হরমুজ, বাব আল-মান্দেব থেকে মালাক্কা

বাংলাদেশ ও বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ যত প্রণালি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৫১
সমুদ্র অর্থনীতিতে বাংলাদেশ ও বিশ্ববাণিজ্যের শ্বাসনালির মতোই রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
সমুদ্র অর্থনীতিতে বাংলাদেশ ও বিশ্ববাণিজ্যের শ্বাসনালির মতোই রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আবারও সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন- পৃথিবীর সমুদ্রপথে এমন কৌশলগত প্রণালি আসলে কতগুলো? কোনগুলো দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পণ্য, জ্বালানি ও কনটেইনার পরিবাহিত হয়? আর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কোন কোন প্রণালির ওপর নির্ভরশীল?

বিশ্বে প্রণালির সংখ্যা কয়েক শতাধিক হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করার মতো প্রধান ‘চোকপয়েন্ট’ দুই ডজনের বেশি নয়। তবে এসব জলপথের কোনোও কোনোটি বন্ধ হলে জাহাজকে হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে বাড়ে জাহাজভাড়া, জ্বালানি ব্যয়, বিমা, পণ্য পৌঁছানোর সময় এবং ভোক্তার খরচ।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের পরিমাণের হিসাবে এবং ৭০ শতাংশ আর্থিক মূল্যের হিসাবে সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়।

এর একটি বড় অংশ মাত্র কয়েকটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ বা ‘চোক পয়েন্ট’ দিয়ে অতিক্রম করে। কোনো একক শক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই চোক পয়েন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় বা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ধসে পড়তে পারে।

একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা, সামরিক কৌশলবিদ এবং মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই চোক পয়েন্টগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে আসছে।

ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ‘চ্যাথাম হাউস’ খাদ্য ও খনিজ পরিবহনের ঝুঁকি বিশ্লেষণে সমুদ্রপথের এই চোক পয়েন্টগুলোকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে ভঙ্গুর জায়গা বলে উল্লেখ করেছে। অ্যাডমিরাল অ্যালফ্রেড থায়ার মাহানের ‘সি পাওয়ার’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূ-রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ডাঙ্গায় নয়, বরং সমুদ্রের দখল ও এই চোক পয়েন্টগুলোর ওপর নির্ভর করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট

চোকপয়েন্ট মূলত সমুদ্রের মধ্যে জাহাজ চলাচলের প্রাকৃতিক বা মানুষের তৈরি সরু রাস্তা। উদাহরণ হিসাবে মালাক্কা প্রণালী বা হরমুজ প্রণালীর কথা বলা যেতে পারে। আবার সুয়েজ বা পানামা খালকেও বিশ্লেষকেরা ‘চোক পয়েন্ট’ বলেন। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্যই হয় সমুদ্রপথে। যেখানে বড় সাগরগুলোকে যুক্ত করে এসব ‘চোক পয়েন্ট’।

মালাক্কা প্রণালি: বিশ্বের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অন্যতম সংক্ষিপ্ত সামুদ্রিক যোগাযোগপথ এটি। বছরে প্রায় ১ লাখ জাহাজ চলাচল করে। চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটা বড় অংশ ওই সামুদ্রিক রাস্তার উপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক হিসাবে, বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের মূল্যের প্রায় ২০–৩০ শতাংশ বা আনুমানিক ২ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য এ পথে পরিবাহিত হয়। ২০২৫ সালে জাহাজ চলাচল করেছে ১ লাখ ২ হাজার ৫০০-এর বেশি। ওই বছরের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে গেছে, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২৯ শতাংশ।

তাইওয়ান প্রণালি: পূর্ব এশিয়ার শিল্পবাণিজ্যের কেন্দ্র

চীন ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী তাইওয়ান প্রণালি কনটেইনার, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, কয়লা, আকরিক ও শিল্পপণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কনটেইনার বহর এ পথে যায়।

আইএমএফ পোর্টওয়াচের হিসাবে, ২০২৪ সালে মালাক্কা ও তাইওয়ান প্রণালি দিয়ে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। তাইওয়ানে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হওয়ায় এ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যমতে, তাইওয়ানের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং চীনের প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এ পথের সঙ্গে যুক্ত।

হরমুজ প্রণালি: জ্বালানি সরবরাহের সংকীর্ণ গলা

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ এটি। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০–২৫ শতাংশ এ পথে যায়। কাতারের এলএনজি রপ্তানির জন্যও এটি একমাত্র সমুদ্রপথ।

ইআইএর হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এ পথে গেছে।

হরমুজের বিকল্প সীমিত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন থাকলেও সম্মিলিত সক্ষমতা হরমুজের স্বাভাবিক প্রবাহের পুরো বিকল্প নয়। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের কার্যকর বিকল্প প্রায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিক সময়ের দৈনিক ১২৫–১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজের বদলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে কিছু দিনে জাহাজ চলাচল এক অঙ্কে নেমে আসে।

বাব এল-মান্দেব: এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের দরজা

ইয়েমেন, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী বাব এল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া থেকে ইউরোপগামী জাহাজের জন্য এটি সুয়েজ করিডরের প্রবেশদ্বার।

হুথি হামলার কারণে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে বহু জাহাজ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে যাত্রা কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এ পথে গেছে। গাড়ি ও কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ, তেলজাত পণ্যের ১৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের ১৩ শতাংশ এ জলপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ইআইএর হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে পরিবাহিত হয়েছে। নিরাপত্তা সংকটে দৈনিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক প্রায় ৭৪টি থেকে ৩০টির নিচে নেমে এসেছে।

সুয়েজ খাল: এশিয়া-ইউরোপের প্রধান শর্টকাট

মিসরের সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি বাব এল-মান্দেবের সঙ্গে একই বাণিজ্যিক করিডরের অংশ এবং আফ্রিকা ঘুরে যাওয়ার প্রয়োজন দূর করে। স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ১২–১৫ শতাংশ এ খাল ব্যবহার করে। ওইসিডি’র হিসেবে, ২০২৩ সালে লোহিত সাগর–বাব এল-মান্দেব–সুয়েজ করিডর দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের আনুমানিক ১৫ শতাংশ পরিবাহিত হয়েছে। ২০২৪–২৫ সালে হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে চলাচল কমে যায়।

জিব্রাল্টার ও ডোভার প্রণালি (ইউরোপীয় বাণিজ্য করিডর)

আটলান্টিকের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা জিব্রাল্টার (স্পেন-মরক্কো) এবং উত্তর সাগরকে যুক্ত করা ডোভার প্রণালি (যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স) বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের যথাক্রমে ১৯ ও ১৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। জিব্রাল্টার দিয়ে দিনে ৬০ লাখ ব্যারেল তেল ও ১২৩টি জাহাজ এবং ডোভার দিয়ে প্রতিদিন ৪০০–৬০০টি জাহাজ চলাচল করে।

তুর্কি ও ডেনিশ প্রণালিসমূহ (ব্ল্যাক সি ও বাল্টিক প্রবেশদ্বার)

কৃষ্ণসাগরের একমাত্র দ্বার তুর্কি প্রণালি (বসফরাস ও দার্দানেলিস) দিয়ে শস্য, সার ও দৈনিক ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়, যা রাশিয়া-ইউক্রেনের বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে বাল্টিক ও উত্তর সাগরকে যুক্ত করা ডেনিশ প্রণালিসমূহ দিয়ে বছরে ৭০ হাজার জাহাজ এবং দিনে ৪৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা রাশিয়ার সমুদ্রপথের ৪০ শতাংশ তেল রপ্তানি সামলায়।

পানামা খাল

প্রণালি না হলেও পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম শর্টকাট। এর ফলে দুই মহাসাগরের মধ্যে দূরত্ব কমে দাঁড়িয়েছে ৮,৩০০ কিলোমিটার। পানামা খাল না থাকলে বা বন্ধ হলে, প্রশান্ত থেকে আটলান্টিকে যেতে পণ্যবাহী জাহাজকে পুরো দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে পাড়ি দিতে হবে ২০ হাজার ৯০০ কিলোমিটার রাস্তা। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২ দশমিক ১৬ শতাংশ টন হিসেবে এ পথে গেছে। কনটেইনার, গাড়ি, শস্য, এলপিজি ও রাসায়নিক পণ্য পরিবহনে এর গুরুত্ব বেশি। খরায় পানির স্তর কমে গেলে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়।

সুন্দা, লম্বক ও কোরিয়া প্রণালি

মালাক্কার বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা ও লম্বক প্রণালি ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যবর্তী কোরিয়া প্রণালি পূর্ব চীন সাগর ও জাপান সাগরকে যুক্ত করেছে। পূর্ব এশিয়ার ভারী শিল্পপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ এ পথে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবাহিত হয়।

প্রণালির গুরুত্ব শুধু জাহাজের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; পণ্যের পরিমাণ, আর্থিক মূল্য এবং বিকল্প পথের দূরত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় হরমুজ সবচেয়ে বড় জ্বালানি ঝুঁকি, মালাক্কা এশীয় বাণিজ্যের ঝুঁকি, বাব এল-মান্দেব এশিয়া–ইউরোপ সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং তাইওয়ান পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তি ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কোন প্রণালিনির্ভর?

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আসা-যাওয়া করে। দেশের মোট পণ্যবাণিজ্য সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে আনুমানিক ১০০–১২০ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি। আমদানিতে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি; রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের আধিপত্য।

পূর্ব এশিয়া-বাংলাদেশ: মালাক্কা করিডর

মালাক্কা প্রণালি → সিঙ্গাপুর প্রণালি → দক্ষিণ চীন সাগর → চট্টগ্রাম/মোংলা

চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম থেকে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক, তুলা, টেক্সটাইল উপকরণ ও কনটেইনারজাত পণ্য আসে। ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া (১ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৬) বছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

চট্টগ্রামে বড় মাদার ভেসেল ভেড়ানোর সক্ষমতা না থাকায় কনটেইনার প্রথমে ফিডার জাহাজে সিঙ্গাপুর, পোর্ট ক্লাং বা কলম্বোর মতো ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্রে যায়। ফলে মালাক্কা বাংলাদেশের আমদানি সরবরাহব্যবস্থার প্রধান প্রবেশদ্বার।

মধ্যপ্রাচ্য-বাংলাদেশ: হরমুজ করিডর

হরমুজ প্রণালি → ওমান উপসাগর → আরব সাগর → ভারত মহাসাগর → বাংলাদেশ

অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল, এলএনজি, এলপিজি, পেট্রোকেমিক্যাল ও সার আমদানিতে হরমুজ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। আমদানি করা এলএনজির প্রায় ৬৮–৭৫ শতাংশ কাতার থেকে আসে এ পথে।

বাংলাদেশের বিদ্যুতের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি। ফলে হরমুজে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি মূল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও আমদানি ব্যয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ-ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র: বাব এল-মান্দেব-সুয়েজ করিডর

বাব এল-মান্দেব → লোহিত সাগর → সুয়েজ খাল → ভূমধ্যসাগর → জিব্রাল্টার → ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে এ করিডর ব্যবহার করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ছিল প্রায় ৪৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার—মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে রপ্তানি প্রায় ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং আমদানি প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার।

রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোর হিসাবে, দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ, যার বড় অংশ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী তৈরি পোশাক, এ পথে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক।

হুথি হামলার কারণে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে জাহাজগুলো কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে এশিয়া–ইউরোপের সমুদ্রযাত্রায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং ১৫–৩০ দিন অতিরিক্ত সময় যোগ হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত রুটগুলোর ভাড়া ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সময়, পরিবহন ব্যয় ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ, পূর্ব এশিয়া থেকে শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও কনটেইনার আমদানির জন্য মালাক্কা এবং এর সংযোগপথ হিসেবে ট্রান্সশিপমেন্টের কাজে সিঙ্গাপুর প্রণালি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি, এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের মূল ভরসা হরমুজ প্রণালি। একইভাবে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করা এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য সচল রাখার ক্ষেত্রে বাব এল-মান্দেব, সুয়েজ খাল ও জিব্রাল্টার প্রণালি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে।

ঝুঁকির জায়গা

বাংলাদেশের জন্য প্রধান ঝুঁকি দুটি খাতে—

জ্বালানি নিরাপত্তা: হরমুজে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।

রপ্তানি প্রতিযোগিতা: বাব এল-মান্দেব–লোহিত সাগর–সুয়েজ করিডরে সংকট হলে আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ চলাচলে সময় ও ব্যয় বাড়ে। এতে পোশাক রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত