ভূমিকম্প মানুষ মারে না, মারে দুর্বল ভবন: আসছে কি মহাবিপর্যয়

মেহেদী আহমেদ আনসারী
মেহেদী আহমেদ আনসারী

স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রকৃতির এই মৃদু সতর্কবার্তা কি আমরা টের পাচ্ছি? রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি দূরে নয় (৪০০-৪২০ কিলোমিটার)। ভূমিকম্পের গভীরতা তুলনামূলক কম (শ্যালো ডেপথ) হওয়ায় এর তীব্র কাঁপুনি আমরা সেভাবে টের পাইনি। কিন্তু একই দূরত্বে এই মাত্রার ভূমিকম্পটি যদি ৭ মাত্রার হতো, তবে এর ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব হতো ভয়াবহ।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমাদের দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি চক্র বা 'রিটার্ন পিরিয়ড' রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৭৬২ সালে আরাকানে ৮ বা এর কাছাকাছি মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হয়েছিল। সে হিসেবে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো এখনই আঘাত হানবে না, কারণ সেই পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।

তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, ৭ বা ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়— ১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭.৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল আর্থকোয়েক ৭.১ (যে ফল্টের ওপর ভিত্তি করে যমুনা সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে), ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০-২০০ বছরের চক্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এখন যেকোনো সময় ঘটার অপেক্ষায় রয়েছে।

বাংলাদেশের আশেপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ইন্ডিয়া বর্ডার পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার লম্বা 'ডাউকি ফল্ট' অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্লেট বাউন্ডারি-১ (আরাকান ফল্ট), প্লেট বাউন্ডারি-২ (নোয়াখালী থেকে সিলেট) এবং প্লেট বাউন্ডারি-৩ (সিলেট থেকে কাছাড়) একে অপরের সাথে সংযুক্ত থেকে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়েও আমাদের বড় চিন্তার বিষয় হলো— আমাদের প্রস্তুতি। জাইকা এবং সিডিএমপি'র একটি জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। কিন্তু এই ৭২ হাজার ভবন কোনগুলো, তা নির্দিষ্ট করা নেই। আমার জানামতে, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১৫ লাখই ছোটো বিল্ডিং, টিনশেড বা বস্তি, যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কম। কিন্তু মূল বিপদের কারণ হলো অবশিষ্ট ৬ লাখ বহুতল পাকা দালান (৪ তলার ওপরে)। এর মধ্যে আমাদের প্রাথমিক ধারণায় অন্তত ৪০ শতাংশ ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বলতে সরকার মূলত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি কেনাকেই বুঝে থাকে। কিন্তু মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভবন নির্মাণে।

প্রকৌশল বিদ্যায় একটি কথা প্রচলিত আছে, "Earthquake does not kill people, weak buildings do" (ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে)। ২০২৩ সালে তুরস্কে ব্যাক-টু-ব্যাক ৭ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মানুষ মারা গেছে মূলত ভবন ধসে চাপা পড়ে। তাই ভূমিকম্প থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে ভবনকে উপযুক্তভাবে নির্মাণ করার এবং পুরোনো ভবনগুলো মজবুতীকরণ করার কোনো বিকল্প নেই।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বলতে সরকার মূলত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি কেনাকেই বুঝে থাকে। কিন্তু মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভবন নির্মাণে। ভবন ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একজন মানুষকে জীবিত বা মৃত উদ্ধার করতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। অথচ একটি বহুতল আবাসিক ভবনকে (৫ কাঠা) রেট্রোফিটিং বা মজবুত করতে খরচ হয় আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। একটি ভবনে যদি ১০টি ফ্ল্যাট থাকে এবং মালিকরা প্রত্যেকে ৫-৬ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন, তবে ওই ভবনের ৫০ জন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। রানা প্লাজা ধসের পর বিদেশি ক্রেতাদের চাপে আমরা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার তৈরি পোশাক কারখানা মজবুত করেছি। এখানে সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি, মালিকরাই নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে তা করেছেন। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে এই বাস্তবতা বুঝতে হবে।

যদি ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে আমাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। এর সাথে আহতদের চিকিৎসা, পরিবারগুলোর পথে বসা এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির নেই। তাই নতুন সরকারকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো তাদের জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা করে রাখে। আমাদের দেশে এমন কোনো 'ডিজাস্টার ফান্ড' নেই। দুর্যোগ এলে তারপর আমরা টাকার খোঁজ করি। এই নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন করা জরুরি।

আমাদের 'স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট' (এসওডি) নামে একটি নির্দেশিকা রয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক এবং করণীয় নির্ধারণের কথা বলা আছে, যা বর্তমানে অনেকটাই উপেক্ষিত। বড় বিপর্যয়ের আগেই আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

প্রথমত, স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সদ্য স্নাতক হওয়া সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের 'ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড'-এর ওপর ৩ মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং পেশাজীবী ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের রিফ্রেশার কোর্স করাতে হবে। কারণ আমাদের প্রকৌশলীদের মধ্যেও ভূমিকম্প সহনশীল নকশা সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাজউকের আওতাধীন ১৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ৮টি জোনে ভাগ করে জোন-ভিত্তিক ভবনের অবস্থা যাচাইয়ের কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে।

তৃতীয়ত, নতুন ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান ভবনের মূল্যায়নের জন্য 'থার্ড পার্টি ভেরিফিকেশন' বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এই নিরপেক্ষ পরামর্শক সংস্থা ছাড়পত্র দিলেই কেবল রাজউক বা সিটি কর্পোরেশনগুলো 'অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' (ব্যবহারের সনদ) প্রদান করবে।

সর্বোপরি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভূমিকম্প আজ হোক বা কাল, আসবেই। আমরা যদি কেবল উদ্ধারকাজের প্রস্তুতির আশায় বসে থাকি, তবে মহাবিপর্যয় এড়ানো যাবে না। কিন্তু আমরা যদি আমাদের ভবনগুলোকে সঠিকভাবে তৈরি এবং মজবুত করতে পারি, তবে অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব। এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর, নিজেদের নিরাপদ করার।

  • মেহেদী আহমেদ আনসারী: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত