সৃজনশীলতার অর্থনীতি : বরাদ্দের চেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৪: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

কয়েক বছর আগের কথা। রাজশাহীর এক পরিচিত তরুণ গ্রাফিক ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল। বাড়িতে খুব একটা সায় ছিল না। বাবা বলতেন, এই কাজে সংসার চলবে না। কিন্তু বছর দুয়েকের মাথায় সে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছে, ডলারে। পাশের বাড়ির ছেলে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত, আর এই তরুণ তার ল্যাপটপ থেকে ইউরোপের ক্লায়েন্টের কাজ করছে। ব্যাংকার হিসেবে আমি যখন এই ধরনের অ্যাকাউন্ট দেখি, একটাই কথা মনে হয়—সম্পদ মাটির নিচে নয়, মাথার ভেতরেও থাকে।

সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে আসলে এটাই বোঝায়। মানুষের চিন্তা, দক্ষতা, সংস্কৃতি আর উদ্ভাবনকে পণ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া। চলচ্চিত্র, গান, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে মোবাইল গেম পর্যন্ত সবই এর আওতায় পড়ে। এখানে কারখানা লাগে না, বিশাল জমি লাগে না। একটা ভালো আইডিয়া আর সেটাকে বাজারযোগ্য করার দক্ষতাই যথেষ্ট। জাতিসংঘের হিসাবে, এই খাত থেকে বিশ্বে প্রতি বছর আয় হয় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, কর্মসংস্থান হয় পাঁচ কোটি মানুষের। আর এই পাঁচ কোটির প্রায় অর্ধেকই নারী।

বাংলাদেশ এই বিশাল বাজারে কতটুকু আছে? সৎ উত্তর হলো, নগণ্য। এমনকি জিডিপিতে এই খাতের অবদান কত, সেটার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও নেই। অথচ ফিলিপাইনে এই হার সাত দশমিক তিন শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় সাত দশমিক আট শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে চার দশমিক দুই শতাংশ। এই তুলনাটা যত ছোট মনে হোক, আসলে অনেক বড় ফারাক।

তাহলে কেন আমরা পিছিয়ে? শুধু নীতির অভাব নয়, সমস্যাটা আরও গভীরে। আমাদের সমাজে সৃজনশীল কাজকে এখনো পেশা হিসেবে মানা হয় না। ছেলে বলবে গান করতে চায়, বাবা বলবেন আগে কিছু একটা পড়ো। মেয়ে বলবে অ্যানিমেশন শিখতে চায়, মা বলবেন এতে কী হবে? একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইলেই পরিবার ও সমাজ টেনে ধরে। এই মানসিকতা রাতারাতি বদলানো যায় না, কিন্তু রাষ্ট্র যদি সৃজনশীল কাজকে সম্মান ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সমাজও ধীরে ধীরে বদলায়। ইতিহাস বলে, অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯৯৪ সালে ‘ক্রিয়েটিভ নেশন’ নামের পলিসি নিল, তার পরের দশকে দেশটির সাংস্কৃতিক শিল্পের আকার কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার তিনশো কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে এই খাতের জন্য। পূর্বাচলে একটি বড় সৃজনশীল কেন্দ্র, জেলায় জেলায় ইনোভেশন হাব, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড, এমনকি একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। কাগজে পড়লে বেশ উচ্চাভিলাষী মনে হয়। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল এই খাতে জিডিপির দেড় শতাংশ অবদান এবং পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান।

এখানে কারখানা লাগে না, বিশাল জমি লাগে না। একটা ভালো আইডিয়া আর সেটাকে বাজারযোগ্য করার দক্ষতাই যথেষ্ট। জাতিসংঘের হিসাবে, এই খাত থেকে বিশ্বে প্রতি বছর আয় হয় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, কর্মসংস্থান হয় পাঁচ কোটি মানুষের। আর এই পাঁচ কোটির প্রায় অর্ধেকই নারী।

কিন্তু এই পরিকল্পনা কাজে আসবে কি? আমার মতে, অবকাঠামো বানালেই সৃজনশীল অর্থনীতি হয় না। একটা বিল্ডিং তৈরি হলেই সেখানে শিল্পী আসবে না, যদি মেধাস্বত্বের সুরক্ষা না থাকে। একজন নির্মাতা সিনেমা বানাবেন না, যদি পাইরেসির বিরুদ্ধে আইন শক্ত না হয়। একজন তরুণ উদ্যোক্তা কনটেন্ট তৈরি করবেন না, যদি তার আইডিয়া চুরি হওয়ার ভয় থাকে। কপিরাইট সুরক্ষা এবং মেধাস্বত্বের কার্যকর প্রয়োগ না বাড়লে বাকি সব উদ্যোগ বালির ভিতে দাঁড়াবে।

অর্থায়নের প্রশ্নটাও সহজ নয়। একজন ব্যাংকার হিসেবে বলছি, ব্যাংক সাধারণত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি দেখে ঋণ দেয়। কিন্তু একজন সফটওয়্যার ডেভেলপারের সম্পদ তার কোড, একজন চলচ্চিত্রকারের সম্পদ তার স্ক্রিপ্ট। এগুলো জামানত হিসেবে গণ্য হয় না। প্রচলিত ব্যাংক ঋণের কাঠামো এই খাতের জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে, বিশেষ স্টার্টআপ তহবিল তৈরি না হলে, এই খাতে বিনিয়োগ আসবে না। তিনশো কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ শুরুর জন্য ভালো, কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়।

আরেকটি বড় সমস্যা দক্ষতার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিও নেই, অ্যানিমেশন ল্যাব নেই, ডিজিটাল মনিটাইজেশনের কাঠামো দুর্বল। যে তরুণ অ্যানিমেশন বানাতে চায়, সে পেশাদার প্রশিক্ষণ কোথায় পাবে? যে মেয়েটি ফ্যাশন ডিজাইনার হতে চায়, তার পোর্টফোলিও আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছাবে কীভাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে ভালো বাজেট বরাদ্দও কাজে লাগবে না।

তবে সম্ভাবনা যে আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে আছে। ইউটিউবে বাংলা কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, মানিকগঞ্জের শীতলপাটি এগুলো নতুন প্যাকেজিং আর ডিজিটাল বিপণনে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। "ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট" মডেল সঠিকভাবে কাজ করলে গ্রামীণ শিল্পীদের জীবন বদলে যেতে পারে। কেবল দরকার সঠিক ডিজাইনার, সঠিক বাজার সংযোগ আর সরকারের ধারাবাহিক মনোযোগ।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার আছে। যুক্তরাজ্য নব্বইয়ের দশকে সৃজনশীল শিল্পকে আলাদা খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কর ছাড় আর কপিরাইট সুরক্ষা দিয়েছিল। আজ সেই খাত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান দিচ্ছে। জাপান তার মাঙ্গা আর অ্যানিমেকে শুধু বিনোদন হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ড বানিয়েছে। বাংলাদেশের বাউলের দর্শন, মসলিনের ইতিহাস, লোকসংগীতের বৈচিত্র্য এগুলো নিয়েও এমন কিছু করা সম্ভব। কিন্তু সেটার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শুধু একটা বাজেট বরাদ্দ নয়।

নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টাও আলাদা করে ভাবা দরকার। সৃজনশীল খাতের অনেক কাজ ঘরে বসে করা যায়। একজন নারী উদ্যোক্তা নকশিকাঁথা তৈরি করছেন, অনলাইনে বিক্রি করছেন, বিদেশে পাঠাচ্ছেন — এই মডেল ইতোমধ্যে কাজ করছে ছোট আকারে। সরকার যদি এই নারীদের সহজ শর্তে ঋণ, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ আর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ দেয়, তাহলে এই খাত অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে এই বাজেটের উদ্যোগ একটা ভালো শুরু। তবে শুধু টাকা বরাদ্দেই কাজ শেষ নয়। মেধাস্বত্বের সুরক্ষা, ভেঞ্চার বিনিয়োগের পরিবেশ, দক্ষতা তৈরির কার্যকর কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি সৃজনশীল পণ্যের পরিচিতি তৈরি না হলে এই উদ্যোগ হয়তো আরেকটি ঘোষণায় পরিণত হবে। রাজশাহীর সেই তরুণের মতো আরও লাখো মানুষ আছে এই দেশে, যাদের মাথায় আইডিয়া আছে কিন্তু পথ নেই। তাদের জন্য পথটা তৈরি করাই এখন আসল কাজ।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত