মুজিবনগর দিবস

মুজিবনগর সরকারের নেপথ্যে কারা ছিলেন

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০: ০২
মুজিবনগর সরকার: বাম থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এইচএম কামরুজ্জামান, জেনারেল এমএজি ওসমানী। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (পরবর্তীতে মুজিবনগর নামকরণ) শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়। তাই দিনকে ‘মুজিবনগর দিবস’ বলা হয়। তবে কোন সরকার মুজিবনগর দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে—এমন তথ্য কোনো সরকারি গেজেটে পাওয়া যায় না।

তবে একথা অনস্বীকার্য, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে একটি বৈধ সরকার গঠন ছিল মুক্তিযুদ্ধকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের কৌশলগত পদক্ষেপ। কারণ, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করছিল। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা চালায়। এই প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা আসে এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ চালাতে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রয়োজন ছিল। সেখান থেকেই একটি প্রবাসী সরকার গঠনের ধারণা সামনে আসে।

নেপথ্যের নেতৃত্ব: কারা ছিলেন মূল কারিগর

মুজিবনগর সরকার গঠনের নেপথ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলী।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন এই সরকারের প্রধান সংগঠক ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনির অপারেশন সার্চ লাইটের পর তিনি গোপনে ভারত পৌঁছে সরকারের কাঠামো দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, কারণ শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দিক সামলান।

১৭ এপ্রিল সকলে শপথ হয়ে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার সদস্য হিসাবে মনসুর আলি, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, আব্দুল মান্নান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, নুরুল ইসলাম আর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এ এ জি ওসমানীকে নিয়োগ করেন।

এদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে ছিলেন এম এ জি ওসমানী, যিনি সেনাবাহিনী সংগঠিত করেন এবং যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

কেমন ছিল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া

মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল পরিকল্পিত এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি সচেতন প্রচেষ্টা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বৈধতা ব্যবহার করে সরকার গঠনের ভিত্তি তৈরি করা হয়। এতে সরকারটি জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার পরে গার্ড অব অনার নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার পরে গার্ড অব অনার নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার যুক্তি দাঁড় করানো হয়। এই ঘোষণাকেই সরকার গঠনের সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ‘প্রজ্ঞাপন’ জারি করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রের কাঠামো, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা হয়। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। এই দিনটিকে সরকার কার্যকর হওয়ার দিন হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে এই স্থান ‘মুজিবনগর’ নামে পরিচিতি পায়।

সরকার গঠনের পরপরই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও কূটনৈতিক কার্যক্রম চালু করা হয়। শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগ্রহ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা সবই এই সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়।

এসময় ভারত সরকার মুজিবনগর সরকারের নেতাদের আশ্রয় দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ একটি সংগঠিত সামরিক ও কূটনৈতিক রূপ পায়। একইসঙ্গে, এই সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি পাঠানো, গণহত্যার তথ্য তুলে ধরা এবং সমর্থন আদায়ের চেষ্টা ছিল এর অংশ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর সরকার কেবল একটি প্রতীকী সরকার ছিল না; এটি ছিল কার্যকর যুদ্ধকালীন প্রশাসন। এর গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। রাজনৈতিক বৈধতা, সামরিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা। এই সরকার গঠনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বাধীন একটি সংগ্রাম। বিভিন্ন সেক্টরে বিভক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে আনা সম্ভব হয় এই সরকার গঠনের মাধ্যমে। একটি সংগঠিত সরকার থাকায় বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন চাওয়া সহজ হয়। এছাড়া যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রশাসনিক ধারাবাহিক কাঠামো বজায় থাকে।

তবে সবকিছু সহজ ছিল না। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, সম্পদের অভাব এবং যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তা ছিল মুজিবনগর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া দেশের ভেতরে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, গবেষক সিনথিয়া ফরিদের লেখা নেগসিয়েশন নেশনহুড

সম্পর্কিত