ইরানে ফের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের, সমঝোতার লঙ্ঘন বলল তেহরান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪১
হরমুজ প্রণালিতে টহলরত আইআরজিসি নৌবাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগে ইরানে ফের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এই তথ্য জানায়। এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছে ইরান। কড়া জবাবের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। খবর আলজাজিরা ও সিএনএনের।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কেশম দ্বীপ, সিরিক ও বন্দর আব্বাসে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সিরিক বন্দরের একটি বাণিজ্যিক ডকে আঘাত হানার পর স্প্লিন্টারের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মিনাব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আইআরআইবি আরও জানিয়েছে, কেশম দ্বীপে ছয়টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি বৃহত্তম দ্বীপ এবং জলপথটির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। আর সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এই বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অধিকাংশ হামলা বেসামরিক এলাকাগুলোকে’ লক্ষ্য করে করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইনে বিামন হামলার সাইরেন বেজেছে। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কুনা জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়েছে। তবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আর বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণকে ‘শান্ত থাকতে এবং নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে যেতে’ বলেছে।

৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের বাহিনী ইরানে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। আপাতত অভিযান শেষ বলেও জানিয়েছে।

সেন্টকম বলেছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার সাইট এবং সেই সঙ্গে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর আঘাত হেনেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোর দিয়ে পণ্য চলাচল সচল রাখতে এবং ইরানের হামলার ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে হরমুজ প্রণালি ও এর কাছাকাছি এলাকায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি ছোট নৌকাতেও আঘাত করা হয়েছে।

ইরানি তেল বিক্রিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধা বাতিল করার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালাল। এর আগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানায়, ইরানের তেল বিক্রি নিয়ে গত জুন মাসে ঘোষিত একটি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ওই লাইসেন্সে ইরানকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি এবং সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার ইরানি বাহিনীর

ইরানি সামরিক বাহিনীর খাতাম-আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এই হামলাকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে।

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন আয়োজনের মধ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে উল্লেখ করে বাহিনীটি বলেছে, তারা এর ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেবেন।

এ ছাড়া হরমুজ ব্যবস্থাপনায় ইরান কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না জানিয়ে বলা হয়, প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাংকার চলাচলের একমাত্র নিরাপদ পথ হলো ইরান কর্তৃক নির্ধারিত রুট।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘চুক্তি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলায় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে ইরান। দেশটির পক্ষে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এমওইউ লঙ্ঘনের বেশ কয়েকটি ‘বড় ধরনের ঘটনা’র তালিকা তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রণালিতে ইরানি বিন্যাস লঙ্ঘন’, ‘আরও হামলার অবিরাম হুমকি’, ‘তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল’, ‘দক্ষিণ ইরানে হামলা’ এবং লেবাননে ‘চলমান জায়নবাদী আগ্রাসন’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমওইউর শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

গালিবাফ আরও বলেন, ‘জোরজবরদস্তি ও নিপীড়নের যুগ শেষ। এতে কোনো লাভ হবে না। আমরা পিছু হটব না।’

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে এবং এই জলপথ দিয়ে নিরাপদ ট্রানজিট নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালির রুট দিয়ে যেকোনো যাতায়াত ইরানি পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর ইরাক থেকে দেশে ফিরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আইআরআইবি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ হামলার পর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরাকের নাজাফ শহর থেকে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন আয়োজনের সূচি অনুযায়ী বর্তমানে তার কফিন পাশের দেশ ইরাকের নাজাফে রয়েছে। সেখান থেকে ইরাকের কারবালায় নিয়ে যাওয়ার কথা। এরপর ৯ জুলাই দাফনের জন্য ইরানের মাশহাদ শহরে ফিরিয়ে আনা হবে। এই বহরে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত