জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

উর্দু ছোট গল্প

একজন বারবনিতার চিঠি

লেখা:
লেখা:
কৃষণ চন্দর

স্ট্রিম গ্রাফিক

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং কায়েদে আজম জিন্নাহর প্রতি,

আমার বিশ্বাস, এর আগে আপনারা কোনো বারবনিতার চিঠি পাননি। সম্ভবত আজ পর্যন্ত আপনারা আমার মতো অন্য কোনো নারীর মুখও দেখেননি। আমি জানি আপনাদের এই চিঠি লেখা কতটা অশালীন। তাও আবার এমন খোলা চিঠি! কিন্তু কী করব, পরিস্থিতি আমাকে অসুহায় করেছ। আর এই দুই কিশোরীর দাবিও এতই তীব্র যে আমি এই চিঠি না লিখে পারলাম না। এই চিঠি কি আমি লিখছি? নাকি এই চিঠি আমার মাধ্যমে লিখিয়ে নিচ্ছে ‘বেলা’ আর ‘বাতুল’। আমি অন্তর থেকে ক্ষমা চাইছি যদি আমার চিঠির কোনো বাক্য আপনাদের কাছে আপত্তিকর মনে হয়। সেটা আমার নিরুপায় অবস্থা ভেবে ক্ষমা করবেন।

বেলা আর বাতুল কেন আমাকে দিয়ে এই চিঠি লিখিয়ে নিচ্ছে? এই দুই মেয়ে কারা? ওরা কেন আমাকে এমন বাধ্য করল এই চিঠি লিখতে? এসব বলার আগে আমি নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। ঘাবড়াবেন না। আমি আপনাদের আমার বীভৎস জীবনের ইতিহাস শোনাব না। কখন বা কোন পরিস্থিতিতে আমি পতিতা হলাম, সে কোথাও না বললাম।

কোনো তথাকথিত ‘ভদ্র’ আবেগের আশ্রয় নিয়ে আমি আপনাদের কাছে মিথ্যে করুণা ভিক্ষা করতে আসিনি। আপনাদের সংবেদনশীল হৃদয়ের সুযোগ নিয়ে নিজের সাফাই গাইতে কোনো প্রেমের গল্প ফাঁদতে চাই না। এই চিঠি লেখার উদ্দেশ্য আপনাদের বারবনিতা জীবনের রহস্য জানানো নয়। আমি শুধু নিজের সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। যেকথাগুলোর প্রভাব পরবর্তীকালে বেলা আর বাতুলের জীবনে পড়তে পারে।

আপনারা বহুবার বোম্বে এসেছেন। জিন্নাহ সাহেব তো বোম্বেকে খুব ভালোভাবেই দেখেছেন। কিন্তু আপনারা আমাদের এই এলাকা কেনই বা দেখবেন? যে এলাকায় আমি থাকি তার নাম ‘ফার্স রোড’। ফার্স রোড হচ্ছে গ্র্যান্ট রোড আর মদনপুরার ঠিক মাঝখানে। গ্র্যান্ট রোডের ওপাশে ল্যামিংটন রোড, অপেরা হাউস, চৌপাট্টি, মেরিন ড্রাইভ আর ফোর্টের এলাকা। এসব জায়গায় বোম্বের উচ্চবিত্ত ভদ্রলোকেরা থাকেন। আর মদনপুরার দিকে গরিবদের বস্তি। ফার্স রোড এই দুইয়ের মাঝখানে। মাঝখানে হওয়ায় ধনী ও দরিদ্র উভয়ই এখান থেকে সমান সুবিধা পেতে পারে। তবে ফার্স রোড মদনপুরার বেশি কাছে। নিশ্চয়ই জানেন যে চরম দারিদ্র্য আর বারবনিতা বৃত্তির মধ্যে দূরত্ব সবসময়ই খুব কম থাকে।

