আরিফ রহমান

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, শনিবার। বর্ষপঞ্জির চিরায়ত নিয়মে অগ্রহায়ণের কুয়াশামাখা মেঘলা আকাশ আর ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে আকাশে উঠেছিল শাওয়ালের চাঁদ। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে দিনটি ছিল এক পবিত্র উৎসবের, কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বদ্বীপ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওই এক ফালি চাঁদ কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনেনি।
সেদিনের চাঁদটি ছিল এক বিষাদময় বাস্তবতার নীরব সাক্ষী। এক কোটি মানুষ তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে শরণার্থী। লাখ লাখ নারী পাকিস্তানি জান্তার ক্যাম্পে পাশবিক নির্যাতনের শিকার। আর রণাঙ্গনে চলছে জীবনবাজি রাখা লড়াই। উৎসবের চিরায়ত সংজ্ঞাকে পাল্টে দিয়ে একাত্তরের ঈদুল ফিতর পরিণত হয়েছিল শোক, আত্মত্যাগ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে।
দখলদার বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত 'স্বাভাবিকতার' কাঠামোর ভেতরে থেকে উৎসব পালনে স্বতঃস্ফূর্ত অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বুঝিয়ে দিয়েছিল, পরাধীনতায় আবদ্ধ কোনো ভূখণ্ডে উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।
অবরুদ্ধ ঢাকা শহর ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর এক ভুতুড়ে নগরীর রূপ ধারণ করেছিল। পাকিস্তানি জান্তা ঈদের দিন সকালেই শহরে কারফিউ জারি করে এবং চিরুনি তল্লাশি শুরু করে। এই ভীতিকর পরিবেশে শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈদকেন্দ্রিক কোনো উদ্দীপনা ছিল না।
শিল্পী হাশেম খান তাঁর শীর্ষক স্মৃতিচারণায় অবরুদ্ধ ঢাকার চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চিরায়ত ঈদের দিন শিশুদের যে উচ্ছ্বাস বা নতুন জামাকাপড় কেনার যে প্রবল আগ্রহ থাকে, একাত্তরের ঈদে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। ঘরে ঘরে পোলাও, কোরমা, ফিরনি বা সেমাই রান্নার কোনো আয়োজন ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা নিনা যুদ্ধকালীন নয় মাস ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন। তাঁর দিনলিপি থেকে জানা যায়, ১৬ নভেম্বরের দিকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে এবারের ঈদে কারও মুখে কোনো আনন্দ নেই। কেউ নতুন জামা কেনেনি, কেবল ছোট বোনদের জন্য সাধারণ খদ্দরের কাপড় কেনা হয়েছিল এবং তিনি নিজে বসে ছোট ভাইবোনের জামা সেলাই করেছিলেন।
শহীদ জননীর রান্নাঘর
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর কালজয়ী দিনলিপি 'একাত্তরের দিনগুলি'-তে এই দিনের এক অন্যরকম আত্মত্যাগের চিত্র এঁকেছেন। ঈদের দিন সকালে তিনি ঘরের পর্দা কাচা, ঝুল ঝাড়া বা মাকড়সার জাল পরিষ্কার করার মতো সাধারণ কাজগুলোও করেননি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান এবং পরিবারের কেউ ঈদের নামাজ পড়তে যায়নি। কিন্তু এই চরম বিষাদের মাঝেও তিনি ভোরে উঠে পোলাও, কোরমা, কোপ্তা, কাবাব ও জর্দা রান্না করেছিলেন। তাঁর মনে প্রবল আশা ছিল যদি রাতের অন্ধকারে তাঁর সন্তান রুমির কোনো সহযোদ্ধা গেরিলা আশ্রয়ের খোঁজে আসে, তবে তাদের তিনি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবেন। এমনকি গেরিলাদের জামায় লাগিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি গোপনে এক শিশি আতরও কিনে রেখেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের