খুলনায় বনায়ন প্রকল্পের শত শত গাছে মড়ক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

ডুমুরিয়ায় সড়কের পাশের গাছে মড়ক দেখা দিয়েছে। স্ট্রিম ছবি

খুলনার শহর লাগোয়া উপজেলা-ডুমুরিয়ায় ৯টি সড়কের পাশে বনায়ন প্রকল্পের আওতায় গাছ রোপণ করেছিল সরকারের কয়েকটি সংস্থা। তবে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় গত চার বছরে এসব গাছের বেশিরভাগ মারা গেছে।

অপরদিকে উপজেলা সদর ও রংপুর ইউনিয়নের সাজিয়ারা-থুকড়া-গফফার সড়কের পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রোপণ করা প্রায় ১৭ শ নারিকেল ও তালগাছ ঝুঁকিতে পড়েছে। সড়কের পাশ ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে খনন করে ঘের তৈরি করায় ধসে পড়ছে সড়কের মাটি। ফলে গাছগুলো শিকড়হীন হয়ে নুয়ে পড়ছে।

২০০১ সালের দিকে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সরকারি অর্থায়নে সড়কগুলোর দুপাশ ঘেঁষে শিরিষ, মেহগনি, রেইনট্রি ও নিমগাছের চারা রোপণ করা হয়। বপন করা হয় বাবলাগাছের বীজও।
এসব গাছ বড় হয়ে ওঠে এবং সড়কের দুই পাশ সবুজে ছেয়ে যাওয়ায় দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তবে ২০২২ সালের মার্চের দিকে গাছগুলোর ডাল-পাতা শুকাতে শুরু করে।

এরপর একপর্যায়ে পুরো গাছের বাকল শুকিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মরতে শুরু করে গাছগুলো। মরা গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সড়কে সবুজের সমারোহ উজাড় হতে শুরু করেছে। তবে পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে অধিক সহনশীল হওয়ায় কিছু বাবলাগাছ এখনও জীবিত রয়েছে।

ডুমুরিয়া সদরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আবদুল কাদের খান বলেন, উপজেলার অধিকাংশ সড়কে কয়েক বছর আগে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি গাছ ছিল। অজ্ঞাত রোগে সড়কের পাশের শত শত গাছ মরে গেছে। আরও কয়েকশ গাছ ‘আধা মরা’ অবস্থায় আছে। গ্রামবাসী অনেকেই এসব গাছর গোড়াসহ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দেওয়া উচিত।

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার কৈয়া-মোস্তর মোড়, শৈলমারী-শরাফপুর, বসুন্দিয়া-চরচটিয়া, কাঁঠালতলা-মাগুরখালী, সুন্দরবুনিয়া-গোলাবদহ, ডুমুরিয়া-বানিয়াখালী, শাহাপুর-ফুলতলা, রংপুর-খর্নিয়া, গুটুদিয়া-শলুয়া সড়কের পাশে মৃতপ্রায় বা মরা গাছের ছড়াছড়ি।

এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইনসাদ-ইবন বলেন, একধরনের পোকা গাছের কাণ্ডে আক্রমণ করে নরম অংশ খেতে শুরু করে। ফলে গাছগুলো ধীরে ধীরে মরে যায়।
তিনি আরও বলেন, নোনাপানির প্রভাবেও গাছ মারা যেতে পারে। পোকা দমনে ব্যবস্থা নিলে জীবিত গাছগুলো রক্ষা করা সম্ভব বলে ধারণা করছেন তিনি।

সামাজিক বন বিভাগের ডুমুরিয়া উপজেলা কর্মকর্তা মো. লিয়াকাত আলী খান বলেন, ডুমুরিয়ায় সড়কের পাশে বনায়নের কিছু গাছে ভাইরাস ও কিছু গাছে পোকা হানা দিয়েছে। বালাইনাশক ছিটিয়ে আক্রান্ত গাছগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দেন তিনি। ঝুঁকিপূর্ণ মরা গাছগুলো নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান এ বন কর্মকর্তা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাবলা গাছে সাধারণত পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন হয় না। এ গাছ নোনাপানির প্রভাবেও সহজে মারা যায় না। ফলে সড়কের পাশে কেবল এ গাছগুলো টিকে গেছে।

এলজিইডির ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহম্মাদ দারুল হুদা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল সেন এ বিষয়ে বলেন, সড়কের পাশে বনায়ন প্রকল্পের গাছে মড়ক লাগার বিষয়ে তাদের জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে বনায়ন প্রকল্পের গাছগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তারা।

অন্যদিকে উপজেলা সদর ও রংপুর ইউনিয়নের সাজিয়ারা-থুকড়া-গফফার সড়কের পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে প্রায় ১৭ শ নারিকেল ও তালগাছ হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, কিছু মানুষ সারা বছরই মাছচাষের ঘের নির্মাণে সড়ক ঘেঁষে খনন করছেন। এতে ঘেরের পানির তোড়ে সড়কের মাটি ধসে যাচ্ছে। ফলে নারকেল ও তাল গাছগুলো ধীরে ধীরে শিকড়হীন হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক নারকেল ও শতাধিক তালগাছ নুয়ে পড়েছে। কিছু কিছু গাছ মারাও গেছে।
বর্তমানে গাছগুলো দেখাশোনার জন্যও কোনো পাহারাদার নেই। আশপাশের গ্রামের মানুষ, ডাব ও তাল নিয়ে যাচ্ছে। গাছের পাতা কেটে উজাড় করছে।

ঘেরের কারণের নারকেল গাছের গোড়া থেকে সরে গেছে মাটি। স্ট্রিম ছবি
ঘেরের কারণের নারকেল গাছের গোড়া থেকে সরে গেছে মাটি। স্ট্রিম ছবি

উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে উপজেলার সদর ও রংপুর ইউনিয়নের সাজিয়াড়া-থুকড়া গফফার সড়কের দুই পাশ ঘেঁষে পাঁচ কিলোমিটার সড়কে ১২ শ নারকেল ও পাঁচ শতাধিক তালের চারা রোপণ করে এলজিইডি।
রোপণ করা নারকেল ও তাল গাছগুলো পাহারা ও পরিচর্যার জন্য ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পাঁচজন নারী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ জন্য ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যান্ত মোট ৮ বছরে নারকেল ও তালগাছগুলো রক্ষায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।

উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. দারুল হুদা বলেন, শিগগিরই উপজেলা সদর ও রংপুর ইউনিয়নের সাজিয়ারা-থুকড়া-গফফার সড়কের পাশের সরকারি জায়গা নির্ধারণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সড়কের গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণে পাহারাদার নিয়োগের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে সড়কের পাশের এসব গাছ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, ‘আমি সবে যোগদান করেছি। বিষয়গুলো আমার জানা নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

সম্পর্কিত