকে, সেই দৃশ্যের সত্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া পুলিশের দায়িত্বের অংশ কি না, সেটি ভাবার বিষয়। বিশেষত যখন ঘটনাটি পুলিশের চোখের সামনেই ঘটেছে বলে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। জাকিয়ার দাবি, তার সাবেক কর্মচারী বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে অন্যত্র কাজ শুরু করেছেন। জাকিয়া বলেন, ১৫ জুলাই কর্মচারীকে আগস্ট পর্যন্ত কাজ করার অনুরোধ করেছিলেন। ২২ আগস্ট জানতে পারেন, তিনি অন্যত্র কাজ করছেন। পরে বেতন নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনে আসতে বলেন। এরপর দোকানে হামলা এবং কর্মচারীকে বেতন দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে তার অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে অভিযোগ করে মামলা করার কথা জানালে তাকে মামলা করতে দেওয়া হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে সাবেক কর্মচারী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি নিয়ম মেনে চাকরি ছাড়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং অন্য দোকানে চাকরি না করে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন। তার পাল্টা অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি দাবি করেছেন, জাকিয়া তাকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রস্তাব দিয়েছিলেন; তাতে রাজি না হওয়ায় নানাভাবে চাপ দেওয়া হতো। নিজের সম্মান রক্ষার জন্য চাকরি ছেড়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। দুই পক্ষের এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্ত ছাড়া সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব তাই নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই থাকা উচিত।
ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্যেও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ জানিয়েছেন, জাকিয়া শতাধিক নারীসহ হ্যান্ড মাইক হাতে বাজারে মিছিল করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে প্রতিবাদ জানান এবং পরে থানায় যান। পুলিশ এসে জাকিয়াকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়। তিনি আরও বলেছেন, জাকিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে এবং তাকে কাপড় বাজারে আর ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ তিনি নিজেই জানিয়েছেন, থানায় যাওয়ার পরও কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
এই সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন কি কোনো ব্যবসায়ীকে বাজারে ব্যবসা করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে? পারলে সেই ক্ষমতার আইনগত ভিত্তি কী? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না? লিখিত অভিযোগ, তদন্ত ও শুনানি ছাড়া শুধু জনমত কিংবা সংগঠনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কারও জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া হলে তা ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু জাকিয়ার ক্ষেত্রে নয়, দেশের সব স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে জাকিয়ার বিরুদ্ধেও যদি সত্যিই ব্যবসায়ীদের ওপর শতাধিক নারী নিয়ে চড়াও হওয়ার অভিযোগ থাকে, তারও তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ী নিজস্ব কর্মী কিংবা সমর্থকদের নিয়ে বাজারে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জাকিয়ার অভিযোগ যেমন যাচাই করতে হবে, তেমনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রমাণের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে। ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য এখানেই যে, পক্ষের পরিচয় নয়, তথ্য ও প্রমাণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়।
ঘটনার আরেকটি দিকও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। গতকাল দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ রাজবাড়ীর ঘটনাকে সরাসরি ক্ষমতাসীন বিএনপির কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করেছেন। অথচ প্রকাশিত তথ্য, ভিডিও, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য কিংবা পুলিশের ভাষ্যে এমন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ সামনে আসেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হামলাকারীদের সাংগঠনিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা নয়; তা অপপ্রচারে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করার এই প্রবণতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কোনো ঘটনা ঘটলেই তার সঙ্গে পছন্দের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জুড়ে দেওয়া হলে সত্য অনুসন্ধানের জায়গা সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগ থাকলেও মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। ফলে রাজবাড়ীর ঘটনায় সহিংসতার নিন্দা যেমন জরুরি, তেমনি প্রমাণহীন রাজনৈতিক প্রচার থেকেও বিরত থাকা জরুরি। অপরাধের দায় অপরাধীর; কোনো রাজনৈতিক দলের দায় নির্ধারণ করতে হলে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আদালত নয়। একটি ভিডিও মানুষের সামনে ঘটনার কোনো অংশ তুলে ধরতে পারে, কিন্তু তার পূর্বাপর পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা বিরোধের মূল কারণ সবসময় জানাতে পারে না। তাই ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করা স্বাভাবিক হলেও মুহূর্তের মধ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা, কোনো সংগঠনকে দায়ী করা কিংবা রাজনৈতিক দলের নামে প্রচার চালানো দায়িত্বশীল আচরণ নয়। তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি শক্তিশালী না হলে গুজব ও অপপ্রচার সহজেই সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
জাকিয়া সুলতানা নিজেকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তার দাবি অনুযায়ী ২৬টি সাবসেন্টারে প্রায় চার হাজার নারী কাজ করেন। সংখ্যাটি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে দাবি সত্য হলে তার ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত। ফলে ব্যবসায়িক বিরোধের প্রভাব শুধু মালিক ও কর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মীদের আয়, পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার ওপরও তার প্রভাব পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাই প্রমাণ, আইন ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজবাড়ীর ঘটনাটি নারী উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন নারী ব্যবসা করতে গিয়ে বিরোধে জড়াতে পারেন, অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন, এমনকি ভুলও করতে পারেন। কিন্তু এসব কোনো অবস্থাতেই তাকে প্রকাশ্যে অপমান, লাঞ্ছনা কিংবা শারীরিক আক্রমণের বৈধতা দেয় না। নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়, ব্যাংকঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়; অথচ ব্যবসায়িক বিরোধে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই ক্ষমতায়নের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই রাজবাড়ীর ঘটনাকে দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। দুই পক্ষের অভিযোগ যাচাই, ভাইরাল ভিডিওর সত্যতা পরীক্ষা, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ, পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়ী সমিতির সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাকিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সেই তথ্যও সামনে আসতে হবে; প্রমাণ না থাকলে রাজনৈতিক অপপ্রচার বন্ধ হওয়া দরকার।
সভ্য সমাজে ব্যবসায়িক বিরোধের নিষ্পত্তি হয় আলোচনায়, প্রমাণে এবং আইনের পথে। জনতার শক্তি, ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান কিংবা রাজনৈতিক প্রচার কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। রাজবাড়ীর ঘটনাটি তাই শুধু একজন নারী উদ্যোক্তার ওপর হামলার অভিযোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনের শাসন, নারী উদ্যোক্তার নিরাপত্তা, ব্যবসায়ী সংগঠনের ক্ষমতার সীমা, পুলিশের দায়িত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ তথ্য প্রচারের প্রশ্ন।
মতবিরোধের অধিকার সবার আছে, অভিযোগ করার অধিকার সবার আছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও সবার আছে। কিন্তু কাউকে প্রকাশ্যে অপমান ও সহিংসতার শিকার করার অধিকার কারও নেই। একইভাবে কোনো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক দলকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করার অধিকারও কারও নেই। রাজবাড়ীর ঘটনায় তাই প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সত্য অনুসন্ধান; পক্ষপাত নয়, প্রমাণ; জনতার রায় নয়, আইনের শাসন।

রাজবাড়ী শহরের কাপড় বাজারে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও মারধরের অভিযোগের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা জাকিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সময় এক যুবক তাকে লাথি দেয়। পরে আরেক যুবক লাথি মারে এবং আরেক ব্যক্তি তাকে ধাক্কা দেয়। পেছনে থাকা এক পুলিশ সদস্য প্রথম হামলাকারীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে বলে ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও কীভাবে কয়েকজন ব্যক্তি একজন নারীকে প্রকাশ্যে আঘাত করার সুযোগ পেলেন?
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাসমুল হক জানিয়েছেন, শনিবার দুপুরে ঘটনাটি ঘটে এবং কোনো পক্ষই লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তিনি আরও বলেছেন, পুলিশ তখনও ভাইরাল ভিডিও দেখেনি; ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানতে লিখিত অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকাশ্য স্থানে সংঘটিত সহিংসতার দৃশ্য যদি ভিডিওতে ধারণ হয়ে থাকে, সেই দৃশ্যের সত্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া পুলিশের দায়িত্বের অংশ কি না, সেটি ভাবার বিষয়। বিশেষত যখন ঘটনাটি পুলিশের চোখের সামনেই ঘটেছে বলে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। জাকিয়ার দাবি, তার সাবেক কর্মচারী বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে অন্যত্র কাজ শুরু করেছেন। জাকিয়া বলেন, ১৫ জুলাই কর্মচারীকে আগস্ট পর্যন্ত কাজ করার অনুরোধ করেছিলেন। ২২ আগস্ট জানতে পারেন, তিনি অন্যত্র কাজ করছেন। পরে বেতন নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনে আসতে বলেন। এরপর দোকানে হামলা এবং কর্মচারীকে বেতন দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে তার অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে অভিযোগ করে মামলা করার কথা জানালে তাকে মামলা করতে দেওয়া হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে সাবেক কর্মচারী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি নিয়ম মেনে চাকরি ছাড়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং অন্য দোকানে চাকরি না করে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন। তার পাল্টা অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি দাবি করেছেন, জাকিয়া তাকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রস্তাব দিয়েছিলেন; তাতে রাজি না হওয়ায় নানাভাবে চাপ দেওয়া হতো। নিজের সম্মান রক্ষার জন্য চাকরি ছেড়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। দুই পক্ষের এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্ত ছাড়া সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব তাই নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই থাকা উচিত।
ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্যেও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ জানিয়েছেন, জাকিয়া শতাধিক নারীসহ হ্যান্ড মাইক হাতে বাজারে মিছিল করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে প্রতিবাদ জানান এবং পরে থানায় যান। পুলিশ এসে জাকিয়াকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়। তিনি আরও বলেছেন, জাকিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে এবং তাকে কাপড় বাজারে আর ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ তিনি নিজেই জানিয়েছেন, থানায় যাওয়ার পরও কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
এই সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন কি কোনো ব্যবসায়ীকে বাজারে ব্যবসা করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে? পারলে সেই ক্ষমতার আইনগত ভিত্তি কী? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না? লিখিত অভিযোগ, তদন্ত ও শুনানি ছাড়া শুধু জনমত কিংবা সংগঠনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কারও জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া হলে তা ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু জাকিয়ার ক্ষেত্রে নয়, দেশের সব স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে জাকিয়ার বিরুদ্ধেও যদি সত্যিই ব্যবসায়ীদের ওপর শতাধিক নারী নিয়ে চড়াও হওয়ার অভিযোগ থাকে, তারও তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ী নিজস্ব কর্মী কিংবা সমর্থকদের নিয়ে বাজারে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জাকিয়ার অভিযোগ যেমন যাচাই করতে হবে, তেমনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রমাণের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে। ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য এখানেই যে, পক্ষের পরিচয় নয়, তথ্য ও প্রমাণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়।
ঘটনার আরেকটি দিকও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। গতকাল দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ রাজবাড়ীর ঘটনাকে সরাসরি ক্ষমতাসীন বিএনপির কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করেছেন। অথচ প্রকাশিত তথ্য, ভিডিও, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য কিংবা পুলিশের ভাষ্যে এমন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ সামনে আসেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হামলাকারীদের সাংগঠনিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা নয়; তা অপপ্রচারে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করার এই প্রবণতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কোনো ঘটনা ঘটলেই তার সঙ্গে পছন্দের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জুড়ে দেওয়া হলে সত্য অনুসন্ধানের জায়গা সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগ থাকলেও মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। ফলে রাজবাড়ীর ঘটনায় সহিংসতার নিন্দা যেমন জরুরি, তেমনি প্রমাণহীন রাজনৈতিক প্রচার থেকেও বিরত থাকা জরুরি। অপরাধের দায় অপরাধীর; কোনো রাজনৈতিক দলের দায় নির্ধারণ করতে হলে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আদালত নয়। একটি ভিডিও মানুষের সামনে ঘটনার কোনো অংশ তুলে ধরতে পারে, কিন্তু তার পূর্বাপর পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা বিরোধের মূল কারণ সবসময় জানাতে পারে না। তাই ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করা স্বাভাবিক হলেও মুহূর্তের মধ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা, কোনো সংগঠনকে দায়ী করা কিংবা রাজনৈতিক দলের নামে প্রচার চালানো দায়িত্বশীল আচরণ নয়। তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি শক্তিশালী না হলে গুজব ও অপপ্রচার সহজেই সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
জাকিয়া সুলতানা নিজেকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তার দাবি অনুযায়ী ২৬টি সাবসেন্টারে প্রায় চার হাজার নারী কাজ করেন। সংখ্যাটি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে দাবি সত্য হলে তার ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত। ফলে ব্যবসায়িক বিরোধের প্রভাব শুধু মালিক ও কর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মীদের আয়, পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার ওপরও তার প্রভাব পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাই প্রমাণ, আইন ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজবাড়ীর ঘটনাটি নারী উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন নারী ব্যবসা করতে গিয়ে বিরোধে জড়াতে পারেন, অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন, এমনকি ভুলও করতে পারেন। কিন্তু এসব কোনো অবস্থাতেই তাকে প্রকাশ্যে অপমান, লাঞ্ছনা কিংবা শারীরিক আক্রমণের বৈধতা দেয় না। নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়, ব্যাংকঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়; অথচ ব্যবসায়িক বিরোধে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই ক্ষমতায়নের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই রাজবাড়ীর ঘটনাকে দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। দুই পক্ষের অভিযোগ যাচাই, ভাইরাল ভিডিওর সত্যতা পরীক্ষা, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ, পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়ী সমিতির সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাকিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সেই তথ্যও সামনে আসতে হবে; প্রমাণ না থাকলে রাজনৈতিক অপপ্রচার বন্ধ হওয়া দরকার।
সভ্য সমাজে ব্যবসায়িক বিরোধের নিষ্পত্তি হয় আলোচনায়, প্রমাণে এবং আইনের পথে। জনতার শক্তি, ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান কিংবা রাজনৈতিক প্রচার কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। রাজবাড়ীর ঘটনাটি তাই শুধু একজন নারী উদ্যোক্তার ওপর হামলার অভিযোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনের শাসন, নারী উদ্যোক্তার নিরাপত্তা, ব্যবসায়ী সংগঠনের ক্ষমতার সীমা, পুলিশের দায়িত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ তথ্য প্রচারের প্রশ্ন।
মতবিরোধের অধিকার সবার আছে, অভিযোগ করার অধিকার সবার আছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও সবার আছে। কিন্তু কাউকে প্রকাশ্যে অপমান ও সহিংসতার শিকার করার অধিকার কারও নেই। একইভাবে কোনো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক দলকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করার অধিকারও কারও নেই। রাজবাড়ীর ঘটনায় তাই প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সত্য অনুসন্ধান; পক্ষপাত নয়, প্রমাণ; জনতার রায় নয়, আইনের শাসন।
.png)

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। সামরিক শক্তিমত্তা গড়ে ওঠে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সমরাস্ত্র কেনাকাটায় বাংলাদেশ আ
২১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে কোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে বা কোনো সংস্কার উদ্যোগ মাঝপথে থেমে গেলে আমরা সাধারণত দুটি ব্যাখ্যা শুনি—‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব’ কিংবা ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আসলে কী?
৩০ আগস্ট ২০২৬
ঠাকুরগাঁওয়ের ক্রিকেটের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্পর্ক বহু আগের। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার একটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে উত্তরের সীমান্তঘেঁষা এই জেলার ক্রিকেটমাঠের সঙ্গে। সেই সময়ের কিছু স্মৃতি আমার পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গেও
৩০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে শুধু উন্নয়ন নয়; একইসঙ্গে অসমতার দ্রুত বিস্তার। শহরের গ্লাস টাওয়ার আর গ্রামের অনিশ্চিত শ্রম—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কখনো একই ফ্রেমে সমানভাবে ধরা পড়ে না। উন্নয়ন হয় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার জন্য?
২৯ আগস্ট ২০২৬