জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

স্ট্রিম ঈদ আয়োজন

মূলানুগতার দোহাই দিয়ে একটি অপাঠ্য অনুবাদ নির্মাণ করতে চাই না: জি এইচ হাবীব

বাংলাদেশের খ্যাতিমান অনুবাদক জি এইচ হাবীব। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’, নরওয়েজিয়ান লেখক ইয়স্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগৎ’, উমবার্তো ইকোর ‘গোলাপের নাম’-এর মতো অনূদিত বইগুলো তাঁকে এনে দিয়েছে খ্যাতি ও পাঠকের ভালোবাসা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন জি এইচ হাবীব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। সম্পাদনা করেন অনুবাদ সাহিত্যের পত্রিকা ‘তর্জমা’।

তাঁর অনুবাদের মূল দর্শন বেশ সহজ—যে বইটি পড়ে তাঁর নিজের ভালো লাগে, সেটিই অনুবাদ করতে আগ্রহী হন। বিশ্বসাহিত্যের অন্দরমহল, অনুবাদের কলাকৌশল এবং সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন স্ট্রিমের সঙ্গে।

স্ট্রিম গ্রাফিক

একজন অনুবাদকের মূল পরিচয় কী—তিনি কি কেবল একজন ‘ভাষার কারিগর’, নাকি মূল লেখকের সমকক্ষ একজন ‘পুনঃস্রষ্টা’?

জি এইচ হাবীব: নিজের কথা বলতে পারি। মূল লেখকের সমকক্ষতা কখনোই দাবি করি না। কিন্তু অনুবাদ যে নেহাতই একটি অনুকরণ, দ্বিতীয় শ্রেণির ও অনুল্লেখযোগ্য অসৃজনশীল অগুরুত্বপূর্ণ কাজ, তাও মনে করি না একদম।

‘আক্ষরিক অনুবাদ’ বনাম ‘ভাবানুবাদ’—এই চিরন্তন বিতর্কে আপনার ব্যক্তিগত অবস্থান কোথায়?

হাবীব: অনুবাদ একটি আপস। কিছু পাবো কিছু হারাবো। শুধু হারাবার কথা ভেবে আহাজারি করলে অনুবাদ না পড়ে মূল পড়াই ভালো। আমার কাছে পাঠযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সেই সঙ্গে, ফিকশনের ক্ষেত্রে, লেখকের রচনাশৈলীর দিকটিও হেলাফেলার নয়কিন্তু তা পাঠযোগ্যতা বিসর্জন দিয়ে নয়। মূলানুগতার দোহাই দিয়ে একটা অপাঠ্য অনুবাদ নির্মাণ করতে চাই না।
এমন কোনো বই বা লেখক কি আছেন, যাঁর কাজ অনুবাদ করতে গিয়ে আপনার নিজের জীবনদর্শন বা চিন্তার জগৎ গভীরভাবে প্রভাবিত বা পরিবর্তিত হয়েছে?

হাবীব: এক্ষেত্রে বলতেই হবে ইয়স্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগৎ’, এবং উমবের্তো একোর ‘গোলাপের নাম’, আর আইজাক আসিমভের ‘ফাউন্ডেশন’- এর কথা। পাশ্চাত্য দর্শন সম্পর্কে জানার হাতেখড়ি হয়েছিল আমার এই বইটি অনুবাদ করতে গিয়ে, যা আমাকে সম্পূর্ণ নতুন অনিন্দ্যসুন্দর এক জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। অন্য বই দুটি মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল লেখকের কল্পনাশক্তি ও রচনাশৈলীর অভিনবত্ব ও ব্যাপকতা দিয়ে।

অন্য ভাষার কোনো জটিল সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বা শব্দগুচ্ছ বাংলায় রূপান্তর করতে গিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?

হাবীব: এই ‘লড়াই’ সম্ভবত সবচাইতে বেশি করতে হয়েছে উমবের্তো একোর ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’ (গোলাপের নাম) অনুবাদ করতে গিয়ে। বিষয়, রচনাশৈলী, পরিভাষা, জ্ঞানকাণ্ডের বিভিন্ন পরিসর, ইত্যাদির দুরূহতার সঙ্গে দীর্ঘ কষ্টদায়ক তবে একই সাথে অত্যন্ত আনন্দময় একটি লড়াই বা যাত্রা ছিল সেটি, যেটা ১৬ বছরে শেষ হলেও, এখনো চলছে। চলছে এই অর্থে যে রচনাটির বা অনুবাদকর্মটির নতুন নতুন সংস্করণে সম্পাদনা বা পরিমার্জনা আশা করি জারি থাকবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অনুবাদ সাহিত্যের একটি বড় জোয়ার দেখা যাচ্ছে। তরুণেরা প্রচুর বিদেশি বই পড়ছেন এবং অনুবাদও করছেন। অনুবাদের এই পরিমাণগত বৃদ্ধিকে আপনি গুণগত মানের দিক থেকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

হাবীব: বেশ কয়েক বছর আগে আমার শিক্ষক ও সাহিত্যিক হায়াত মামুদ বলেছিলেন, বাংলাদেশে যে অনুবাদ হচ্ছে এটাই তো বড় কথা। দেশের সার্বিক যে টালমাটাল অবস্থা সেগুলো বিবেচনা করে বলতে হয়, স্যারের কথাটা এখনো সত্য। তাই বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি না। অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু পরিসরে বেশ সচেতনতাও লক্ষ করা যায়। যদিও হয়ত বেনোজল অনেক। তাই বলে হতাশ হলে চলবে না। দেশের সার্বিক অবস্থা ভালো হলে এক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

আমাদের প্রকাশনা শিল্পে বিদেশি বইয়ের ‘কপিরাইট’ বা মেধাস্বত্ব নেওয়ার বিষয়টি এখনো ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতে বাংলাদেশের এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি আমাদের সাহিত্যিক মর্যাদাকে কতটা ক্ষুণ্ন করছে? এর কাঠামোগত সমাধান কী হতে পারে?

হাবীব: আন্তর্জাতিক কোন জগতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে? বাংলাদেশের কোন জিনিসটি ঠিকঠাক মতো চলছে? বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্রনীতি, মূল্যবোধের অবস্থা কি? আমাদের প্রকাশনা জগতের অবস্থা কি, তার বাজার কতটুকু? এটাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্যকর অবস্থার ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি? এসব অত্যন্ত মৌলিক বিষয় ঠিক না করে প্রকাশনার জগতে, বিশেষ করে অনুবাদের ক্ষেত্রে বিদেশের কাছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি ঠিক করার প্রয়াস ঠিক কতটা কাণ্ডজ্ঞান ও বাস্তবসম্মত? অনুবাদস্বত্ব ক্রয় করে অনুবাদ করতে পারলে খুবই ভালো, কিন্তু আমাদের বইয়ের একটি সংস্করণের যে মুদ্রণসংখ্যা ৩০০ থেকে ৫০০, তা নিঃশেষিত হওয়ার কাল পরিধি, কমপক্ষে তিন থেকে চার বছর, কপিরাইট ক্রয়ের উচ্চ ব্যয়, অনুবাদকের সম্মানজনক মজুরিএকটি ভালো অনুবাদে যে বিপুল সময় ব্যয় হয় তার দামসহ, সেই সঙ্গে বিবেচনায় আসবে, প্রকাশকদের আর্থিক অবস্থা, প্রকাশকের মুনাফা, বিপণন খরচ, এসব মাথায় রেখে শুধু একটা কথাই বলবোনেসেসিটি নোউজ নো ল।

আমাদের এত সমৃদ্ধ সাহিত্য থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা বিশ্বসাহিত্যের মূল স্রোতে জায়গা করে নিতে পারছি না? এর জন্য কি বিশ্বমানের অনুবাদকের অভাব দায়ী?

হাবীব: এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, শিক্ষানীতি শিক্ষাব্যবস্থা, গ্রন্থ পাঠের সংস্কৃতি, বাংলাসহ নানা ভাষাচর্চা বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আমাদের মূল্যবোধের চর্চা, দূরদৃষ্টি, সঠিক পরিকল্পনা, জ্ঞানের জগতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও বাজার সম্পর্কে আমাদের সম্যক জ্ঞান, ইত্যাদি নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।

সোশ্যাল মিডিয়ার ইনস্ট্যান্ট বিনোদন জায়গা করে নিচ্ছে। সেখানে দস্তয়েভস্কি, মার্কেজ বা কাফকার মতো লেখকদের ভারী ও সময়সাপেক্ষ সাহিত্য নতুন প্রজন্মের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন?

