কাজী নিশাত তাবাসসুম

বছর ঘুরে আবারও ফিরে এলো বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। আর এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘শোভাযাত্রা’। রঙিন মুখোশ, বিশালাকৃতির প্রতীকী ভাস্কর্য, ঢাকের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি যেন এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজন।
সাল ১৯৮৫, বাংলা ১৩৯১-এর শেষভাগ। যশোর ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় যশোরের ‘চারুপীঠ’ নামের একটি আর্ট স্কুল প্রথম শুরু করে এই শোভাযাত্রা। তারাই প্রথম লোকজ উপাদান নিয়ে এমনভাবে একটি শোভাযাত্রা করেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। তখন এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।
পরে ১৯৮৯ সালে সামরিক শাসনের সময় (বাংলা ১৩৯৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এই শোভাযাত্রার পুনরায় আয়োজন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। সে সময় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই শোভাযাত্রা ছিল এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ। অন্যায়, অশুভ শক্তি এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবেই এর জন্ম। তাই শুরু থেকেই এই শোভাযাত্রার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী সুর।
পরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅঅভ্যুত্থানের পর গত বছর এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ঠিক এক বছরের মাথায় বিএনপি সরকার এর নাম পরিবর্তন করে নাম দিয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
নাম পরিবর্তন নিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নাম নিয়ে যা হচ্ছে তা স্রেফ রাজনীতি।’
প্রথমদিকের শোভাযাত্রায় দেখা যেত নানা প্রতীকী উপস্থাপন। যেমন—দানব, পিশাচ, পেঁচা, ভয়ংকর মুখোশ, রাক্ষস ইত্যাদি। এগুলো কেবল শিল্পকর্ম ছিল না, বরং সমাজের অশুভ শক্তির প্রতীক। পাশাপাশি ছিল পাখি, সূর্য, ফুল, হাতি, ঘোড়া যা আশা, শান্তি ও মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই দ্বৈততার মধ্যেই শোভাযাত্রা একটি বার্তা দিত—অশুভর বিরুদ্ধে শুভর জয়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শোভাযাত্রাটি এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন এটি শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন শহর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালিত হয়। পরিবার, শিশু, তরুণ-তরুণী সবাই এতে অংশ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকের কাছে এটি এখন আনন্দ, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের উৎসব।
২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন মাত্রা দেয়। ফলে পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা এখন কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
মফস্বল ও বড় শহরের শোভাযাত্রায় অনেক পার্থক্য দেখা যায়। শহরের শোভাযাত্রা অনেক বেশি সংগঠিত ও বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিল্প ও নান্দনিকতার দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে, মফস্বলে এটি অনেক সময় সহজ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়, যেখানে মানুষের অংশগ্রহণই মূল বিষয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই একটি মিল রয়েছে—মানুষের মধ্যে আনন্দ ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করা।
ডিজিটাল যুগে শোভাযাত্রা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। এতে করে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তবে একই সঙ্গে এর বাণিজ্যিকীকরণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, অতিরিক্ত প্রচারণা ও স্পন্সরশিপের কারণে এর মৌলিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশাখের শোভাযাত্রা একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেমন উৎসব, তেমনি প্রতিবাদও। এটি যেমন আনন্দের প্রকাশ, তেমনি সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি একই সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, ইতিহাস ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে বৈশাখের শোভাযাত্রা কেমন হবে তা নির্ভর করছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। আমরা যদি এটিকে শুধুই আনন্দের উৎসব হিসেবে দেখি, তাহলে এর প্রতিবাদী চেতনা হারিয়ে যেতে পারে। আবার যদি এর ভেতরের বার্তা, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোকে গুরুত্ব দিই, তাহলে এটি ভবিষ্যতেও একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে টিকে থাকবে।

বছর ঘুরে আবারও ফিরে এলো বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। আর এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘শোভাযাত্রা’। রঙিন মুখোশ, বিশালাকৃতির প্রতীকী ভাস্কর্য, ঢাকের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি যেন এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজন।
সাল ১৯৮৫, বাংলা ১৩৯১-এর শেষভাগ। যশোর ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় যশোরের ‘চারুপীঠ’ নামের একটি আর্ট স্কুল প্রথম শুরু করে এই শোভাযাত্রা। তারাই প্রথম লোকজ উপাদান নিয়ে এমনভাবে একটি শোভাযাত্রা করেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। তখন এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।
পরে ১৯৮৯ সালে সামরিক শাসনের সময় (বাংলা ১৩৯৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এই শোভাযাত্রার পুনরায় আয়োজন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। সে সময় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই শোভাযাত্রা ছিল এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ। অন্যায়, অশুভ শক্তি এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবেই এর জন্ম। তাই শুরু থেকেই এই শোভাযাত্রার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী সুর।
পরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅঅভ্যুত্থানের পর গত বছর এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ঠিক এক বছরের মাথায় বিএনপি সরকার এর নাম পরিবর্তন করে নাম দিয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
নাম পরিবর্তন নিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নাম নিয়ে যা হচ্ছে তা স্রেফ রাজনীতি।’
প্রথমদিকের শোভাযাত্রায় দেখা যেত নানা প্রতীকী উপস্থাপন। যেমন—দানব, পিশাচ, পেঁচা, ভয়ংকর মুখোশ, রাক্ষস ইত্যাদি। এগুলো কেবল শিল্পকর্ম ছিল না, বরং সমাজের অশুভ শক্তির প্রতীক। পাশাপাশি ছিল পাখি, সূর্য, ফুল, হাতি, ঘোড়া যা আশা, শান্তি ও মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই দ্বৈততার মধ্যেই শোভাযাত্রা একটি বার্তা দিত—অশুভর বিরুদ্ধে শুভর জয়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শোভাযাত্রাটি এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন এটি শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন শহর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালিত হয়। পরিবার, শিশু, তরুণ-তরুণী সবাই এতে অংশ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকের কাছে এটি এখন আনন্দ, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের উৎসব।
২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন মাত্রা দেয়। ফলে পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা এখন কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
মফস্বল ও বড় শহরের শোভাযাত্রায় অনেক পার্থক্য দেখা যায়। শহরের শোভাযাত্রা অনেক বেশি সংগঠিত ও বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিল্প ও নান্দনিকতার দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে, মফস্বলে এটি অনেক সময় সহজ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়, যেখানে মানুষের অংশগ্রহণই মূল বিষয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই একটি মিল রয়েছে—মানুষের মধ্যে আনন্দ ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করা।
ডিজিটাল যুগে শোভাযাত্রা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। এতে করে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তবে একই সঙ্গে এর বাণিজ্যিকীকরণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, অতিরিক্ত প্রচারণা ও স্পন্সরশিপের কারণে এর মৌলিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশাখের শোভাযাত্রা একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেমন উৎসব, তেমনি প্রতিবাদও। এটি যেমন আনন্দের প্রকাশ, তেমনি সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি একই সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, ইতিহাস ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে বৈশাখের শোভাযাত্রা কেমন হবে তা নির্ভর করছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। আমরা যদি এটিকে শুধুই আনন্দের উৎসব হিসেবে দেখি, তাহলে এর প্রতিবাদী চেতনা হারিয়ে যেতে পারে। আবার যদি এর ভেতরের বার্তা, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোকে গুরুত্ব দিই, তাহলে এটি ভবিষ্যতেও একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে টিকে থাকবে।

আজ ৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। মূলত প্রাচীন নথি, দলিলাদি এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করাই এই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
১৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের মানুষের কাছে রাজনীতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। রাষ্ট্রের বিন্যাস আর গঠনকাঠামো বুঝতে চাওয়া পাঠকের সংখ্যা প্রচুর। এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়। তবে বিগত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই বিশেষ বিষয়কেন্দ্রিক বই প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক স
১ দিন আগে
ঘরে পানি আসায় ঝর্ণার জীবনে দুটো বড় পরিবর্তন হলো। এক. পরিবারের ডায়রিয়া, কলেরা বা গ্যাস্ট্রিকের মতো রোগবালাই কমে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ কমে যাচ্ছে। দুই. পানির খোঁজে যে সময় নষ্ট হতো ঝর্ণার, সে সময় বাঁচতে শুরু করল।
১ দিন আগে
গতকাল রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পে। আমি তখন ফেসবুকে স্ক্রল করছিলাম। আমি কিছু টের পাই নি। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমার নিউজফিড ভরে গেল নতুন নতুন পোস্টে। অনেকেই লিখেছেন, ‘মাথাটা ঘুরে উঠল!’, ‘ভূমিকম্প হলো নাকি?’ আবার কেউ লিখছেন, ‘ভূমিকম্প টের পেয়েছেন কে কে?’
২ দিন আগে