জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গল্প

তৃতীয় বন্ধু

স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বাস করবেন না কথাটা! কিন্তু সত্যিই কেউ আমাকে অলওয়েজ ফলো করে। বাজারের ব্যাগ নিয়ে যখন বের হই, সিঁড়ি দিয়ে নামছি তখন থেকে ফলো করা শুরু। থপথপ করে পিছনের দিকে আওয়াজ হয়। পিছনে হাজারবার তাকিয়েও কিছু দেখতে পারিনি; নাকি চোখের সমস্যা বুঝতে পারি না। রাস্তায় হাঁটার সময়ও একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরের দিকে চলে আসে। এটা কি ভয়ের না অন্য কিছু তা-ও জানি না। এখন প্রশ্ন হলো—কে ফলো করে?

যখন একা থাকি তখন এই রকম হয় এবং সাথে যখন সঙ্গী-সাথীরা থাকে তখন অন্য রকম ঘটনা ঘটে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি হঠাৎ মনে হয় ডান দিক থেকে কেউ আমাকে দেখছে। আবার বাম থেকে দেখছে। শরীরের লোমগুলো সজারুর কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে যায়। অথচ নিজেও জানি কেউ নেই। অদৃশ্য কোনো কিছুর প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। অথচ অদৃশ্য কিছুই যেন আমাকে ফলো করছে।

অনেক দিন ধরেই বেকার সময় কাটাচ্ছি। তাই সকালে বাজারের দিকে যাই। দেখা যায় শুধু আলু কেনার জন্য বাজারে যাচ্ছি। আলু যে মুদি দোকানেও পাওয়া যায় সেটা জানা সত্ত্বেও বাজারে যাই। টাইম কিছুটা হলেও পাস হয়। বাসায় বসে করার মতো কিচ্ছু নাই। মুক্তি নয়টার দিকে অফিসে চলে গেলে পুরাই ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তখন করার মতো কিছুই থাকে না। তাই টাইম কাটানোর জন্য বাজারে যাওয়া। ঘুরে-ফিরে দেখা। বিচিত্র ধরনের লোকের সঙ্গে মোলাকাত। তাদের ভাষা, বৈশিষ্ট্য—এসব লক্ষ করি। আর অন্য দিক দিয়ে কেউ আমাকে লক্ষ করে।

মুক্তি এক দিন ধরে-বেঁধে এক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল। নাম আব্দুল গণি। খুশি মনেই গেলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে আমার ডাক পড়ল। মুক্তি আর আমি দুজনে তাঁর চেম্বারে প্রবেশ করতেই তিনি সালাম দিলেন। মনে মনে সালামের উত্তর দিলাম। তাঁর সামনে বসতেই উনি বললেন, ‘ভালো আছেন?’

কাকে প্রশ্নটা করেছেন বুঝতে পারলাম না। মুক্তির দিকে তাকালাম। মুক্তি হেসে তাঁকে উত্তর দিল, ‘জি ভালো। আপনি?’ ‘ভালো। সমস্যাটা কার?’ আমার দিকে তাকিয়ে মুক্তি বলল, ‘আমার হাজবেন্ড মনে করে তাকে কেউ ফলো করে।’ আব্দুল গণি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে ফলো করে?’ ‘কে ফলো করে জানি না। এর জন্যই তো আপনার কাছে আসা।’ ‘একটু ডিটেইলস বলুন। আমি তো পুলিশ না যে তদন্ত করব কে আপনাকে ফলো করে।’ ‘আসলে ওর মনে হয় কেউ ফলো করছে। কিন্তু কখনো কাউকে দেখেনি। বা কারো কথাও শোনেনি।’

‘বুঝলাম।’ বললেন উনি, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। হাতে একটা কলম নিয়ে টেবিলের ওপর টোকা দিতে দিতে বললেন, ‘তাহলে মনে করেন কেউ আপনাকে ফলো করে?’ ‘জি।’ ‘আচ্ছা। এবার বলুন ঠিক কখন কখন এমনটা মনে হয়?’ ‘একা থাকলে, বন্ধুদের সাথে থাকলেও।’ ‘বাসায় থাকলে?’ ‘বাসায় থাকলে খুব একটা মনে হয় না। বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকি, তাই হয়তো। বা তখনও কেউ করে কিন্তু টের পাই না।’

‘হুম’… বলেই কাগজে কী যেন লিখতে শুরু করলেন। লেখা শেষ করে বললেন, ‘এই ওষুধগুলো কিছুদিন খান। দুই সপ্তাহ পরে আসুন।’ ‘আমার সমস্যাটা কী? সেটা বলুন।’ ‘সমস্যাটা এখন বলব না। ওষুধগুলো খান, তারপরেও যদি কিছু না হয় তখন শিওর হব আপনার কী সমস্যা?’

ডাক্তারের কথাবার্তা আজব। কথা নেই বার্তা নেই ওষুধ ধরিয়ে দিলেন। সেদিন ওষুধ কিনে খাওয়া শুরু করলাম। ওষুধ খাওয়ার পরে মনে হচ্ছে এতদিন মনে হতো একজন ফলো করে, এখন মনে হয় দুজন। ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকছে।

নয়টা দশ। বাজারের একটা ব্যাগ নিয়ে বের হলাম। পিছনে দুজন হাঁটছে। শব্দ পাচ্ছি। কিন্তু জানি তাকালেই কেউ নেই। তাই তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলাম না। কিছুদূর হাঁটতেই একটা চায়ের দোকান। সেখানে গিয়ে বসলাম। দুধচায়ের অর্ডার দিয়ে সিগারেট ধরালাম। গতকাল রাতে দশটা বেনসন নিয়েছিলাম এখনও দুইটা আছে। রাতে কখন ঘুম এসেছিল কে জানে? না হলে দুইটাও থাকত না। চাওয়ালা চা দিলে চুমুক দিলাম। পিছনের দুজনের কথা কিন্তু ভুলিনি। তারাও আমার সঙ্গী, কিন্তু অদৃশ্য।

লোকটার এত কনফিডেন্স, এতটা আমার নিজেরও নাই। একে করপোরেট ওয়ার্ল্ডে ইন করাতে পারলে অনেক ডেভেলপ করত। পেঁয়াজ কিনলাম তিন কেজি। এখন শুধু মাছ কিনলেই হবে। কিন্তু মাছের যা দাম! মাছ বিক্রেতাদের দাম জিজ্ঞেস করতেই ভয় করে। তবু সস্তা মাছের ভেতরে পাঙাশ, নলা, তেলাপিয়া, আর পাল্লা কৈ। এদের টেস্ট যে খুব ভালো তা-ও না। তবে দামের কারণে এগুলোই আপাতত খাচ্ছি। টাকা থাকলে আবার ইলিশ কিনতেও কার্পণ্য করি না। টাকার ওপর নির্ভর করে আমি কিপটে কি না!

সামনাসামনি আসলে অবশ্যই চা ও সিগারেটের অফার করতাম। ওহ… ভুলে গেছি এখন বাসায় একা থাকলেও মনে হয় একা না। অনেকেই আছে। তাদের শোরগোলও পাওয়া যায়। বিচ্ছিন্ন শব্দ। একবার আলমারির পিছন থেকে আসে, একবার খাটের নিচ থেকে। আবার টেবিলের তলা থেকে। বারান্দায় দাঁড়ালে পিছনে যে রুম সেটা থেকে। কোনো কিছু বোঝার উপায় নেই, অথচ শব্দগুলো স্পষ্ট শুনতে পাই। শব্দগুলোকে বাক্যে পরিণত করতে পারলে কিছুটা হলেও বোঝা যেত। চা শেষ করে বিল দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে বাজারে পৌঁছে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাই। কারণ এত মানুষের ভিড়ে কেউ তো আমাকে কিডন্যাপ করতে পারবে না। বাজারে অনেক পরিচিত লোকজনও আসে। তাদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়। গতকাল দেখা হয়েছিল রিপনের সাথে। বন্ধু না হলেও প্রায় বন্ধু বলা যায়।

দেখেই বলেছিল, ‘পিয়াস তোমার খবর কী? তুমি নাকি ভূতের ভয় পাও।’ আমার চোখ দুটো হঠাৎ করেই বড় বড় হয়ে গেল, ব্যাটা বলে কী? কৃত্রিম হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এসব কে বলে?’ ‘মাইন্ড করলা? খালেদ বলল।’ ‘খালেদ কিছু জানে না। ও তো একটা ছাগল। তুমি তাকে ভালো মতোই চেনো, তিলকে তাল বানাতে সে ওস্তাদ।’ ‘সরি। আর যদি সত্যিই পাও, আমাকে বোলো। এক হুজুর পরিচিত আছে, খুবই ভালো।’

রিপনকে অনেক বাজার করতে হবে বলে ওর সামনে থেকে চলে যাই। আবার আজকে কার সাথে দেখা হয় কে জানে? অবশ্য দেখা হবার সম্ভাবনাই বেশি। যেভাবে রিউমার ছড়াচ্ছে, দোকানদারও কবে যেন এসব জিজ্ঞেস করে বসে।

দুই কেজি আলু কিনলাম। বিশ টাকা কেজি। সাইজও ভালো। ওনার ডিজিটাল মেশিন নাই। পাল্লা-পাথর দিয়ে মেপে দিল। বললাম, ‘এই মাপ কি ঠিক?’ ‘কী কন স্যার, যদি ভুল হয় আমি কিড়া খাই।’ ‘আচ্ছা তোমাকে কিড়া খাইতে হবে না। দাও।’

লোকটার এত কনফিডেন্স, এতটা আমার নিজেরও নাই। একে করপোরেট ওয়ার্ল্ডে ইন করাতে পারলে অনেক ডেভেলপ করত। পেঁয়াজ কিনলাম তিন কেজি। এখন শুধু মাছ কিনলেই হবে। কিন্তু মাছের যা দাম! মাছ বিক্রেতাদের দাম জিজ্ঞেস করতেই ভয় করে। তবু সস্তা মাছের ভেতরে পাঙাশ, নলা, তেলাপিয়া, আর পাল্লা কৈ। এদের টেস্ট যে খুব ভালো তা-ও না। তবে দামের কারণে এগুলোই আপাতত খাচ্ছি। টাকা থাকলে আবার ইলিশ কিনতেও কার্পণ্য করি না। টাকার ওপর নির্ভর করে আমি কিপটে কি না!

কেনাকাটা করার সময়ও মনে হয় এই বুঝি কেউ পিছন দিক দিয়া এসে ঘাড় ধরে বলবে, ‘পিয়াস চল আমাদের সাথে।’ যদিও এই রকম কিছু ঘটেনি। তবে আমার বিশ্বাস এক দিন ঘটবে।

বাজার-সদাই করে বাসায় ফিরলাম। একটা পাঙাশ কিনেছি আড়াইশ টাকা দিয়ে। পনেরো টাকা দিয়ে কাটাতে হয়েছে। বাসায় এনে বটি দিয়ে সুন্দর করে পিসগুলোকে সাইজ করলাম। বিভিন্ন ধরনের মশলার ফাঁকি দিয়ে সাত পিস মিক্সড করলাম। চুলায় আগুন ধরিয়ে কড়াইতে সয়াবিন তেল ঢেলে দিয়ে তেলটা গরম হওয়া পর্যন্ত রবীন্দ্রসংগীত গাইতে থাকলাম….মাঝে মাঝে তব দেখা পাই….। গরম তেলে একটা একটা মাছের টুকরো ছেড়ে দিলাম। চিটমিট চিটমিট শব্দ হচ্ছে। শব্দটাও বেশ রবীন্দ্রিক। চিটমিট শব্দের সাথে অন্য রুম থেকে দ্রুত ধোঁয়া বেরোলে যে রকম শব্দ হয় সেই রকম শব্দ হতে লাগল। অবশ্য অন্য রুমে যাবার কোনো প্রয়োজনবোধ করলাম না। কারণ গিয়ে দেখব শূন্য। শুধু শুধু কষ্ট করে লাভ কী!

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে ভাতঘুম দেব ভেবে চিৎ হয়ে শুয়ে মেসেঞ্জারের বাক্স খুলতেই অনেকগুলো মেসেজ। সেগুলোর রিপ্লাই দিতে দিতেই ঘুম চলে আসবে মনে হয়। কয়েকটা রিপ্লাই দিলাম। একটা কল এল। আননোন নাম্বার। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলে উঠল, ’পিয়াস বলছেন?’ ‘হ্যাঁ, কে?’ ‘ওকে।’

বলেই লাইন কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কলব্যাক করলাম। কিন্তু নট রিচেবল বলছে। কেউ জাস্ট এইটুকু জানার জন্য ফোন দেয়। কে দিল সেটাও জানা হলো না। বেচারার হয়তো চার্জ শেষ হয়ে গেছে। নেটওয়ার্ক না-ও থাকতে পারে। অনেক কিছুই চিন্তা করলাম। ব্যাপার হচ্ছে এই লোকের ফোন এসে কাজের কাজ হলো। চিন্তা করার মতো একটা সাবজেক্ট পেলাম। তাঁকে নিয়ে কয়েকটা নোটস টুকে রাখলাম।

কেন ফোনটা কেটে গেল? ১. চার্জ শেষ ২. নেটওয়ার্ক নাই ৩. দুর্ঘটনা, এমনকি মারাও যাইতে পারে। ৪. গার্লফ্রেন্ড রাগ করে ফোন ভেঙে ফেলেছে। ৫. নিজেই আছাড় মেরেছে। ৬. ওয়াশরুম থেকে ফোন দিয়েছে, কিন্তু পিছলে কমোডে পড়ে গেছে। ৭. ছিনতাই হয়ে গেছে।

এই রকম ১০০টা পয়েন্ট লিখে ফেললাম। কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলাম না বলেই এত কষ্ট। লিস্টটা টেপ দিয়ে—যেই টেবিলে বসে মাঝে মাঝে পড়ি—সেখানে আটকে দিলাম। এটা নিয়ে গবেষণা করতে হবে। দেখা যাক কোনো ফল পাওয়া যায় কি না।

সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করতে গিয়ে দেখি নেই। নেহাত দায়ে পড়েই আবার বের হতে হলো। ফলোয়ারও আমাকে ফলো করতে শুরু করল। এতক্ষণ এত লিখলাম, তখনও শব্দগুলো পেয়েছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি কিসের শব্দ, অবশ্য এই বুঝতে না পারার ব্যাপারটা লেখা ঠিক হলো না, আগেও একবার লিখে ফেলেছি। যাই হোক, বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

বারান্দায় বসে বসে সিগারেট টানছি। মুক্তি ফোন দিয়ে বলেছে দ্রুত ফিরবে, আমাকে নিয়ে নাকি শপিংয়ে যাবে। শপিং করতে খারাপ লাগে না। যতক্ষণ মুক্তির সাথে থাকি ভালো লাগে। এটা-ওটা পছন্দ করে দিই। আমাকেও দেয়। সিগারেট টানতে টানতে ভাবছি সেই ফোনকলের কথা। আবার কল করলাম, নট রিচেবল।

বেকার স্বামীদের স্ত্রীর কথায় বেশি আপত্তি করতে নেই। নীল শার্টটা গায়ে গলিয়ে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, হঠাৎ মনে হলো আয়নার ভেতর আমার ঠিক পেছনের ছায়াটা একটু বেশি গাঢ়। আমি একটু ডান দিকে সরলাম, ছায়াটাও সরল। আমি বাঁয়ে সরলাম, ওটাও বাঁয়ে। সাধারণ ফিজিক্সের নিয়ম অনুযায়ী এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, ছায়াটার নড়াচড়ার টাইমিং আমার চেয়ে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ স্লো।

সিগারেটের শেষ অংশটুকু টবে গুঁজে দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। মুক্তির আসতে এখনো অন্তত আধা ঘণ্টা দেরি। এই আধা ঘণ্টা কী করা যায়? আমার সেই একশটা পয়েন্টের লিস্টের দিকে তাকালাম। ৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল— ‘ছিনতাই হয়ে গেছে’। যদি সত্যিই ছিনতাই হয়ে থাকে, তবে ফোনটা এখন কোনো না কোনো চোরাই মার্কেটে ঘুরছে। আর যদি লোকটা সত্যিই মরে গিয়ে থাকে, তাহলে তো আমার এই লিস্টের কোনো মানেই হয় না। মরা মানুষের ফোন বন্ধ থাকাটাই প্রকৃতির নিয়ম।

ঠিক তখনই বাথরুমের দিক থেকে একটা শব্দ হলো। পানির কল ছেড়ে দেওয়ার শব্দ। ছলাৎ করে পানি পড়ার আওয়াজ। আমি স্পষ্ট শুনলাম। অথচ আমি জানি বাথরুমে কেউ নেই। আমি ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে এগোলাম। দরজা অর্ধেক খোলা। উঁকি দিয়ে দেখলাম, যা ভেবেছি তাই। কেউ নেই, কলও বন্ধ। কিন্তু মেঝের একটা নির্দিষ্ট জায়গা ভেজা। যেন কেউ এইমাত্র সেখানে দাঁড়িয়ে মুখ ধুয়ে গেল!

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে আবার সেই অস্বস্তিকর স্রোতটা নেমে গেল। আমি আব্দুল গণি সাহেবের দেওয়া ওষুধের পাতাটা বের করলাম। গোলাপি রঙের ছোট একটা ট্যাবলেট। সকালে একটা খেয়েছি, রাতে আরেকটা খাওয়ার কথা। এই ব্যাটা ডাক্তার আমাকে কী ওষুধ দিল কে জানে! আগে তো এরা শুধু পিছু নিত, এখন দেখি আমার বাথরুমও ব্যবহার করা শুরু করেছে। এই রেটে চলতে থাকলে তো দুদিন পর এরা আমার ভাগের পাঙাশ মাছও দাবি করে বসবে।

কলিংবেল বেজে উঠল। মুক্তি এসেছে। আমি দরজা খুলে দিলাম। মুক্তি ঢুকেই সোফায় ধপাস করে বসে পড়ল। কপালে ঘাম। আমি টেবিল থেকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম। এক চুমুকে অর্ধেক পানি শেষ করে মুক্তি বলল, ‘উফ! যা জ্যাম না রাস্তায়! রেডি হয়ে নাও পিয়াস, বের হব। নিউ মার্কেটে যাব।’ ‘নিউ মার্কেট? এই জ্যাম ঠেলে?’ আমি কিছুটা আপত্তি করার চেষ্টা করলাম। ‘হ্যাঁ। আমার কয়েকটা কুর্তি কেনা লাগবে। আর তোমার জন্য দুটো শার্ট। তুমি তো নিজে থেকে কিছুই কিনবে না। যাও, ওই নীল শার্টটা পরে নাও।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। বেকার স্বামীদের স্ত্রীর কথায় বেশি আপত্তি করতে নেই। নীল শার্টটা গায়ে গলিয়ে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, হঠাৎ মনে হলো আয়নার ভেতর আমার ঠিক পেছনের ছায়াটা একটু বেশি গাঢ়। আমি একটু ডান দিকে সরলাম, ছায়াটাও সরল। আমি বাঁয়ে সরলাম, ওটাও বাঁয়ে। সাধারণ ফিজিক্সের নিয়ম অনুযায়ী এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, ছায়াটার নড়াচড়ার টাইমিং আমার চেয়ে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ স্লো। মানে আমি সরার একটু পরে সে সরছে। মাথাটা ঝাঁকি দিয়ে আয়নার সামনে থেকে সরে এলাম। গণি সাহেবের ওষুধ আমার ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশনও শুরু করে দিল নাকি?

