ফুটবলের মহাযজ্ঞ এবার তিন দেশে: ২০২৬-এ কী অপেক্ষা করছে

প্রথমবারের মতো তিন দেশ মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে ফিফা। ৯৩০ সালের উরুগুয়ের প্রথম আসর থেকে ২০২২ সালে কাতারে ২২তম আসর পর্যন্ত কখনোই তিন দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন হয়নি। ফুটবল সবচেয়ে বড় এই আয়োজনে এমন বিবর্তন এবং কেন ফিফা এবার তিন দেশের কাঁধে এই বিশাল দায়িত্ব তুলে দিল—তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৮: ৫২
বিশ্বকাপের বিবর্তন। স্ট্রিম গ্রাফিক

ফিফা সাধারণত চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করার দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট দেশের হাতেই তুলে দিয়ে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে। যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো লজিস্টিক সুবিধা, একক মুদ্রা, একই প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সমর্থকদের যাতায়াতের সুবিধা। ১৯৩০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপই একটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ফিফা তাদের চিরচেনা এই প্রথা ভেঙে এশিয়ার দুই দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে হোস্টের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল। যা ছিল এশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম কোনও বিশ্বকাপ। সেই স্মৃতি আবারও ফিরে আসার সুযোগ আসছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে; যা আয়োজন করবে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ মিলে।

ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ এর এই আসরটি হতে যাচ্ছে এক অনন্য নজির। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ নিয়ে আয়োজিত এই মহাযজ্ঞের আয়োজক হিসেবে থাকছে তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা।

এগিয়ে রাখবে আয়োজকদের পূর্ব অভিজ্ঞতা

যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ এককভাবে আয়োজনের অভিজ্ঞতা আছে। অন্যদিকে মেক্সিকোর অভিজ্ঞতা আছে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের এককভাবে আয়োজনের। পুরুষ বিশ্বকাপ আয়োজন না করলেও আরেক স্বাগতিক কানাডা ২০১৫ সালের আয়োজন করেছিল ফিফা নারী বিশ্বকাপ।

মেক্সিকোর এস্তাদিও আজটেকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়াম আগামী ৭৪ দিন পর ফুটবল বিশ্ব দেখবে এক নজিরবিহীন উৎসব। যেখানে তিন দেশের সীমান্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে ফুটবলের জাদুকরি ছঁন্দে।

স্মৃতিতে ২০০২ এর বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবারই একাধিক দেশ যৌথভাবে আয়োজক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। ২০০২ সালে এশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে স্বাগতিক ছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। সেসময় দুই দেশের আয়োজন নিয়ে অনেক সংশয় থাকলেও, মাঠের লড়াইটি ছিল দেখার মতো। ৩২টি দল এই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। যেখানে মোট ৬৪টি ম্যাচের মধ্যে ৩২টি ম্যাচই সমানভাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া আয়োজন করেছিল।

সেই বিশ্বকাপে তুরস্কের তৃতীয় হওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালে ওঠার মতো ঘটনাগুলো সবাই মনে রাখবে। ২০০২ বিশ্বকাপে টিকিটের এভারেজ মূল্য ছিল ৯৭ ডলার। ৫৮৪ মিলিয়ন ডলারের রেভিনিউ জেনারেট করতে পেরেছিল। তবে দুই দেশের আলাদা মুদ্রা, ভাষা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য সমর্থকদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল যদিও টুর্নামেন্ট যথেষ্ঠ আকর্ষণীয় ছিল। আর এই বিশ্বকাপে ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে সাম্বার দেশ ব্রাজিল পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে। ফিফা সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও যৌথ আয়োজনের পথে হাঁটল, তবে এবার প্রেক্ষাপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কীভাবে এই তিন দেশ পেল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে কীভাবে তিন দেশের হাতেই বিশ্বকাপের দায়িত্ব আসল? ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ নাটকীয়। যেখানে অংশগ্রহণ করেছিল তিনটি দেশের সমন্বয়ে ‘ইউনাইটেড বিড’ এই বিডের আলায়েন্স হিসেবে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা এবং মরক্কো।

২০১৮ সালের ১৩ জুন মস্কোতে অনুষ্ঠিত ৬৮তম ফিফা কংগ্রেসে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক নির্ধারণে ভোটগ্রহণ করা হয়। ফিফার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মোট ২০০টি বৈধ ভোট পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল ১৩৪ যে ভোটে জয়ী হয়ে ৩ দেশ বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছিল।

বিশ্বকাপ আয়োজনে ফিফার নতুনত্ব ও চ্যালেঞ্জ

অবকাঠামো ও আর্থিক নিশ্চয়তা: এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হচ্ছে ১০৪টি। এত বিশাল সংখ্যক ম্যাচ আয়োজন করার মতো অবকাঠামো, স্টেডিয়াম এবং ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি সব তাদের দেশে আছে। তিনটি দেশ মিলে এই বিশাল চাপ ভাগ করে নেওয়ায় আয়োজনটি অনেক বেশি সহজসাধ্য হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো ফিফাকে রেকর্ড ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ থেকে যা অবশ্যই ফিফাকে লাভোবান করবে। তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের এভারেজ প্রইজ আনুমানিক ২০০ মার্কিন ডলার

ফুটবলের বিশ্বায়নের ও ভিন্ন সংস্কৃতিক মেলবন্ধন: ফিফার প্রধান লক্ষ্য ছিলো এশিয়া, ইউরোপ ও ল্যাটিনের দেশগুলার অংশ গ্রহণ বাড়িয়ে ফুটবলকে বিশ্বে আরো জনপ্রিয় করার। বিশ্বকাপে ৪৮টি দেশের অংশ নেওয়ার ফলে অনেক নতুন দেশ যেমন বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে তেমন ভাবে টুর্নামেন্টের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আগের থেকে বাড়বে।

তিন দেশের ১৬টি শহরে খেলা হওয়ায় দর্শকদের এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে আকাশপথই হবে তাদের যাতাযাতের প্রধান মাধ্যম। মেক্সিকো সিটির উচ্চতা আর কানাডার গ্রীষ্মের উষ্মতা আবহাওয়া দর্শকদের জন্য এটি এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা যেমন দিবে। তাছাড়া তিন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির মেল বন্ধন অন্যান্য দেশ থেকে আসা সমর্থকদের জন্যও ফুটবলের বাইরে নতুন একটা অভিজ্ঞতা দিবে।

ম্যাচ সংখ্যা: ২০০২ সালের বিশ্বকাপ যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সমান সংখ্যক ৩২টি ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছিলো সেখানে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ৭৮টি ম্যাচ হোস্ট করলেও মেক্সিকো ও কানাডা সমান সংখ্যক ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করবে।

ভিসা জটিলতা: এবারের বিশ্বকাপের ৭৮টি ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজন করবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ক্ষেত্রে ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট ও পাসকে ভিসা ইন্টারভিউয়ের সময় বেশি প্রায়োরিটি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল যদিও এখানে সংশয় থাকবে ইরান সমর্থকদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র চলমান সংঘাতের জন্য আগেই ইরানিদের জন্য তাদের দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো তার জন্য ইরানও তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচ সমর্থকদের নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সংঘাতের রেশ ধরে তারা তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলা ম্যাক্সিকোতে আয়োজন করতে ফিফাকে জানায় এখন যদি ফিফা ইরানের ম্যাচগুলো শিফট না করে অন্যত্র তখন ইরানের অংশগ্রহন নিয়ে একটা সংশয় থাকবে।

সম্পর্কিত