দোকানটি ভালো জায়গায় নয়। এখানে রাতে তো বটেই, দিনেও মানুষ হোঁচট খায়। এই অন্ধকার গলিতে মানুষ পকেট খালি করে যায়। মদ খেয়ে মাতলামি করে। তুচ্ছ কারণে এখানে ছুরি চলে, প্রতি দু-তিন দিন অন্তর এখানে খুন হয়। প্রতি মুহূর্তে জান হাতে নিয়ে থাকতে হয়।

এই এলাকা খুব একটা সুন্দর নয়। বাসিন্দারাও বদখত। এর বুক চিরে দিনরাত ট্রামের ঘড়ঘড়ানি চলতে থাকে। দুনিয়ার যত নেড়ি কুত্তা, বখাটে ছেলে, গুণ্ডাদের গলিতে ঘুরতে দেখা যায়। পঙ্গু, লম্পট, যক্ষ্মা রোগী—সব ধরনের মানুষ এখানে ভিড় করে। নোংরা হোটেল, স্যাঁতসেঁতে ফুটপাতে আবর্জনার স্তূপের ওপর ভনভন করা লাখ লাখ মাছি, কাঠ আর কয়লার গুদাম, পেশাদার দালাল, বাসি ফুলের মালা বিক্রেতা, চটি বই আর নগ্ন ছবির দোকানদার, চীনা নাপিত, মুসলিম নাপিত আর ল্যাংগট পরা গালিগালাজ করা পালোয়ান—আমাদের জীবনের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা আপনি এই ফার্স রোডে পাবেন।

এআই দিয়ে বানানো ছবি

খুবই স্বাভাবিক। আপনারা এখানে কেন আসবেন? কোনো ভদ্রলোক এদিকে পা বাড়ান না। ভদ্রলোকেরা গ্র্যান্ট রোডের ওপাশে থাকেন। আর যারা খুব বেশি ভদ্র তারা থাকেন মালাবার হিলে। আমি একবার জিন্নাহ সাহেবের কুঠির সামনে দিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে মাথা নত করে সালামও করেছিলাম। বাতুলও আমার সাথে ছিল। জিন্নাহ সাহেবের প্রতি বাতুলের অসীম শ্রদ্ধা। তা আমি কোনোদিন ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। খোদা আর রাসুলের পর দুনিয়ায় সে যদি কাউকে ভালোবেসে থাকে তবে সে আপনি। সে আপনার ছবি লকেটে ভরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে রাখে। কোনো খারাপ নিয়তে নয়। বাতুলের বয়স এখন মাত্র ১১ বছর। ছোট্ট একটা মেয়ে তো সে…। যদিও ফার্স রোডের লোকেরা এখনই তাকে নিয়ে আজেবাজে মতলব আঁটছে। সে কথা নাহয় পরে বলব।

বেলা নিজের চোখে তার বাবাকে খুন হতে দেখেছে। তারপর নিজের চোখে দেখেছে তার মায়ের মৃত্যুযন্ত্রণা। উন্মত্ত খুনিরা তার মায়ের স্তন কেটে ফেলে দিয়েছিল। সেই স্তন—যা দিয়ে একজন মা নিজের সন্তানকে দুধ পান করায়, সৃষ্টির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে। সৃষ্টির ওপর এত বড় জুলুম কে করেছিল?

তো এই হলো ফার্স রোড যেখানে আমি থাকি। ফার্স রোডের পশ্চিম প্রান্তে চীনা নাপিতের দোকানের কাছে এক অন্ধকার গলির মোড়ে আমার দোকান। লোকে অবশ্য অন্য নামে ডাকে। আপনারা জ্ঞানী মানুষ। আপনাদের কাছে কী লুকাব? আমি একে দোকানই বলি। সেখানে আমি ঠিক সেভাবেই ব্যবসা করি যেভাবে মুদি দোকানি, সবজিওয়ালা, ফলওয়ালা বা হোটেলের মালিক ব্যবসা করে। প্রতিটি ব্যবসায় গ্রাহককে খুশি করার পাশাপাশি নিজের লাভের কথাও ভাবতে হয়। আমার ব্যবসাও ঠিক তেমন। পার্থক্য শুধু এই যে আমি কালোবাজারি করি না। এটুকু ছাড়া অন্য ব্যবসায়ীদের সাথে আমার কোনো তফাত নেই।

দোকানটি ভালো জায়গায় নয়। এখানে রাতে তো বটেই, দিনেও মানুষ হোঁচট খায়। এই অন্ধকার গলিতে মানুষ পকেট খালি করে যায়। মদ খেয়ে মাতলামি করে। তুচ্ছ কারণে এখানে ছুরি চলে, প্রতি দু-তিন দিন অন্তর এখানে খুন হয়। প্রতি মুহূর্তে জান হাতে নিয়ে থাকতে হয়।

আমি আবার খুব উঁচুদরের নর্তকী নই। হলে পাওয়াই বা ওর্লিতে সমুদ্রের ধারে কুঠি নিয়ে থাকতাম। আমি খুব সাধারণ মানের একজন পতিতা। আমি সারা হিন্দুস্তান দেখেছি, বহু ঘাটের জল খেয়েছি। সব ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে এই বোম্বেতে, এই ফার্স রোডে, এই দোকানেই বসে আছি। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই দোকানের সেলামি এখন ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অথচ জায়গাটা মোটেই ভালো নয়। বাতাস দুর্গন্ধে ভরা, চারদিকে কাদা-প্যাঁচপ্যাঁচে নোংরা। আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। খেকি কুকুরগুলো খদ্দেরদের কামড়াতে তেড়ে আসে। তবুও এই জায়গার সেলামি ছয় হাজার টাকা!

আমার দোকানটা একতলা একটি বাড়িতে। দুটো ঘর। সামনের ঘরটি আমার বৈঠকখানা। এখানে আমি গান গাই, নাচি, খদ্দেরদের মনোরঞ্জন করি। পেছনের ঘরটি রান্নাঘর, গোসলখানা আর শোয়ার ঘর। একদিকে জলের কল, হাঁড়ি-পাতিল, আর একটা বড় খাট। তার নিচে আরেকটি ছোট খাট। আর তার নিচে আমার কাপড়ের ট্রাঙ্ক। বাইরের ঘরে বিজলি বাতি থাকলেও ভেতরের ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাড়ির মালিক বহু বছর ধরে চুনকাম করায়নি, করাবেও না। এত সময় কার আছে? আমি সারারাত নাচি, গান গাই আর দিনে ওই বালিশে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। বেলা আর বাতুলকে আমি পেছনের ঘরটি দিয়েছি। প্রায়ই খদ্দেররা যখন হাত-মুখ ধুতে ওপাশে যায়। বেলা আর বাতুল বড় বড় চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ওই চাউনি যা বলতে চায়, আমার এই চিঠিও ঠিক তা-ই বলছে। তারা যদি এই মুহূর্তে আমার কাছে না থাকত, তবে এই গুনাহগার নারী আপনাদের কাছে এই ধৃষ্টতা দেখাত না। আমি জানি দুনিয়া আমার ওপর থুতু ছিটাবে। হয়তো আপনাদের কাছে এই চিঠি পৌঁছাবেও না। তবুও নিরুপায় হয়ে চিঠিটি লিখছি কারণ বেলা আর বাতুলের এটাই ইচ্ছে।