আমরা যখন নিচে নেমে রিকশা খুঁজছি, তখন স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমার পেছনে দুজন দাঁড়িয়ে আছে। একজন মনে হয় একটু বেশি লম্বা, কারণ আমার ঘাড়ের কাছে ওপর থেকে একটা ঠান্ডা নিশ্বাস এসে পড়ছে। অন্যজন একটু দূরে। আমি মুক্তির দিকে তাকালাম। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে রিকশাওয়ালাদের সাথে দরদাম করছে। ‘মামা নিউ মার্কেট যাইবা?’ ‘যামু। আশি টেকা।’ ‘আশি টাকা কেন? সবসময় তো পঞ্চাশ টাকা দিয়ে যাই।’

আমি মনে মনে হাসলাম। এই ‘সবসময় পঞ্চাশ টাকা দিয়ে যাই’ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাহা মিথ্যা কথাগুলোর একটি। যা হোক, শেষমেশ ষাট টাকায় রিকশা ঠিক হলো।

রিকশায় আমরা দুজন পাশাপাশি বসেছি। আমার ডান পাশে মুক্তি। বাঁ পাশটা খালি, মানে রাস্তার দিক। রিকশা চলতে শুরু করার পর আমি টের পেলাম, রিকশার পেছনের পাদানিতে কেউ একজন দাঁড়িয়ে পড়েছে। রিকশাটা একটু ভারী হয়ে গেল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম না। কারণ আমি জানি দেখলে কাউকেই পাব না। শুধু শুধু ঘাড় ব্যথা করে লাভ কী! আমি বরং উপভোগ করার চেষ্টা করলাম। এক রিকশায় আমরা চারজন যাচ্ছি, অথচ ভাড়া দিচ্ছি দুজনের। লস তো রিকশাওয়ালার, আমার কী!

নিউ মার্কেট বরাবরের মতোই লোকে লোকারণ্য। গিজগিজ করছে মানুষ। এই ভিড়ের মাঝে আমার সেই অদৃশ্য সঙ্গীদের কোনো অস্তিত্ব টের পেলাম না। হয়তো ভিড়ের চাপে তারা পিছিয়ে পড়েছে, অথবা মানুষের ভিড় তাদের পছন্দ না। মুক্তির পেছনে পেছনে আমি একটা লেডিস কাপড়ের দোকানে ঢুকলাম।

মুক্তি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। ‘কী হয়েছে তোমার? মুখটা এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?’

সে একটার পর একটা কুর্তি দেখছে, আর দোকানদার বিরক্তিকর উৎসাহ নিয়ে সেগুলো মেলে ধরছে। ‘…আপা এইটা দেখেন, একদম লেটেস্ট কালেকশন। আপনার গায়ের রঙের সাথে দারুণ ফুটবে।’ আমার কাজ হলো মুক্তি যখন কোনো কুর্তি আমার দিকে তুলে ধরবে, তখন বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলা, ‘হ্যাঁ, কালারটা সুন্দর। তবে আগেরটা বেশি ভালো ছিল।’

ঠিক এই সময় আমার পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। বের করে দেখি সেই আননোন নাম্বার! বুকের ভেতরটা একটু ছ্যাঁত করে উঠল। চারপাশের এত কোলাহল, এত মানুষ, তবুও কেন যেন মনে হলো পুরো দোকানটা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেছে। আমি দোকান থেকে একটু বাইরে এসে রিসিভ করলাম। ‘হ্যালো?’ ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু একটা ভারী নিশ্বাসের শব্দ। ‘হ্যালো, কে বলছেন? পিয়াস বলছি।’ এবার ওপাশ থেকে একটা গলা শোনা গেল। খুব যান্ত্রিক আর শীতল গলা— ‘নীল শার্টটা আপনাকে মানিয়েছে পিয়াস।’

আমার শরীর মুহূর্তেই বরফ হয়ে গেল। আমি দ্রুত চারপাশে তাকালাম। হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে। কেউ আমার দিকে তাকিয়ে নেই। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। ‘কে আপনি? কোথায় আপনি?’ আমি গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম। ‘আমি আপনার পেছনেই ছিলাম। ভিড়ের কারণে একটু পিছিয়ে পড়েছি। তবে আমরা আপনাকে দেখছি।’

‘আমরা’…! শব্দটা আমার কানে গিয়ে ধাক্কা দিল। তার মানে এরা সত্যিই দুজন। আমি পেছন ফিরে তাকালাম। না, কেউ নেই। ‘আপনারা কী চান আমার কাছে?’ ওপাশ থেকে একটা ছোট হাসির শব্দ ভেসে এল। ‘আমরা কিছুই চাই না পিয়াস। আমরা শুধু সঙ্গ দিতে চাই। একা থাকতে থাকতে আপনি তো ক্লান্ত।’ ’আপনার লিস্টের কী খবর? ওই যে, ফোন কেটে যাওয়ার কারণের লিস্ট?’

আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। এই লিস্টের কথা তো আমি আর মুক্তি ছাড়া কেউ জানে না! এমনকি মুক্তিও পুরোটা পড়েনি। লোকটা জানল কীভাবে? ‘আপনি আমার ঘরের ভেতর ঢুকেছিলেন?’ ‘আমরা তো আপনার সাথেই থাকি পিয়াস। আচ্ছা রাখি, আপনার স্ত্রী আপনাকে খুঁজছে।’

লাইনটা কেটে গেল। আমি ড্যাবড্যাব করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যি সত্যি ভেতর থেকে মুক্তি ডাকছে, ‘পিয়াস! কই গেলে? এদিকে আসো, দেখো তো এই দুইটার মধ্যে কোনটা নেব?’

আমি টলটলে পায়ে ভেতরে গেলাম। মুক্তির হাতে একটা মেরুন আর একটা কফি কালারের কুর্তি। আমি কোনোমতে বললাম, ‘মেরুনটা নাও।’ মুক্তি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। ‘কী হয়েছে তোমার? মুখটা এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?’ ‘না... মানে, একটু গরম লাগছে তো। চলো, তোমার কেনা হলে বের হই।’

শপিং শেষ করে যখন আমরা নিউ মার্কেট থেকে বের হলাম, তখন রাত আটটা। রাস্তায় সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলো। আমার ভেতর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। এতক্ষণ যেটাকে আমি ভয় পাচ্ছিলাম, এখন সেটার জায়গায় একটা অদম্য কৌতূহল এসে ভর করেছে। এই অদৃশ্য সঙ্গীরা কারা? এরা কি সত্যিই ভূত, নাকি অন্য কোনো ডাইমেনশনের প্রাণী? নাকি আমার মাথার ভেতরের কোনো নিউরনের শর্টসার্কিট?

বাসায় ফেরার পথে আমি আর কোনো কথা বললাম না। মুক্তিও ক্লান্ত ছিল, সেও চুপচাপ। বাসায় ফিরে মুক্তি সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল ফ্রেশ হতে। আমি সোফায় বসে গণি সাহেবের দেওয়া ওষুধের পাতাটা আবার বের করলাম। আজ সকালে ওষুধটা খাওয়ার পরেই বাথরুমে শব্দ পেয়েছি। ওষুধ খাওয়ার পরেই লোকটার ফোন এসেছে, যে লোকটা আমার লিস্টের কথা জানে। তার মানে কী? এই ওষুধ কি আমার সমস্যা কমাচ্ছে, নাকি এদের সাথে আমার যোগাযোগের রাস্তাটা আরও পরিষ্কার করে দিচ্ছে?

আমি একটা কাগজ আর কলম নিলাম। নতুন একটা লিস্ট তৈরি করা দরকার। বিষয়: অদৃশ্য সঙ্গীদের উদ্দেশ্য কী? ১. এরা আমার বডি দখল করতে চায়। (সিনেমায়ে যেমন দেখায়) ২. এরা আমার মতোই বেকার ভূত, টাইমপাস করার জন্য আমার পিছু নিয়েছে। ৩. গণি সাহেবের ওষুধ আসলে কোনো জাদুর বড়ি, যা আমাকে অন্য জগতের সাথে কানেক্ট করছে। ৪. আমি আসলে পাগল হয়ে যাচ্ছি।

সকালে ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। মনে হচ্ছে যেন পালকের মতো হালকা হয়ে গেছি। গত কয়েক বছরের বেকার জীবনের সেই পরিচিত বুক-ধড়ফড়ানি বা ডিপ্রেশনের ছিটেফোঁটাও আজ আর নেই। বিছানা ছেড়ে উঠলাম। বেডরুমের দরজা খুলে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখি ডাইনিং টেবিলে নাশতা সাজানো।

চার নম্বর পয়েন্টটা লিখে আমি নিজেই একটু হাসলাম। পাগল হয়ে গেলে মানুষ কি এত লজিক্যালি লিস্ট বানাতে পারে? অসম্ভব। আমার ব্রেন পুরোপুরি সুস্থ।

ঠিক তখনই আবার ফোন বাজল। আননোন নাম্বার। আমি এবার একটুও ভয় পেলাম না। বেশ শান্তভাবেই রিসিভ করলাম। ‘হ্যালো।’ ‘লিস্ট বানানো শেষ হলো পিয়াস?’ সেই একই শীতল কণ্ঠস্বর। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। তা আপনারা এখন কোথায়? ড্রয়িংরুমে নাকি বেডরুমে?’ ওপাশ থেকে আবার সেই যান্ত্রিক হাসি। ‘আমরা ড্রয়িংরুমেই আছি। সোফার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দুজন।’ আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। কেউ নেই। ‘দেখতে তো পাচ্ছি না আপনাদের।’ আমি বেশ আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। ‘আপনি দেখতে পাবেন না পিয়াস। অন্তত এখনই না। তবে আপনি চাইলে আমাদের পুরোপুরি অনুভব করতে পারেন।’ ‘কীভাবে?’ ‘আজ রাতের ওষুধটা খেয়ে নিন। ডাক্তার সাহেব আপনাকে যে গোলাপি বড়িটা দিয়েছেন।’

আমি চমকে উঠলাম। এরা চাইছে আমি ওষুধটা খাই! তার মানে আমার তিন নম্বর পয়েন্টটাই ঠিক। এই ওষুধটাই হচ্ছে এদের সাথে আমার কানেক্টিং কেবল। ‘ওষুধ খেলে কী হবে?’ আমি জানতে চাইলাম। ‘ওষুধ খেলে কাল সকাল থেকে আমরা আর দুজন থাকব না। আমরা তিনজন হয়ে যাব। আপনার একাকীত্ব পুরোপুরি কেটে যাবে পিয়াস। আমরা আপনার সাথে লুডু খেলব, বাজারের ব্যাগ টেনে দেব। বেকারত্বের এই বিরক্তিকর সময়টা আমরা মিলেমিশে পার করে দেব।’

কথাগুলো শুনে আমার কেন যেন খুব একটা খারাপ লাগল না। বরং একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। এই বিশাল ঢাকা শহরে, যেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড়, সেখানে সবাই সবার মতো ব্যস্ত। কেউ কারো খবর রাখে না। আমার বউ মুক্তিও সকাল নয়টায় বেরিয়ে যায়, ফেরে সেই সন্ধ্যায়। সারাটা দিন আমি একা একা এই চার দেয়ালের ভেতর পচে মরি। এই নিঃসঙ্গতার চেয়ে অদৃশ্য তিনজন বন্ধু থাকা কি খুব বেশি খারাপ কিছু? ‘তোমাদের তৃতীয় বন্ধুটি কে হবে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘সেটা কাল সকালেই বুঝতে পারবেন পিয়াস। এখন ওষুধটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।’

ফোনটা কেটে গেল। বাথরুম থেকে বের হয়ে মুক্তি তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এল। ‘কী গো, একা একা বসে কী ভাবছ? ডিনার করবে না?’ আমি মুক্তির দিকে তাকালাম। আমার স্ত্রী। কত সুন্দর, কত স্বাভাবিক একটা জীবন তার। আর আমি কোথায় তলিয়ে যাচ্ছি কে জানে! ‘হ্যাঁ, করব। তুমি খাবার বাড়ো, আমি আসছি।’

রাতের খাওয়া শেষে আমি এক গ্লাস পানি নিয়ে টেবিলে বসলাম। ওষুধের পাতা থেকে গোলাপি রঙের বড়িটা বের করলাম। মুক্তি আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ডাক্তার গণি সাহেব কিন্তু বলেছেন ওষুধটা রেগুলার খেতে। কোনোভাবেই গ্যাপ দেওয়া যাবে না। তোমার কি মনে হয়, ওষুধটা খেয়ে একটু ভালো ফিল করছ?’

আমি বড়িটা জিভের ডগায় রাখলাম। পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুক্তির দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি দিলাম। ‘হ্যাঁ মুক্তি। আমি খুব ভালো ফিল করছি। আমার মনে হয়, গণি সাহেবের এই ওষুধটা আসলেই জাদুকরী।’ ঢোক গিলে ওষুধটা খেয়ে ফেললাম।

মুক্তি তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, ‘যাক বাঁচা গেল। তোমার ওই ফলো করার ফালতু চিন্তাটা মাথা থেকে গেলেই আমি শান্তি পাই। চলো, এখন শুয়ে পড়ি।’

মুক্তি বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আমি টেবিল থেকে উঠে লাইট অফ করতে যাব, ঠিক তখনই আমার ডান পাশ থেকে খুব নিচু স্বরে, ফিসফিস করে কেউ একজন বলে উঠল, ‘গুড ডিসিশন, পিয়াস।’ আমি থমকে দাঁড়ালাম। তারপর বাঁ পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল, ‘কাল সকালে আমাদের নতুন বন্ধুর সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।’

আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভয়ের বদলে আমার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। কাল সকালে আমরা তিনজন থেকে চারজন হতে যাচ্ছি। চারজন মিলে দারুণ একটা ক্যারাম বোর্ড খেলা যাবে। আমি তো একা নই, আমার একটা পুরো টিম তৈরি হচ্ছে! আমি অন্ধকারেই ফিসফিস করে বললাম, ‘গুড নাইট, বন্ধুরা। কাল সকালে দেখা হবে।’

তারপর ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে এগোলাম। পেছন থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলাম, থপথপ করে দুজোড়া পা আমার সাথে সাথে বেডরুমের দিকে এগিয়ে আসছে। এবার আর আমার মেরুদণ্ড বেয়ে কোনো অস্বস্তিকর স্রোত নামল না। বরং মনে হলো, যাক, শেষমেশ আমার বেকার জীবনে কিছুটা বিনোদনের ব্যবস্থা তো হলো! কাল সকালে বাজারে যাওয়ার সময় আর একা যেতে হবে না। আলু কেনার সময় এবার আমার টিমের লোকজন আমাকে সাহায্য করবে। কে জানে, হয়তো কাল আমরা তিন কেজি না, পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনে আনব!

সকালে ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। মনে হচ্ছে যেন পালকের মতো হালকা হয়ে গেছি। গত কয়েক বছরের বেকার জীবনের সেই পরিচিত বুক-ধড়ফড়ানি বা ডিপ্রেশনের ছিটেফোঁটাও আজ আর নেই। বিছানা ছেড়ে উঠলাম। বেডরুমের দরজা খুলে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখি ডাইনিং টেবিলে নাশতা সাজানো। মুক্তি চুলা থেকে চা নামিয়ে আনছে। আমি হাসিমুখে বললাম, ‘গুড মর্নিং, মুক্তি! আজ বাজারে যাব না, চলো দুজনে মিলে বরং কোথাও ঘুরে আসি...’

