পুশইন: ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নাকি শক্তির রাজনীতি?

একেএম শামসুদ্দিন
একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৮: ৪৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া বা ‘পুশইন’-কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুশইন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারত একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি। বাংলাদেশের অভিযোগ–যথাযথ যাচাই-বাছাই ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কিছু ব্যক্তিকে এদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার আপত্তি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সত্ত্বেও ভারত যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এটি কি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা, নাকি এর মধ্যে আছে শক্তি প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করার প্রবণতা?

কোনো রাষ্ট্রের অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত। কিন্তু সেই অধিকার আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও দ্বিপক্ষীয় দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। যদি কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি আর কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকে না; বরং অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা হিসেবেই প্রতিভাত হয়।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করার। কিন্তু সেটা অবশ্যই স্বীকৃত প্রক্রিয়ায় হতে হবে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর), মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন নির্দেশিকায় ব্যক্তির পরিচয় ও আইনি অবস্থান যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে কেবল ভাষা, ধর্ম, নাম অথবা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্য দেশের নাগরিক বলে ধরে নেওয়া আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়।

বিশেষ করে কোনো রাষ্ট্র যদি দাবি করে–একজন ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিক, তাহলে সেই দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় সাধন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। একতরফাভাবে লোকজনকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার আর সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থী বলেও গণ্য হয়।

এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা নিয়ে এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি

জাতিসংঘের অধীনে গৃহীত আইসিসিপিআর-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বলা আছে, কোনো অভিবাসীকেই আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া বহিষ্কার করা যাবে না। বহিষ্কারের আগে তার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকা উচিত। যদি কোনো ব্যক্তিকে আইনের আশ্রয়ে পরিচয় যাচাই, শুনানি বা আপিলের সুযোগ ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে এই নীতির সরাসরি বরখেলাপ হয়েছে বলে ধরা হবে।

সমষ্টিগত বহিষ্কার নিষিদ্ধ করার নীতি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বলে, অধিকসংখ্যক নাগরিক বা গোষ্ঠীকে ব্যক্তিগত পরিচয় ও পরিস্থিতি যাচাই না করে একযোগে বহিষ্কার করা উচিত হবে না। যদি কোনো রাষ্ট্র কেবল ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা সন্দেহের ভিত্তিতে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করে, তাহলে তা সমষ্টিগত বহিষ্কার নিষিদ্ধ করার নীতির লঙ্ঘন হবে।

রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকি

যদি সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিশ্চিত না করে অন্য রাষ্ট্রে ঠেলে দেওয়া হয় এবং ওই রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে, তাহলে তিনি কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন। আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বরখেলাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা

জাতিসংঘ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক মানুষের আইনসম্মত মর্যাদা পাওয়ার অধিকার আছে’, কাউকে খামখেয়ালিভাবে নির্বাসিত করা যাবে না। যদিও মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা সরাসরি বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির ভিত্তি হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

অপ্রত্যাবাসন নীতি

কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো জায়গায় ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে। এতে অপ্রত্যাবাসন নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। তবে ভারত-বাংলাদেশ পুশইন বিতর্কে এই নীতি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, এমন নয়; এটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চরিত্রগত রেকর্ডের ওপর।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নীতি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি হলো, একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া তার ভূখণ্ডে মানুষ প্রবেশ করাতে পারে না। যদি বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তবু ভারত যদি একতরফাভাবে সীমান্তের এপারে ঠেলে দেয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে। পুশহীন অব্যাহত রেখে ভারত প্রতিনিয়ত সেটিই করে যাচ্ছে।

অবৈধ প্রবেশকারী হিসেবে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য দ্বিপক্ষীয় যাচাই প্রক্রিয়া অপরিহার্য। অন্যথায় একজন রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি, শরণার্থী কিংবা এমনকি কোনো দেশের নিজস্ব নাগরিকও ভুলভাবে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার শিকার হতে পারেন।

ভারতের আচরণ কি শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত

বাংলাদেশের ধারাবাহিক আপত্তি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পরও ভারত পুশইন অব্যাহত রেখে আন্তর্জাতিক আইন তোয়াক্কা না করার মনোভাবই প্রকাশ করে চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ ধরণের আচরণকে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করার ঘৃণিত প্রবণতার সঙ্গে তুলানা করছেন।

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র। অর্থনীতি, সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে। ফলে কোনো ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে নিজ সিদ্ধান্ত যখন চাপিয়ে দেওয়া চেষ্টা করে, তখন তাকে ‘আগ্রাসী মনোভাব’-এর বহিঃপ্রকাশ বলেই গণ্য করা যায়। তবে পুশইন নিয়ে ভারতের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত এ ব্যাপারে প্রায়ই যুক্তি দিয়ে থাকে, তারা অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত অপরাধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশী দেশের আপত্তি সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ চলতে থাকলে তা পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি তৈরি করে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মুসলিম পরিচয়ের প্রশ্ন

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে পুশইন ইস্যু বোঝা সম্ভব নয়। গত এক দশক ধরে অবৈধ অভিবাসন, নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের ঘিরে যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে, তা ভারতের বিভিন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে অনেকে মনে করেন, অবৈধ অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান কেবল নিরাপত্তা নীতির অংশ নয়; এটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন সুসংহত করারও কার্যকর হাতিয়ার। এ অবস্থায় যদি কথিত বাংলাদেশি মুসলিমদের শনাক্তকরণ ও বহিষ্কারকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না; বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ অনেক বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপি ভোটারদের কাছে নিজেদের কঠোর অবস্থান প্রদর্শনের জন্য বিষয়টি সবচেয়ে বেশি তুলে ধরে। তারা অভিবাসন প্রশ্নকে জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়েও সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় ভোটারদের প্রভাবিত করতে বিজেপি রাজ্যবিশেষে হয় মুসলিম নতুবা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি ইস্যুকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুশইন ইস্যুকে আবেগের পরিবর্তে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করা। প্রতিটি পুশইনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নথিভুক্ত করতে হবে। ছবি, ভিডিও, সাক্ষ্য, স্থানাঙ্ক ও সরকারি প্রতিবেদন সংরক্ষণ করতে হবে। যদিও নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের ডিজি পর্যায়ের সম্মলনে আলোচনার তালিকায় পুশইন ইস্যুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; তবে ভারতের ওপর বিশ্বাস নেই। অভিজ্ঞতা বলে, ভারত আলোচনাকালেও গৃহীত সিদ্ধান্তের চরম লঙ্ঘন করেছে। সম্মেলনে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড জিরোতে নামিয়ে আনার কথা বলে সেদিনই গুলি করে আন্তর্জাতিক সীমানায় একাধিক বাংলাদেশির লাশ ফেলা হয়েছে। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামগুলোতেও বিষয়টি উত্থাপন করতে হবে। এতে সমস্যাটিকে কেবল বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। আধুনিক কূটনীতিতে তথ্য ও বয়ানের লড়াই অনেক সময় সীমান্ত যুদ্ধের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে, প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি নেই; আপত্তি রয়েছে ভারতের যাচাইহীন ও একতরফা পুশইন নীতির বিষয়ে। এই অবস্থান বাংলাদেশের নৈতিক ও আইনি ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো তথ্যসমৃদ্ধ কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ধৈর্য।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

সম্পর্কিত