হাবীব: একথা ঠিক যে বর্তমানে আমাদের মনোযোগের সময় পরিধি কমে যাচ্ছে। আমরা অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ লঘু তরল বিষয়বস্তু বা পরিবেশনার দিকে বেশি করে ঝুঁকছি। কিন্তু সেইসঙ্গে খেয়াল করবেন যে বিশেষ করে দেশের বাইরে নানান স্থানে সৃজনশীল ও মননশীল লেখালেখির জগতে সিরিয়াস তথা চিন্তাশীল নানান প্রশ্ন ভাবনা ইত্যাদি উসকে দেবার মতো বিভিন্ন রচনা প্রকাশ হওয়া থেমে নাই। আমাদের দেশেও এ ধরনের রচনা প্রকাশিত হচ্ছে, যদিও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই চর্চাটি চালিয়ে যেতে হবে, চালাবার অনুকূল পরিবেশ যাতে থাকে সে ব্যাপারে কাজ করে যেতে হবে। থামলে চলবে না।

আপনি কি পাঠকের রুচি বা বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বই নির্বাচন করেন, নাকি নিজের বৌদ্ধিক তাড়না থেকেই বই বেছে নেন?

হাবীব: পাঠকের রুচি বা বাজারের চাহিদা খুবই গৌণ ভূমিকা পালন করে অনুবাদের জন্য আমার বই বাছাই করার ক্ষেত্রে। রচনাটি আমার খুব ভালো লেগেছে কিনা, পড়ে আনন্দ পেয়েছে কিনা, এবং সেই ভালোলাগা ও আনন্দ আনন্দ পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেবার একটি অন্তর্গত তাগিদ বোধ করছি কিনা সেটাই আমার কাছে মূল বিবেচ্য। সেটা যদি এমনও হয় যে অধিকাংশ পাঠকই রচনাটি গ্রহণ করার মতো অবস্থায় নেই, তারপরেও।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনুবাদের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি করছে। অনেক প্রযুক্তিবিদের মতে, আগামীতে হয়তো যন্ত্রই নিখুঁত অনুবাদ করে দেবে। আপনি কি মনে করেন এআই কখনো মানুষের সৃজনশীলতা, সাহিত্যিক রসবোধ এবং অনুবাদের পেছনের ‘মানবিক সহানুভূতি’-কে টেক্কা দিতে পারবে?

হাবীব: এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আপনার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অনুবাদক জীবনে এমন কোনো বই কি আছে, যেটিকে আপনি আপনার ‘মাস্টারপিস’ বা সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক কাজ বলে মনে করেন? অথবা, এমন কোনো বই কি আছে যা অনুবাদ করা আপনার আজীবনের স্বপ্ন কিন্তু এখনো হাত দেননি?

হাবীব: মাস্টারপিস না বলে বরং বলি যে কাজগুলো করে অত্যন্ত আনন্দলাভ করেছি, এবং খুব চ্যালেঞ্জ অনুভব করেছি সেরকম কয়েকটি হলো ‘গোলাপের নাম’, ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’, ‘সোফির জগৎ’ ও ‘ফাউন্ডেশন’।

কেউ যদি সিরিয়াসলি অনুবাদ সাহিত্যকে পেশা বা জীবনের ব্রত হিসেবে নিতে চায়, সেই সব তরুণ অনুবাদকদের প্রতি আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী হবে?

হাবীব: পরামর্শ দেয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই আসলে। এক্ষেত্রে শুধু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই। অনুবাদের কাজটা করে আনন্দ পাওয়া জরুরি। ভালোবাসা জরুরি। আনন্দ পেলে, ভালোবাসা অনুভব করলেই বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেয়া বা পেশা হিসেবে নেয়ার কথা উঠতে পারে। যদিও কেবল অনুবাদকে পেশা হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশে বেঁচে থাকা যায় না বললেই চলে। এর পরে রয়েছে, যে ভাষা থেকে আর যে ভাষায় অনুবাদ করা হবে সেই দুই ভাষা ভালো করে রপ্ত করার চেষ্টা করা। এই দুই ভাষার নানান রচনা পাঠ করে দুই ভাষার ওপর যথেষ্ট দখল আনা সারা জীবনব্যাপী একটা কাজ। সেই সঙ্গে কোন ধরনের কাজ অনূদিত হয়েছে সে সবের খোঁজ খবর রাখা, এবং নিজের পছন্দ এবং রুচি অনুসারে বিশেষ করে এখনো অনুবাদ না হওয়া কাজগুলো অনুবাদে হাত দেওয়া।

সম্পর্কিত