কিন্তু মুক্তি আমার কথার কোনো উত্তর দিল না। সে আমাকে পাশ কাটিয়ে, চা নিয়ে সোজা হেঁটে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সেখানে আরেকজন বসে আছে! নীল রঙের শার্ট পরা একটা লোক। লোকটার পিঠ আমার দিকে। আমি স্তব্ধ হয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। লোকটা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুক্তির দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘ওষুধটা আসলেই জাদুর মতো কাজ করেছে মুক্তি। আজ রাতে একদম ডিপ স্লিপ হয়েছে। কোনো আজেবাজে স্বপ্ন দেখিনি, মনেই হয়নি কেউ আমাকে ফলো করছে।’

লোকটার গলা হুবহু আমার! শুধু গলা নয়, চেহারা, চুল আঁচড়ানোর স্টাইল, বসার ভঙ্গি—সব আমার। আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। আমি নিজের হাত দুটোর দিকে তাকালাম। সেগুলো কেমন যেন আবছা, প্রায় স্বচ্ছ।

ঠিক তখনই আমার ডান কাঁধে একটা শীতল হাত এসে পড়ল। বাঁ কাঁধে আরেকটা। আমি চমকে দুপাশে তাকালাম। আমার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—তাদের দুজনের চেহারাই আমার মতো! একজন পরে আছে আমার সেই পুরোনো চেক শার্ট, আরেকজনের গায়ে গত রোববারের পরা সেই হলুদ টি-শার্টটা। ডানপাশের জন মুচকি হেসে বলল, ‘গুড মর্নিং, পিয়াস। বলেছিলাম না, আজ সকালে আমাদের নতুন বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেব? এই যে, তুমিই সেই তৃতীয় বন্ধু।’

আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘এসবের মানে কী? ওই লোকটা কে? আর তোমরাই বা কে?’ বাঁদিকের জন এবার কথা বলল। তার গলাটা হুবহু কাল রাতের সেই আননোন নাম্বারের লোকটার মতো। যান্ত্রিক এবং শীতল। ‘ডাক্তার গণির ওই গোলাপি বড়িটা কোনো সাধারণ ওষুধ না পিয়াস। ওটা মানুষের ব্রেন থেকে তার ডিপ্রেসড, প্যারানয়েড আর বেকার সত্তাগুলোকে আলাদা করে শরীর থেকে বের করে দেয়। ব্রেনকে রিবুট করে একটা একদম ফ্রেশ, সলিড আর নরমাল ‘পিয়াস’ তৈরি করে। ওই যে টেবিলে বসে চা খাচ্ছে, ও হলো ফ্রেশ পিয়াস। আর আমরা হলাম তোমার ব্রেনের ডিলিট হয়ে যাওয়া পুরোনো ফোল্ডার। বাতিল সত্তা।’

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো পা বাড়ালাম। আমার নিজেরই শরীরের পেছনে। আমরা তিনজন সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। সামনে বাজারের ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছে ফ্রেশ পিয়াস। আর তার ঠিক এক ধাপ পেছনে আমরা তিনজন। থপথপ... থপথপ...

আমি চিৎকার করে মুক্তিকে ডাকতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা থেকে কোনো শব্দ হলো না। টেবিলে বসা ‘আমি’ ততক্ষণে নাশতা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। বাজারের পুরোনো ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে মুক্তির কপালে আলতো চুমু খেল। ‘আমি বাজার থেকে আসছি। আজ একটু বড় সাইজের পাঙাশ আনব, ঠিক আছে?’ ফ্রেশ পিয়াস দরজা খুলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

আমার ডানপাশের জন আমার পিঠে হাত রেখে আলতো ধাক্কা দিল। ‘চলো বন্ধু, ডিউটি শুরু। এখন থেকে আমাদের কাজ শুধু ওকে ফলো করা। একা একা বেকার বসে থাকার চেয়ে তিনজনে মিলে এই কাজটা করা অনেক ইন্টারেস্টিং, তাই না?’ আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো পা বাড়ালাম। আমার নিজেরই শরীরের পেছনে। আমরা তিনজন সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। সামনে বাজারের ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছে ফ্রেশ পিয়াস। আর তার ঠিক এক ধাপ পেছনে আমরা তিনজন। থপথপ... থপথপ...

হঠাৎ তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে এসে সামনের পিয়াস থমকে দাঁড়াল। সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তির ছাপ। মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের স্রোত নামার সেই পরিচিত অনুভূতিটা তার মুখে স্পষ্ট। সে কাউকে দেখতে পেল না। শুধু কপালে একটু ঘাম জমল। সে ঢোক গিলে দ্রুত পা চালিয়ে নিচে নামতে লাগল। আমরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। আমি বুঝতে পারলাম, খেলাটা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আজ হয়তো আমরা তিনজনে মিলে ওর ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলে পাঁচ কেজি পেঁয়াজই কিনে আনব!

সম্পর্কিত