একটি বড় উদাহরণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক লেখায়। ঈদের দিন সকালে তিনি তাঁর ছোট ছেলে কায়েসকে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন, সড়ক জনমানবশূন্য এবং রাস্তায় ট্রাকে ট্রাকে মিলিটারির টহল চলছে। টেলিভিশন অফিসের কাছে গেলে মিলিটারি তাঁদের রিকশা ফিরিয়ে দেয়। তিনি দেখতে পান, বায়তুল মোকাররম মসজিদে সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় নামমাত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুদ্ধকালে এই ধরনের জামাতকে 'নাজায়েজ' বিবেচনা করে তিনি তাঁর জীবনে প্রথমবারের মতো ঈদের জামাতে শরিক হওয়া থেকে বিরত থাকেন।
ঈদের দিনে প্রবাসী সরকার
কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরেও ঈদ পালিত হয়েছিল অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে।
ঈদের দিনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক অনন্য নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুজিবনগর সরকারের কার্যালয়ে সেই দিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মিষ্টান্ন ও শুকনো খাবার উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদ সেই মিষ্টি ও ফলমূল মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিলিয়ে দেন।
রাতের অন্ধকারে তিনি গোপনে কুষ্টিয়া রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে সাধারণ সেমাই খেয়ে যোদ্ধাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদ উদযাপন করেন এবং ভোরে কলকাতায় ফিরে আসেন।
'জয় বাংলা' পত্রিকার সম্পাদকীয়
১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২৬ নভেম্বর প্রবাসী সরকারের মুখপত্র 'জয় বাংলা' পত্রিকায় প্রকাশিত বার্তাগুলো সেই সময়ের রাজনৈতিক দর্শন ফুটিয়ে তোলে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন যে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণে শোকে মুহ্যমান জাতি সে বছর ঈদ উৎসব পালন করতে পারেনি। ঠিক একইভাবে, একাত্তরে ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত ১০ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে জাতি আবারও ঈদ উৎসব বর্জন করেছে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, দেশকে শত্রুমুক্ত করার পরই কেবল জাতি বিজয়ের ঈদ উদযাপন করবে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও'
মুক্তিযুদ্ধে জনমত গঠন, অবরুদ্ধ দেশবাসীকে প্রতিরোধের মন্ত্রে একতাবদ্ধ রাখা এবং যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট। বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, সৈয়দ আব্দুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বেতার কেন্দ্র থেকে ঈদের দিনে ধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিরোধের আগুন।
একাত্তরের রোজার ঈদে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়িত উপস্থাপনাটি ছিল কালজয়ী গান 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও'। গানটির কথা লিখেছিলেন কবি শহীদুল ইসলাম, সুর করেছিলেন অজিত রায় এবং সমবেত কণ্ঠে গেয়েছিলেন রূপা ফরহাদসহ অন্যান্য শিল্পীরা। ইসলামি ঐতিহ্যে শাওয়ালের চাঁদ হলো আনন্দ, প্রাপ্তি এবং রোজার পরিসমাপ্তির পবিত্র প্রতীক। কিন্তু এই গানে বলা হলো— 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও.../ দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/ রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো?'
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, ঈদের দুই দিন আগেই গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আকাশে চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই এটি সম্প্রচার করা হয়।
গানটির আবেগিক অনুরণন এতটাই তীব্র ছিল যে, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ঈদের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারা দিন বেজে চলা এই গানটি শুনে রণাঙ্গনের অনেক সাহসী যোদ্ধাও সেদিন ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন।
মেলাঘর ক্যাম্পের এক টুকরো মাংস
ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান ঘাঁটি মেলাঘর ক্যাম্পে ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফরিদপুরের হাজার হাজার তরুণ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। লে. কর্নেল খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দারের অধীনে পরিচালিত এই ক্যাম্পে পর্যাপ্ত খাবারের তীব্র অভাব ছিল; হাজার হাজার মানুষের জন্য ছিল মাত্র একটি টিউবওয়েল।
ঈদের দিন এই অভাবী পরিবেশে যখন হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারে সামান্য মাংস পরিবেশন করা হয়। এই নিয়ে এক অভাবনীয় আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ক্যাম্পে। সেদিন 'আজ তো ঈদ! তাই মাংস।' খাবার পরিবেশনকারীর এই কথা শুনে অবরুদ্ধ ঢাকায় পরিবার ফেলে আসা অনেক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঈদের দিনের শহীদ আশফাকুস সামাদ
ঈদের দিনে রণাঙ্গনে আত্মত্যাগের অমর উপাখ্যান রচনা করেন বীর উত্তম আবু মঈন মো. আশফাকুস সামাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই অকুতোভয় ছাত্র ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯ ও ২০ নভেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার ফুলকুমার নদীর ওপর রায়গঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসী সম্মুখ যুদ্ধে তিনি অবতীর্ণ হন।
শত্রুর অপ্রত্যাশিত এবং শক্তিশালী আর্টিলারি ও এলএমজি বাঙ্কারের ট্র্যাপে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েন, তখন সামাদ তাঁর সহযোদ্ধাদের জানান, "কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। মরলে সবাই মরব। বাঁচলে একসঙ্গেই বাঁচব"।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে সহযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি মেশিনগান হাতে শত্রুর দিকে অবিরাম গুলি ছুঁড়তে থাকেন। এই জীবনমরণ লড়াইয়ের একপর্যায়ে তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঈদের আনন্দ ছিল কেবলই মাতৃভূমির স্বাধীনতা। এলাকার জনগণ পরে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে জয়মনিরহাটের নামকরণ করেন 'সামাদ নগর'।
শরণার্থী শিবিরের হাহাকার এবং এক অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও বর্বরতায় প্রায় এক কোটি মানুষ বাধ্য হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছিল। ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসামের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া এই ছিন্নমূল মানুষের কাছে ঈদ ছিল এক নিদারুণ কষ্টের দিন।
এরই মাঝে ভারতের হেজামারা শরণার্থী ক্যাম্প এবং ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা। সেখানে ঈদের জামাতে ইমামতি করার দায়িত্ব পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার ওপর, যিনি পরবর্তী জীবনে সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। রণাঙ্গনের ভয়াবহতা, স্বজন হারানোর হাহাকার এবং চারপাশের অবর্ণনীয় দুর্দশার মাঝে দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার সময় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে একপর্যায়ে অবিশ্বাস্য এক ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
তিনি উপস্থিত সহযোদ্ধা ও শরণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, "আল্লাহর কসম! আগামী বকরা ঈদের (ঈদুল আজহা) আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। আমি আপনাদের নিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করব।"
আশ্চর্য বিষয় রণাঙ্গনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এবং বিজয়ের মাত্র ১ মাস ১০ দিন পর, ১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পালিত হয় প্রথম ঈদুল আজহা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। ১৯৭২ সালের এই প্রথম ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই প্রাঙ্গণেই। এই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সেই মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা।
ত্যাগের মূল্যে অর্জিত বিজয়ের ঈদ
সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, একাত্তরের অবরুদ্ধ ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় দিনপঞ্জির তারিখ ছিল না; এটি ছিল বাঙালির ধৈর্য, মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। একটি জাতি যখন তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ধর্মীয় উৎসবকে স্বেচ্ছায় বর্জন করে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে, তখন সম্ভবত পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিই তাদের পরাধীন করে রাখতে পারে না।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের রান্না করা কিন্তু পরিবেশন না করা জর্দা, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিতরণ করা মিষ্টি, শিল্পী হাশেম খানের নাগরিক বিষাদ, আবু জাফর সামসুদ্দীনের বর্জিত ঈদের জামাত, মেলাঘর ক্যাম্পে মাংস পেয়ে কেঁদে ওঠা তরুণ গেরিলা, আর শহীদ আশফাকুস সামাদের শেষ বুলেটটি সব মিলিয়ে একাত্তরের ঈদ ছিল প্রতিরোধের এক মহাকাব্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই "ফিরে যাওয়া চাঁদ" আর ফিরে যায়নি, বরং তা স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে চিরস্থায়ী বিজয়ের আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।
তথ্যসূত্র:
• একাত্তরের ঈদ - Bangla Tribune
https://www.banglatribune.com/literature/217413/একাত্তরের-ঈদ
• একাত্তরে আজ ছিল মলিন ঈদ - নাগরিক সংবাদ, প্রথম আলো
https://https://nagorik.prothomalo.com/একাত্তরে-আজ-ছিল-মলিন-ঈদ
• একাত্তরেও এসেছিল ঈদ, তবে... - সময় নিউজ https://www.somoynews.tv/news/2022-05-01/কেমন-ছিলো-একাত্তরের-ঈ
• ১৯৭১: আজ তো ঈদ, তাই মাংস! - The Business Standard https://www.tbsnews.net/bangla/মতামত/১৯৭১-আজ-তো-ঈদ-তাই-মাংস
• একাত্তরে ঈদের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছিল - প্রথম আলো
https://www.prothomalo.com/onnoalo/7sswy423w7
• একাত্তরের বিষন্ন ইদের চাঁদ - সারাবাংলা https://sarabangla.net/featured-news/post-668026/
• কেমন ছিল '৭১–এর ঈদ | প্রথম আলো https://www.prothomalo.com/bangladesh/21n708rura

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, শনিবার। বর্ষপঞ্জির চিরায়ত নিয়মে অগ্রহায়ণের কুয়াশামাখা মেঘলা আকাশ আর ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে আকাশে উঠেছিল শাওয়ালের চাঁদ। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে দিনটি ছিল এক পবিত্র উৎসবের, কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বদ্বীপ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওই এক ফালি চাঁদ কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনেনি।
সেদিনের চাঁদটি ছিল এক বিষাদময় বাস্তবতার নীরব সাক্ষী। এক কোটি মানুষ তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে শরণার্থী। লাখ লাখ নারী পাকিস্তানি জান্তার ক্যাম্পে পাশবিক নির্যাতনের শিকার। আর রণাঙ্গনে চলছে জীবনবাজি রাখা লড়াই। উৎসবের চিরায়ত সংজ্ঞাকে পাল্টে দিয়ে একাত্তরের ঈদুল ফিতর পরিণত হয়েছিল শোক, আত্মত্যাগ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে।
দখলদার বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত 'স্বাভাবিকতার' কাঠামোর ভেতরে থেকে উৎসব পালনে স্বতঃস্ফূর্ত অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বুঝিয়ে দিয়েছিল, পরাধীনতায় আবদ্ধ কোনো ভূখণ্ডে উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।
অবরুদ্ধ ঢাকা শহর ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর এক ভুতুড়ে নগরীর রূপ ধারণ করেছিল। পাকিস্তানি জান্তা ঈদের দিন সকালেই শহরে কারফিউ জারি করে এবং চিরুনি তল্লাশি শুরু করে। এই ভীতিকর পরিবেশে শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈদকেন্দ্রিক কোনো উদ্দীপনা ছিল না।
শিল্পী হাশেম খান তাঁর শীর্ষক স্মৃতিচারণায় অবরুদ্ধ ঢাকার চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চিরায়ত ঈদের দিন শিশুদের যে উচ্ছ্বাস বা নতুন জামাকাপড় কেনার যে প্রবল আগ্রহ থাকে, একাত্তরের ঈদে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। ঘরে ঘরে পোলাও, কোরমা, ফিরনি বা সেমাই রান্নার কোনো আয়োজন ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা নিনা যুদ্ধকালীন নয় মাস ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন। তাঁর দিনলিপি থেকে জানা যায়, ১৬ নভেম্বরের দিকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে এবারের ঈদে কারও মুখে কোনো আনন্দ নেই। কেউ নতুন জামা কেনেনি, কেবল ছোট বোনদের জন্য সাধারণ খদ্দরের কাপড় কেনা হয়েছিল এবং তিনি নিজে বসে ছোট ভাইবোনের জামা সেলাই করেছিলেন।
শহীদ জননীর রান্নাঘর
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর কালজয়ী দিনলিপি 'একাত্তরের দিনগুলি'-তে এই দিনের এক অন্যরকম আত্মত্যাগের চিত্র এঁকেছেন। ঈদের দিন সকালে তিনি ঘরের পর্দা কাচা, ঝুল ঝাড়া বা মাকড়সার জাল পরিষ্কার করার মতো সাধারণ কাজগুলোও করেননি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান এবং পরিবারের কেউ ঈদের নামাজ পড়তে যায়নি। কিন্তু এই চরম বিষাদের মাঝেও তিনি ভোরে উঠে পোলাও, কোরমা, কোপ্তা, কাবাব ও জর্দা রান্না করেছিলেন। তাঁর মনে প্রবল আশা ছিল যদি রাতের অন্ধকারে তাঁর সন্তান রুমির কোনো সহযোদ্ধা গেরিলা আশ্রয়ের খোঁজে আসে, তবে তাদের তিনি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবেন। এমনকি গেরিলাদের জামায় লাগিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি গোপনে এক শিশি আতরও কিনে রেখেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের একটি বড় উদাহরণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক লেখায়। ঈদের দিন সকালে তিনি তাঁর ছোট ছেলে কায়েসকে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন, সড়ক জনমানবশূন্য এবং রাস্তায় ট্রাকে ট্রাকে মিলিটারির টহল চলছে। টেলিভিশন অফিসের কাছে গেলে মিলিটারি তাঁদের রিকশা ফিরিয়ে দেয়। তিনি দেখতে পান, বায়তুল মোকাররম মসজিদে সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় নামমাত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুদ্ধকালে এই ধরনের জামাতকে 'নাজায়েজ' বিবেচনা করে তিনি তাঁর জীবনে প্রথমবারের মতো ঈদের জামাতে শরিক হওয়া থেকে বিরত থাকেন।
ঈদের দিনে প্রবাসী সরকার
কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরেও ঈদ পালিত হয়েছিল অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে।
ঈদের দিনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক অনন্য নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুজিবনগর সরকারের কার্যালয়ে সেই দিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মিষ্টান্ন ও শুকনো খাবার উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদ সেই মিষ্টি ও ফলমূল মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিলিয়ে দেন।
রাতের অন্ধকারে তিনি গোপনে কুষ্টিয়া রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে সাধারণ সেমাই খেয়ে যোদ্ধাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদ উদযাপন করেন এবং ভোরে কলকাতায় ফিরে আসেন।
'জয় বাংলা' পত্রিকার সম্পাদকীয়
১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২৬ নভেম্বর প্রবাসী সরকারের মুখপত্র 'জয় বাংলা' পত্রিকায় প্রকাশিত বার্তাগুলো সেই সময়ের রাজনৈতিক দর্শন ফুটিয়ে তোলে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন যে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণে শোকে মুহ্যমান জাতি সে বছর ঈদ উৎসব পালন করতে পারেনি। ঠিক একইভাবে, একাত্তরে ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত ১০ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে জাতি আবারও ঈদ উৎসব বর্জন করেছে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, দেশকে শত্রুমুক্ত করার পরই কেবল জাতি বিজয়ের ঈদ উদযাপন করবে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও'
মুক্তিযুদ্ধে জনমত গঠন, অবরুদ্ধ দেশবাসীকে প্রতিরোধের মন্ত্রে একতাবদ্ধ রাখা এবং যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট। বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, সৈয়দ আব্দুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বেতার কেন্দ্র থেকে ঈদের দিনে ধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিরোধের আগুন।
একাত্তরের রোজার ঈদে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়িত উপস্থাপনাটি ছিল কালজয়ী গান 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও'। গানটির কথা লিখেছিলেন কবি শহীদুল ইসলাম, সুর করেছিলেন অজিত রায় এবং সমবেত কণ্ঠে গেয়েছিলেন রূপা ফরহাদসহ অন্যান্য শিল্পীরা। ইসলামি ঐতিহ্যে শাওয়ালের চাঁদ হলো আনন্দ, প্রাপ্তি এবং রোজার পরিসমাপ্তির পবিত্র প্রতীক। কিন্তু এই গানে বলা হলো— 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও.../ দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/ রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো?'
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, ঈদের দুই দিন আগেই গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আকাশে চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই এটি সম্প্রচার করা হয়।
গানটির আবেগিক অনুরণন এতটাই তীব্র ছিল যে, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ঈদের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারা দিন বেজে চলা এই গানটি শুনে রণাঙ্গনের অনেক সাহসী যোদ্ধাও সেদিন ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন।
মেলাঘর ক্যাম্পের এক টুকরো মাংস
ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান ঘাঁটি মেলাঘর ক্যাম্পে ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফরিদপুরের হাজার হাজার তরুণ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। লে. কর্নেল খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দারের অধীনে পরিচালিত এই ক্যাম্পে পর্যাপ্ত খাবারের তীব্র অভাব ছিল; হাজার হাজার মানুষের জন্য ছিল মাত্র একটি টিউবওয়েল।
ঈদের দিন এই অভাবী পরিবেশে যখন হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারে সামান্য মাংস পরিবেশন করা হয়। এই নিয়ে এক অভাবনীয় আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ক্যাম্পে। সেদিন 'আজ তো ঈদ! তাই মাংস।' খাবার পরিবেশনকারীর এই কথা শুনে অবরুদ্ধ ঢাকায় পরিবার ফেলে আসা অনেক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঈদের দিনের শহীদ আশফাকুস সামাদ
ঈদের দিনে রণাঙ্গনে আত্মত্যাগের অমর উপাখ্যান রচনা করেন বীর উত্তম আবু মঈন মো. আশফাকুস সামাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই অকুতোভয় ছাত্র ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯ ও ২০ নভেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার ফুলকুমার নদীর ওপর রায়গঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসী সম্মুখ যুদ্ধে তিনি অবতীর্ণ হন।
শত্রুর অপ্রত্যাশিত এবং শক্তিশালী আর্টিলারি ও এলএমজি বাঙ্কারের ট্র্যাপে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েন, তখন সামাদ তাঁর সহযোদ্ধাদের জানান, "কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। মরলে সবাই মরব। বাঁচলে একসঙ্গেই বাঁচব"।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে সহযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি মেশিনগান হাতে শত্রুর দিকে অবিরাম গুলি ছুঁড়তে থাকেন। এই জীবনমরণ লড়াইয়ের একপর্যায়ে তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঈদের আনন্দ ছিল কেবলই মাতৃভূমির স্বাধীনতা। এলাকার জনগণ পরে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে জয়মনিরহাটের নামকরণ করেন 'সামাদ নগর'।
শরণার্থী শিবিরের হাহাকার এবং এক অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও বর্বরতায় প্রায় এক কোটি মানুষ বাধ্য হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছিল। ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসামের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া এই ছিন্নমূল মানুষের কাছে ঈদ ছিল এক নিদারুণ কষ্টের দিন।
এরই মাঝে ভারতের হেজামারা শরণার্থী ক্যাম্প এবং ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা। সেখানে ঈদের জামাতে ইমামতি করার দায়িত্ব পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদার ওপর, যিনি পরবর্তী জীবনে সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। রণাঙ্গনের ভয়াবহতা, স্বজন হারানোর হাহাকার এবং চারপাশের অবর্ণনীয় দুর্দশার মাঝে দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার সময় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে একপর্যায়ে অবিশ্বাস্য এক ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
তিনি উপস্থিত সহযোদ্ধা ও শরণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, "আল্লাহর কসম! আগামী বকরা ঈদের (ঈদুল আজহা) আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। আমি আপনাদের নিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করব।"
আশ্চর্য বিষয় রণাঙ্গনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এবং বিজয়ের মাত্র ১ মাস ১০ দিন পর, ১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পালিত হয় প্রথম ঈদুল আজহা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। ১৯৭২ সালের এই প্রথম ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই প্রাঙ্গণেই। এই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সেই মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা।
ত্যাগের মূল্যে অর্জিত বিজয়ের ঈদ
সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, একাত্তরের অবরুদ্ধ ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় দিনপঞ্জির তারিখ ছিল না; এটি ছিল বাঙালির ধৈর্য, মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। একটি জাতি যখন তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ধর্মীয় উৎসবকে স্বেচ্ছায় বর্জন করে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে, তখন সম্ভবত পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিই তাদের পরাধীন করে রাখতে পারে না।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের রান্না করা কিন্তু পরিবেশন না করা জর্দা, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিতরণ করা মিষ্টি, শিল্পী হাশেম খানের নাগরিক বিষাদ, আবু জাফর সামসুদ্দীনের বর্জিত ঈদের জামাত, মেলাঘর ক্যাম্পে মাংস পেয়ে কেঁদে ওঠা তরুণ গেরিলা, আর শহীদ আশফাকুস সামাদের শেষ বুলেটটি সব মিলিয়ে একাত্তরের ঈদ ছিল প্রতিরোধের এক মহাকাব্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই "ফিরে যাওয়া চাঁদ" আর ফিরে যায়নি, বরং তা স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে চিরস্থায়ী বিজয়ের আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।
তথ্যসূত্র:
• একাত্তরের ঈদ - Bangla Tribune
https://www.banglatribune.com/literature/217413/একাত্তরের-ঈদ
• একাত্তরে আজ ছিল মলিন ঈদ - নাগরিক সংবাদ, প্রথম আলো
https://https://nagorik.prothomalo.com/একাত্তরে-আজ-ছিল-মলিন-ঈদ
• একাত্তরেও এসেছিল ঈদ, তবে... - সময় নিউজ https://www.somoynews.tv/news/2022-05-01/কেমন-ছিলো-একাত্তরের-ঈ
• ১৯৭১: আজ তো ঈদ, তাই মাংস! - The Business Standard https://www.tbsnews.net/bangla/মতামত/১৯৭১-আজ-তো-ঈদ-তাই-মাংস
• একাত্তরে ঈদের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছিল - প্রথম আলো
https://www.prothomalo.com/onnoalo/7sswy423w7
• একাত্তরের বিষন্ন ইদের চাঁদ - সারাবাংলা https://sarabangla.net/featured-news/post-668026/
• কেমন ছিল '৭১–এর ঈদ | প্রথম আলো https://www.prothomalo.com/bangladesh/21n708rura

আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ এলো ২০০৩ সালে। তখন আমার হাইস্কুল যাত্রা শেষের দিকে। কৈশোরের ওই সময়টার আগ পর্যন্ত আমাদের, মানে আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের ভাই-বোনদের ঈদ অভিজ্ঞতা খানিকটা অন্যরকম। স্মৃতি হাতড়ে যা মেলে, তা এ নিমিষেই গল্প করা সম্ভব। তবে সেই আবেগ হয়তো আরব্য রজনীর গল্পের চেয়েও টানটান।
১ ঘণ্টা আগে
সিকিউরিটি চিফ জানালো বিপদের সমূহ শঙ্কা। মানুষের কলোনিতে এক মশা-বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটেছে—ড. বাশার। এই মশকবিজ্ঞানী পরামর্শ দিয়েছেন যেকোনো মূল্যে ইউনাইটেড স্টেটস অব মস্কোইটোকে ‘ডেস্ট্রয়’ করতে হবে।
৩ ঘণ্টা আগে
বিশ্বাস করবেন না কথাটা! কিন্তু সত্যিই কেউ আমাকে অলওয়েজ ফলো করে। বাজারের ব্যাগ নিয়ে যখন বের হই, সিঁড়ি দিয়ে নামছি তখন থেকে ফলো করা শুরু। থপথপ করে পিছনের দিকে আওয়াজ হয়। পিছনে হাজারবার তাকিয়েও কিছু দেখতে পারিনি; নাকি চোখের সমস্যা বুঝতে পারি না।
১৪ ঘণ্টা আগে
প্রকৃতিতে কী খেয়াল চলছে কে জানে। মাটি অনুর্বর, পানি-বাতাস দূষিত। গ্রীষ্মের দেশে হঠাৎ করেই তুষারপাতের মতো শহরে ‘সত্যযুগ’ নেমে এল যেন। চারপাশের সবকিছু আগের মতোই আছে, ভৌত-অবকাঠামোর কোনো বদল চোখে পড়ে না। শুধু সবাই যা বলছে, নীরবেই তা ফলে যাচ্ছে, নয়তো উল্টো শোনা যাচ্ছে।
১৫ ঘণ্টা আগে