আপনারা হয়তো ভাবছেন বেলা আর বাতুল আমার নিজের মেয়ে। না। আমার কোনো সন্তান নেই। এই দুই মেয়েকে আমি বাজার থেকে কিনেছি। যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তুঙ্গে ছিল আর গ্র্যান্ট রোড, ফার্স রোড ও মদনপুরায় মানুষের রক্ত জলের মতো বইছিল—সেই সময় আমি বেলাকে একজন মুসলিম দালালের কাছ থেকে তিনশ টাকায় কিনেছিলাম। ওই দালাল মেয়েটিকে দিল্লি থেকে এনেছিল। সেখানে বেলার মা-বাবা থাকতেন। বেলার পরিবার রাওয়ালপিন্ডির রাজা বাজারের পেছনে পুঞ্চ হাউসের সামনের গলিতে থাকত। মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল ওর। রক্তে ছিল আভিজাত্য আর সারল্য। বেলা ছিল তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। রাওয়ালপিন্ডিতে যখন মুসলিমরা হিন্দুদের ওপর চড়াও হয়, তখন সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। দিনটা ছিল ১২ই জুলাই। বেলা স্কুল থেকে ফিরছিল। সে দেখল তার বাড়ির সামনে এক বিশাল জনতা। হাতে নানা রকমের অস্ত্র। ওরা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিল। মানুষকে ঘর থেকে বের করে খুন করছিল।

বেলা নিজের চোখে তার বাবাকে খুন হতে দেখেছে। তারপর নিজের চোখে দেখেছে তার মায়ের মৃত্যুযন্ত্রণা। উন্মত্ত খুনিরা তার মায়ের স্তন কেটে ফেলে দিয়েছিল। সেই স্তন—যা দিয়ে একজন মা নিজের সন্তানকে দুধ পান করায়, সৃষ্টির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে। সৃষ্টির ওপর এত বড় জুলুম কে করেছিল?

বেলা এখন আমার কাছে। আমার আগে সে ওই দালালের কাছে ছিল। বেলার বয়স তখন বারো বছর হয়েছে কী হয়নি। বাড়ি থাকলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। বড় হলে তার মা-বাবা কোনো ভদ্র ঘরের গরিব ছেলের সাথে তার বিয়ে দিতেন। সে নিজের ছোট্ট সংসার সাজাত স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে। কিন্তু সেই অকাল ঝড়ে বেলার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। এখন বেলাকে দেখে বারো বছরের কিশোরী মনে হয় না। তার বয়স কম । কিন্তু তার জীবন অভিজ্ঞতা অনেক বড়। তার চোখের সেই আতঙ্ক, মানবতার প্রতি সেই তিক্ততা আর মৃত্যুর তৃষ্ণা—কায়েদে আজম সাহেব, আপনি যদি তা দেখতেন তবে হয়তো আঁচ করতে পারতেন। সেই সহায়হীন চোখের গভীরতা আপনি হয়তো বুঝতেন।

আপনারা তো সজ্জন মানুষ। আপনারা হিন্দু বা মুসলিম ভদ্র ঘরের নিরপরাধ মেয়েদের দেখেছেন। আপনারা হয়তো বুঝতে পারতেন যে নিষ্পাপ হওয়ার কোনো ধর্ম হয় না। সেটা গোটা মানবতার আমানত। সারা বিশ্বের উত্তরাধিকার। যে একে ধ্বংস করে, দুনিয়ার কোনো ধর্মের ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করতে পারেন না। বাতুল আর বেলা আজ দুই বোনের মতো আমার কাছে থাকে। কিন্তু বাতুল আর বেলা আপন বোন নয়। বাতুল মুসলিম মেয়ে। বেলার জন্ম হিন্দু ঘরে। আজ দুজনেই ফার্স রোডের এক পতিতার ঘরে বাস করে।

বেলা রাওয়ালপিন্ডি থেকে এসেছে। বাতুল জালন্ধরের খেমকরন গ্রামের এক পাঠানের মেয়ে। বাতুলের বাবার সাতটি মেয়ে ছিল। তিনজন বিবাহিত আর চারজন কুমারী। বাতুলের বাবা ছিল কৃষক। গরিব পাঠান। কিন্তু আত্মমর্যাদাবান। বংশপরম্পরায় তারা খেমকরনে বাস করত। জাঠদের সেই গ্রামে এই তিন-চারটি ঘরই ছিল পাঠানের। তারা কত শান্তিতে ছিল তা পণ্ডিতজি আপনি হয়তো এই থেকে বুঝবেন যে, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের গ্রামে মসজিদ বানানোর অনুমতি ছিল না। তারা ঘরের ভেতর চুপচাপ নামাজ পড়ত। মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের আমল থেকে কোনো মুমিন ওই গ্রামে আজান দেয়নি। তাদের অন্তর ঈমানের আলোয় উজ্জ্বল থাকলেও জাগতিক বাধ্যবাধকতা ছিল তীব্র। তবু পরমতসহিষ্ণুতার খাতিরে তারা কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। বাতুল ছিল তার বাবার সবচাইতে প্রিয় সন্তান। সাত বোনের মধ্যে ছোট, সবচাইতে সুন্দর। এতই সুন্দর যে মনে হয় হাত দিলে যেন ময়লা হয়ে যাবে। পণ্ডিতজি, আপনি নিজে কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত। একজন শিল্পী হিসেবে জানেন সৌন্দর্য কাকে বলে। আজ সেই সৌন্দর্য আমার এই আবর্জনার স্তূপে মিশে আছে। কোনো জহুরি একে চিনে নেবে এমন সম্ভাবনা খুব কম। এই নোংরা নর্দমায় কেবল লোলুপ দৃষ্টির খদ্দেররাই ঘোরাফেরা করে।

আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি অনেক কিছু বলে ফেললাম। হয়তো এসব আমার বলা উচিত হয়নি। হয়তো এতে আপনাদের মর্যাদাহানি হয়েছে। হয়তো এর চেয়ে তিক্ত কথা আপনাদের কেউ শোনায়নি। হয়তো আপনারা কিছুই করতে পারবেন না। তবুও আমাদের দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। দুই দেশ হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান।

বাতুল পুরোপুরি নিরক্ষর। সে শুধু জিন্নাহ সাহেবের নাম শুনেছিল। কী মনে করে পাকিস্তানকে এক চমৎকার ব্যাপার মনে করে সে-ও স্লোগান দিয়েছিল। যেমন তিন-চার বছরের শিশুরাও বাড়িতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলে বেড়ায়। মাত্র ১১ বছর বয়স তো তার। এই নিরক্ষর বাতুল মাত্র কয়েকদিন হলো আমার কাছে এসেছে। একজন হিন্দু দালাল তাকে আমার কাছে নিয়ে আসে। আমি তাকে পাঁচশ টাকায় কিনে নিই। এর আগে সে কোথায় ছিল, আমি জানি না। তবে লেডি ডাক্তার আমাকে যা বলেছেন, তা শুনলে আপনি হয়তো পাগল হয়ে যাবেন। বাতুল নিজেও এখন প্রায় উন্মাদের মতো। তার বাবাকে জাঠরা এমন নির্মমভাবে মেরেছে যে হিন্দু সভ্যতার গত ছয় হাজার বছরের আবরণ খুলে গিয়ে আদিম বর্বরতা নগ্ন রূপে বেরিয়ে এসেছে। প্রথমে জাঠরা তার চোখ উপড়ে ফেলে। তারপর তার মুখে প্রস্রাব করে। তারপর তার গলা চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে আনে। এরপর তার বিবাহিত মেয়েদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। ঠিক তাদের বাবার লাশের সামনে। রিহানা, গুল দরখশা, মারজানা, বেগম—একে একে ওই বুনো মানুষগুলো তাদের মন্দিরের মূর্তিকে অপবিত্র করল। যে পিতা তাদের জীবন দিয়েছিলেন, যে পিতা তাদের লোরি শুনিয়ে বড় করেছেন, যার সামনে তারা সলজ্জ মাথা নত করত—সেই বোন ও মায়েদের সাথে পৈশাচিক আচরণ করা হলো। হিন্দু ধর্ম আজ তার সম্মান খুইয়েছে। তার সহিষ্ণুতা ধ্বংস হয়েছে। তার গরিমা ধুলোয় মিশিয়েছে। আজ ঋগ্বেদের প্রতিটি মন্ত্র নিস্তব্ধ। আজ গ্রন্থ সাহেবের প্রতিটি দোহা লজ্জিত। আজ গীতার প্রতিটি শ্লোক রক্তাক্ত। কার সাহস আছে আমার সামনে অজন্তার চিত্রকলার গল্প করবে? অশোকের শিলালিপি শোনাবে? ইলোরার মূর্তিদের গুণগান গাইবে? বাতুলের ওই অসহায় নিথর ঠোঁট, তার শরীরে ওই হিংস্র জানোয়ারদের দাঁতের দাগ—এর মধ্যেই তোমাদের অজন্তার মৃত্যু ঘটেছে। তোমাদের ইলোরার জানাজা বেরিয়েছে। তোমাদের সভ্যতার কাফন তৈরি হয়েছে। আমি সেই সৌন্দর্য দেখাব আজ যা একসময় বাতুল ছিল। আজ সেই পচনশীল লাশের দিকে তাকান আপনারা যার নাম বাতুল।

আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি অনেক কিছু বলে ফেললাম। হয়তো এসব আমার বলা উচিত হয়নি। হয়তো এতে আপনাদের মর্যাদাহানি হয়েছে। হয়তো এর চেয়ে তিক্ত কথা আপনাদের কেউ শোনায়নি। হয়তো আপনারা কিছুই করতে পারবেন না। তবুও আমাদের দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। দুই দেশ হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান।

একজন বারবনিতারও হয়তো তার নেতাদের কাছে প্রশ্ন করার অধিকার আছে যে এখন বেলা আর বাতুলের কী হবে? বেলা আর বাতুল শুধু দুটি মেয়ে নয়। তারা দুটো জাতি। দুটো সভ্যতা। তারা মন্দির আর মসজিদ। বেলা আর বাতুল এখন ফার্স রোডের এক পতিতার কাছে থাকে যে চীনা নাপিতের পাশে নিজের ব্যবসা চালায়। বেলা আর বাতুল এই কাজ পছন্দ করে না। আমি তাদের কিনেছি। আমি চাইলে তাদের দিয়ে এই কাজ করাতে পারি। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডি আর জালন্ধর তাদের সাথে যা করেছে, আমি তা করব না। আমি তাদের এখনো ফার্স রোডের অন্ধকার থেকে আলাদা করে রেখেছি। তবুও যখন আমার খদ্দেররা পেছনের ঘরে হাত-মুখ ধুতে যায়, তখন বেলা আর বাতুলের চোখগুলো আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যে আমি আর স্থির থাকতে পারি না। আমি তাদের সেই না বলা কথা আপনাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছে দিতে পারছি না। আপনারা কি পারেন না নিজে এসে তাদের চোখের ভাষা পড়ে দেখতে?

পণ্ডিতজি, আমি চাই আপনি বাতুলকে নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করুন। জিন্নাহ সাহেব, আমি চাই আপনি বেলাকে আপনার প্রিয় কন্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিন। এই ফার্স রোডের থাবা থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিজের ঘরে আশ্রয় দিন। আর শুনুন নোয়াখালী থেকে রাওয়ালপিন্ডি, ভরতপুর থেকে বোম্বে পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হওয়া সেই লাখ লাখ আত্মার আহাজারি। সবাই তো শুনছে! এই আর্তনাদ কি শুধু ‘গভর্নমেন্ট হাউস’ পর্যন্তই পৌঁছায় না? এই আওয়াজ কি আপনারা শুনবেন?

আপনার বিশ্বস্ত,

ফার্স রোডের একজন বারবনিতা

উর্দু থেকে অনুবাদ জাভেদ হুসেন

সম্পর্কিত