মুজিবনগর দিবস

মুজিবনগর সরকার যেভাবে আইনি বৈধতা পেয়েছিল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০: ০১
মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার পরে গার্ড অব অনার নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার ইতিহাসে ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল এই সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে রাষ্ট্রের বৈধতা প্রমাণের জন্য বেশ কিছু উপাদানের প্রয়োজন হয়। স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, কার্যকরী সরকার এবং অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতা থাকতে হয়। এই প্রতিটি শর্তই মুজিবনগর সরকার দক্ষতার সঙ্গে নিশ্চিত করেছিল। প্রশ্ন জাগে, কীভাবে একটি যুদ্ধকালীন সরকার ধাপে ধাপে নিজেদের আইনি বৈধতা অর্জন করেছিল?

ব্যলট বাক্সের রায় ও আইনি ম্যান্ডেট

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি বৈধতার শিকড় পোঁতা ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল। ভোটের হার ছিল ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ। সমগ্র পাকিস্তানের ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদেও তারা ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল গণরায় বিশ্বদরবারে মুজিবনগর সরকারকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তকমা থেকে রক্ষা করে। এই রায়ের ফলেই তারা জনগণের নির্বাচিত বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান হঠাৎ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। এর মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট এবং আইনি অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। এই ঘটনাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সামনে বিকল্প আইনি পথে হাঁটার যৌক্তিকতা তৈরি করে। আইনগত তত্ত্বে একে ‘ডকট্রিন অব ডেমোক্রেটিক লেজিটিমেসি’ বলা হয়। যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসনক্ষমতা গ্রহণ করতে বাধাগ্রস্ত হন, তখন তাঁরা জনগণের পক্ষ থেকে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার লাভ করেন।

মার্চের সমান্তরাল শাসন ও কার্যত নিয়ন্ত্রণ

১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়কাল আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ৩৫টি প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেন। এই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ব্যাংক পরিচালনা, খাজনা আদায়, শিল্প ও বাণিজ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডি ফ্যাক্টো’ বা কার্যত সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তখন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়েছিল। জনগণ শুধু তাঁদের নির্বাচিত নেতার আদেশ পালন করছিল। এই প্রেক্ষাপট প্রমাণ করে, ১০ এপ্রিলের সরকার গঠন হঠাৎ ঘটা কোনো বিষয় ছিল না। মার্চের সেই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আইনি রূপান্তর ছিল এই নতুন সরকার।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও প্রথম সংবিধান

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সামরিক জান্তা যখন নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই নাগরিকদের আত্মরক্ষার অধিকার জন্মায়। আন্তর্জাতিক আইনানুসারে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করা তখন সম্পূর্ণ বৈধ হয়ে ওঠে।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ১০ এপ্রিল নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভারতের আগরতলায় সমবেত হন। তাঁরা নিজেদের একটি গণপরিষদ হিসেবে গঠন করেন। সেখানেই ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা প্রোক্লামেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স গৃহীত হয়।

এই ঘোষণাপত্র মুজিবনগর সরকারকে পূর্ণাঙ্গ আইনি রূপ দান করে। ঘোষণাপত্র ১০ এপ্রিল গৃহীত হলেও আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য একে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে কার্যকর দেখানো হয়।

শূন্যতা পূরণে আইনের ধারাবাহিকতা

একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময় বিচারিক শূন্যতা এড়ানো সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জ। ১০ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ‘আইনের ধারাবাহিকতা প্রয়োগ আদেশ’ জারি করেন। বাংলাদেশের আইনব্যবস্থার দ্বিতীয় ভিত্তিপ্রস্তর ছিল এই আদেশ।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ছবি: সংগৃহীত
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ছবি: সংগৃহীত

এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, ২৫ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকা সব আইন নবগঠিত রাষ্ট্রের অধীনে বলবৎ থাকবে। এর ফলে বিচারক ও সিভিল কর্মকর্তারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়ে নিজ নিজ পদে বহাল থাকতে পেরেছিলেন। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলের যে আইনগুলো জনগণের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না, সেগুলোকে নতুন দেশে গ্রহণ করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রিক স্বীকৃতি

একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ১৯৩৩ সালের ‘মন্টেভিডিও কনভেনশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কনভেনশন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের চারটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। মুজিবনগর সরকার এই প্রতিটি শর্ত সফলভাবে পূরণ করেছিল।

পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে তাদের সার্বভৌমত্বের অধিকার প্রদান করেছিল। সরকার ভারত থেকে কাজ করলেও দেশের অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল একটি কৌশলগত আইনি পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে প্রমাণ করা হয় যে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভিত্তি রয়েছে। মন্ত্রিসভা ও সচিবালয়ের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু ছিল। পাশাপাশি লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও কলকাতায় মিশন স্থাপন করে বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার কাজও সরকার সফলভাবে করেছিল।

সংবিধানে পাকাপোক্ত স্বীকৃতি ও আদালতের রায়

১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর মুজিবনগর সরকার ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের মূল সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানে মুজিবনগর সরকারের সব কর্মকাণ্ডের আইনি বৈধতাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়। সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ এবং চতুর্থ তফসিল ছিল সেই আইনি সেতু। চতুর্থ তফসিলের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অধীনে গৃহীত সকল পদক্ষেপ বৈধ বলে গণ্য হবে। এগুলো কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে এই আইনি বৈধতাকে সমুন্নত রেখেছেন। ১৯৮০ সালের ‘মেসার্স দুলিচাঁদ ওমরাওলাল বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছিল সার্বভৌম দলিল। মুজিবনগর সরকারের আইনি ক্ষমতা কোনো বিদেশি শক্তির দান ছিল না; জনগণের রায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম ক্ষমতাই ছিল এর মূল ভিত্তি।

সম্পর্কিত