বান্দরবানে পাহাড় ধসের শঙ্কায় ৫ হাজার পরিবার, আটকা পড়েছে শতাধিক পর্যটক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দরবান ও থানচি

বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাসতি গড়েছে অনেক পরিবার। স্ট্রিম ছবি

বান্দরবানে টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পাঁচ হাজার পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে অব্যাহত বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়ে এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটক ও জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) এক গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী তিনদিন বান্দরবান পার্বত্য জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনসহ জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালনের জন্য অনুরোধ করা হয়।

সোমবার রাত থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবানে ১২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে জেলা আবহাওয়া অফিস। তবে দুপুর ৩টার দিকে এর পরিমাণ ছিল ১৪৯ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের কারণে বান্দরবান-থানচি সড়কের কয়েকটি স্থানে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ধসে পড়া মাটি সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ করেন। এছাড়া থানচির সঙ্গে তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের এবং লামা-আলীকদমের কিছু সড়কে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জেলা সদরের কয়েকটি এলাকাতেও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

থানচি–বান্দরবান সড়কের নীলগিরি এলাকায় পাহাড়ধসে পড়া পাথর অপসারণে সেনাবাহিনীর ১৭ ইসিবি কাজ করছে। বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে থানচি ইউএনও।

থানচির রেমাক্রী বাজারের একটি রিসোর্টে আটকা পর্যটকরা। সংগৃহীত ছবি
থানচির রেমাক্রী বাজারের একটি রিসোর্টে আটকা পর্যটকরা। সংগৃহীত ছবি

থানচিতে আটকা শতাধিক পর্যটক

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে থানচি উপজেলার তিন্দু, রেমাক্রী, নাফাখুম ও আমিয়াখুমসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে থানচি উপজেলা প্রশাসন।

প্রশাসন জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে স্থানীয় রিসোর্ট মালিকদের মাধ্যমে পর্যটকদের বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেমাক্রী বাজারের বিভিন্ন রিসোর্টে গাইডসহ ৭৪ জন পর্যটক অবস্থান করছেন। সাংগু নদীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তাদের নিরাপদে থানচি সদরে নিয়ে আসা হবে।

অন্যদিকে আমিয়াখুম এলাকার ১৮ জন পর্যটককে গাইডের সহায়তায় পায়ে হেঁটে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাইগং ঝর্ণায় আটকে থাকা ১০ জন পর্যটক ইতিমধ্যে থানচি উপজেলা সদরে পৌঁছেছেন।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য খ্যাইসাপ্রু মারমা ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এ্যান্ড্রিয় ত্রিপুরা মোবাইল ফোনে জানিয়েছেন, নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে থানচি সদরের সঙ্গে সব ধরনের নৌযোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল জানিয়েছে, সাঙ্গু নদীর তীব্র স্রোত, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে থানচির সব পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে নৌপথ ও পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত না করারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি এবং ঝুঁকি কেটে গেলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো পুনরায় ভ্রমণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে একটি পরিবার। স্ট্রিম ছবি
বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে একটি পরিবার। স্ট্রিম ছবি

ঝুঁকিতে পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দারা

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান পার্বত্য জেলার ৭ উপজেলায় ৫ হাজার ৭৫৬টি পরিবার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছে। এসব পরিবারে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ রয়েছে। তবে বেসরকারি হিসেবে এর পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।

বান্দরবান পৌরসভার ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, বনরুপা পাড়া, সিদ্দিকনগর, ক্যাচিংঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। জেলা সদরের বাইরে রুমা, লামা, আলীকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রোয়াংছড়ি উপজেলাতে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্ষায় এসব এলাকায় পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক স্ট্রিমকে বলে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ শুধু জেলা প্রশাসনের নিলে হবে না, জেলা পরিষদ ও পৌরসভা মিলে এই কাজ করতে হবে। এটাকে আরও বাস্তবায়নে করতে হলে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

পৌর প্রশাসক বলেন, পাহাড় কাটা বন্ধে জরিমানা ও মালপত্র জব্দ চলমান। এতেও যদি বন্ধ না হয়, তাহলে সাজার বিধানের দিকে যেতে হবে।

জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত